জীবনে এমন কত বিচ্ছেদ, কত মৃত্যু আছে, ফিরিয়া লাভ কি? পৃথিবীতে কে কাহার…

‘সাজগোজ নিয়ে ঝগড়ায় প্রাণ গেল স্ত্রীর’ শিরোনামে রাইজিংবিডিতে গতকাল প্রকাশিত খবরের নেপথ্যে বেরিয়ে এসেছে আরো চাঞ্চল্যকর তথ্য। দেখা যায়, এই নববধূর মৃত্যুটি হঠাৎ কোনো দুর্ঘটনা নয়, কাপড় ইস্ত্রি করার আয়রন দিয়ে আঘাতের পর আঘাতে হত্যা করা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যফেরত যুবক হারুনুর রশিদ নিজের শারীরিক অক্ষমতা ঢাকতেই এই হত্যাকাণ্ডটি ঘটিয়েছেন। জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশকে এমনটিই জানিয়েছেন ওই যুবক।
জানা যায়, চার মাস নয়, মাত্র দেড় মাসে আগে বিয়ে হয়েছিল তাদের। ২৩ বছর বয়সি এই নববধূর প্রকৃত নাম হচ্ছে এ্যানি আক্তার। বিয়ের পর এই দেড় মাস সময়ে নববধূকে কোনো দাম্পত্য সুখ দিতে পারেননি ওই যুবক। শুধু নিজের শারীরিক অক্ষমতা ঢাকতেই সুন্দরী নববধূকে কাপড় ইস্ত্রি করার আয়রন দিয়ে আঘাতে আঘাতে হত্যা করেন এই পাষণ্ড। হত্যার পর পালিয়ে না গিয়ে নিজেকে পুলিশের কাছে সমর্পিত করেন হারুনুর রশিদ। গ্রেফতারের পর পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে দাম্পত্য সম্পর্কে নিজের শারীরিক অক্ষমতা এবং এই অক্ষমতা ঢাকতেই নববিবাহিতা স্ত্রীকে খুন করার কথা পুলিশের কাছে অকপটে স্বীকার করেন তিনি।
উল্লেখ্য, গত মঙ্গলবার সকালে চট্টগ্রাম মহানগরীর হালিশহর থানার বড়পুল এলাকায় নববধূ এ্যানি আক্তারকে নির্মমভাবে হত্যা করে পাষণ্ড স্বামী হারুনুর রশিদ। এই ঘটনায় ঘাতক হারুনুর রশিদ ও তার পিতা-মাতাকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে ঘাতক হারুন যা বললেন :
স্ত্রীর খুনি স্বামী হারুনুর রশিদ জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশকে জানান, খুনের আগের রাতে স্ত্রীকে নিয়ে সপরিবারে বোনের বাড়িতে দাওয়াত খেতে গিয়েছিলেন। দাওয়াত খেয়ে ফিরে রাত ১২টার দিকে হারুন তার স্ত্রীকে নিয়ে নিজের শয়নকক্ষে ঘুমাতে যান। ঘুমাতে যাওয়ার পর শারীরিক সম্পর্ক নিয়ে তার স্ত্রীর সঙ্গে মনোমালিন্য ও তর্কবিতর্ক হয়।
হারুনের অভিযোগ, এরপর রাতে স্ত্রীকে কাছে পেতে চাইলে তার ডাকে সাড়া দেননি এ্যানি। এই পর্যায়ে স্ত্রী তাকে অপমানিত করে বলেও পুলিশকে জানান হারুন। একপর্যায়ে স্ত্রী ঘুমিয়ে গেলেও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে ঘুমাতে পারছিলেন না হারুন।
হারুন জানান, ‘মানসিক অস্থিরতার কারণে আমি স্ত্রীর পাশেই সারা রাত জেগে থাকি। ভোর সাড়ে ৬টায় হঠাৎ এ্যানিকে খুন করার চিন্তা চলে আসে মাথায়।’
সকালে ঘুম থেকে জেগে যদি এ্যানি বাসার সবাইকে তার শারীরিক অক্ষমতার কথা বলে দেয়- এই আশঙ্কা থেকেই স্ত্রীকে খুন করার পরিকল্পনা নেন হারুন। এই সময় হাতের কাছে থাকা কাপড় ইস্ত্রি করার আয়রন দিয়ে ঘুমন্ত স্ত্রীর মাথায় সজোরে আঘাত করেন হারুন। প্রথম আঘাতে এ্যানি রক্তাক্ত হয়ে যায় এবং বাঁচার আকুতি নিয়ে চিৎকার করতে চাইলে আরো কয়েকটি আঘাত করে মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়।
হারুন যখন তার স্ত্রীকে নির্মমভাবে হত্যা করছিল, বাসার অন্য রুমগুলোতে পরিবারের অন্য সদস্যরা ঘুমে। স্ত্রীর মৃত্যু নিশ্চিত হয়ে রক্তে পুরো বিছানা ভেসে গেলেও হারুন তখন স্ত্রীর লাশের পাশে বসে থাকেন। সকাল ৭টার দিকে হারুনের পিতা আবুল কালাম (৮৩) তার পুত্রবধূ ঘুম থেকে না ওঠায় তাকে ডাকতে গেলে প্রথমেই খুনের বিষয়টি জানতে পারেন তিনি। পরে বাসার অন্য সদস্যরা ঘটনা জেনে যায়। আশপাশে বসবাসকারীদের মধ্যেও ঘটনা জানাজানি হয়।
পরে খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছায় পুলিশ। আটক করা হয় ঘাতক হারুনুর রশিদ ও তার বয়োবৃদ্ধ পিতা-মাতাকে। গ্রেফতারের পরপরই শারীরিক অক্ষমতা ঢাকতে স্ত্রীকে একাই হত্যা করেছেন বলে পুলিশের কাছে স্বীকার করেন হারুনুর রশিদ।
হারুন পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে আরো জানান, তিনি ২০০৭ সালে আবুধাবিতে যান চাকরি নিয়ে। সেখানে ‘আলতারামান’ নামে একটি সাপ্লাই কোম্পানিতে চাকরি করতেন। গত সেপ্টেম্বরে পাঁচ বছর পর দেশে আসেন হারুন। এরপর পারিবারিক পছন্দে সীতাকুণ্ড উপজেলার ডেকোরেশন ব্যবসায়ী মোহাম্মদ ইউনুছের কন্যা এ্যানিকে বিয়ে করেন।
হারুন পুলিশকে বলেন ‘আমি ভুল করেছি। আমি আমার স্ত্রীকে মেরে যখন ফেলেছি। আমার ফাঁসি হলে হোক। খুন করে আমি পালাইনি। লাশ পাহারা দিয়ে রেখেছি দুই ঘণ্টা। এ্যানিকে আমি স্ত্রীর মর্যাদা দিতে পারিনি। কারণ, শারীরিকভাবে আমি অক্ষম। রাতে তাকে কাছে ডাকার পর সে সাড়া না দেওয়ায় আমি মানসিকভাবে ভেঙে পড়ি। সারা রাত ঘুমাইনি। খুন করার চিন্তাটা আসে হঠাৎ।’
হারুনের পারিবারিক সদস্যদের ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এ্যানির শ্বশুর আবুল কালামের তিন ছেলে ও চার মেয়ে। তিন ভাইয়ের মধ্যে হারুন সবার ছোট। মেজো ভাই বছরখানেক আগে আত্মহত্যা করেছেন। চাকরি সূত্রে হারুনের বড় ভাই পরিবার নিয়ে থাকেন আবুধাবিতে। বয়োবৃদ্ধ আবুল কালাম একসময় রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন। এখন সবাই মিলে বসবাস করছিলেন হালিশহর বড়পুল এলাকায়।
হত্যাকাণ্ডের শিকার এ্যানির পিতা মোহাম্মদ ইউনুছ রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘বড় শখ করে মেয়েকে বিয়ে দিয়েছিলাম ১০ লাখ টাকা খরচ করে। বিয়ের সময় একটি ফ্রিজ ছাড়া সাংসারিক যাবতীয় সব কিছুই যৌতুক হিসেবে দেওয়া হয়েছিল হারুনকে। শুধু একটি ফ্রিজ না দেওয়ায় আমার কন্যাকে শাশুড়ি-ননদরা নির্যাতন চালাত। বিয়ের পর মাত্র তিনবার বাবার বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিল এ্যানি।’
এই হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে হালিশহর থানার ওসি সৈয়দ আবু জাফর মো. শাহজাহান কবীর জানান, ‘মূল ঘাতককে গ্রেফতার করা হয়েছে। পুলিশের কাছে স্ত্রী খুনের দায় স্বীকার করেছে ঘাতক হারুন। আজ বুধবার সে আদালতে স্বেচ্ছায় জবানবন্দি দিতে পারে। এই ঘটনায় এ্যানির বাবা যৌতুক আইনে একটি মামলা দায়ের করেছেন। এতে ঘাতক স্বামী, শ্বশুর ও শাশুড়িকে আসামি করা হয়েছে। মামলায় ঘাতক হারুন ও তার পিতা-মাতাকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
রাইজিংবিডি

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: