জীবনে এমন কত বিচ্ছেদ, কত মৃত্যু আছে, ফিরিয়া লাভ কি? পৃথিবীতে কে কাহার…

পশ্চিমাদের কাছে ‘বাংলাদেশের প্রিন্স’ হিসেবে পরিচিত তিনি। সম্পদশালী ধনকুবের হিসেবে বিশ্বব্যাপী খ্যাতি তার। ধারণা করা হয়, তিনিই বাংলাদেশের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি। কিন্তু কে এই রহস্যের রাজপুত্র? লোকের মুখে মুখে আছে তার বিচিত্র ও বর্ণাঢ্য জীবনের অনেক চমকপ্রদ ও চাঞ্চল্যকর ঘটনা। তার বিপুল সম্পদরাজি, তার চলন-বলন সব মিলে রহস্যের যেন শেষ নেই। প্রায় তিন দশক ধরে সেই রহস্যের নাম মুসা বিন শমসের।
প্রিন্স মুসা বলেও তার পরিচিতি ছড়িয়েছে। কিন্তু কেন তিনি প্রিন্স, তার বিপুল সম্পদের উৎসই বা কী- সে তথ্য এখনও রয়ে গেছে অজানা; বরং তিনি বারবার মিডিয়ায় মুখরোচক আলোচনার খোরাক জুগিয়েছেন তার পরিকল্পিত কিংবা খেয়ালি কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে।
একবার ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারকে নির্বাচনে ৫০ লাখ পাউন্ড অনুদানের ঘোষণা দিয়ে, একবার আয়ারল্যান্ডের জাতীয় ঐতিহ্য কালকিনি দুর্গ কিনে নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সদর দপ্তর বানানোর প্রস্তাব দিয়ে।
সর্বশেষ সুইস ব্যাংকে তার সাত বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ৫১ হাজার কোটি টাকা বাজেয়াপ্ত হওয়ার খবরের মধ্য দিয়ে মুসা বিন শমসের চমক সৃষ্টি করেছেন সারা দুনিয়ায়।
আরও বিস্ময় হচ্ছে, দক্ষিণ আফ্রিকার বিশ্বনন্দিত নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘লং ওয়াক টু ফ্রিডম’ বইটি উপহার হিসেবে দিয়েছিলেন তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু বাংলাদেশের ফরিদপুরের মুসা বিন শমসেরকে!
অবশ্য মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষক ডা. এম এ হাসানের ‘পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধী’ গ্রন্থে ১৯৭১ সালে সে সময়ের তরুণ মুসা বিন শমসেরের ভিন্ন পরিচয় পাওয়া যায়।
ওই গ্রন্থের তথ্য-প্রমাণ অনুযায়ী মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মুসা ছিলেন পাকিস্তানি সেনা অফিসারদের ঘনিষ্ঠজন আর মুক্তিকামী বাঙালির আতঙ্ক।
সর্বশেষ বৃহস্পতিবার আরও একবার মুসা বিন শমসের আলোচনায় এলেন দুদকে জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হয়ে। সেখানেও তার রাজকীয় পদার্পণ।
চার নারী নিরাপত্তাকর্মীসহ ৪০ জনের ব্যক্তিগত দেহরক্ষীর বহর নিয়ে তিনি দুদকের ফটকে গাড়ি থেকে নামেন। সে মুহূর্তে তার ডান হাতে শুভ্র আলোর দ্যুতি; হাতে তার হীরকখচিত বিশ্বখ্যাত রোলেক্স ব্র্যান্ডের অতি দামি ঘড়ি।
ওই ঘড়ির দাম ৫০ লাখ মার্কিন ডলার। ২০০৯ সালের ১৪ নভেম্বর সংখ্যায় ব্রিটেনের প্রভাবশালী মিডিয়া দ্য উইকলি নিউজের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন থেকে মুসা বিন শমসের ব্যবহৃত এই বিখ্যাত ঘড়ির দাম জানা গিয়েছিল। এ ধরনের ঘড়ি বিশেষ অর্ডারে বানিয়ে নিতে হয়; কোম্পানি সাধারণভাবে বিক্রির জন্য তা তৈরি করে না।
ওই প্রতিবেদনে তার ব্যবহৃত একটি কলমের দাম উল্লেখ করা হয় ১০ লাখ মার্কিন ডলার, যে কলমে সাত হাজার ৫০০টি হীরক খণ্ড আর ২৪ ক্যারেট স্বর্ণ ব্যবহার করা হয়। এই কলম দিয়েই তিনি সুইস ব্যাংক অ্যাকাউন্টের চেকে স্বাক্ষর করেন। কলমটি রক্ষিতও হয় সুইস ব্যাংকেই একটি ভল্ট ভাড়া নিয়ে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছিল, প্রিন্স মুসা বিন শমসের তার অঙ্গসজ্জায় ব্যবহার করেন ৭০ লাখ ডলারের বেশি দামের গহনা। প্রতিদিন গোসলেই তার ব্যয় হয় প্রায় পাঁচ হাজার ডলার।
ওই প্রতিবেদনে সবচেয়ে বড় চমক ছিল সুইস ব্যাংকে মুসা বিন শমসেরের সাত বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমপরিমাণ অর্থ জব্দ হওয়া। আর ওই অর্থ জব্দের মূলে ছিল তার সেই বিখ্যাত হীরকখচিত কলম। কারণ, কলম ভল্টে রাখার বিপরীতে নিয়মিত রাজস্ব পরিশোধ না করায় সুইস ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তার কলম তুলতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।
মুসা বিন শমসেরও নাছোড়বান্দা_ ওই কলম ছাড়া তিনি কিছুতেই ব্যাংকের চেক কিংবা অন্য কোনো কাগজপত্রে স্বাক্ষর করবেন না।
ফলে সুইস ব্যাংকে তার লেনদেন অনিয়মিত হয়ে পড়ে। এ কারণে নোটিশের প্রায় নয় মাস পর ২০০৯ সালের জানুয়ারি মাসে ব্যাংকে রক্ষিত তার সাত বিলিয়ন ডলারই জব্দ ঘোষণা করে সুইস ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।
সেই সাত বিলিয়ন ডলার অর্থ নিয়ে কিছুদিন আগে বিজনেস এশিয়ায় আরও একটি প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। সেই প্রতিবেদন থেকেই দুদকের টনক নড়ে। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাক পড়ে মুসা বিন শমসেরের।
জিজ্ঞাসাবাদ শেষে সাংবাদিকদেরও সেই ৫১ হাজার কোটি টাকার গল্প শুনিয়ে দেশে পদ্মা সেতু নির্মাণসহ জনকল্যাণে তার অনেক বড় বড় স্বপ্নের কথাও বলেছেন মুসা।
তার ব্যবসা ঘিরেও রয়েছে নানা রহস্য। এ পর্যন্ত মুসাকে নিয়ে দুনিয়ার বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে যত খবর এসেছে, তার প্রতিটিতে বলা হয়েছে, তার মূল ব্যবসা অস্ত্র। অস্ত্রের ব্যবসা কতটা বৈধ, কতটা অবৈধ- তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে জনমনে। আর দেশে পরিচিত ব্যবসা বলতে জনশক্তি রপ্তানি প্রতিষ্ঠান ডেটকো। দেশে জনশক্তি রপ্তানিতে প্রতিষ্ঠানটি শীর্ষস্থানীয়, কিন্তু তার আয়-ব্যয়ের হিসাব কত?
বিশ্বখ্যাত ফোর্বস ম্যাগাজিনের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি মুসা বিন শমসের। ম্যাগাজিনে তার ব্যবসায়িক পরিচয়ে লেখা রয়েছে অস্ত্র সরবরাহকারী।
ফোর্বসের তথ্য অনুযায়ী, মুসা বিন শমসেরের মোট অর্থের পরিমাণ ১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ৯৫ হাজার কোটি টাকা)। এর মধ্যে সাত বিলিয়ন ডলার আইনি জটিলতায় আটকে আছে সুইস ব্যাংকে।
বেশভূষা, অঙ্গসজ্জা ও পানাহার
বেশভূষা ও অঙ্গসজ্জায় মুসা ব্যবহার করেন ১৬ ক্যারেটের একটি রুবি। যার দাম ১০ লাখ ডলার। ৫০ হাজার ডলার দামের একটি চুনিও পরেন তিনি। এ ছাড়াও পরেন ৫০ হাজার ডলার মূল্যের একটি হীরা ও এক লাখ ডলার মূল্যের একটি পান্না (এমেরাল্ড)।
নিত্যদিনের চলাফেরায় অথবা বিশেষ কোনো অনুষ্ঠানে তিনি ৭০ লাখ ডলারের বেশি মূল্যের গহনা-অলঙ্কার পরেন। তার পরনের কয়েকটি স্যুট স্বর্ণসুতাখচিত। তাকে কখনো এক স্যুট পরিহিত অবস্থায় দুবার দেখা যায় না। প্রতিটি স্যুটের মূল্য পাঁচ থেকে ছয় হাজার পাউন্ড। প্রতিদিন তিনি গোসল করেন গোলাপ পানিতে। আর বাংলাদেশী পানি তিনি পান করেন না। বিদেশ থেকে আমদানি করা পানি তিনি পান করেন।
মুসার প্রাসাদ
রাজধানীর অভিজাত গুলশান এলাকার সুরম্য প্রাসাদে মুসার বসবাস। প্রাসাদের সাজসজ্জাও চোখধাঁধানো। ঘরগুলোর মেঝে মহামূল্যবান কার্পেটে মোড়া। লিভিংরুমের আকর্ষণ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে সুপরিসর ডাইনিং স্পেস। সব মিলিয়ে মুসার প্রাসাদটি যেন স্বপ্নপুরী।
হীরার জুতা
হীরকখচিত যে জুতা পরেন তার প্রতি জোড়ার মূল্য এক লাখ ডলার। তার সংগ্রহে রয়েছে রত্নখচিত হাজারো জুতা।
মুসার কলম
এক কোটি ডলার মূল্যের মন্ট বাল্ক কলম ব্যবহার করেন তিনি। ফ্রান্সের তৈরি ওই কলম মাত্র একটিই তৈরি করেছে নির্মাতা কোম্পানি। ২২ ক্যারেট স্বর্ণের তৈরি ওই কলমটিতে রয়েছে ৭৫০০টি হীরক খণ্ড। এক কোটি ডলারের বেশি লেনদেনের ক্ষেত্রে তিনি ওই কলম ব্যবহার করেন
বর্তমানে ওই কলমসহ সাত বিলিয়ন মার্কিন ডলার সুইস ব্যাংকে আটকা রয়েছে। এ কলম ও অর্থ ফেরত পেতে পাঁচ বছর আগেই মামলা করেছেন তিনি। যে কোনো সময় ওই অর্থ ও কলম ফেরত পেতে পারেন।
শেখ সেলিমের বেয়াই
মুসা বিন শমসেরের ছেলে ববি হাজ্জাজ জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদের বিশেষ উপদেষ্টা। ববি আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিমের জামাই।
ফলে মুসা বিন শমসের ক্ষমতাসীন দলের নেতা শেখ সেলিমের বেয়াই।
মুসা বিন শমসের নামে এখন পরিচিত হলেও তার নাম এ ডি এম (আবু দাউদ মোহাম্মদ) মুসা। তার জন্ম ১৯৫০ সালের ১৫ অক্টোবর ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার কাজিকান্দা গ্রামে।। তার বাবা শমসের আলী মোল্লা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সরকারের কর্মকর্তা ছিলেন।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: