জীবনে এমন কত বিচ্ছেদ, কত মৃত্যু আছে, ফিরিয়া লাভ কি? পৃথিবীতে কে কাহার…

অরুন্ধতী রায়
আজকের দুনিয়ায় ‘প্রগতি’ ও ‘উন্নয়ন’ শব্দের অর্থ পরিবর্তিত হয়ে অর্থনৈতিক ‘সংস্কার’ ‘পুনর্নিয়ন্ত্রণ’ ও বেসরকারিকরণের সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ‘স্বাধীনতা’র অর্থ হয়েছে ‘পছন্দ’। মানবিক শক্তির চেয়ে ডিওড্রান্টের ব্র্যান্ড বেছে নেওয়ার সঙ্গেই এর সংশ্লিষ্টতা বেশি। ‘বাজার’ এখন এমন কোনো জায়গা নয়, যেখানে আপনি দরকারি পণ্য কিনতে যান। ‘বাজার’ এখন একটা অঞ্চলবিহীন জায়গা, যেখানে মুখাবয়বহীন করপোরেশনগুলো ব্যবসা করে, ‘ভবিষ্যৎ’ কেনা ও বেচার সওদা করে। ‘ন্যায়বিচার’ বলতে বোঝাচ্ছে ‘মানবাধিকার’ (বলা হয়ে থাকে খুব কম ক্ষেত্রেই এটি রক্ষিত হবে)। ভাষার ওপর এই চৌর্যবৃত্তি, শব্দের ওপর জবরদখল প্রতিষ্ঠা করে একে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা নতুন নিয়ন্ত্রক জারদের একটি মেধাবী কৌশলের সফলতা। শব্দকে এর মাধ্যমে এমন একটা অর্থ দেওয়া হয়, যা এর ঐতিহ্যগত অর্থ থেকে সম্পূর্ণ বিপরীত। এর মধ্যদিয়ে তারা তাদের সমালোচনাকারীকে একঘরে করে দেয়। যে ভাষা দিয়ে তারা তাদের সমালোচনা করে বাতিল করে দিতে চায় তা থেকে তাদের বঞ্চিত করে। তাদের দেয় ‘প্রগতিবিরোধী’, ‘উন্নয়নবিরোধী’, ‘সংস্কারবিরোধী’ ‘জাতিবিরোধী’, ‘নেতিবাদী’_ এ রকম সব বাজে আখ্যা। একটি নদী বা একটি বন বাঁচানোর কথা তুলুন, এরা বলবে, ‘আপনি কি তাহলে প্রগতিতে বিশ্বাস করেন না?’ যে লোকদের ভূমি বাঁধের কারণে অধিগৃহীত হচ্ছে বা যাদের বাড়িঘর বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে তাদের এরা বলবে, ‘আপনাদের কি বিকল্প কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনা আছে?’ যারা বিশ্বাস করে প্রাথমিক শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক নিরাপত্তা সরকারের অবশ্য কর্তব্য তাদের এরা বলবে, ‘আপনি বাজার ব্যবস্থার বিরুদ্ধে।’ আর মানসিক প্রতিবন্ধী ছাড়া কে বাজারের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে?
চুরি যাওয়া শব্দগুলোর দাবি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার জন্য দরকার ব্যাখ্যা দেওয়া। অল্প মনোযোগের এই দুনিয়ায় কাজটা খুব ক্লান্তিকর। আর হয়ে ওঠে ব্যয়বহুল। এ সময় গরিবের জন্য স্বাধীন মত খুব ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। আমাদের কিছু না করার চাবিকাঠি হয়তো এই ভাষার মধ্যেই নিহিত।
‘প্রগতি’র এ রকম একটা পরিস্থিতিতে ভারতে একটি বৃহৎ মধ্যশ্রেণী তৈরি হয়েছে, যারা হঠাৎ সম্পদ ও সে সম্পদের সঙ্গে আসা হঠাৎ শ্রদ্ধার চাপে হতবিহ্বল। কিন্তু এর সঙ্গেই এসেছে এদের চেয়ে বৃহৎ ও বেপরোয়া নিম্নবিত্তের মানুষ। লাখ লাখ মানুষ অন্যায্য পরিবেশগত প্রকৌশল, বিশাল নির্মাণযজ্ঞ, বাঁধ, খনি, বিশেষায়িত অর্থনৈতিক অঞ্চলের দ্বারা সৃষ্ট বন্যা, খরা, মরুকরণের ফলে তাদের জমি থেকে উৎখাত হয়েছে বা সরে গেছে। এ সবকিছুই তৈরি হয়েছে গরিবের উন্নয়নের জন্য। কিন্তু আদতে এগুলো নতুন অভিজাত শ্রেণীর সেবায় নিয়োজিত।
জমির জন্য যুদ্ধ ‘উন্নয়ন’ বিতর্কের একদম কেন্দ্রীয় বিষয়। ভারতের অর্থমন্ত্রী হওয়ার আগে পি চিদাম্বরম ছিলেন এনরনের আইনজীবী ও বেদান্ত নামে একটি খনি করপোরেশনের পরিচালকমণ্ডলীর সদস্য। এই কোম্পানিই বর্তমানে নিয়মগিরি পাহাড়ে ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে। সম্ভবত তার পেশা তার বিশ্বদৃষ্টিকে আকার দিয়েছে। অথবা অন্য কোনোভাবে ঘটনাটি ঘটেছে। এক বছর আগে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, তার স্বপ্ন হলো, তিনি ভারতের ৮৫ শতাংশ মানুষকে শহরে বাস করতে দেখতে চান। তার এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য দরকার অকল্পনীয় পর্যায়ের সামাজিক প্রকৌশল। এর মানে হলো পাঁচশ’ হাজার মিলিয়ন মানুষকে বাধ্য করে শহরে নিয়ে আসা। এ প্রক্রিয়া প্রক্রিয়াধীন। আর এটি ভারতকে একটি পুলিশি রাষ্ট্রে পরিণত করতে চলেছে। যে মানুষগুলো তাদের জমি সমর্পণ করতে রাজি নয়, তাদের বন্দুকের নলের মুখে সেটা করতে বাধ্য করা হচ্ছে। সম্ভবত এ প্রক্রিয়াটিই পি চিদাম্বরমের অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আসার পথটিকে সহজ করে দিয়েছে। দুই মন্ত্রণালয়ের পার্থক্য একটি পাতলা ঝিলি্লর দ্বারা আলাদা হয়ে রয়েছে। এই দুঃস্বপ্ন যাকে স্বপ্ন বলে অভিহিত করা হচ্ছে, তা ভারতের বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদকে, এর বিপুল ভূমিকে করপোরেট ধ্বংসযজ্ঞের নিচে ফেলে দেবে। স্বাধীনতার পর যে ভূমি সংস্কারনীতি নেওয়া হয়েছিল তাকে উল্টে দেবে।
ইতিমধ্যে অরণ্য, পাহাড় ও নদীপ্রবাহগুলো লুণ্ঠক বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর শিকারে পরিণত হয়েছে। রাজ্য সরকারগুলো এতে সমর্থন দিয়েছে। অনাবাদি জমিগুলো তাদের দখলে চলে গেছে। সোজা কথায় একে বলা যায় পরিবেশ হত্যা। পূর্ব ভারতে বক্সাইট ও লৌহ আকরিক অনুসন্ধানের খনিগুলো পুরো ইকোসিস্টেমকে ধ্বংস করছে, উর্ব্বর ভূমিকে পরিণত করছে মরুভূমিতে। হিমালয় অঞ্চলে কয়েকশ’ বড় বাঁধের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যার একমাত্র পরিণতি ভয়াবহ বিপর্যয়। সমতল এলাকায় নদীতে বাঁধ দেওয়া হচ্ছে। বলা হচ্ছে, এগুলো বন্যা নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে নির্মাণ করা হচ্ছে। কিন্তু এর ফলে নদীগুলো ফুলে উঠে আরও বেশি বন্যার কারণ হয়ে উঠছে, জলাবদ্ধতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। চাষের জমিতে লবণাক্ত পানি ঢুকে যাচ্ছে, লাখো মানুষের জীবন-জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ভারতে অধিকাংশ পবিত্র নদী অপবিত্র নর্দমায় পরিণত হয়েছে। আবর্জনা ও শিল্পবর্জ্যের আধার হয়ে উঠেছে। খুব কষ্টে একটি নদী এর প্রবাহ সাগর পর্যন্ত অব্যাহত রাখতে পারে।
একটি অবাস্তব ধারণা থেকে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট একটি অবিশ্বাস্য ও অহমিকাপূর্ণ ধারণার বশবর্তী হয়ে স্বেচ্ছাচারীর মতো আদেশ দিয়েছিল যে, ভারতের নদীগুলোকে যান্ত্রিক ব্যবস্থার মতো আন্তঃসংযুক্ত করতে হবে। এ আদেশের পেছনে ছিল সেই অবাস্তব ধারণা যে, পানি সাগরে পড়া মানে তার অপচয় হওয়া। এটি বাস্তবায়ন করার অর্থ হলো, পাহাড় ও অরণ্যের মধ্যদিয়ে নালা খনন করা, প্রাকৃতিক ভূমিরেখা ও অববাহিকায় নদীর প্রবাহ ব্যবস্থাকে ব্যাহত করা। বদ্বীপ ও মোহনাকে ধ্বংস করা। অন্য কথায় পুরো উপমহাদেশের ইকোসিস্টেমকে ধ্বংস করা। (বিএন কিরপাল, যিনি এই মামলার বিচারক ছিলেন, তিনি পরে অবসর গ্রহণের পর কোকা-কোলার পরিবেশ বোর্ডে যোগ দিয়েছেন। দারুণ!)
মুক্তবাজার অর্থনীতির দাপট ও শাসন কৃষকের চাষ ব্যবস্থায় উদ্বেগজনক পরিবর্তন এনে দিয়েছে। সভ্যতার এক অভিশাপ হিসেবে তারা অনেক বেশি যান্ত্রিক সেচের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠেছেন। টেকসই খাদ্যবীজ, স্থানীয় মাটির অবস্থা বা স্থানীয় জলবায়ুর জায়গা দখল করেছে পানি সেচ, হাইব্রিড ও উচ্চফলনশীল শস্য। এগুলো পুরো বাজারের ওপর নির্ভরশীল। আর এগুলোর জন্য দরকার হয় রাসায়নিক সার, কীটনাশক, খাল খনন করে সেচ পরিচালন আর ভূগর্ভস্থ পানির অপরিমেয় উত্তোলন। রাসায়নিক প্লাবিত করে কৃষিজমির ক্ষতিসাধন করে এর উর্বরতা নাশ করা হয়েছে। উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। কৃষক ঋণের জালে বাঁধা পড়েছে। গত ক’বছরে ভারতে ১ লাখ ৮০ হাজার কৃষক আত্মহত্যা করেছে। সাব-সাহারান দেশগুলোর মতো এখানে মন্দা, ক্ষুধা ও অপুষ্টি আঘাত করছে। ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধির সূচকটি ঠিক উল্টো করে দিলেই সঠিক চিত্রটি পাওয়া যাবে। প্রবৃদ্ধির এই উচ্চহার দুরবস্থারই পূর্বাভাস।
সামন্ততন্ত্র ও বর্ণ ব্যবস্থার মধ্যে শুকাতে থাকা একটি প্রাচীন সমাজ হওয়া সত্ত্বেও এ দেশ একটি বৃহৎ মেশিনে মথিত হচ্ছে। পুরনো বিভেদ এবং তার নতুন রূপায়ণ এই মন্থনে আরও শক্তি দিচ্ছে। মন্থনে অমৃত হলো সেই কোটি ক্রেতার ভারতীয় বাজার (সেলফোন, গাড়ি, কম্পিউটার, ভ্যালেন্টাইন ডের শুভেচ্ছা কার্ড) ও আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ের ঈর্ষা। পানি এখানে এক সামান্য ঘটনা। একে ছিটিয়ে দেওয়া যাবে, পুকুরে সংরক্ষণ করা যাবে এবং দরকার হলে প্রবাহ ঘুরিয়ে দেওয়া যাবে।
হ আউটলুক ম্যাগাজিন থেকে সংক্ষেপিত ভাষান্তর : মাহবুব মোর্শেদ

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: