জীবনে এমন কত বিচ্ছেদ, কত মৃত্যু আছে, ফিরিয়া লাভ কি? পৃথিবীতে কে কাহার…

সাইফ বরকতুল্লাহ: আরজ আলী মাতুব্বর। পেশায় ছিলেন গ্রাম্য কৃষক। বাস্তবে ছিলেন জ্ঞানপিপাসু দার্শনিক, গবেষক। মাত্র দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত অথচ কি গভীর জ্ঞান ছিল তার! ৮৬ বছরের জীবনকালে ৭০ বছরই লাইব্রেরিতে কাটিয়েছেন পড়াশোনা করে। মুক্তচিন্তার আলোর মশাল তিনি, যার বেড়ে ওঠা এই দেশেরই মাটি এবং মানুষের মধ্য থেকে। সমাজ দর্শনের পথিকৃত হিসেবে আরজ আলী মাতুব্বর আজ সমাদৃত।
বাল্যকালেই তিনি শিকার হন ধর্মের নামে এক চরম অর্ধমের মানসিক নির্যাতনের। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আরজ আলী মাতুব্বরের এক বক্তৃতায় বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ওই বক্তৃতায় তিনি বলেছেন :
‘‘আমার মা ছিলেন অতিশয় নামাজী-কালামী একজন ধার্মিকা রমণী। তার নামাজ-রোজা বাদ পড়া তো দূরের কথা, কাজা হতেও দেখিনি কোনোদিন আমার জীবনে। মাঘ মাসের দারুণ শীতের রাতেও তার তাহাজ্জত নামাজ কখনো বাদ পড়েনি এবং তারই ছোঁয়া লেগেছিল আমার গায়েও কিছুটা। কিন্তু আমার জীবনের গতিপথ বেঁকে যায় মায়ের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে একটি দুঃখজনক ঘটনায়। সে ঘটনাটি আমাকে করেছে অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে দ্রোহী।
১৩৩৯ সনে আমার মা মারা গেলে আমি মৃত মায়ের ফটো তুলেছিলাম। আমার মাকে দাফন করার উদ্দেশ্যে যে সমস্ত মুন্সী, মৌলভী ও মুছল্লিরা এসেছিলেন, ‘ফটো তোলা হারাম’ বলে তারা আমার মা’র নামাজের জানাজা ও দাফন করা ত্যাগ করে লাশ ফেলে চলে যান। অগত্যা কতিপয় অমুছল্লি নিয়ে জানাজা ছাড়াই আমার মাকে সৃষ্টিকর্তার হাতে সোপর্দ করতে হয় কবরে। ধর্মীয় দৃষ্টিতে ছবি তোলা দূষণীয় হলেও সে দোষে দোষী স্বয়ং আমিই, আমার মা নন। তথাপি কেন যে আমার মায়ের অবমাননা করা হলো, তা ভেবে না পেয়ে আমি বিমূঢ় হয়ে মার শিয়রে দাঁড়িয়ে তার বিদেহী আত্মাকে উদ্দেশ্য করে এই বলে সেদিন প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, ‘মা। আজীবন ছিলে তুমি ধর্মের একনিষ্ঠ সাধিকা। আর আজ সেই ধর্মের নামেই হলে তুমি শেয়াল কুকুরের ভক্ষ্য। সমাজে বিরাজ করছে এখন ধর্মের নামে অসংখ্য অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কার। তুমি আমায় আর্শীবাদ করো, আমার জীবনের ব্রত হয় যেনো কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাস দুরীকরণ অভিযান।’’
আরজ আলী মাতুব্বর ছিলেন অপ্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষিত ও মুক্তবুদ্ধি চর্চায় অগ্রসর এক অসাধারণ মানুষ। তাঁর চেতনা ছিল লোকায়ত অথচ বিজ্ঞানসম্মত। তিনি সরল ও সহজ ভাষায় প্রাণের আর্তি প্রকাশ করে গেছেন তাঁর রচনাসম্ভারে। তিনি তার প্রগতিশীল সাহিত্যকর্মের জন্য পাকিস্তান আমলে সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ হন।
আরজ আলী মাতুব্বরের জন্ম বরিশালের লামচরি গ্রামে ১৩০৭ বঙ্গাব্দের (১৯০০ সাল, ১৭ ডিসেম্বর) ৩রা পৌষ। জন্মের চার বছরের মাথায় পিতা এন্তাজ আলী মাতুব্বর মৃত্যুবরণ করেন। আরজ আলীরা ছিলেন পাঁচ ভাইবোন। আরজ আলী মাতুব্বরের প্রকৃত নাম ছিলো ‘আরজ আলী’। আঞ্চলিক ভূস্বামী হওয়ার সুবাদে তিনি ‘মাতুব্বর’ নাম ধারণ করেন। গ্রামের মক্তবে কিছুকাল পড়াশোনা করেন। যেখানে শুধু কোরআন এবং ইসলামিক ইতিহাস বিষয়ে শিক্ষা দেওয়া হতো। তিনি নিজ চেষ্টা ও সাধনায় বিজ্ঞান, ইতিহাস, ধর্ম ও দর্শনসহ বিভিন্ন বিষয়ের উপর জ্ঞান অর্জন করেন। ধর্ম, জগত ও জীবন সম্পর্কে নানামুখী জিজ্ঞাসা তাঁর লেখায় উঠে এসেছে। যা থেকে তাঁর প্রজ্ঞা, মুক্তচিন্তা ও মুক্তবুদ্ধির পরিচয় পাওয়া যায়। তিনি বরিশাল মেডিকেল কলেজকে মরণোত্তর চক্ষু ও দেহ দান করেছিলেন। জ্ঞান বিতরণের জন্য তিনি তার অর্জিত সম্পদ দিয়ে গড়ে তুলেছিলেন ‘আরজ মঞ্জিল পাবলিক লাইব্রেরি’।
আরজ আলী মাতুব্বরকে নিয়ে আনু মুহাম্মদ তাঁর লেখা ‘প্রশ্নের শক্তি : আরজ আলী মাতুব্বর`- এ লিখেছেন :
‘‘জ্ঞানের কি ডিগ্রী হয়? নিজের নামে পাননি বলে অন্যের নামে বরিশাল পাবলিক লাইব্রেরি থেকে বই এনে পড়েছেন। এক পর্যায়ে এসে স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি ওয়ারিশদের বুঝিয়ে দিয়ে কাজ করেছেন লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠার জন্য। আরজ আলী মাতুব্বর বলেছেন, ‘দিনমজুরী করেছি মাঠে মাঠে আমিনগিরি রূপে। …টাকা আমার নেই। আর জীবিকা নির্বাহের জন্য আমার টাকার প্রয়োজনও নেই।’ নির্মাণ খরচ কমানোর জন্য লাইব্রেরি তৈরির সময় নিজে শ্রম দিয়েছেন। তিনি খুব পরিষ্কার ছিলেন এই বিষয়ে যে, ‘বস্তুতঃ বিদ্যাশিক্ষার ডিগ্রী আছে, কিন্তু জ্ঞানের কোনো ডিগ্রী নেই। জ্ঞান ডিগ্রীবিহীন ও সীমাহীন। সেই অসীম জ্ঞানার্জনের মাধ্যম স্কুল-কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় নয়, তা হচ্ছে লাইব্রেরি।’’
তার লিখিত বইয়ের মধ্যে ‘সত্যের সন্ধান’, ‘সৃষ্টি রহস্য’, ‘সীজের ফুল’, ‘শয়তানের জবানবন্দী’ অন্যতম। আরজ আলীর রচিত পাণ্ডুলিপির সংখ্যা মোট ১৫টি। এর মধ্যে তাঁর জীবদ্দশায় প্রকাশিত হয়েছিল ৪টি। এই বইগুলো হলো- ‘সত্যের সন্ধান’, ‘অনুমান’, ‘সৃষ্টি রহস্য’ ও ‘স্মরণিকা’। আরজ আলী মাতুব্বর তাঁর প্রথম বইয়ের প্রচ্ছদও আঁকেন। বইটি লিখেছিলেন ১৯৫২ সালে। প্রকাশিত হয় ১৯৭৩ সালে ‘সত্যের সন্ধানে’ শিরোনামে। বইটি তাঁকে এলাকায় ‘শিক্ষিত ব্যক্তি’ হিসেবে সুনাম এনে দিয়েছিল। বইয়ের মুখবন্ধে তিনি লিখেছিলেন :
‘আমি অনেক কিছুই ভাবছি, আমার মন প্রশ্নে ভরপুর কিন্তু এলোমেলোভাবে। আমি তখন প্রশ্নের সংক্ষেপণ লিখতে থাকি, বই লেখার জন্য নয় শুধুমাত্র পরবর্তীতে মনে করার জন্য। অসীম সমুদ্রের মতন সেই প্রশ্নগুলো আমার মনে গেঁথে আছে এবং আমি ধীরে ধীরে ধর্মীয় গণ্ডি হতে বের হতে থাকি।’
আরজ আলী মাতুব্বরের লেখায় পাঠক গ্রামীণ পটভূমির চিত্র খুঁজে পান। সেখানে মেলে অনেক প্রশ্নের উত্তর। তাঁর কিছু লেখা ইংরেজিতে ভাষান্তর করা হয়েছে। এবং তাঁর লেখাগুলো দিয়ে রচনা সমগ্রও প্রকাশিত হয়েছে। আরজ আলী মাতুব্বর ১৯৮৫ সালের ১৫ মার্চ বরিশাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ইন্তেকাল করেন।
রাইজিংবিডি

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: