জীবনে এমন কত বিচ্ছেদ, কত মৃত্যু আছে, ফিরিয়া লাভ কি? পৃথিবীতে কে কাহার…

মো হী ত উ ল আ ল ম
শিশু ছয় মাস পার হতে থাকলেই বাবা-মাসহ আত্মীয়-স্বজন ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েন জানতে যে শিশু বসছে কি না, হামাগুড়ি দেয়ার চেষ্টা করছে কি না কিংবা শিশুর দাঁত দেখা দিচ্ছে কি না। তেমনি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট সরকারের ছয় মাস যখন (৬ জুলাই ২০০৯) পূরণ হল চারদিক থেকে সবাই একটা হিসাব-নিকাশে নেমে পড়লেন কী পাওয়া গেল আর কী পাওয়া গেল না তা নিয়ে।
মহাজোট সরকার খারাপ করল কি ভালো করল এ ব্যাপারে মন্তব্য রাখতে বললে নিশ্চিত বিভিন্ন রকমের মত আসবে এবং কেউ কেউ বিশেষজ্ঞ মতামত দেবেন আবার কেউ কেউ সাধারণ মতামত দেবেন। আমি নিজেও নিজের অবস্থান থেকে মহাজোট সরকারের ছয় মাসের শাসন অবলোকন করলাম এবং কি করলাম সেটাই এখন পেশ করছি।
ব্যক্তিগতভাবে আমি খুব ভীতু লোক। অসুখকে ভয় পাই, মৃত্যুকে ভয় পাই এবং সবচেয়ে বেশি ভয় পাই সন্ত্রাসকে। কিন্তু আমিও তো রাষ্ট্রের একজন নাগরিক এবং রাষ্ট্রীয় সরকার আমারও দেখভাল করবে, আমার এবং আমার পরিবারের নিরাপত্তাটুকুন দেখবে এ আশা আমার যেমন, তেমনি আমার মতো আরও অনেকের।
কিন্তু আমি দেখছি, দেশব্যাপী সন্ত্রাস বেড়ে যাচ্ছে। শীর্ষ সন্ত্রাসীরা যেমন ফিরে আসছে, তেমনি নতুন সন্ত্রাসীরা গজিয়ে উঠছে। রোগের মধ্যে কলেরা, ম্যালেরিয়া যেমন ছোঁয়াছে রোগ, তেমনি সমাজের মধ্যে সন্ত্রাস সবচেয়ে ছোঁয়াছে। সন্ত্রাসকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে আজকে যে ছেলে হাতে পিস্তল নেয়নি, সে ছেলে কালকে তা নেবে। যে ছেলে আজকে চাঁদাবাজি করেনি, কালকে সে তা করবে। হেরোইন সেবন যেমন একটা নেশা, সন্ত্রাসও তেমনি একটা নেশা। আবার ক্যান্সারের বীজ পরিবহনের জন্য যেমন রক্ত সবচেয়ে ভালো মাধ্যম, তেমনি সন্ত্রাসের বিস্তৃতির জন্য সবচেয়ে ভালো মাধ্যম হল অনিয়ন্ত্রিত ছাত্র রাজনীতি (এবং কিছুটা শিক্ষক রাজনীতি)। জানুয়ারি মাস থেকেই ছাত্রলীগের রাজনীতির মধ্যে অস্থিরতা দেখা যাচ্ছিল এবং নেতৃত্ব ও হলে দখলদারিত্ব নিয়ে তীব্র কোন্দলের ফলে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের শুরু হয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা মেডিকেল কলেজে ছাত্র বা ছাত্র নামধারী সন্ত্রাসী নিহত হয়। পরিস্থিতি সীমা অতিক্রম করলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই ছাত্রলীগের সাংগঠনিক পদ ছেড়ে দেন, যেটি ছিল তার এ ছয় মাসের মধ্যে নেয়া অনেকগুলো ভালো সিদ্ধান্তের একটি। তারপরও ছাত্র রাজনীতিসহ দেশের বিভিন্ন সেক্টরে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের আলামত বেড়ে গেছে। টেন্ডারবাজি, ঠিকাদারি ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ ও বাজার দখল (কারওয়ানবাজার হত্যাকাণ্ড) প্রবণতা হুমকির মতো দেখা দিচ্ছে, যেগুলোর পেছনে ছাত্রলীগ, যুবলীগ বা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা জড়িত বলে পত্রিকায় খবর আসছে। এটাও সত্য যে, আমাদের দেশের সন্ত্রাসের ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় সন্ত্রাসীরা সবসময় সরকারি দলের সমর্থক হয়ে থাকে। অন্য দলের সন্ত্রাসীরা বা সাধারণ সন্ত্রাসীরা যে সরকার দলীয় হয়ে যায়নি তাও নয়।
‘চ্যারিটি বিগিনস অ্যাট হোম’ বা ‘দানপ্রথা প্রথমে ঘরেই শুরু করতে হয়’ বলে যে জনপ্রিয় রচনা ছাত্রদেরকে স্কুলে লিখতে হয়, তার মর্মকথা হচ্ছেÑ ‘আপনি আচরি ধর্ম পরকে শেখাও’। মহাজোট সরকারকে তথা আওয়ামী লীগকে এ কঠিন কাজটি করতে এখন ব্রতী হতে হবে। আমার এক ভাই মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল এবং মুক্তিযুদ্ধের পরপর সে কেমন যেন বেপরোয়া হয়ে উঠছিল এবং আমার বৃদ্ধ বাবা-মার পক্ষে তাকে সামাল দেয়া কঠিন হয়ে উঠছিল। এ সময় এক পর্যায়ে বাবার কানে গেল যে, সে গ্রামের এক কলেজ থেকে নকল করে বিএ পরীক্ষা দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমার বাবা সেই রাতেই ভাইটি ঘরে ফেরার আগে তার বালিশের তলায় একটি চিরকুট গুঁজে দিলেন এ বলে যে, সে যদি নকল করে পরীক্ষা দেয়, বাবা তা হলে তাকে ত্যাজ্যপুত্র করবেন। (অনেক পরে অবশ্য আমার এক বিজ্ঞ সহকর্মী আমাকে জানিয়েছিলেন যে, ইসলাম ধর্মে নাকি পুত্রকে ত্যাজ্য করার বাপের কোন ক্ষমতা নেই।) আমার এ উচ্ছৃঙ্খল ভাইটি আর পরীক্ষাটি দেয়নি এবং আজকে সে তার নিজের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সুপ্রতিষ্ঠিত।
মহাজোট সরকারের শুরুর দিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডকে শাক দিয়ে মাছ ঢাকার কায়দায় বলতে চাইলেন যে, এগুলো বিএনপি’র অন্তর্কোন্দল থেকে সৃষ্ট। কিন্তু সদাজাগ্রত প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া তাকে আঙুল দিয়ে প্রায় দেখিয়ে দিল যে, সরকারি দলের সমর্থকদের মধ্যেই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের হিড়িক পড়েছে।
সরকারের তরফ থেকে এ ধরনের আত্মপ্রবঞ্চনামূলক দৃষ্টিভঙ্গিকে আমি ভয় পাই।
প্রতিটি সরকারই আত্মপ্রবঞ্চিত হতে ভালোবাসে। সরকারের শক্তি যে কাঠামোগত ছাঁচে আবদ্ধ থাকে, সে কাঠামোর একটি দ্বিবিধ চরিত্র আছে। এটি একদিকে সরকারকে বাস্তবতার কাছাকাছি নিয়ে যায়, আবার অন্যদিকে বাস্তবতা থেকে দূরেও সরিয়ে রাখে। যেমন একজন সাধারণ মানুষ হয়তো দারিদ্র্য কি জিনিস বা বন্যা উপদ্রুত অঞ্চলের লোকের কষ্ট কি সে সম্পর্কে একটি আবছা ধারণা রাখে, কিন্তু একজন সরকারি লোকের পক্ষে (ডিসি, মন্ত্রী বা যে কোন পদমর্যাদাধারী) ওই দরিদ্রক্লিষ্ট বা বন্যাউপদ্রুত জনগোষ্ঠীকে খুব কাছে থেকে দেখার সুযোগ হয়। শেখ হাসিনা বা মইন উ আহমেদ কাছে থেকে যতটা দারিদ্র্য দেখেছেন আমি ততটা দেখিনি। কারণ পাওয়ার স্ট্রাকচারের (শক্তির কাঠামোগত রূপ) কারণে তাদের পক্ষে সেটা সম্ভব হয়েছে। অন্যদিকে, বিপরীতভাবে এটাও সত্য যে পাজেরো জিপের সুশীতল কাচবদ্ধ পরিবেশে থেকে তারা মুহূর্তেই এ দারিদ্র্য, এ নিরন্ন বুভুক্ষু মানুষকে ভুলে যেতে পারেন, চাই কি সমস্ত বাংলাদেশকে ভুলে যেতে পারেন। অধস্তন ব্যক্তির তোষামোদী কথাও দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে বাস্তবতা থেকে দূরে নিয়ে যেতে পারে। পাওয়ার স্ট্রাকচারের কারণেই এ আত্মপ্রবঞ্চনাজাত মুখোশ তৈরি হওয়া সম্ভব। এ আত্মপ্রবঞ্চনাজাত বোধের প্রশ্রয়ের কারণেই আমাদের দেশের মন্ত্রীদের পক্ষে সম্ভব হয় পাঁচতারা হোটেলের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সুসজ্জিত সুআলোকিত হলরুমে গিয়ে দারিদ্র্য নিরসনের ওপর আন্তর্জাতিক সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে ফিতা কাটা।
এ ছয় মাসে আমি যেটা লক্ষ্য করলাম সেটা হল সরকার যেন ক্রমশ আত্মপ্রবঞ্চিত হতে ভালোবাসছে। আশুলিয়ার হা-মীম পোশাক কারখানা পুড়ে যাওয়ার ঘটনাটি এখানে আরেকটি সাম্প্রতিক দৃষ্টান্ত। পত্রিকায় কারখানাটিতে আগুন ধরানোর আগে থেকেই পুলিশের রহস্যজনক নিষ্ক্রিয়তার খবর এসেছে এবং আত্মপ্রবঞ্চিত একজন বড় কর্মকর্তা নিচের কর্মকর্তা থেকে খবর পেয়ে সন্তুষ্ট ছিলেন যে, ওইটি একটি সামান্য টিনশেডের আগুন ছাড়া আর কিছু নয়। এবং যত দিন যাচ্ছে ততই এটা পরিষ্কার হচ্ছে যে, ওই কারখানার মালিকগ্র“পের বিপক্ষের মহল এ ষড়যন্ত্রমূলক কাণ্ডটি ঘটিয়েছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সরকার যদি আত্মপ্রবঞ্চিত না হয় তাহলে বুঝতে পারবেন যে, পিলখানার ঘটনাটি যেমন ছিল সরকারকে নড়বড়ে করে দেয়ার একটি বড় ষড়যন্ত্র, পোশাক-কারখানা পোড়ার ঘটনাটিও কিন্তু সরকারের অবিচল শাসন ও নিয়ন্ত্রণের প্রতি হুমকিস্বরূপ।
পরিশেষে, একটি গল্প দিয়ে আজকের আলোচনাটি শেষ করি। এক সাহেব দাফতরিক কাজে দূরবর্তী শহরে ভ্রমণে যাচ্ছেন। বাসার নৈশপ্রহরী তাকে বারণ করলেন যেতে। কেননা, সে রাতে স্বপ্নে দেখেছে যে, যে ট্রেনে করে সাহেব যাবেন সেটি দুর্ঘটনায় পতিত হবে। সাহেব তারপরও গেলেন এবং ট্রেনটি দুর্ঘটনায়ও পড়ল, সাহেব ব্যথাও পেলেন সামান্য এবং প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে এসে প্রথমে যে কাজটি করলেন, সেটি হচ্ছে ওই নৈশপ্রহরীকে চাকরি থেকে ছাঁটাই করে দিলেন। কারণ তার তো পাহারা দেয়ার কথা ছিল, ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখার কথা ছিল না। সরকার আত্মপ্রবঞ্চিত হতে ভালো না বাসলেই ভালো।
মোহীত উল আলম : অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, ইউল্যাব

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: