জীবনে এমন কত বিচ্ছেদ, কত মৃত্যু আছে, ফিরিয়া লাভ কি? পৃথিবীতে কে কাহার…

মহীবুল আজিজ
পঞ্চাশের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক চর্চায় আলাউদ্দিন আল আজাদ ছিলেন উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক। বিশেষ করে বাঙালি জাতীয়তাবাদ, প্রগতিশীল সংস্কৃতি ও চিন্তার স্মারক ছিলেন তখন থেকেই। ফেব্র“য়ারিকেন্দ্রিক কবিতা ‘স্মৃতির মিনার’ চিরকালীন বাংলা সাহিত্যের সম্পদ। বাংলাদেশের সাহিত্যের পঞ্চাশ ও ষাটের ছোটগল্প ও উপন্যাসে ব্যক্তি এবং সমাজকে দেখার আধুনিক পদ্ধতি গ্রহণ করেছিলেন তিনি। এই সময়কার সমকালীন জীবনের সংকটকে বিজ্ঞানসম্মতভাবে দেখার চেষ্টা করেছেন তার কথাসাহিত্যে, যার আবেদন এখনও ফুরিয়ে যায়নি। পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় আলাউদ্দিন আল আজাদের সাহিত্যের অনুবাদ বাংলাদেশের সাহিত্যের যথার্থ প্রতিনিধিত্ব করছে। গল্প-উপন্যাস, নাটক-কবিতা সব মিলিয়ে এক বিচিত্র সৃজনশীল প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গেছেন তিনি।
আলাউদ্দিন আল আজাদ আধুনিক জীবনদৃষ্টিতে বাঙালির অতীতকে জানতে চেয়েছিলেন। তিনি ছিলেন রুশ সাহিত্যের ভক্তÑ তলস্তয়, তুর্গিনের ও গোর্কির অনুরাগী। তার প্রথম জীবনের ছোটগল্পে বিশেষ করে ‘জেগে আছি’ ও ‘ধান কন্যা’র গল্পগুলোতে মার্কসবাদের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। সোমেন চন্দ, গোলাম কুদ্দুস, ননী ভৌমিক এবং আজাদ স্বয়ং পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের মার্কসবাদী গল্পের ধারাকে বেগবান করেন। পরবর্তীতে অসীম রায় এবং দেবেশ রায়ের হাতে তা নতুন রূপ পায়। পরে অবশ্য আজাদ মার্কসবাদী ধারা ছেড়ে মনোবিশ্লেষণ রীতির দিকে ঝুঁকে পড়েন।
শিক্ষাবিদ হিসেবে তিনি ছিলেন উজ্জ্বল ব্যক্তিত্বের অধিকারী। বিভিন্ন সরকারি কলেজে এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন সুনামের সঙ্গে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে থাকাকালীন শিক্ষা ও সংস্কৃতিবিষয়ক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে তিনি ইতিবাচক ভূমিকা রাখেন। বিভাগীয় সভাপতি হিসেবে দৃঢ় অথচ সহানুভূতিশীল পরোপকারী এবং প্রয়োজনে কঠিন প্রশাসক হওয়ারও দৃষ্টান্ত দেখিয়েছেন তিনি। বিভাগের শিক্ষাসফরে, বনভোজনে এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে এ কঠিন প্রশাসককেই আমরা দেখি দিল খোলা ও আড্ডাবাজ মানুষ হিসেবে। একেবারে নতুন ভর্তি হওয়া ছাত্রটিকেও তিনি ‘আপনি’ বলে সম্বোধন করতেন, যা আরেকজন প্রয়াত শিক্ষাবিদ আবু হেনা মোস্তফা কামালকে স্মরণ করিয়ে দেয়। প্রতিটি ব্যক্তির প্রতিই তিনি ছিলেন সম্মানপ্রবণ।
গবেষণা ক্ষেত্রেও তিনি ব্যতিক্রমী অনুসন্ধানী ছিলেন। কবি ঈশ্বরগুপ্তের কবিতাকে নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে মূল্যায়ন করেছিলেন লন্ডনের স্কুল অব ওরিয়েন্টাল এন্ড আফ্রিকান স্টাডিজ-এ গিয়ে। তার পিএইচডির অভিসন্দর্ভটি পরে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে নজরুল অধ্যাপক হিসেবে বৃত থাকাকালীন নজরুলকে নিয়ে তার মূল্যায়নও ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। তার প্রবন্ধের বই ‘সাহিত্যের আগন্তুক ঋতু’ এবং নজরুলকে নিয়ে তার প্রবন্ধগুলো আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় বুদ্ধদেব বসু কিংবা সুধীন দত্তকে। নিজে সৃজনশীল হয়ে অন্যের সৃজন প্রতিভার মূল্যায়ন যে এক ধরনের সাহিত্যিক দায়বোধÑ এ বিষয়ে তিনি অত্যন্ত সচেতন ছিলেন।
তার গণমুখী জীবনচেতনা এবং লোকায়ত সংস্কৃতির প্রতি অনুরাগের ফসল ‘হীরামন’। বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত অনুষ্ঠানটি বাংলাদেশ-পশ্চিমবঙ্গসহ আরও দু-একটি দেশে বেশ প্রশংসা কুড়ায়।
‘হীরামন’-এ তিনি আধুনিক জটিল বাজার অর্থনীতির চাপে বিধ্বস্ত জীবন থেকে সরে গিয়ে বাংলার লুপ্তপ্রায় সাহিত্য ও সংস্কৃতির উপাদানকে আরোহণ করেন পরম যতেœ। হীরামনের নাট্য আখ্যানগুলো মধ্যযুগ এবং তার পরবর্তী সময়কার বাংলার ইতিহাস, সমাজ, কিংবদন্তি, পুরাণ প্রভৃতির আশ্রয়ে গড়া এমন এক জগৎ, যা নিয়ে বর্তমানে ইউরোপ-আমেরিকায় নতুনভাবে গবেষণা হচ্ছে।
আজ থেকে বহুকাল আগে তিনি কর্ণফুলী উপন্যাসে যে আদিবাসী জনজীবনের বৃত্তান্ত তুলে ধরেন তা তখনকার জন্য ছিল অকল্পনীয় ব্যাপার। পার্বত্য চট্টগ্রামের জনজীবন নিয়ে লেখা এটি সর্বপ্রথম উপন্যাস। ‘তেইশ নম্বর তৈলচিত্র’, ‘ক্ষুধা ও আশা’ কিংবা ‘শীতের শেষ রাত, বসন্তের প্রথম দিন’Ñ এসব উপন্যাসে কী মধ্যবিত্ত কী নিুবিত্ত কী উচ্চশিক্ষিত প্রতিটি মানুষের মনের জটিলতা বিশ্লেষণে তিনি ছিলেন অনুসন্ধিসু।
মহীবুল আজিজ : অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: