জীবনে এমন কত বিচ্ছেদ, কত মৃত্যু আছে, ফিরিয়া লাভ কি? পৃথিবীতে কে কাহার…

‘৫২-এর ভাষা আন্দোলনকে নিয়ে সাড়া জাগানো কবিতা ‘স্মৃতিসত্দম্ভ’-এর রচয়িতা খ্যাতিমান সাহিত্যিক, ভাষা সংগ্রামী, শিক্ষাবিদ ড. আলাউদ্দিন আল আজাদ গত শুক্রবার গভীর রাতে উত্তরার নিজ বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। পঞ্চাশটিরও অধিক উপন্যাস-গল্প-কবিতাগ্রন্থ ও নাটকের প্রণেতা আলাউদ্দিন আল আজাদের প্রথম উপন্যাস তেইশ নম্বর তৈলচিত্র ১৯৬০ সালে প্রকাশিত হয়। ১৯৭৭ সালে এ উপন্যাস অবলম্বনে আরেক খ্যাতিমান চলচ্চিত্র অভিনেতা-পরিচালক সুভাষ দত্ত নির্মাণ করেন ‘বসুন্ধরা’ চলচ্চিত্র। বসুন্ধরা ইলিয়াস কাঞ্চনের অভিষেক চলচ্চিত্র। সুভাষ দত্ত ও ইলিয়াস কাঞ্চনের অনুভূতি নিয়ে লিখেছেন এমএইচ শহীদ

কবি আলাউদ্দিন আল আজাদ স্মৃতিসত্দম্ভ কবিতায় লিখেছিলেন_ ‘স্মৃতির মিনার ভেঙেছে তোমার ভয় কী বন্ধু/আমরা তো রয়েছি এখনো চারকোটি পরিবার খাড়া_’। এ কবিতাটি আমাদের জাতীয় চেতনা-সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য আর ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে উদ্বুদ্ধকরণী মন্ত্রও বটে। বসুন্ধরা চলচ্চিত্রটি ১১টি ক্যাটাগরিতে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পায়। এ চলচ্চিত্রের কাহিনীকার হিসেবে আলাউদ্দিন আল আজাদ, পরিচালক সুভাষ দত্ত, নায়িকা ববিতাসহ ১১টি পুরস্কার অর্জন ওই সময়ের চলচ্চিত্র জগতে আলোড়ন তোলে। বসুন্ধরা পরিচালনা, আলাউদ্দিন আল আজাদের সঙ্গে হৃদ্যতাসহ নানা প্রসঙ্গে :

সুভাষ দত্ত

আলাউদ্দিন আল আজাদের মৃত্যুতে দেশের অপূরণীয় ক্ষতি হলো। তার সঙ্গে আমার অনত্দরঙ্গ অনেক স্মৃতিই আছে। বসুন্ধরাকে ঘিরে যে স্মৃতি তা ভোলার নয়। বসুন্ধরা কাহিনী আমার হাতে তুলে দেয়ার পর সম্ভবত আলাউদ্দিন আল আজাদ রাশিয়া হাইকমিশনে চাকরি নিয়ে_ মানে রাশিয়াতে অবস্থান করছিলেন। তখন তো ফোনের এই যুগ ছিল না। তিনি চিঠি লিখে খোঁজ নিতেন; আমাকে চিঠি লিখে জানাতে হতো বসুন্ধরার বর্তমান অবস্থা। বসুন্ধরা প্রযোজনা করেছিল মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট। এটি আমার দশম চলচ্চিত্র। তবে এ কথা আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি_ আমার প্রথম চলচ্চিত্র ‘সুতরাং’ যেমন আমার কাছে অসম্ভব প্রিয় তেমনি বসুন্ধরাও কোন অংশে কম নয়। বসুন্ধরা সে অর্থে বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র ছিল না। মূলত একটি আর্টফিল্ম। কিন্তু দর্শকপ্রিয়তায় যে কোন বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রকেও এটি হার মানিয়েছিল। বিশেষত এই চলচ্চিত্রের গানগুলো সাধারণ মানুষের মুখে শোনা যেত হলের বাইরেও। তখনকার দিনে তথ্যপ্রযুক্তির এত উন্নয়ন হয়নি, কিন্তু আমরা যে কাজটাই করতাম তাতে মনোযোগ-পরিশ্রম ও অধ্যাবসায়ের কমতি ছিল না। তাই সেসময়ের চলচ্চিত্র কালোত্তীর্ণ হয়েছে নিঃসন্দেহে। আমি মনে করি বসুন্ধরা কালোত্তীর্ণ বাংলা চলচ্চিত্রগুলোর অন্যতম একটি। পরবর্তীতে নানা কারণে আর আলাউদ্দিন আল আজাদের কোন কাহিনীতে আমার চলচ্চিত্র পরিচালনা হয়ে ওঠেনি।

ইলিয়াস কাঞ্চন

বসুন্ধরাকে ঘিরে আমার অনুভূতি অন্যরকম। বসুন্ধরা মুক্তির বেশ পরে সুধীজনদের প্রশ্ন করা হয়েছিল_ চলচ্চিত্রের কে কার প্রিয়? তখন আলাউদ্দিন আল আজাদ স্যার বলেছিলেন, আমি নাকি তার প্রিয়-পছন্দের অভিনেতা। এটা আমার জন্য পরম পাওয়া। স্যারের প্রিয়ভাজন হওয়ার যোগ্য হয়ে ওঠার চেষ্টা আমি আজীবন করে চলেছি। আমার সঙ্গে বেশ কয়েকবার স্যারের দেখা হয়েছে। একবার ঢাকা কলেজে দেখা হয়। সে স্মৃতিও ভুলবার নয়। অতি বিনয়ী এ মানুষটির সংস্পর্শ আমাকে ধন্য করেছে। আর এই মুহূর্তে একটা কথাই বলব_ শিক্ষক হিসেবে তিনি যেমন ছিলেন অতুলনীয়, মানুষ হিসেবেও ছিলেন অসম্ভব ভাল। তার প্রয়াণে জাতির অপূরণীয় ক্ষতি হলো।

এছাড়াও একসময়ের জনপ্রিয় টিভি অনুষ্ঠান ‘মণিহার’র জনক আলাউদ্দিন আল আজাদ। এ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বাংলা ক্লাসিককে সারাদেশের মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রাখেন তিনি। তার কাহিনীর উলেস্নখযোগ্য আরেকটি চলচ্চিত্র ‘সূর্যস্নান’। সালাহউদ্দিনের পরিচালনায় নির্মিত এ ছবিটি ১৯৬২ সালে তেহরান চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কৃত হয়। বসুন্ধরা ও সূর্যস্নানের অমর স্রষ্টা আলাউদ্দিন আল আজাদ ১৯৩২ সালের ৬ মে নরসিংদীর রামনগর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৫৩ ও ১৯৫৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় অনার্স ও মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর অধ্যাপনা পেশায় যুক্ত হন। ঈশ্বরগুপ্তের জীবন ও কবিতা বিষয়ে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৭০ সালে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। ৫টি সরকারি কলেজে অধ্যাপনা এবং পরবর্তীতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন। পেশাগত জীবনে তিনি মস্কোর বাংলাদেশ দূতাবাসে সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা, শিক্ষা সচিব, সংস্কৃতি বিষয়ক বিভাগ ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়েও গুরম্নত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: