জীবনে এমন কত বিচ্ছেদ, কত মৃত্যু আছে, ফিরিয়া লাভ কি? পৃথিবীতে কে কাহার…

সৈয়দ আবুল মকসুদ
কোনো জাতির ইতিহাস টিপাইমুখ এলাকার ওই খরস্রোতা পাহাড়ি নদীর মতোই। তা সমান্তরালভাবে একরেখায় প্রবাহিত হয় না। প্রত্যেক জাতির জীবন-নদ চড়াই-উতরাই পেরিয়ে এঁকেবেঁকে চলতে থাকে। বঙ্গীয় বদ্বীপের হতভাগ্য মানুষের আড়াই হাজার বছরের ইতিহাসেও রয়েছে কত বাঁক, কত যে চড়াই-উতরাই।
স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ভারত ও পাকিস্তান একই সময়ে একই মাতৃগর্ভ থেকে ভুমিষ্ঠ হয়। সাম্প্রদায়িকতার জলবায়ুই জন্ন দেয় ভারতীয় উপমহাদেশে দুটি রাষ্ট্রের। পাকিস্তান বাস্তবে ও কাগজপত্রে ছিল মুসলিম সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র। হিন্দুপ্রধান ও হিন্দুশাসিত ভারতের সঙ্গে তার বৈরিতা ছিল আজন্েনর−যদিও দুটি দেশের ইতিহাস অভিন্ন, ঐতিহ্য অভিন্ন। সরকারে সরকারে যতই বৈরিতা থাকুক, পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চল পূর্ব বাংলার মানুষের সঙ্গে ভারতের জনগণের সম্পর্ক ছিল স্বাভাবিক−মধুর যদি নাও হয়ে থাকে। হিন্দু-মুসলমান কেউই সাম্প্রদায়িকতামুক্ত নয়, তারপরও এক দেশের মানুষের দুঃখে অন্য দেশের মানুষের সহমর্মিতা ছিল। সেই দিনটির কথা আমার মনে পড়ে, যেদিন প্রধানমন্ত্রী পন্ডিত জওহরলাল নেহেরু হূদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। মানিকগঞ্জ মহকুমার এক অজপাড়াগাঁয়ে আমরা একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচের আয়োজন করেছিলাম। সেকালের যোগাযোগ ও তথ্যপ্রবাহের অবস্থা এখনকার মানুষ কল্পনা করতে পারবে না। দ্রুততম তথ্যপ্রবাহের একমাত্র উপায় ছিল রেডিও। ফুটবল খেলাটি যখন আরম্ভ হবে, দুই দলের ২২ জন খেলোয়াড় প্রস্তুতি নিচ্ছে, কে একজন একটি ট্র্যানজিসটার হাতে ঘোরাফেরা করছিল, সে বলে উঠল, ভারতের প্রধানমন্ত্রী মারা গেছেন। মাঠের মাঝখানে বল ফেলে রেখে সবাই গোল হয়ে দাঁড়াল ট্র্যানজিসটার ঘিরে। নিজের কানে আমরা শুনলাম সংবাদটি। স্বতঃস্কুর্তভাবে সবাই সিদ্ধান্ত নিল, আজ খেলা হবে না, পরের সপ্তাহে হবে।
সেটা আইয়ুব খানের জামানা। ইসলামি আবহ খুবই ছিল। হিন্দুদের কোনো কন্ঠস্বর ছিল না। সরকার ঘোষণা দিয়েছিল সরকারি আনুষ্ঠানিকতার। কিন্তু জনগণ করেছিল জনগণের কাজ। পরদিন সব স্কুল-কলেজ বন্ধ রইল। উপমহাদেশের একজন মহান স্বাধীনতা সংগ্রামীর মৃত্যুতে সমবেদনা জানাল সবাই। একই দৃশ্য আমি লক্ষ করেছি যেদিন মিসেস ইন্ধিরা গান্ধী নিহত হলেন। ঢাকার রাস্তায় আমি সাধারণ মানুষের মুখে একটি শোকের ছায়া দেখেছি।
আজ আমরা এমন এক বাংলাদেশে বাস করছি, যেখানে অনেকেরই এ-কথা অবিশ্বাস্য মনে হবে যে, ১৯৬২ সাল পর্যন্ত পূর্ব বাংলার স্কুলে ইংরেজি-বাংলা র‌্যাপিড-রিডার বইতে রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, মহাত্মা গান্ধী, চিত্তরঞ্জন দাস, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু প্রমুখের জীবনী পড়ানো হতো মুহম্মদ আলী জিন্নাহ, স্যার সৈয়দ আহমদ, লিয়াকত আলী খান, মওলানা মোহাম্মদ আলী, নবাব সলিমুল্লাহ প্রমুখের সঙ্গে। ১৯৬৩ থেকে পাঠ্যসুচিতে মুসলমান মনীষীরা প্রাধান্য পেতে থাকেন। কিন্তু বাঙালির আকাঙ্ক্ষা একটি সমন্বিত সংস্কৃতি−সাম্প্রদায়িক সংস্কৃতি নয়। তাই অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতী য়তাবাদী রাজনীতিকেই সমর্থন দেওয়া হয়, ইসলামের নামে যা ধ্বংস করতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল একাত্তরে।
একাত্তরে আমি মসজিদে দেখেছি মোনাজাতরত মুসল্লিদের। আরশের দিকে তাদের হাত। চোখে তাদের পানি। ‘ইয়া আল্লাহ, হে দুনিয়ার মালিক, জালেমের হাত থেকে তুমি আমাদের…।’ ওই মুসলমানেরা শুধু মুসলমানদের জন্য মোনাজাত করে নাই। সব মানুষের জন্যই করেছে। সেদিন আমি বেড়াবিহীন প্রতিমাবিহীন জীর্ণ মন্দিরের মেঝের মাটিতে লুটিয়ে পড়ে মাথা কুটতে দেখেছি অকালবিধবা হিন্দু যুবতীকে, ঝোপের আড়ালে দাঁড়িয়ে গোপনে নিঃশব্দে অশ্রুপাত করতে দেখেছি সদ্যশহীদ পুত্রের বৃদ্ধ বাবাকে। মুসল্লিদের মোনাজাত, হিন্দু নারীর প্রাণপাত, বৃদ্ধের স্রষ্টাকে উদ্দেশ করে অশ্রুপাত ছিল তাদের স্বার্থগত কারণে নয়, দেশের জন্য, স্বাধীনতার জন্য। নারকীয় পরিবেশ থেকে এমন একটি জীবন তাঁরা চেয়েছেন যা হবে নিরাপদ ও স্বাধীন।
কিন্তু আমরা পেয়েছি কী? অশীতিপর রাজনীতিবিদ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিপ্রধান অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের মতোই আমার মতো নগণ্য নাগরিকেরও ঘুম হয় না। মধ্যরাতে বারান্দায় দাঁড়াই। রাতের নৈঃশব্দে মহানগরের দিকে তাকাই। কোটি কোটি মানুষের ভবিষ্যতের কথা ভেবে বুক ভারী হয়ে আসে। ষাটের দশকে যুবক ছিলাম। চোখে স্বপ্ন ছিল। এখন কেন বুক কাঁপে দুঃস্বপ্নে। প্রায়ই অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ বলেন, ‘সৈয়দ সাব, মনের কথা কওনের জন্যে একটা মানুষ খুঁইজা পাই না।’ হ্যাঁ, বুঝতে পারি মানুষ কমে গেছে, জনসংখ্যা বাড়লেও।
পৃথিবীর সবচেয়ে উর্বর এই ভুখন্ডের মানুষের কপালে কখনো কুঠারাঘাত করেছে তারা নিজেরাই, কখনো অন্য কেউ। আঘাতের পর আঘাতে আজ বাঙালির কপাল ক্ষতবিক্ষত, তার এই রক্তাক্ত ললাটের জন্য সব সময় অন্যকেও দায়ী করা যাবে না। জনগণকেও পুরোপুরি দায়ী করা যাবে না। দায়ী তার নেতৃত্ব। সৎ ও দুরদর্শী নেতৃত্বে পরিচালিত হওয়ার সৌভাগ্য বাঙালি ও বাংলাদেশের বিভিন্ন জাতিসত্তার মানুষের হয়নি। তাই এই দুঃসহ বর্তমান ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।
কিছু কথা বলার জন্য আমাকে গ্রাম্য কবিয়ালের মতো খানিকটা ভণিতা করতে হলো। টিপাইমুখ বাঁধকে কেন্দ্র করে এখন বাংলাদেশে এক অস্বস্তিকর পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। আমরা যদি যতটা সম্ভব স্পষ্ট ও বস্তুনিষ্ঠভাবে বিষয়টিকে না দেখি তা হলে শুধু যে দুই দেশের পরিবেশ-প্রকৃতি বিপর্যস্ত হবে তাই নয়, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কও বিপর্যস্ত হবে, বাংলাদেশের অস্তিত্ব গভীর সংকটে পড়বে এবং হিন্দু-মুসলমান সাম্প্রদায়িকতায় এমন এক মাত্রা যোগ হবে যা মেরামত করা আগামীতে অত্যন্ত কঠিন হবে। আপাতত সব ধর্মের মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও পরিণামে মুসলমানরাই হবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত, কারণ উপমহাদেশে মুসলমানেরা সংখ্যালঘু। বাংলাদেশে মুসলমানেরা সংখ্যাগরিষ্ঠ বলে যে গর্ব করে তা হয়ে পড়বে অর্থহীন। ভারতে বহু পল্লী মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং বাংলাদেশে অনেক গ্রাম আছে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ−ছোট জায়গার সংখ্যাগরিষ্ঠতার কোনো মূল্য নেই।
পাকিস্তানের মুসলমান শাসকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে বাঙালি মুসলমান নেতারা তাঁদের স্বাধীনতা সংগ্রামের শেষ অধ্যায় মুক্তিযুদ্ধ শুরু করেন। বাঙালি মুসলমানদের স্বাধীনতা সংগ্রামে হিন্দুপ্রধান ভারতের জনগণ ও সরকার সর্বাত্মক সাহায্য-সহযোগিতা দেয়। দক্ষিণ ভিয়েতনামের মুক্তিযুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীন সহযোগিতা দেয়। ওটা ছিল আদর্শিক সহযোগিতা, কিন্তু বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সহযোগিতার কারণ অনেক। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বাঙালি হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে একই সঙ্গে বিভেদ ও বন্ধুতা ছিল। কিন্তু একাত্তরে তাদের মধ্যে যে-বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে অভিন্ন শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে তা অতীতে আর কখনো হয়নি। কিন্তু সেই বন্ধুত্ব স্থায়ী ও সুদৃঢ় করার উদ্যোগ নেননি দুই সম্প্রদায়ের সমাজপতিরা এবং দুই দেশের নেতারা।
বাংলাদেশের সংখ্যালঘু হিন্দুরা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সংখ্যালঘু। তারা পাকিস্তানের সাম্প্রদায়িক শাসকগোষ্ঠী ও একশ্রেণীর মুসলমানের দ্বারা ২৪টি বছর সীমাহীন অবিচারের শিকার হয়েছে। তারা তাদের বিষয়-সম্পত্তি হারিয়েছে এবং দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছে। তবু কোনো রকম উগ্র প্রতিবাদের পথ তারা বেছে নেয়নি, অবিচার সহ্য করেছে নীরবে। আওয়ামী লীগের ধর্মনিরপেক্ষ নীতিতে তাদের মধ্যে স্বস্তির ভাব ফিরে আসে। কিন্তু তা সাময়িক। বাংলাদেশের শাসকশ্রেণীর নীতির পরিবর্তন ঘটল, কিন্তু তাদের চরিত্রের পরিবর্তন হলো না। অন্যদিকে সব সম্প্রদায়ের সীমাহীন ত্যাগের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জিত হলো বটে, কিন্তু বাঙালি হিন্দুর মতো বাঙালি মুসলমানেরও ভয় ও নিরাপত্তাহীনতা গেল না: ধর্মীয় স্বকীয়তা হারানোর ভয় ও বৃহৎ ভারতের কারণে মুসলমানের নিরাপত্তাহীনতা। হিন্দুদেরও নিরাপত্তাহীনতা দুর হলো না।
বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতীয়তাবাদী ছিলেন, কিন্তু ভারতের প্রতি কৃতজ্ঞতাবশত বন্ধুত্ব রক্ষায়ও সচেষ্ট ছিলেন। তাঁর সময় সমুদ্রসীমা, ফারাਆার পানির হিস্যা, ছিটমহল হস্তান্তর প্রভৃতি নিয়ে যেসব সমস্যা দেখা দেয় তা তিনি আলোচনার মাধ্যমে মীমাংসার উদ্যোগ নেন। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ভারত-বাংলাদেশ বন্ধুত্বেরও যেন মৃত্যু ঘটে। জিয়াউর রহমান ছিলেন মুসলিম জাতীয়তাবাদী। আমেরিকা ও মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা থাকায় ভারতের বন্ধুত্বের তিনি প্রয়োজন বোধ করেননি। সেটি ছিল তাঁর অত্যন্ত হটকারী ও অদুরদর্শী নীতি। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ছিলেন বহুরূপী। বৈপরীত্যে ভরা তাঁর চরিত্র। সহজে কেউ চিনতে পারত না, তিনিও মুসলিম জাতীয়তাবাদী। সাম্প্রদায়িক ষোল আনা, কিন্তু কৌশলগত কারণে ভারতবিরোধী ছিলেন না। মধ্যপ্রাচ্য ও পাকিস্তানপন্থী হয়েও ভারতের প্রতি ছিলেন বন্ধুভাবাপন্ন। কিন্তু বাংলাদেশে সংঘবদ্ধ ভারতবিরোধী চেতনা গড়ে তুলতে তাঁর ভুমিকা সবচেয়ে বেশি। রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম তাঁর দান। সুতরাং বাংলাদেশে মুসলিম সাম্প্রদায়িকতার সমান্তরাল হিন্দু সাম্প্রদায়িকতার তিনি জনক। হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের জন্ন হয়েছে তাঁর জন্য। আজ বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার প্রতি ইঞ্চি মাটিতে সাম্প্রদায়িকতার দুর্গন্ধ। বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতারই একটি রূপ ভারতবিরোধিতা। তবে কোনো কোনো কট্টর বাম গোষ্ঠীও ভারতবিরোধী।
বলা হচ্ছে, একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠী ভারতবিরোধী ভাবাবেগ সৃষ্টির উদ্দেশে টিপাইমুখ নিয়ে হইচই করছে। যদিও টিপাইমুখের প্রকল্পের প্রতিবাদ প্রথম ধর্মনিরপেক্ষ বামদের থেকেই এসেছে। সাম্প্রদায়িকেরা সেই সুযোগ গ্রহণ করেছে মাত্র। কিন্তু কী কারণে বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক মানুষেরাও কখনো ভারতের সমালোচনা করে তা ভেবে দেখা হয় না।
চুক্তি করার সঙ্গে সঙ্গে ছোট বাংলাদেশ তার বিরাট ভুখন্ড বেরুবাড়ী ভারতকে দিয়ে দেয়−প্রতিদানে মাত্র তিন বিঘা জমিটুকু সে পায় না। সেটা ছাড়াও ১৯৪৭ থেকে নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত পূর্ববঙ্গে একশ্রেণীর মানুষের মধ্যে যতটুকু ভারতবিরোধী মনোভাব ছিল, এক তসলিমা নাসরীনকে কেন্দ্র করে তা দশ গুণ বেড়ে গেছে। তসলিমা ভারতে যে আতিথেয়তা পেয়েছেন পৃথিবীর ইতিহাসে কোনো বিদেশি নাগরিক অন্য কোনো রাষ্ট্রে এমন আদর-অভ্যর্থনা, খাতির-যত্ন পায়নি। বাংলাদেশে বসে ভারতের মৃদু সমালোচনা করলে মুসলমান হোক, হিন্দু হোক ভিসা পান না; অথচ ভারতে বসে তসলিমা সে দেশের নেতৃবৃন্দ ও ভারত সরকারকে চটাং চটাং কড়া কড়া কথা বলা সত্ত্বেও তাঁর প্রতি ভারত সরকারের করুণা কিছুমাত্র হ্রাস পায় না। তাঁর মিশন হলো কোরআন শরিফ, ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে কথা বলা। বাংলাদেশের অসহায় মানুষ এতে কষ্ট পায়। মকবুল ফিদা হুসেনকে কোনোদিনই বাংলাদেশ স্থান দেবে না।
কেউ কেউ ব্যক্তিগত কারণে অর্থাৎ ভিসা না পেলে ভারতের ওপর নাখোশ হয়। আমার ব্যক্তিগত ধারণা, ভিসা প্রদানে ভারত খুবই উদার। প্রেস ও সংস্কৃতি বিভাগের কুটনীতিক ও কর্মকর্তারা খুবই সহায়ক। অন্তত দুই বার আমি সন্ধের আগে দুতাবাস বন্ধ হওয়ার সময় গিয়েও জরুরি ভিত্তিতে ভিসা পেয়েছি। বরং ভারতে বাংলাদেশ মিশন ভিসা দেওয়ায় রক্ষণশীল। ভারতের বিভিন্ন বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন ও কাস্টমস কর্মকর্তাদের থেকেও কোনো দিন অসৌজন্যমূলক আচরণ পাইনি। কিন্তু ব্যক্তির বাইরে সরকারে সরকারে একটা সম্পর্ক থাকে। বাংলাদেশ-ভারত সেই সম্পর্কটি প্রত্যাশিত রকম উষ্ণ নয়।
টিপাইমুখ নিয়ে বিএনপি-জামায়াত-ইসলামি ঐক্যজোট যা করছে তা বাচালতা ছাড়া কিছু নয়। তাদের প্রতিটি কাজ সাম্প্রদায়িকতাপ্রসুত। এবার তারা ক্ষমতায় থাকলে মিন মিন করা ছাড়া কিছু বলতেন না। এখন বলছেন, ফুলেরতল গ্রামে গিয়ে ‘চড়ুইভাতি’ করবেন, লং মার্চ করবেন, জাতিসংঘে যাবেন−ড. মনমোহন সিং ও শেখ হাসিনাকে চিঠিও লিখেছেন ইত্যাদি। ওদিকে সরকার বিষয়টিকে ধামাচাপা দেওয়ার ফিকির করছে। সরকারও ‘বনভোজনের’ জন্য ফুলেরতল প্রতিনিধিদল পাঠাচ্ছে। বাংলাদেশের জনগণের টাকায় দিল্লিতে যে আমাদের হাইকমিশনার রয়েছেন এ ব্যাপারে তাঁর কী ভুমিকা জানা গেল না। ভারত সরকারের সঙ্গে কোনো ব্যাপারে বিবাদে জড়ানো শেখ হাসিনার সরকারের জন্য হবে আত্মঘাতী। শেখ মুজিবের মেয়ে হিসেবে তিনি জানেন কিসে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা হবে। কিন্তু ভু-রাজনীতি ও ব্যক্তিগত সম্পর্ক তাঁকে বেকায়দায় ফেলে দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর এই উভয় সংকট বেগম জিয়ার জন্য খুবই উপভোগ্য।
ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে উচ্চপর্যায়ে যোগাযোগই কাম্য। কিন্তু ভারতের পররাষ্ট্র সচিব শিবশঙ্কর মেননের আকস্িনক ঢাকা সফর এবং প্রধানমন্ত্রী ও সেনাপ্রধানের সঙ্গে বৈঠক স্বাভাবিক মনে হয় না। তাতে সরকারবিরোধী ও ভারতবিরোধীরা সন্দেহ করার একটা উপাদান পেয়ে গেল। ভারতের হাইকমিশনার বাংলাদেশে ভারতের মুখপাত্র। শেরাটনের আলোচনা সভায় তাঁর বক্তব্য যদি কুটনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভুত নাও হয়ে থাকে, শ্রুতিকটু ঠেকেছে তাতে সন্দেহ নেই। সে জন্য বিএনপি তাঁকে বহিষ্ককার করতে চায়। যেন একজন কুটনীতিককে বহিষ্ককার করলেই টিপাইমুখ সমস্যার সমাধান হয়ে গেল। বস্তুত, তারা ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের একটা ঝগড়া চাইছে।
১৯৭২ সাল থেকে আজ পর্যন্ত ঢাকায় যাঁরা ভারতের হাইকমিশনার হয়ে এসেছেন তাঁরা সবাই দক্ষ ও পেশাদার কুটনীতিক। কখনো যদি দুই দেশের মধ্যে কোনো ব্যাপারে টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়েছে, তারা তা শান্তভাবে সমাধান করেছেন। মি. পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তীও পেশাদার কুটনীতিক। এর আগে তিনি ঢাকায় ভারতের ডেপুটি হাইকমিশনার ছিলেন। তখন থেকেই তাঁকে জানি। এখানকার অনেকের সঙ্গেই তাঁর বন্ধুত্ব। তাঁকে মজলিসি মানুষ বলে জানতাম। এবার যখন হাইকমিশনার হয়ে এলেন, ধারণা করেছিলাম তাঁর সময় বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক আরও ভালো হবে। আমার ধারণা ভুল প্রমাণিত হলো।
বাংলাদেশে অনেক পেশাদার পাকিস্তানপন্থী ও পেশাদার ভারতপন্থী আছেন। ওটা তাঁদের জীবিকা। বন্ধুবৎসল শ্রীচক্রবর্তীর সম্ভবত তাঁদের কারও কারও সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়েছে। বাংলাদেশের মানুষের আবেগ-অনুভুতি সম্পর্কে তাঁরা তাঁকে ভুল বার্তা দিয়ে থাকবেন। ভারতের মতো আঞ্চলিক শক্তির রাষ্ট্রদুতের উচিত শুধু বিশেষ মতাদর্শের কিছু অবসরপ্রাপ্তদের সঙ্গে কথা না বলে সব শ্রেণীর প্রতিনিধির সঙ্গেই কথা বলা। বাংলাদেশে চাল-সংকটের সময়ও তিনি সমালোচিত হয়েছিলেন। তখন তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা না খেয়ে কি আপনাদের খাওয়াব?’ তা বক্তব্য হিসেবে ঠিক, কিন্তু দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবে নয়। ওই বক্তব্যে একটা নিষ্ঠুরতার প্রকাশ ঘটেছে। এবারের বক্তব্যটিও আক্রমণাত্মক।
শুরুতে যা বলেছি, পাকিস্তানপ্রেমিক গভীর হিন্দুবিদ্বেষী ছাড়া বাংলাদেশের মানুষ মোটেই ভারতবিরোধী নয়। বিভিন্ন কারণে তারা ভারতের সমালোচক হয়ে ওঠে। হতে পারে সে কারণ ফারাਆা, হতে পারে তালপট্টি, হতে পারে তিন বিঘা, হতে পারে কাঁটাতার বা বিএসএফের হত্যাকান্ড, হতে পারে চাল ক্রয়, হতে পারে তসলিমা এবং হতে পারে টিপাইমুখ প্রকল্প। বাংলাদেশের মূলধারার অধিকাংশ কাগজ ও টিভি চ্যানেল ধর্মনিরপেক্ষ ও ভারতবান্ধব।
যদি স্রেফ তার অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রয়োজনেও উজানের শক্তিশালী দেশ ভারত টিপাইমুখ বাঁধ প্রকল্প বাস্তবায়ন করে, তা হলেও বাংলাদেশের মানুষ সংগত কারণেই মনে করবে মুসলমানপ্রধান দেশটির ক্ষতি করার জন্যই ভারত ওই নিষ্ঠুর প্রকল্পটি গ্রহণ করেছে। ভারত বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে মাথা ঘামাবে তা অস্বাভাবিক নয়। কারণ রাজনীতির মধ্য দিয়েই বাংলাদেশের জন্ন এবং জন্নলগ্নে বাংলাদেশের যে রাজনীতি তাতে ভারতের অংশগ্রহণ ছিল। আড়াই কোটি হিন্দু বাংলাদেশের নাগরিক। তাদের সমানসংখ্যক আত্মীয়-জ্ঞাতি আছে ভারতে। সুতরাং দুই দেশের সম্পর্ক ভালো রাখতেই হবে। দুই দেশের শাসকশ্রেণীকে বেছে নিতে হবে তাঁরা কোন পথ গ্রহণ করবেন: বিরোধের, না বন্ধুত্বের। সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী যে প্রোপাগান্ডা করছে ৩৮ বছর ধরে, তা যদি আংশিকও সত্য বলে প্রমাণিত হয়, তাহলে তা হবে বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ প্রগতিশীল শক্তির জন্য বিরাট পরাজয়। ভারত বাংলাদেশের সম্প্রীতিতে কোনো দেশেরই ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা নেই বরং দুই দেশের জনগণের ষোল আনা লাভ। ভারতের কোনো কার্যক্রম বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ইন্ধন হয়ে ওঠে কি না পরিবেশ বিপর্যয়ের বিষয়ে বিবেচনার আগে তা নিয়ে ভারতকে ভাবতে হবে।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক, কলাম লেখক।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: