জীবনে এমন কত বিচ্ছেদ, কত মৃত্যু আছে, ফিরিয়া লাভ কি? পৃথিবীতে কে কাহার…

সু ন ন্দা ক বী র
অনেক ছোটবেলায় খুব সম্ভবত তখন ক্লাস ফোরে পড়ি, একটা আবৃত্তি প্রতিযোগিতায় শামিল হয়েছি। উপলক্ষ রবীন্দ্রখ্যাত সমাজকর্মী, বিদূষী রমণী এবং অধ্যাপক কবীর চৌধুরীর সুযোগ্য নর্ম এবং মর্ম সহচরী।
যাই হোক, নির্বাচিত কবিতা ছিল ‘অভিসার’Ñ সবার জন্যেই। আমাদের বয়সী প্রায় সবাই ২১২ বিভিন্ন রকম উপস্থাপনা, কলাকৌশল ও নৈপুণ্য প্রকাশে তৎপর। বাসবদত্তা এবং উপগুপ্তর সম্ভাব্য (হলে হতে পারত) সবরকম অঙ্গসঞ্চালনও বাদ পড়েনি। এরই মধ্যে এক প্রতিযোগী দাখিল হলেন। দাখিল হলেন এজন্য বলছি যে তড়াক করে লাফিয়ে স্টেজে উঠলেন এবং শুরু করলেন তার প্রদর্শনীয় এবং শ্রবণায় আবৃত্তি, আমি অবশ্যি শেষদিকের ক’টা লাইন তুলে ধরছি :
‘কে এইস্যাছ তুমি ওগো দয়াময়
শুধাইল নারী সইন্যাসী কয়
আজি রজনীতে হইয়েছে স(অ)ময়
এইস্যাছ বাসবদইত্তা!’
অতঃপর অতঃপর ‘দর্শকজন মুদিল নয়ন সভা হলো নিস্তব্ধ’।
না, ভুল বললাম। ভুরভুরিয়ে হাসি উঠেই অট্টহাসিতে ফেটে পড়েছিলাম আমরা। না, বিচারকমণ্ডলী হাসেননি। অনেক কষ্টে তাদের শালীনতার পরীক্ষা দিতে হয়েছিল। আমরা রামগড়-রের ছানা হতে পারিনি, আমাদের দুর্ভাগ্য! এখন বয়েস হয়েছে। মনে হয় ‘ঠাট্টা করে ওড়াই সখি নিজের কথাটাই।’ কষ্ট হয়। একুশে ফেব্র“য়ারি আসে, চলেও যায়। বাংলাভাষার নানাদিক, বৈশিষ্ট্য, দুর্বলতা, সবলতা ব্যবচ্ছেদ করা হয়Ñ সব মিডিয়া সভাসমিতি এবং আলোচনায়, এমনকি গুণীজনের লিভিংরুমেও যেখানে হয়তোবা সাহিত্যের দিকপালদের পোট্রেট দেয়ালে প্রলম্বিত।
ভাষা এবং সাহিত্য অনেকটা রন্ধনশিল্পের মতো। যতই সুখাদ্য হোক, পরিবেশনা যদি না হয় রুচিসম্মত এবং সৌন্দর্যমণ্ডিত তাহলে ক্ষিধের সঙ্গে যুগপৎ তৃপ্তিও উধাও হয়। বিষয়বস্তু যতই মূল্যবান বা অকিঞ্চিতকর হোক ভাষার গুণেই হয়ে ওঠে সরস, রম্য এবং পঠনযোগ্য। অত্যন্ত গুরুগম্ভীর বৈজ্ঞানিক তত্ত্বও আগ্রহ জšে§ দেয় উপস্থাপনার গুণে।
এপার বাংলায় প্রচুর লেখক ও কবি রয়েছেনÑ সাহিত্যের উদ্যান যাদের পদচারণায় নিত্যই মুখর, যারা সত্যিই প্রথিতযশা। এরা শুধু সমকালীনই নন, উত্তরসূরিদের কাছেও তারা সমভাবেই আদৃত হবেন বলে প্রত্যেক বোদ্ধারই বিশ্বাস। কিন্তু এদের অনেকেই যখন কোন রচনা থেকে পাঠ করেন কিংবা আলোচনায় অংশ নেন তখন সাধারণ বাংলা উচ্চারণও যেভাবে লাঞ্ছিত হয়, তা সত্যিই পীড়াদায়ক। আমাদের আলোচক, আবৃত্তিকার, রিপোর্টার, পাঠক শতকরা ৯৮ ভাগেরই উচ্চারণ অত্যন্ত শ্রবণকটু।
পাইকারি হারে ‘এ্যাবং (এবং), দ্যাশ (দেশ), ব্যাতন (বেতন), দুটু (দুটো), সুষ্ঠ (সুষ্ঠু), পতিষ্ঠা (প্রতিষ্ঠা), পচ্চিম (পশ্চিম)Ñ ইত্যাদি অহরহ শুনতে শুনতে ক্লান্তি আসে। অসংখ্য অসহ উচ্চারণের মধ্যে একয়টি উদাহরণ মাত্র।
একদা রবীন্দ্র নাথ বলেছিলেন, ‘এরা তো আবৃত্তি করে না, করে আব্রিত্তি।’ কোন এক বাঙালের ওপর রাগ করে প্রতিমাদেবীকে বলেছিলেন : ‘যারা ম্যাগ (মেঘ) বলে তাদের ক্যাক (কেক) খেতে দাও।’ কথাগুলো বাবার কাছে শোনা, সত্যিমিথ্যে জানিনে। প্রসঙ্গত বলি আমার বাবা প্রয়াত সুধীর সেন রবীন্দ্র নাথের অত্যন্ত প্রিয় ছাত্র ছিলেন, বিশ্বভারতীতে অধ্যাপনা এবং গবেষণা করতেন।
রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে যারা ‘ন্যাতা’ (আমাদের অধিকাংশের উচ্চারণে), যারা মিডিয়ায় ভাষ্যকার, আলোচক, বক্তা, শিক্ষকÑ এদের উচ্চারণ যদি শুদ্ধ এবং সুখশ্রাব্য হয় তবে আমার বিশ্বাস বক্তব্যের গ্রহণযোগ্যতাও অনেকখানি বাড়ে। পাঠ বা আলোচনায় মহাপ্রাণ বর্ণসমূহ, ৃ (ঋ-কার), এ (এ্যা নয়), ও (উ নয়), প-ভ (ঔষ্ঠ্য বর্ণ), ড়, ঢ়, হ্র (র নয়), হƒ (রি নয়), ্র (র-ফলা), ব (ব-ফলা), ম (ম-ফলা), ঁ ইত্যাদি আরও নানাবিধ উচ্চারণ সঠিকভাবে না করার জন্য পুরো বক্তব্যটাই অনেকাংশে মার খেয়ে যায়। অ (ও-এর মতো উচ্চারণ)-এর ব্যবহার, যেমন অগ্নি, অঙ্গুলি এবং অ (নঞর্থক)-এর ব্যবহার যেমন অশেষ, অনাগত- উচ্চারণে প্রভূত পার্থক্য আনে। পরের বর্ণ ক্ষ থাকলে আগের বর্ণের উচ্চারণ, কিংবা ’ ক্ষ, গ্ন্য, ক্সক্ষ, চ্ছ্র, ঞ্চ, ঞ্ছ, জ্ঞ, ঞ্জ, Í্য, ন্ধ্র, ষ্ট্র, স্খ, হ, হ্ম ইত্যাদির উচ্চারণও সঠিকভাবে করা উচিত।
আনিসুজ্জামান বলেছেন : ‘বানানের মতো উচ্চারণও বদলায়, প্রমিত উচ্চারণ সম্পর্কে ধারণাও পালটায়। রবীন্দ্র করতেন বলে মনে হয় না। আমরা করি। উচ্চারণের নিয়ম নিয়ে মতপার্থক্য হতে পারে, নিয়ম সম্পর্কে মতৈক্য হলেও ব্যতিক্রম নিয়ে মতান্তর হওয়া খুব স্বাভাবিক হবে।’
রবীন্দ্র নাথের সঙ্গে প্রত্যেক বোদ্ধাই একমত হবেন যে আমাদের উচ্চারণ বেশিরভাগই প্রাকৃত বাংলা উচ্চারণ, আঞ্চলিকতা দোষদুষ্ট। এদেশের ভাষায় প্রাকৃত উচ্চারণ থাকবেই। কিন্তু তারপরও মনে হয় এই দুর্বলতা অনেকটাই অতিক্রম করা যায় সঠিক শ্র“তিচর্চা, অধ্যবসায় এবং স্বীয় উদ্যোগের সাহায্যে। আজকাল শুদ্ধ উচ্চারণ শেখানোর সহায়তা করতে পারে এমন প্রচুর প্রতিষ্ঠান, ক্যাসেট, ডিস্ক ইত্যাদি বেরিয়েছে। নিজের জন্য প্রয়োজন জিভের আড়ভাঙানো (পৌনঃপুনিক উচ্চারণ) এবং সঠিক শ্রবণযোগ্যতা, অর্থাৎ কানটাকে তৈরি করা। কিন্তু শুনে যেন চেষ্টাকৃত বা আরোপিত মনে না হয়। সবটাই হবে স্বতঃস্ফূর্ত।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের প্রথমভাগ-৩ অনুচ্ছেদের ঘোষণা ‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা’। একাত্তরের পর আটত্রিশ বছর অতিক্রান্ত। ভাষাচর্চায় আমরা অনেক ঋদ্ধ হয়েছি বটে, কিন্তু প্রয়োজন আরও পরিশীলন ও মার্জিতায়নের। প্রাথমিকভাবে স্কুল থেকেই যদি সঠিক উচ্চারণের সঙ্গে নিয়মিত পাঠ অভ্যাস করানো যায় তাহলে শিক্ষার্থীদের জড়তা কেটে গিয়ে উচ্চারণে স্পষ্টতা আসে। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে সরষের মধ্যেই ভূত। যারা শেখাবেন তাদের নিজেদের উচ্চারণেই প্রভূত ঘাটতি এবং দোষদুষ্টতা। আরও যন্ত্রণাদায়ক হচ্ছে কতিপয় ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের অতিসচেতন ছাত্রছাত্রীদের বাংলা উচ্চারণ। ইংলিশ ধপপবহঃ-এ বাংলা বলার কায়দায় মা-বাবারা রীতিমতো পুলকিত, আর আমরা আতঙ্কিত। আমার এক বন্ধু মজা করে বলেন : ‘মাইজাবাই সাইজাবাই খোই ঘ্যালারে (রে-টাকে একটু জিভে ঘষে দিয়ে)’
এখন বিশ্বের দরবারে সাহিত্য, ভাষায়, শিল্পে, বিজ্ঞানেÑ সবক্ষেত্রে আমাদের সবার বীঢ়ড়ংঁৎব ভিন্ন মাত্রা এনেছে। কাজেই কুয়োর ব্যাঙ হয়ে না থেকে যেটা সাধ্যায়ত্ত সেটার দিকে মন দিলে ক্ষতি কি! না হলে ‘তোমার ভাষা বোঝার আশায় দিতে হবে জলাঞ্জলি!’
শুধু সাহিত্য নয়, সঙ্গীতেও উচ্চারণের সৌন্দর্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রবীন্দ্র ও নজরুল সঙ্গীতে উচ্চারণ এক গভীর দ্যোতনা, এক আলাদা ফরসবহংরড়হ যোগ করে। কণ্ঠমাধুর্যের সঙ্গে উচ্চারণের সাযুজ্য যে আবহ তৈরি করতে পারে তা নিঃসন্দেহে দুর্লভ। পরিশীলিত গায়কী- যা আছে সুচিত্রা মিত্রের কণ্ঠে, যা আছে আসাফুদ্দৌলার গলায়!
বাংলা শব্দের পাশাপাশি বাংলায় বহুল প্রচলিত ইংরেজি সাধারণ শব্দ আছে যেমন : ঃবষবারংরড়হ, ধপঃরড়হ, াধঃ, ধপরফ, পধষপঁষধঃরড়হ, ঃবহংরড়হ, ুড়ড় ইত্যাদি এবং আরও অসংখ্য শব্দ। অনেক সময়ই ঃবষবারংরড়হ টেলিভীষণ হয়। াধঃ হয় ভেট, ধপরফ উচ্চারিত হয় এসিড হিসেবে। বাংলা ঔষ্ঠ বর্ণ ফ এবং ভ এবং ইংলিশ ষবঃবৎ ভ ও া- এর উচ্চারণের তফাৎ অনেকের বোধগম্য হয় না। বিদেশী শব্দে ‘ং’ এর বদলে ‘ছ’ উচ্চারণও অনেক সময় কর্ণপীড়াদায়ক হয়। ু- এর ভুল উচ্চারণ হয় ল- এর মতো। মুশকিল হচ্ছে ংধঃ এর ধ এবং ভ, া, ,ি ু প্রভৃতির প্রতিবর্ণ বাংলায় নেই। ‘অল্প কয়েকটি নতুন অক্ষর বা চিহ্ন বাঙ্গালা লিপিতে প্রবর্তিত করিলে মোটামুটি কাজ চলিতে পারে। বিদেশী শব্দের বাঙ্গালা বানান যথাসম্ভব উচ্চারণসূচক হওয়া উচিত’ (রাজশেখর বসু)। অবশ্যি তিনি স্বীকার করেছেন এক ভাষার উচ্চারণ অন্য ভাষার লিপিতে যথাযথ প্রকাশ করা অসম্ভব। সেজন্যই মনে হয় বক্তব্য বা পঠনে বিদেশী শব্দ ব্যবহার করলে যথাসাধ্য সে ভাষায় লেখাই উচিত উচ্চারণ যথাযথ হওয়ার জন্য। অবশ্যি প্রচলিত শব্দের কথা আলাদা।
প্রত্যেকটা ভাষা প্রত্যেকটা ভাষা থেকে আলাদা। প্রত্যেকটার বৈশিষ্ট্য বজায় রেখেই সে ভাষা বলা উচিত, একটার মোড়কে অন্যটা নয়। এতে শ্রদ্ধার বদলে বক্তার প্রতি অশ্রদ্ধাই গভীর হয়।
‘বাঙলা জীবন্ত ভাষা। গতি এর ধর্ম। ঃ আমরা বিশ্বাস করি কোন ভাষার মূল-নিয়ন্ত্রক সে ভাষাগোষ্ঠীর ব্যাপক জনগণ। (নরেন বিশ্বাস)
সুনন্দা কবীর : শিক্ষাবিদ, কবি

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: