জীবনে এমন কত বিচ্ছেদ, কত মৃত্যু আছে, ফিরিয়া লাভ কি? পৃথিবীতে কে কাহার…

ভ্রমণ করতে কার না ভালো লাগে। তবে সম্প্রতি প্রকাশিত এক বৈজ্ঞানিক গবেষণার খবর শোনার পর যেকোনো ভ্রমণপিপাসু বা দেশান্তরী পুরুষকে সন্দেহ হতে পারে আপনার। কেননা, ওই গবেষণায় মার্কিন দুই বিজ্ঞানীর দাবি—শুধুমাত্র কাজে-কামে কিংবা জ্ঞানভাণ্ডার সমৃদ্ধ করতেই নয়, ভ্রমণপ্রিয় পুরুষ নাকি দূরদেশে যাত্রা করে ‘প্রকৃতির আরেক চিরাচরিত ডাকে’ সাড়া দিতে!

স্ত্রী ছাড়াও অন্য একাধিক নারীর সঙ্গে যৌনমিলনের স্বপ্ন নিয়ে দেশান্তরী হয় পুরুষ। পরিব্রাজক পুরুষেরা, সাধারণ পুরুষের তুলনায় বেশি সন্তানের বাবা হয়, কারণ তারা ভ্রমণকালে একাধিক নারীর সঙ্গে যৌনমিলনে আবদ্ধ হয়।
আফ্রিকার আদিবাসী দুই সম্প্রদায়—তিউই এবং তিম্বার ওপর গবেষণা চালিয়ে এমনটাই দাবি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞানী লেইন ভাসরো এবং এলিজাবেথ ক্যাসদান। ইউনিভার্সিটি অব উতাহ-এর এই দুই নৃতত্ত্ববিদ বলেছেন, নারীর তুলনায় পুরুষই বেশি পরিব্রাজক।
গবেষকদ্বয়ের দাবি, অন্যকে প্রভাবিত বা নিয়ন্ত্রিত করার ক্ষমতা নারীর চেয়ে পুরুষের বেশি। এছাড়া পুরুষের দিক ও স্থানিক জ্ঞান নারীর চেয়ে বেশি। এই দুটো গুণই নারীর চেয়ে পুরুষকে বেশি ভ্রমণপিপাসু করে তোলে। এবং সাধারণ পুরুষের চেয়ে পরিব্রাজক পুরুষ তুলনামূলক বেশি নারীর সঙ্গে যৌনসঙ্গম করে বিধায় বেশি সন্তান জন্ম দেয়। মানে যৌনপিপাসাই পুরুষকে নারীর তুলনায় বেশি পরিব্রাজক হিসেবে বিবর্তিত করেছে।
এই গবেষণার ওপর সম্প্রতি একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে ‘ইভোলুশন এ্যান্ড হিউম্যান বিহেভিয়র’ জার্নালে।
মানুষের বেলায় প্রথম
পরিভ্রমণ দক্ষতা ও প্রজনন সক্ষমতার মধ্যে এমন যোগসূত্র এই প্রথম ধরা পড়ল বলে মন্তব্য করেছেন লেইন ভাসরো।
ভাসরোর মতে, ‘স্থানিক ও দিকনির্দেশক গুণাবলী, পরিভ্রমণ, ভ্রমণসীমা এবং প্রজনন ক্ষমতার মধ্যে যোগসূত্র খুঁজে বের করার চেষ্টা এই প্রথম।’ উতাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞানের পোস্ট ডক্টরাল এই গবেষক বলেন, পুরো বিষয়টি বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে দেখা ও বিচার করার চেষ্টা করা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এলিজাবেথ ক্যাসদান জানান, ‘এই যোগসূত্রের অংশ বিশেষই কেবল (পূর্বে) প্রকাশিত হয়েছে। তবে আমাদের গবেষণায় পুরো প্রক্রিয়াটিই উন্মোচিত হয়েছে; এটাই এই গবেষণার অভিনবত্ব।’
স্থান বা জায়গা সম্পর্কে জ্ঞানকে বলা হয় স্থানিক জ্ঞান। কোন স্থান কোন দিকে এবং কোন পথে কীভাবে সেখানে পৌঁছতে হবে—সেই জ্ঞানকে বলা হয় যাত্রাজ্ঞান। এই দুটো দক্ষতা যার বেশি থাকবে, সে-ই বেশি অভিপ্রয়াণী বা ভালো পরিব্রাজক হতে পারবে।
ভাসরো বলেন, ‘স্থানিক দক্ষতা ও যাত্রাজ্ঞান—দুটোতেই নারীর চেয়ে পুরুষ এগিয়ে। মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, এটাই নারী-পুরুষের মধ্যে পার্থক্য গড়ে দিয়েছে। আর নৃতাত্ত্বিক দৃষ্টিতে নারী-পুরুষে ভেদাভেদ গড়ে দিয়েছে তাদের ভ্রমণসীমা। মানে, কত দূর কত পথ পাড়ি দেয় তারা, তার সীমা বা বলয়।’
স্থানিক ও যাত্রাজ্ঞানের দক্ষতাকে বলা যায় ভ্রমণ-দক্ষতা। এই ভ্রমণ-দক্ষতার সঙ্গে ভ্রমণসীমার একটা স্পষ্ট যোগসূত্র আছে।
ভাসরো যেমনটা বলেন, ‘ভ্রমণসীমার পার্থক্যই নারী-পুরুষের ভ্রমণ-দক্ষতার পার্থক্যের সূচক। আমরা ভ্রমণ-দক্ষতা ও ভ্রমণসীমার মধ্যে যোগসূত্র আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছি।’
এবং ভ্রমণ-দক্ষতার সুবাদে পরিব্রাজক পুরুষ তুলনামূলক বেশি প্রজনন সক্ষমতা প্রদর্শন করেন। তাহলে কি এই প্রশ্ন জাগে না যে, অধিক যৌনসঙ্গীর সন্ধানেই পুরুষ দূরদেশে ভ্রমণে বের হয়?
কিছু স্তন্যপায়ী প্রাণীর বেলায় এই প্রশ্নের উত্তর ‘হ্যাঁ’। যেমন ভোল ও নিশাচর ইঁদুর—এদের বেলায় ভ্রমণ-দক্ষতা ও প্রজনন সক্ষমতার মধ্যে এ ধরনের যোগসূত্র আগেই জানা গেছে।
‘কিন্তু’ ভাসরো যোগ করেন, ‘মানুষের বেলায় এ বিষয়ে তেমন কিছু জানা ছিল না কারও।’
তিউই দম্পতি : নিজেদের ঘরের সামনে নামিবিয়ার তিউই আদিবাসী সম্প্রদায়ের এক দম্পতি। এই সম্প্রদায়ের পুরুষরা বিয়ে করা স্ত্রীর সংসারে যত সন্তান জন্ম না দেয় তার চেয়ে বেশি সন্তান জন্ম দেয় অন্য নারীর সঙ্গে মিলনে।
তিউই ও তিম্বার আদিবাসী সংস্কৃতি
ক্যাসদানের মতে ভ্রমণ অভিজ্ঞতা আমাদের কাছে কোনো বস্তুর ছবি পরবর্তীতে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে, যা আমাদের ভ্রমণ-দক্ষতাকে বাড়ায়।
ভিন্ন ভিন্ন মানুষের মধ্যে প্রজননের ক্ষেত্রে আরও নানা ব্যাপার যেমন সংস্কৃতিগত পার্থক্যও গুরুত্বপূর্ণ। তবে ভ্রমণ-দক্ষতা এক্ষেত্রে বিশেষ প্রভাব ফেলে।
ক্যাসদান বলেন, ‘যে কারণে আমরা মনে করি, বিবর্তনের ধারায় প্রজনন ও ভ্রমণ-দক্ষতার মধ্যে নিশ্চয়ই কোনো যোগসূত্র আছে।’
অন্যান্য গবেষকদের মতে, পুরুষদের প্রতিযোগিতামূলক সঙ্গী নির্বাচন তাদের ভ্রমণ-দক্ষতাকে নির্দেশ করে।
পুরো বিষয়টি বোঝার জন্য নামিবিয়ার তিউই ও তিম্বার আদিবাসীদের ওপর এক গবেষণা পরিচালনা করেন ক্যাসদান ও ভাসরো।
এ দুটো সম্প্রদায়ের আদিবাসীরা গরু-ছাগল পালন করে। তারা জামের মতো এক প্রকার ফল, আলু, মধু ও মিষ্টি কুমড়া খায়। শুষ্ক মৌসুমে তারা পাহাড়ে তাঁবু খাটিয়ে থাকে। আর ভেজা মৌসুমে থাকে ক্ষেতের ধারে।
তাদেরকে বেছে নেওয়ার কারণ হলো, তারা বছরে প্রায় দুইশ’ কিলোমিটার (১২০ মাইল) দূরবর্তী অঞ্চলগুলোতেও ভ্রমণ করে থাকে এবং খালি পায়ে হেঁটে।
ভাসরো বলেন, ‘খালি পায়ে ভ্রমণ করার পদচিহ্ন আমাদের পূর্বপুরুষদের কথা মনে করিয়ে দেয়।’
এই আদিবাসী পুরুষদের মধ্যে একাধিক বিয়ে এমনকি বিয়ে ব্যতীতও তারা তাদের প্রজনন কাজ সম্পন্ন করে থাকে। এতে দেখা যায়, বিয়ে করা স্ত্রীর থেকে যত না সন্তান হয়, তার চেয়ে বেশি সন্তান তারা জন্ম দেয় অন্য নারীর থেকে। আর এসবই তাদের সংস্কৃতিতে গ্রহণযোগ্য।
তিউই ও তিম্বার আদিবাসী সংস্কৃতির এই দিকটিই এমন গবেষণার জন্য বিশেষ উপযোগী। কেননা তারা বিয়ে ব্যতীতও অন্য সম্পর্কের মাধ্যমে সন্তান জন্ম দিতে পারছে, যা থেকে ভ্রমণসীমা ও প্রজনন সক্ষমতার মধ্যে আরও ভালো করে সংযোগ স্থাপন করা যায়।
ভাসরো যেমনটা বলেছেন, ‘দিক নির্দেশন দক্ষতা নতুন নতুন ও দূরবর্তী পরিবেশে ভ্রমণে সাহায্য করে। আর পরবর্তীতে নতুন সঙ্গী বাছাইয়ের সুযোগ করে দেয়।’
নারী-পুরুষের বৈসাদৃশ্য
২০০৯-১১ সালের দিকে ভাসরো নামিবিয়ার কুনি অঞ্চল ভ্রমণ করেন। এই সফরে তিনি তিউই ও তিম্বার আদিবাসীদের সঙ্গে পরিচিত হন। তিনি ওই সম্প্রদায় দুটোর নারী-পুরুষের মধ্যে বৈসাদৃশ্য খুঁজতে প্রয়াসী হলেন এবং ওই বৈসাদৃশ্যগুলোর মধ্যে আবার যোগসূত্রও স্থাপন করতে সচেষ্ট হলেন। এ জন্য তাদের কয়েকটি পরীক্ষাও নিলেন ভাসরো।
পরীক্ষা : নৃতত্ত্ববিজ্ঞানী লেইন ভারসো ও এক আদিবাসী নারী। কম্পিউটারে বিশেষ এক মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষায় দেখা গেছে, নারীর চেয়ে পুরুষরা বেশি পারদর্শী।
একটা পরীক্ষা নেওয়া হলো কম্পিউটারে। কয়েক সারি হাতের তালুর বিন্যাস দেওয়া হয়েছিল কম্পিউটারে। একটি ছোট্ট প্রশিক্ষণ পর্বের পর ৬৮ জন পুরুষ ও ৫২ জন নারীকে ওই ছবিগুলো দেখানো হলো। একেকটা ছবি দেখার জন্য সময় দেওয়া হলো ৭.৫ সেকেন্ড করে। পরে তাদের বলা হলো—এই ছবিগুলোর মধ্যে কোন হাতটি ডান আর কোনটি বাম হাত, তা চিহ্নিত করতে। দেখা গেল, পুরুষরা এক্ষেত্রে নারীদের চেয়ে এগিয়ে।
ভ্রমণ-দক্ষতার আরেকটি প্রত্যক্ষ পরীক্ষায় ৬৭ জন পুরুষ ও ৫৫ জন নারীকে এমন একটি প্লাস্টিক গ্লাসের ছবি দেখানো হয় যেটার মাঝ বরাবর দিয়ে জলের একটি রেখা আনুভূমিকভাবে চলে গেছে।
এরপর তাদেরকে একটি কাগজে গ্লাসের অগ্রভাগের চারটি ভিন্ন ভিন্ন ছবি এবং নানা কোণে অবস্থিত জলরেখা দেখানো হয়। তাদেরকে সঠিক ছবিটি চিহ্নিত করতে বলা হলো, যা কিনা প্রথমে তাদের দেখানো হয়েছিল। এই কাজেও পুরুষরা জয়ী হয়, যা থেকে বুঝা যায়, অন্তত গবেষকদের দাবি—পুরুষের দিক-নির্দেশন দক্ষতা অপেক্ষাকৃত নারীর চেয়ে উন্নত।
আরেকটি পরীক্ষায় ভাসরো ৩৭ জন পুরুষ ও ৩৬ জন নারীকে কুনি অঞ্চল থেকে প্রায় ৮ থেকে ৮০ মাইল দূরবর্তী ৯টি এলাকা চিহ্নিত করতে বললেন। তিনি এক্ষেত্রে জিপিএসের (গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম) সাহায্য নিয়েছিলেন সত্যতা যাচাইয়ের জন্য। এবারেও দেখা গেল—নারীর চেয়ে এগিয়ে পুরুষ।
পরিংখ্যান অনুযায়ী, এই আদিবাসী নারীদের চেয়ে পুরুষরা বিগত বছরগুলোতে অপেক্ষাকৃত দূরবর্তী এলাকা ভ্রমণ করেছিল। পুরুষেরা যেখানে ৩০ মাইলের মধ্যে তিন-চারটি নতুন জায়গায় ভ্রমণ করেছে, সেখানে নারীরা ২০ মাইলের মধ্যে কেবল দুটো জায়গা ভ্রমণ করেছে।
উল্লেখ্য, পরীক্ষায় উত্তীর্ণ পুরুষরা আবার অনুত্তীর্ণ পুরুষদের চেয়ে ভালো করেছিল ডান-বাম হাত চিহ্নিত করার পরীক্ষায়। অবশ্য নারীদের বেলায় এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেনি।
দেশান্তরীর পুরস্কার অধিক যৌনসঙ্গী
যেসব পুরুষ অপেক্ষাকৃত বেশি এলাকা ভ্রমণ করেছে (ভ্রমণসীমা বেশি), একাধিক নারীর সঙ্গে মিলনের কারণে তাদের সন্তান সংখ্যাও তুলনামূলক বেশি।
ভাসরো তাই বলেছেন, ‘বিষয়টা যেন এমন যে, অধিক সঙ্গীর সঙ্গে মিলন হলো দেশান্তরীর পুরস্কার!’
প্রথম ঘূর্ণন পরীক্ষাটিতে পুরুষরা কেন নারীদের থেকে ভালো ফলাফল করল তার সঠিক ব্যাখ্যা খুঁজে পাওয়া যায়নি। অবশ্য অনেকেই মনে করে, এর পেছনে সংস্কৃতির প্রভাব কাজ করে। কিন্তু কেনই বা এই সংস্কৃতির প্রভাব ভিন্ন ভিন্ন মনুষ্য সমাজে এমনকি পশুদের সমাজেও বিস্তৃত। প্রশ্ন হলো পুরুষরা কেনই বা নারীদের চেয়ে পরিভ্রমণের সুবিধা বেশি পেয়ে থাকে?
ক্যাসদান বলেন, ‘একটা তত্ত্ব বলে, যাকে আমাদের এই গবেষণা সমর্থন করে; তা হলো—প্রজননগতভাবেই পুরুষরা যেহেতু নারীদের চেয়ে অপেক্ষাকৃত বেশি (একাধিক বা অধিক) সঙ্গী বাছাইয়ে সক্ষম।’
তথ্য সহায়তা : সায়েন্স ডেইলি।
ছবি সৌজন্যে : ইউনিভার্সিটি অব উতাহ।
দ্য রিপোর্ট

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: