জীবনে এমন কত বিচ্ছেদ, কত মৃত্যু আছে, ফিরিয়া লাভ কি? পৃথিবীতে কে কাহার…

আশীষ-উর-রহমান শুভ
‘বাদশা’ নামে ঘনিষ্ঠজনরা ছাড়া এখন কেউ তাকে চেনে না। আলাউদ্দিন আল আজাদ এই নামেই তিনি খ্যাতনামা স্বদেশে-বিদেশে। পাড়াগাঁর বাদশা যে কি করে এমন স্বনামখ্যাত আলাউদ্দিন আল আজাদ হয়ে উঠলেন সে এক রীতিমতো রোমাঞ্চকর কাহিনী বলেই মনে হবে। টানা চার কন্যার পর পরম আকাঙ্ক্ষার পুত্র। তাই তার নাম রাখা হলো বাদশা। কিন্তু মাত্র দেড় বছর বয়সেই নিঃস্ব হলেন বাদশা মাতৃবিয়োগে। বয়স যখন দশ, পিতাও ছেড়ে গেলেন মহাকালের ডাকে। জমি-জিরাত যা ছিল জবরদখল করে নিলেন গ্রামের আত্মীয়-স্বজনরা। পঞ্চাশের ভয়াবহ মন্বনত্দর শুরম্ন হয়েছে তখন দেশজুড়ে। হৃতসর্বস্ব বাদশা যেন অলৌকিকভাবেই উপলব্ধি করলেন, সব প্রতিকূলতাকে পরাসত্দ করে অসত্দিত্ব রক্ষার সংগ্রামের একমাত্র অস্ত্র হলো শিক্ষা। বইয়ের মধ্যে খুঁজে পেলেন রোমাঞ্চকর জগত। প্রত্যেক শ্রেণীতে প্রথম স্থানটি স্থায়ীভাবে ছিল উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয় থেকে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা জীবনের শেষাবধি এই প্রথম স্থান নির্ধারিত ছিল তার জন্য। ঢাকায় ভর্তি হয়েছিলেন ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজে। রাতে খবরের কাগজের অফিসে খ-কালীন চাকরি করতেন। যে দাদিমা লালন-পালন করেছিলেন বিনা চিকিৎসায় মারা গেলেন তিনি। তাই ইচ্ছা ছিল ডাক্তারি পড়বেন। খরচের টাকা আসবে কেমন করে? তাই হলো না সে পাঠ নেয়া। বাংলা অনার্স নিয়ে বিএতে প্রথম বিভাগে প্রথম হলেন, এমএতেও তাই। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা দিয়ে বৈদেশিক বৃত্তি নিয়ে উচ্চতর শিক্ষার জন্য চলে যান ইংল্যান্ডে। লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি নেন ‘৭০ সালে এবং রয়েল সোসাইটির ফেলো নির্বাচিত হন। পরে আমেরিকা আধুনিক ভাষা সমিতির সদস্য হন এবং ১৯৮৩তে অরেগন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তুলনামূলক সাহিত্যে উচ্চতর ডিগ্রি নেন। কিন্তু এর বহু আগেই নরসিংদী জেলার রায়পুরা থানার রামনগর গ্রামের বাদশা আলাউদ্দিন আল আজাদ নামে দেশে-বিদেশে খ্যাতিমান হয়ে উঠেছিলেন তার অসাধারণ মেধাবী ও সৃজনশীল রচনার জন্য। প্রবন্ধ, কাব্য, উপন্যাস, ছোটগল্প, নাটক, শিশুতোষ, রচনা, ভ্রমণকাহিনী, জীবনীগ্রন্থ সাহিত্যের হেন কোন ক্ষেত্র নেই যা তার অনন্য সৃজনী প্রতিভার অদৃশ্য রয়ে গেছে।

আলাউদ্দিন আল আজাদের লেখার বয়স তার নিজের বয়সেরই প্রায় সমসাময়িক। জন্মেছিলেন ১৯৩২ সালের ৬ মে। বাবার নাম গাজী আবদুস সোবহান, মা আমেনা খাতুন। প্রথম রচনা প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৪৩ সালে যুগানত্দর পত্রিকায় ছোটদের পাতায় ‘নিমন্ত্রণ’ এবং ১৯৪৭ সালে মাসিক সওগাতে প্রকাশিত হয়েছিল প্রথম প্রবন্ধ ‘আবেগ’।

সাহিত্যকর্মে আবেগের ভূমিকা নিয়ে রচিত এই মননশীল প্রবন্ধ যে কোন কিশোরের তা কেউ ভাবতেই পারেননি। এরপর থেকেই নিয়মিতভাবে লিখে চলেছেন তিনি। অলৌকিক বালক ভাবা হতো তাকে সে সময়। আজ তার প্রকাশিত গ্রন্থসংখ্যা ১২০। দীর্ঘ অর্ধশতাব্দীর অধিককালব্যাপী তার সাহিত্যসম্ভার থেকে নির্বাচিত অংশ সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে পাঁচটি খ-ে।

বাংলাবাজারের গতিধারা প্রকাশনী সমপ্রতি প্রকাশ করেছে বহুমাত্রিক লেখক আলাউদ্দিন আল আজাদের শ্রেষ্ঠ উপন্যাস, শ্রেষ্ঠ ছোটগল্প, শ্রেষ্ঠ কবিতা, শ্রেষ্ঠ নাটক ও শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ। প্রচ্ছদ ও অলঙ্করণ করেছেন শিল্পী সিকদার আবুল বাশার।

এছাড়া আরও আছে_ সাহিত্যের গতিতত্ত্ব : স্বাধীনতা সীমারেখা, সাহিত্যের আগন্তুক ঋতু, সাহিত্য ভাষা ও শিল্পীর দায়বদ্ধতা, আলাউদ্দিন আল আজাদ, জীবনসাহিত্য, বাংলা ভাষার লড়াই স্বরূপের সন্ধানে, স্বনির্বাচিত উপন্যাস, স্বনির্বাচিত গল্প, কর্ণফুলী, তেইশ নম্বর তৈলচিত্র, ক্ষুধা ও আশা, শীতের শেষ রাত বসনত্দের প্রথম দিন, এলিজি ত্রিলজি, কোথা যাও ঐন্দ্রনীলা, প্রেমকথা লুদমিলা, চড়ৎঃৎধরঃ ঘঁসনবৎ ঃবিহঃু ঃযৎবব, কিশোর সমগ্র, রসগোলস্না জিন্দাবাদ, আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাস, হৃদয়ে আমার অমর একুশ, নিখোঁজ সনেট গুচ্ছ, এই নাও আমার প্রেম লালগোলাপ, এধহমপযরষষ, কবিতাসমগ্র ১, কবিতাসমগ্র ২ ও আলাউদ্দিন আল আজাদ জীবন সাহিত্য প্রকাশ করেছেন_ গতিধারা।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: