জীবনে এমন কত বিচ্ছেদ, কত মৃত্যু আছে, ফিরিয়া লাভ কি? পৃথিবীতে কে কাহার…

“আপাতদৃষ্টে সমাজে অবাঞ্ছিত জনগোষ্ঠী হিজরা সম্প্রদায়। বেশিরভাগের ঠাঁই হয় না নিজের পরিবারে। অনেকে আবার নিজের লিঙ্গ পরিচয় নিয়ে মনস্তাত্ত্বিক টানাপড়েনে ভুগতে ভুগতে খেই হারিয়ে ফেলে স্বাভাবিক জীবনপ্রক্রিয়ার। তবে এসবের ঊর্ধ্বে তাদের আরেকটা পরিচয় আছে, তারা মানুষ।”

হিজরাদের নিয়ে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের সময় এসেছে মনে করে এমনটা বললেন বন্ধু সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটি-এর ডেপুটি ডিরেক্টর (প্রোগ্রাম) ফসিউল আহসান।
তিনি আরও জানান, “রাস্তাঘাটে বা গণপরিবহনে হিজরাদের দেখে লোকে যেভাবে বাঁকা কথা বলতে শুরু করে কিংবা আতঙ্কিত হয়, তাতে মনেই হয় না ওরা মানুষ। চিড়িয়াখানার কোনও জন্তু যেন! অথচ ওদের প্রতি আমাদের মানসিকতার একটু পরিবর্তনই কমাতে পারে এ বৈষম্য।”
হিজরাদের মধ্যে নেতৃস্থানীয়দের বলা হয় গুরু। এমন একজন গুরু জয়া শিকদার। ‘সম্পর্কের নয়া সেতু’ নামে একটি সংগঠনের সভাপতি। সংগঠনটি যৌন সংখ্যালঘু ও হিজরাদের নিয়ে কাজ করে।
হিজরাদের সম্পর্কে একটা প্রচলিত ধারণা আছে, কোথাও সন্তান হলে হিজরারা সেখানে দল বেঁধে যায় এবং চাঁদা দাবি করে। সন্তান নিয়ে আসার অভিযোগও আছে তাদের বিরুদ্ধে। এমন অভিযোগকে পুরোপুরি নাকচ করে দেন জয়া শিকদার। বললেন, “এটা কখনোই হয় না। হিজরারা টাকা নিতে যায়, কারণ তারা কখনও মা হতে পারে না। বাবা হতে পারে না। তারা স্রেফ বাচ্চাটাকে আশির্বাদ করে অল্প কিছু টাকা নিয়ে আসে। কিন্তু বাচ্চাকে টেনেহিঁচড়ে ধরে, জোর করে ভয় দেখায়। এমনটা কখনও করে না।”
জয়া শিকদারের মতে, “একটা মানুষ কয়টা বাচ্চা নেয় বলেন? সর্বোচ্চ দুটো। কেউ একটাও নেয়। সেক্ষেত্রে হিজরারা সারা জীবনে তার বাড়িতে হয়তো একবারই গেল। তারপর আবার কে বিয়ে করবে, তখন আবার যাবে। হিজরারা কখনও জোর করে টাকা নেয় না। মানুষ মনে করে তারা চাঁদাবাজি করে। এটা ভুল ধারণা।”
চাঁদা তে‌‌‌ালার প্রসঙ্গে বললেন, “একজন হিজরা স্বাভাবিকভাবে পড়াশোনা করতে পারে না। সে পরিবার ছেড়েছে। সমাজে তার ঠাঁই নেই। সে ক্ষুধার্ত হয়, তাই বাধ্য হয়েই এটা করতে হচ্ছে। এগুলোকে চাঁদাবাজি বলা যায় না। বলা ঠিক হবে না।”
একই দাবি সূর্যের আলো হিজরা সংগঠনের সভাপতি ফাল্গুনী হিজরার। বন্দরনগরী চট্টগ্রামের পাহাড়তলীর বারকোয়াটারে থাকেন। নবজাতকের জন্মের পর হিজরাদের অর্থ দাবি করাকে হিজরাদের ঐতিহ্য বলে মনে করেন তিনি। “আমাদের পূর্বপুরুষরা বহু বছর ধরে এ কাজ করেছেন। এটা পুরো ভারতীয় উপমহাদে‌‌শের হিজরাদের নিজস্ব সংস্কৃতি। এটাই তাদের আয়ের একমাত্র পথ।” আর তাই এ ধরনের অর্থ দাবিকে কোনও অবস্থাতেই চাঁদাবাজি বলতে নারাজ ফাল্গুনী। তবে এমনটা যেন করতে না হয়, সেজন্য অনগ্রসর এ জনগোষ্ঠীর জন্য চাকরিতে কোটা প্রথা চালুর দাবি জানান তিনি।
এ ছাড়া হিজরাদের বিরুদ্ধে নবজাতক নিয়ে যাওয়ার যে ধারণা প্রচলিত আছে তা পুরোপুরি বানোয়াট বলেও উড়িয়ে দেন ফাল্গুনি।
নিজের প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে হিজরাদের প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের চেষ্টা করেন ফাল্গুনী। কম্পিউটার প্রশিক্ষণ, মোবাইল সার্ভিসিং, পার্লারের কাজ শেখান। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সাহায্য নিয়ে হিজরাদের জন্য কর্মমুখী নানা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার চেষ্টা চালাচ্ছেন তিনি।
হিজরাদের নিয়ে আরেকটি বহুল প্রচলিত ভুল ধারণা হলো, হিজরা মানেই যৌনকর্মী। সোনিয়া নামের একজন হিজরা বলেন, “লোকজন যখন আমার দিকে হা করে তাকিয়ে থাকে তখন নিজেকে খুব ছোট মনে হয়। বেশি খারাপ লাগে যখন কিছু খারাপ প্রকৃতির পুরুষ কুপ্রস্তাব দেয়।”
এ প্রসঙ্গে হিজরা উন্নয়ন সংগঠন সাদা-কালোর প্রেসিডেন্ট অনন্যা বণিক বলেন, “হিজরা জনগোষ্ঠী সম্পর্কে সাধারণ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন জরুরি। এক্ষেত্রে হিজরাদের তৃতীয় লিঙ্গের সাংবিধানিক অধিকার দেয়ার পাশাপাশি গণমাধ্যম যদি গণসচেতনার সৃষ্টির জন্য এগিয়ে আসে, হিজড়াদের দুর্ভোগ বহুলাংশে লাঘব হবে।”
প্রেমা নামের একজন বলেন, “আমরা ভিন গ্রহ থেকে আসিনি। আমাদেরও ক্ষুধা আছে, মৌলিক চাহিদা আছে। এরপরও কেন সবাই এত অবহেলা করে? অধিকার থেকে বঞ্চিত রাখে? কোথাও খেতে গেলে বাধা, গাড়িতে চড়তে বাধা। সব জায়গায় কেন আমাদের জন্য বাধার প্রাচীর?”
“কাছ থেকে আপনি একজন হিজরাকে বুঝতে চেষ্টা করুন। তার গভীরে যান। ঘৃণা বা বৈষম্যের বদলে আপনার চিন্তাজগতে এটা এক নতুন উপলব্ধির সূচনা করবে।” এমনটাই মনে করেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ শিক্ষার্থী ও আলোকচিত্রী শাহরিয়া শারমিন।
শারমিন বলেন, “আমি অন্যদের মতো বেড়ে উঠেছি হিজরাদের মানুষের চেয়ে কম কিছু ভেবে। তাদের অভ্যাস, জীবনযাপন, এমনকি চেহারা তাদেরকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করে রেখেছে। এরপর আমি দেখা করি হেনা নামের এক হিজরার সঙ্গে। সে-ই আমাকে দেখিয়ে দেয়, আমি কত ভুলের মধ্যে ছিলাম। তার নিজের জীবন আমার সামনে তুলে ধরে হেনা। আমাকে তার জগতের অংশ বানিয়ে ফেলে। নিজে ও নিজের সম্প্রদায়ের অন্যদের সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দেয় সে। আমি তাদের একেকজনের মাঝে দেখেছি একজন মা, কন্যা, বন্ধু কিংবা প্রেমিককে।”
শাহরিয়া শারমিন সিদ্ধান্ত নেন হিজরাদের জীবনধারা নিয়ে লন্ডনে একটা স্থিরচিত্র প্রদর্শনীর। তিনি এর নাম দেন ‘কল মি হেনা’। গত সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত এ প্রদর্শনীতে ছেলে হয়ে মেয়ের মতো জীবন বেছে নেওয়া হিজরাদের জীবনসংগ্রামের চিত্র তুলে ধরেন তিনি।
প্রদর্শনী করতে গিয়ে ৫১ বছরের হেনার মাধ্যমে শারমিন পরিচিত হন হিজরা সম্প্রদায়ের অন্যদের সঙ্গে। সেখানে একেকজন তাকে শুনিয়েছিল তাদের নিজের জীবনের গল্প। এদের মধ্যে একজন সালমার স্বপ্ন ছিল মা হওয়ার। তাই বৈশাখী নামের এক শিশুকে দত্তক নিয়েছে সে। কিন্তু সালমা দ্বিধান্বিত, বড় হলে বৈশাখী কি তাকে মা ডাকবে নাকি বাবা ডাকবে?
বাংলা ট্রিবিউন

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: