জীবনে এমন কত বিচ্ছেদ, কত মৃত্যু আছে, ফিরিয়া লাভ কি? পৃথিবীতে কে কাহার…

chitra-deerএহতেশামুল হক শাওন খুলনা
সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় প্রবাদ রয়েছে, বাঘের লাফ কুড়ি হাত, হরিণের একুশ হাত। তাই বাঘের থাবা থেকে মাঝে মধ্যে রেহাই পেলেও কুমিরের ছোবল আর শিকারির ফাঁদ ও গুলি থেকে রেহাই পাচ্ছে না চিত্রল হরিণ। সুন্দরবনের কোথাও হরিণ নিরাপদে নেই। প্রায়ই খবর আসে শিকারির গুলি, না হয় কুমিরের হামলায় হরিণের মৃত্যুর। আবার কখনো জানা যায়, জলোচ্ছ্বাসে শ’ শ’ হরিণ ভেসে সাগরের দিকে যাচ্ছে।

জানা গেছে, সুন্দরবন পশ্চিম ও পূর্ব বিভাগে প্রতি মাসে গড়ে ১০ থেকে ১৫টি হরিণ শিকার হয়। মাংস বিক্রি হয় ১৪০ থেকে ১৫০ টাকা কেজি দরে। আর চামড়া শোভা পায় বিত্তশালীদের ড্রয়িং রুমে। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনে পশু হত্যা বা ধরায় স্বল্প মেয়াদের শাস্তি ও জরিমানার বিধান থাকায় সুন্দরবনে হরিণ শিকার থেমে নেই।

সুন্দরবনের ২২ প্রজাতি উভচর, ১৪৩ প্রজাতির সরীসৃপ ও ১১৬ প্রজাতির স্তন্যপায়ীর মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় প্রাণী চিত্রল হরিণ। মায়াবী চাহনির কারণে এ হরিণ দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণ করে। বন বিভাগ সূত্র জানায়, ইন্টারগ্রেটেড রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট প্রকল্পের আওতায় ১৯৯৬-৯৭ সালের জরিপ অনুযায়ী সুন্দরবনে এক থেকে দেড় লাখ হরিণ রয়েছে।

বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের সূত্র জানায়, ২০০১ সালে সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী হরিণের সংখ্যা দেড় থেকে ২ লাখ। প্রতি বছর দু’বার হরিণ বাচ্চা দেয়। তাই গত ৮ বছরের ব্যবধানে আরো ৫০ হাজার হরিণ বৃদ্ধি পেয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট এক সূত্র দাবি করেছে। বনের কটকা, কচিখালী, দুবলা, চান্দেশ্বর, হিরনপয়েন্ট, বগি, চরখালী ও সুপতি এলাকায় বেশিরভাগ সময় হরিণ অবস্থান করে।

অভিযোগ রয়েছে, খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট জেলার বিভিন্ন উপজেলার কয়েকটি চক্র হরিণ শিকারে সক্রিয় রয়েছে। বন বিভাগের বিভিন্ন স্টেশন থেকে মৎস্য আহরণের পাস নিয়ে এ চক্র বনে ঢুকে জালের ফাঁদ দিয়ে হরিণ শিকার করে। এছাড়া লারগাটিল, সিডিল, ফ্রিজিয়াম, ইজিয়াম ও কোজিয়াম নামক চেতনানাশক ওষুধ কেওড়া ফলে মিশিয়ে, আবার কখনো বড়শি দিয়ে, গুলি করে বা তীর ছুড়েও হরিণ শিকার করা হয়। দড়িতে বাঁধা বড়শিতে কলা গেঁথে ঝুলিয়ে রেখে শিকারিরা বসে থাকে গাছের ডালে। হরিণ কলা খেতে এলে গলায় বড়শি বেঁধে আটকা পড়ে। আর জোয়ারের সময় হরিণ দলবেঁধে উঁচু জায়গায় অবস্থান নিলে ছোট নদী থেকে কুমির উঠে এসে তাদের ওপর হামলা চালায়। এছাড়া গরান ও গোলপাতা বনে লুকিয়ে থাকা বাঘ বিভিন্ন সময় হরিণের ওপর হামলা করে।

জানা গেছে, সুন্দরবন সংলগ্ন রামপাল, মংলা, পাইকগাছা উপজেলার গড়ইখালী, কয়রা উপজেলার ঘুগরাকাঠি, দক্ষিণ বেদকাশী, উত্তর বেদকাশী, শ্যামনগর উপজেলার হরিণগর, বুড়িগোয়ালিনী, কৈখালী ও ভেদখালী এলাকায় প্রতি কেজি হরিণের মাংস ১৪০ থেকে ১৫০ টাকায় বিক্রি হয়।

২০০৪ সাল থেকে গত বছর পর্যন্ত বাগেরহাট জেলার শরণখোলা, তাফালবাড়ী, রায়েন্দাবাজার থেকে বন বিভাগের কর্মচারীরা জবাই করা হরিণ ও চামড়া উদ্ধার করে। ২০০৪ সালে ২৩ থেকে ২৬ নভেম্বর চার দিনব্যাপী রাশ মেলায় হরিণ শিকারিরা ২৫টি হরিণ শিকার করেছিল। বন বিভাগের বয়রাস্থ বন সংরক্ষকের অফিস থেকে এ ব্যাপারে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এ রিপোর্ট আজো আলোর মুখ দেখেনি।

সুন্দরবন (পশ্চিম) বন বিভাগের ডিএফও অবনী ভূষণ ঠাকুর জানান, জোয়ারের সময় সুন্দরবনে হরিণ পা নিচে রেখে ভেসে থাকে। তবে জলোচ্ছ্বাসের সময় ভেসে যায়। তার তথ্য অনুযায়ী, আইলায় ৩৫টি হরিণের মৃতদেহ সাগরে ভেসে যায়। শিকারিদের তৎপরতা সম্পর্কে তিনি বলেন, বন বিভাগের কর্মচারীরা তৎপর হওয়ায় চোরাই হরিণ শিকারের পরিমাণ আগের তুলনায় কমেছে। এছাড়া মানুষের মধ্যে সচেতনতা আসায় শিকারিদের অপতৎপরতা অনেকাংশে কমে গেছে।

সুন্দরবন পশ্চিম বিভাগের এক সময় কর্মরত ডিএফও উত্তম কুমার জানান, বন্যপ্রাণী আইন ১৯৭৪ এর ৫ ও ৬ আর্টিকেল অনুযায়ী বনে ফাঁদ পেতে বা গুলি করে পশু মারা বা ধরা অপরাধ। ২৫ ও ২৬ আর্টিকেল অনুযায়ী অপরাধীর ৫শ’ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা ও ৬ মাস থেকে ২ বছর পর্যন্ত কারাদ- হতে পারে।

অন্য এক সূত্র জানায়, সরকার বন্যপ্রাণীকে ইকোলোজিক্যাল সম্পদ হিসেবে সংরক্ষণ করার জন্য নীতিমালা প্রণয়নের ওপর জোর দিয়েছে। প্রস্তাবিত নীতিমালায় সব রকম বন পরিবেশ স্পট এলাকায় বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য প্রতিষ্ঠাসহ অংশীদারিত্বমূলক বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়া সুন্দরবনের শতকরা ৩৫ ভাগ এলাকা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষণার সুপারিশ করা হয়েছে।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: