জীবনে এমন কত বিচ্ছেদ, কত মৃত্যু আছে, ফিরিয়া লাভ কি? পৃথিবীতে কে কাহার…

আলী হাসান
‘স্মৃতির মিনার ভেঙেছে তোমার?/ ভয় কি আমরা এখনো চার কোটি পরিবারঃ
ইটের মিনার ভেঙেছে ভাঙুক/একটি মিনার গড়েছি আমরা চার কোটি পরিবারঃ’

অমর একুশের বিখ্যাত কবিতা ‘স্মৃতিস্তম্ভ’-এর কবি আলাউদ্দিন আল আজাদ আর আমাদের মাঝে নেই। তিনি নিজেই এখন একটি বিরাট-বিশাল স্মৃতিস্তম্ভ হয়ে বাঙলা ও বাঙালির চেতনায় অমলিন হয়ে রইলেন। গত শুক্রবার মধ্যরাতে তার উত্তরার বাসভবন ‘রতœদ্বীপ’-এ তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হযেছিল ৭৮ বছর। হ্যাঁ, ৭৮ বছর বয়সের কোনো মানুষের চলে যাওয়াকে হয়তো অকাল প্রয়াণ হিসেবে উল্লেখ করা যাবে না। কিন্তু রাজধানীর উত্তরা অঞ্চলের ‘রতœদ্বীপ’ বাড়ির রতœটি আর এ ধরাধামে নেইÑ এ কথা ভাবলেই বুকের ভেতর একটা হা হা শূন্যতার রব উঠে, হৃৎপিণ্ড নিদারুণ ব্যথায় কঁকিয়ে উঠে। এক বছর আগে তার একমাত্র ছেলে মারা গেছেন। এই দুঃসহ বেদনাবোধকে কাটিয়ে উঠতে না পেরেই তিনি দিন দিন নিজেও রোগগ্রস্ত হয়ে পড়ছিলেন। এটা তার আত্মীয় পরিজন, বন্ধু-বান্ধব, গুণগ্রাহীÑ সবাই গভীরভাবে অনুধাবন করতে পারার পরেও এর বিপরীতে তাদের তেমন কিছুই করার ছিল না। বাঙলা ও বাঙালি চেতনার অমলিন স্মৃতির মিনারকে অটুট রাখতে পারলেও নিজেরই ঔরসজাত মিনার হারানোর শোককে কাটিয়ে উঠতে পারলেন না। চলে গেলেন প্রিয় পুত্রের কাছেই।
গত শুক্রবার মধ্যরাতের পর যখন তার মৃত্যুর সংবাদটি প্রচার হচ্ছিল তখন থেকেই দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নেমে আসে শোকের ছায়া। তার মরদেহ যখন শহীদ মিনারের পাদদেশে রেখে সর্বস্তরের মানুষ তাদের শেষ শ্রদ্ধা জানাচ্ছিল, জানতে ইচ্ছে করে কী অনুভূতিতে সবাইকে নাড়া দিচ্ছিল তখন? পাক হানাদারদের অন্যায়ের বিরুদ্ধাচরণকারী এক সাহসী বীর চির নিদ্রায় শায়িত আছেন শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে। শত্র“র দলন-পীড়নের মধ্য দিয়ে সৃষ্ট বাঙলা ও বাঙালি চেতনার মিনার প্রাঙ্গণে তার নিথর দেহও কি প্রতিবাদী নয়? পাক-জান্তাদের সেদিন ইটের মিনার ভেঙে ফেলার কদর্যতাকে নেহাত অবহেলা করেই তো তিনি বলতে পেরেছিলেনÑ ‘ইটের মিনার ভেঙেছে ভাঙুক/ একটি মিনার গড়েছি আমরা চার কোটি পরিবার..’।
আলাউদ্দিন আল আজাদ ছিলেন একজন বহুমাত্রিক লেখক। কবি, কথাসাহিত্যিক, গল্পকার, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, প্রাবন্ধিক, গবেষক, অধ্যাপকÑ কোন অভিধায় তিনি বড় নন? নানা মাত্রিকতার এক অনবদ্য সৃজনশীল মানুষ ছিলেন তিনি। তাই তার চলে যাওয়াতে কখনোই মনে হচ্ছে না যে তিনি তার পূর্ণতা দিয়েই বিদায় নিয়েছেন। আমরা অনেকেই হয়তো এর চেয়েও দীর্ঘ জীবন লাভ করে বেঁচে আছি কিন্তু আলাউদ্দিন আল আজাদের মতো সে জীবন কি কোনোভাবেই বর্ণাঢ্য ও বৈচিত্র্যময়?
১৯৩২ সালে আলাউদ্দিন আল আজাদ ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। বায়ান্নর মহান ভাষা আন্দোলন এবং ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। ছোট বেলাতেই তিনি মা-বাবাকে হারান। পড়াশোনা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাঙলা ভাষা ও সাহিত্যে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করে তিনি লন্ডন বিশ্বদ্যিালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন দীর্ঘ সময়। সর্বশেষ সেখানে নজরুল গবেষণা কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক হিসেবে তিনি অবসরগ্রহণ করেন। কিছুকাল রাশিয়ায় বাংলাদেশের দূতাবাসেও দায়িত্ব পালন করেছেন। ঢাকা কলেজে অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন অনেকদিন। কৈশোরবেলা থেকেই তার লেখালেখির শুরু। তার সমস্ত জীবনে লেখা ৭৫টিরও বেশি বইয়ের প্রায় সবই পাঠক সমাজে সমাদৃত। তার কবিতা, গল্প, উপন্যাস অনূদিত হয়েছে ইংরেজি, মালয়, বুলগেরীয়সহ বিভিন্ন ভাষায়। তার বিভিন্ন গল্প থেকে দেশ-বিদেশে প্রচুর সংখ্যক চলচ্চিত্রও নির্মিত হয়েছে।
রবীন্দ্র-উত্তর বাংলা গল্প রচনায় তিনি একটি স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করতে পেরেছিলেন। তার গল্পের প্লট ও বুনন এতোটই আকর্ষণীয় যেÑ তা একটানে পড়ে শেষ না করে পাঠকদের কোনো গত্যন্তর থাকে না। তার গল্পের মানুষরা গ্রাম ও শহরের যুগপদ অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ। উভয় পরিবেশ থেকেই বেড়ে উঠা মানুষগুলো যে কীভাবে জীবনের নানা অনুষঙ্গে বিচিত্র টানাপড়েনের মুখোমুখি হয়Ñ তা তার গল্পে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। প্রাত্যহিক জীবনযাপনের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যে যে অন্তর্ঘাত ও দ্বন্দ্ব বর্তমান রয়েছেÑ তা যেন তার গল্পের প্রধান উপজীব্য। তার রচিত গল্পগুলোর বিষয়-বৈচিত্র্যই বলে দেয় তিনি জীবনাভিজ্ঞতায় কতোটা ঋদ্ধ ছিলেন। তার গল্প পড়তে পড়তে একজন পাঠক যেন তার নিজেরই কোনো অভিজ্ঞতার আলোকে মিলিয়ে গিয়ে সেই গল্পের নিজস্ব এক চরিত্র হয়ে উঠেন। বলার অপেক্ষা রাখে না, গণমানুষের একটি বৃহৎ অংশের মনোজাগতিক বিষয়ের নির্মাতা ছিলেন বলেই আলাউদ্দিন আল আজাদের অনেক গল্পের চলচ্চিত্রায়ণ হয়েছে। তার তেইশ নম্বর তৈলচিত্র উপন্যাস নিয়ে ছবি করেন এদেশের প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক সুভাষ দত্ত। যে ছবিটির নাম ছিল ‘বসুন্ধরা’। ছবিটি দেশ-বিদেশে শুধু প্রশংসা কুড়ায়নি, পেয়েছে অসংখ্য পুরস্কার।
সাহিত্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানের জন্য তিনি বাংলা একাডেমী পুরস্কার ও ইউনেস্কো পুরস্কারসহ বহু পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। বহুমাত্রিক জ্যোতির্ময় এই মানুষটি শুধু গল্প, উপন্যাস ও কবিতায়ই নয়Ñ সাহিত্যের সকল শাখায়ই অত্যন্ত সফলভাবে বিচরণ করে গেছেন। কর্মের ভেতরই তার আজন্ম বেঁচে থাকার বীজ নিহিত রয়েছে। সবচেয়ে দুর্লভ বিষয় হচ্ছেÑ আমাদের সমাজে এমন কজন মানুষের সন্ধান পাওয়া যাবে যারা একই সঙ্গে বাঙালির স্বাধীকার আন্দোলনের প্রধান দুই সংগ্রামেই সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে পেরেছেন? অর্থাৎ ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ। আলাউদ্দিন আল আজাদ সেই গর্বিত মানুষ যিনি একই সঙ্গে ভাষা আন্দোলন ও স্বাধীনতা সংগ্রামের যুগপদ অংশগ্রহণকারী। তার চলে যাওয়ায় আমরা ব্যক্তি আলাউদ্দিন আল আজাদকে হারালাম সত্য কিন্তু তার রচনাপুঞ্জি ও আদর্শই টিকে থাকবে আমাদের মাঝেÑ যা এক উচ্চতম আলোকস্তম্ভরূপেই বিরাজিত থাকবে বলে বিশ্বাস করি।
আলী হাসান : সাংবাদিক, সংস্কৃতিকর্মী।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: