জীবনে এমন কত বিচ্ছেদ, কত মৃত্যু আছে, ফিরিয়া লাভ কি? পৃথিবীতে কে কাহার…

drobaধ্রুব এষ
হুমায়ূন আহমেদের নাটক দেখাচ্ছে।
সুমাইয়া দেখছে।
নাটকের নায়িকা এক ছাগলের ইন্টারভিউ নিচ্ছে।

ছাগল বলল, ‘মানুষ পচা…….. !’ এই সময় ব্রেক। বিজ্ঞাপন বিরতি। সঙ্গে সঙ্গে চ্যানেল চেঞ্জ করল সুমাইয়া। এই চ্যানেলেও হুমায়ূন আহমদের নাটক। নায়িকার বাসায় এক ছেলে (নায়ক) একটা ছোট্ট মেয়েকে নিয়ে উপস্থিত হয়েছে। বলছে সে নায়িকার হাজব্যান্ড। জটিল অবস্থা।
নাটক দেখতে বসল আনহারও।

এক মিনিট।
বিজ্ঞাপন বিরতি।
‘উফ্!’ বলে উঠল সুমাইয়া।
আনহার বলল, ‘দেখবে না আর?’
‘না বাবা! এত বিজ্ঞাপন! সিডি বের হলে দেখব।’

আনমনে টিভির রিমোট নিল আনহার। চ্যানেল চেঞ্জ করল। এবং চেঞ্জ করে চলল। বেশির ভাগ চ্যানেলে বিজ্ঞাপন। না হলে হিন্দি সিরিয়াল। একটা চ্যানেলে নীল টি-শার্ট আর কালো প্যান্ট পরা একটা কাঁকড়া! ত্যাড়া-ব্যাকা হয়ে কী করছে! সুমাইয়া চেঁচিয়ে উঠল, ‘রাকায়েত! রাকায়েত!’

ততক্ষণে চেঞ্জ হয়ে গেছে চ্যানেল। পরের চ্যানেল, পরের চ্যানেল দেখে পরের চ্যানেলে চলে গেছে আনহার। ত্রস্ত হয়ে দেখল আবহাওয়া ভালো না। চোখের মণি জ্বলে উঠেছে সুমাইয়ার। রাগ! কেন?
কোনও কথা বলল না সুমাইয়া। পাশের ঘরে চলে গেল এবং সম্বিত ফিরল আনহারের। স-র্ব-না-শ!

কিন্তু এখন আর উঠে পড়ে কী? সে পরের চ্যানেলটা দেখল। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক চ্যানেল। অনেক লোক দেখে। কিন্তু সে পারলে দেখে না। জীবজন্তুর বাচ্চা হওয়া দেখায়। বিশ্রী দেখতে। অস্বস্তি লাগে তার। পরের চ্যানেলে ধুন্দুমার রেসলিং।

পরের চ্যানেলে আবার হিন্দি সিরিয়াল।
ব্রেক শেষ হয়ে গেছে?
আনহার প্রথম চ্যানেলে ফিরল।
বিজ্ঞাপন!
পরের চ্যানেল।
বিজ্ঞাপন!

এত বিজ্ঞাপন! এত বিজ্ঞাপন!
টিভির পাওয়ার অফ করে দিল আনহার।
কী করবে এখন?
‘রাধিকার মানভঞ্জন’ পালা?
না।

বসে একটা ছবি দেখা যায়।
‘লা ডলচে ভিটা’। ফেলিনির ছবি। দ্য সুইট লাইফ। মার্সেলো মাস্ত্রোয়ানি আছে। ডিভিডি কিনেছে আনহার। দেখা যায় এখন। সুমাইয়া দেখবে?
আনহার উঠে পাশের ঘরে গিয়ে দেখল ফ্লোরে পা ছড়িয়ে বসে আছে সুমাইয়া। সিগারেট টানছে। আনহার বলল, ‘তুমিঃ?’
কথা শেষ করতে দিল না, হিস হিস করে উঠল সুমাইয়া, ‘কুত্তার বাচ্চা!’
আনহার বলল, ‘কী?’

‘কুত্তার বাচ্চা! তুই একটা জানোয়ার! কুত্তার বাচ্চা!’
উচ্চ রক্তচাপ আছে আনহারের। লোসারডিল খায়। ৫০ মি.গ্রা.। এখন মাথায় রক্ত চড়ে গেল তার, ‘কী বললি? কী বললি তুই? কুত্তার বাচ্চা? আমি কুত্তার বাচ্চা? তোর বাপকে গিয়ে কুত্তা বলে আয় আগে!’
‘কুত্তাই তো!

আমার বাপও একটা কুত্তা! কিন্তু সে কখনও তোর মতো না। তোর মতো দয়াহীন না! রাকায়েত! আমাদের গ্রুপের রাকায়েত! কতদিন পর দেখলাম রাকায়েতকে! দেখতেই দিল না! তোর টেলিভিশন আর আমি দেখব না! কক্ষনো দেখব না!’

আনহার বসল এবং একটা ভুল করল। হাত ধরতে গেল সুমাইয়ার। ভয়াবহ প্রতিক্রিয়া হলো। বিশ মিনিট আগে দুই গ্লাস চা বানানো হয়েছিল। আনহার খেয়েছে, সুমাইয়া খায়নি। রাগ করে না, ভুলেই খায়নি। তখন রাগ-পর্ব মঞ্চস্থ হয়নি। রিহার্সেলও চলছিল না। এখন এটা ব্যবহার করল সুমাইয়া! তার চা ছুঁড়ে মারল আনহারের মুখে।

ঈষদোষ্ণ চা। কিছু হলো না। ভিজে গেল শুধু আনহারের চুল, মুখ আর ঘরে পরার টি-শার্টের খানিকটা। হতভম্ব হয়ে গেল আনহার। সুমাইয়ার কী হয়েছে? এত ক্রোধ কেন? রাকায়েত কে? রাকায়েত? সুমাইয়াদের গ্রুপের ছেলে। তাকে দেখতে পারেনি সুমাইয়া!

এটা এমন অন্যায় হয়ে গেছে? অত ভাবেনি তখন আনহার। এখন সে শুধু একটা বিস্মিত কথা বলল, ‘মাই গড!’ বলে টিভির ঘরে চলে গেল এবং মাঝখানের দরজার ছিটকিনি আটকে দিল। এই ছুটির দিন কাটানো তাহলে?

ঘরের লাইটের সুইচ অফ করল আনহার। ঘর তাতে নিকষ অন্ধকার হলো না। যা হলো সেটা অজমাট, জটিল অন্ধকার। পরিস্থিতির সঙ্গে অত্যন্ত মানানসই। মানানসই এই অন্ধকারে বসে একটা স্টিক ধরাল আনহার। গাঁজা। তামাক।

এই কয়েকটা স্টিক দিয়ে গেছে ইহো। ইহো সিকান্দার। কবি এবং তামাকের কারিগর। দেশে ‘মাদক নিয়ন্ত্রণ আইন’ না থাকলে সে তামাকের কুটির শিল্প করত। বলে গেছে, দ্রব্য কাটারি। আখাউড়া হইতে আমদানিকৃত। একটানে পাখি হয়ে যাবেন, বস্!
পাশের ঘরে সুমাইয়াও লাইট অফ করে দিয়েছে। ঘুমিয়ে পড়েছে?

গ্রুপ! গ্রুপ! গ্রুপ ফ্যানটিক!
নাটকের দল! বেইলি রোড সংশ্লিষ্ট।
সুমাইয়া ডাইহার্ড। তার প্রথম মঞ্চ। দ্বিতীয় মঞ্চ। তৃতীয় মঞ্চ। চার নম্বরে হয়ত আনহার!
তিনটান হয়ে গেছে এর মধ্যে।
পাখি হওয়া যায়নি।

বুক ভরে আরেকটা দম দিল আনহার। অভ্যস্ত না সে। মাঝে মধ্যে টানে। ধরে যায় এক আধটা টানলেই।
আচ্ছা, ধরুক!
আচ্ছা, সুমাইয়া।
আচ্ছা, ঘুমাক।
আচ্ছা, লা ডলচে ভিটঃ।
আচ্ছা, দেখা যায়।
ধরেছে কাটারি!

টিভি, ডিভিডির পাওয়ার অন করল আনহার।
ডিস্ক ভরা আছে।
সাউন্ড চেক করল। সতেরো তো আছে। আশা করা যায় ডিস্টার্বড্ হবে না সুমাইয়া।
বিজ্ঞাপন ডিভিডিতেও!
ডিজিটাল সাউন্ড সিস্টেমের বিজ্ঞাপন।
তারপর মেনু।

প্লে ফিচারস মুভি সিন
সিলেকশন সাবটাইটেল
বিহাইন্ড দ্য সিন।
প্লে ফিচারস।
শুরু হয়ে গেল আশ্চর্য বায়োস্কোপ।
লা ডলচে ভিটা।
দ্য সুইট লাইফ।

আনহার এর আগে একবার দেখেছে।
অনেকদিন আগে। আট-নয় বছর হবে। জার্মান সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে। ফেলিনির রেট্রোস্পেকটিভের আয়োজন করেছিল একটা চলচ্চিত্র সংসদ। শিহানদের গ্রুপ।
অসাধারণ ছবির প্রথম দৃশ্যটাই।

হেলিকপ্টারে করে উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে দড়িবাঁধা এক পাথরের যিশুকে। দুই দিকে হাত প্রসারিত যিশুর। পাথরের হাত। হেলিকপ্টার অনেক নিচ দিয়ে উড়ছে। অনেকে দেখছে। এই অনেকের মধ্যে তিনটা বিকিনি। তারা লাফাচ্ছে। তাদের শরীর দুলছে। বুক দুলছে।
ধরে গেছে নাকি আনহারের?

ফিল্মে কনসেনট্রেট করতে পারছে না? নাকি পারছে?
মনে হচ্ছে যিশু হয়ে গেছে সেই। পাথরের যিশু। হেলিকপ্টারে করে তাকেই উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে লোকেরা। তারা কারা? ফিল্মের লোকজন? সিনর ফেলিনি?
নাহ্! বেজায়, বেজায় ধরেছে!

নেশা এবং ঘুম।
নেশা
এবং
ঘুম!
নেশা
এ বং
ঘুম!

নিশা লাগিলরে
বাঁকা দুই নয়নে নিশা লাগিলরে;
হাসন রাজার গান।
চোখ জড়িয়ে এলো আনহারের।
‘লা ডলচে ভিটা’ চলল।
পাশের ঘরে কি সুমাইয়া ঘুমায়?
না, কাশল।

অনেক রাতে একবার ঘুম ভাঙল আনহারের।
‘লা ডলচে ভিটা’ তখনো চলছে।
মাস্ত্রোয়ানির সঙ্গে মস্ত বুকঅলা আমেরিকান নায়িকাটাকে দেখাচ্ছে। নাম কী না এর?
অ্যানিটা অ্যাকবার্গ।
দৃশ্যটা নখরামির।
কুত্তার ডাক কপি করছে অ্যানিটা অ্যাকবার্গ।
‘উ! উ! উ-উ-উ উ উ উ!’

আনহারের মাথা ঝিম ঝিম। পেশাব ধরেছে এবং শীত করছে। ডিসেম্বরের নয় তারিখ আজ। এখনও শীত জাঁকিয়ে পড়েনি। তবে রাতে কুয়াশা হয়। আর যত রাত বাড়ে শীত যতদূর সম্ভব বাড়ে।
আনহার ডিভিডি প্লেয়ার এবং টিভির সুইচ অফ করল।
পেশাব করল।

তাদের লেপ একটা। কাঁথা আছে দুটো। পাশের ঘরে।
ছিটকিনি খুলে সে পাশের ঘরে ঢুকল। এটা তাদের অফিসিয়াল বেডরুম। একটা বক্স খাটে তারা ঘুমায়। টিভিরুমে ফ্লোরিংয়ের ব্যবস্থা। ফ্লোর খুব ঠাণ্ডা। এস্কিমো-ঠাণ্ডা। আচ্ছা, এস্কিমো কাপলরা কি? জম্বি? জম্বিদের মধ্যে জামাই-বউ হয়? আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ওবামা বলেছে, কি বলেছে? ধরে গেছে তোর! ধরে গেছে তোর! মাথা এলোমেলো, এলোমেলো। এ-ল ও, মে-ল ও! এ-লও!

লেপমুড়ি দিয়ে ঘুমাচ্ছে সুমাইয়া। লেপের ওয়ার লাগানো হয়নি। অন্ধকারের মধ্যে শালুর লাল রং। দেখে একটা কাঁথা নিয়ে আবার টিভিরুমে ফিরল এলোমেলো আনহার। আবার দরজার ছিটকিনি আটকে শুয়ে পড়ল পাতলা কাঁথা মুড়ি দিয়ে। সঙ্গে সঙ্গে ঘুম অবশ্য ধরল না। মাথার ভেতর সুমাইয়া কিছুক্ষণ ঘুরল। সমস্যাটা কী? সাইকিয়াট্রিস্টের পেশেন্ট হয়ে গেছে সুমাইয়া! হয়ে গেছে না, আগে থেকেই পেশেন্ট? কেউ রেগে যায় এত অল্পে? আর রাগলে হুঁশ জ্ঞান থাকে না। চেঁচায়। চেঁচিয়ে কী বলে না বলে? কাপ ছুঁড়ে মারে, ব্রা ছুঁড়ে মারে! মামুন ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলবে আনহার? মামুন আল হাসান। সাইকিয়াট্রিস্ট। তারার কাছে মামুন ভাইয়ের ফোন নাম্বার আছে। তবে তারা এখন নিশ্চয় ঘুমাচ্ছে। মেয়ের বাপ হয়েছে কিছুদিন আগে। এখন তারা পরম নিশ্চিন্তে ঘুম যায়।
কিন্তু সুমাইয়া!
আনহারের অনেক টাকা থাকলে একটা নাট্যমঞ্চ নির্মাণ করত সে। লিখতে পারলে নব্বই মিনিটের একটা এক চরিত্রের নাটক লিখত। সেই নাটকে পারফর্ম করত সুমাইয়া। সেই মঞ্চে। বর্ন পারফরমার। অবশ্যই সুমাইয়া। তার ‘প্রথম পার্থ’ দেখেছে আনহার। ‘ওয়াইল্ড ডাক’ ‘অনাক্ষী অঙ্গনা’ দেখেছে। এখন তারা ‘তপস্বী ও তরঙ্গিণী’ করছে।

টেকনিক্যাল শো হয়ে গেছে। নিয়মিত মঞ্চায়ন শুরু হয়ে যাবে! আনহার দেখবে। মঞ্চে যে উঠে সে অন্য এক সুমাইয়া। কিংবা সে তখন সুমাইয়া থাকে না। ‘কুন্তী’ হয়ে যায়, ‘নোরা’ হয়ে যায়, ‘নন্দিনী’ হয়ে যায়, ‘হুরমতী’ হয়ে যায়।

অবিশ্বাস্য এটা। কিন্তু সে একটা কীটস্য কীট, এই বিবেচনার পরেও একটা নিজস্ব ধারণা আছে আনহারের। আর্ট ফর্ম সংহত করে মানুষকে। ধ্যানমগ্ন করে। চিন্তাশীল করে। এত রাগী হয় না আর্টিস্টরা! এরকম কেন সুমাইয়া?
আজ যা হয়েছে এক্সট্রিম।

এক্সট্রিম!
এক্সট্রিম!
এক্সট্রিম!
এক্সট্রিম!
এরকম করে কেন সুমাইয়া?
জবাই করে ফ্রিজে রেখে দিতে হবে ওকে!

অসভ্য মেয়ে!
ফ্লোর কি উড়ছে?
উড়ছে! উড়ছে!
উড়ে কোথায় যাচ্ছে?
আলফা সেন্টুরি?
আবার ঘোর কাটারির!
আবার এলোমেলো। এলোমেলো।

এলওএমও
এলএম
ও ও
ও ঘুম!
ও ঘুম!

ঘুমিয়ে পড়ল দুঃখী না, সুখী না, এলোমেলো এলোমেলো আনহার।
স্বপ্নহীন একটা ঘুম দিয়ে উঠল পরদিন সকাল সাতটায়। অন্যদিন এত সকালে উঠে না। ওঠলেও আধঘণ্টা পোনে এক ঘণ্টা দিনকার পত্রিকা দেখে কেটে যায়। কিন্তু পত্রিকাও তিনদিনের বন্ধ। সুমাইয়া উঠেছে? আনহার মোবাইল ফোন ওপেন করল এবং একটা লেখা দেখল ডিসপ্লেতে-ওয়ান নিউ টেক্সট ম্যাসেজ।
কার এসএমএস?
আনহার পড়ল।
Ami R Tomar Songe
Thakbo Na. Bday.
-Frm Sua
ঝঁধ সুমাইয়া!

কিন্তু ইয়ে মানে কী এর? থাকবে না মানে?
এসএমএসটা কখন পাঠানো?
১টা ২০ এ.এম। মানে রাতে।
এখন নিশ্চয় ঘুমাচ্ছে সুমাইয়া।
না।
দরজা খুলে আনহার সুমাইয়াকে দেখল।
ফ্লোরে বসে আছে একই ভঙ্গিতে। যেরকম কাল রাতে ছিল।
কখন উঠল?

আনহারকে দেখেও দেখল না।
আনহার বলল, ‘কোথায় যাবে তুমি?’
‘তোকে বলতে হবে? কুত্তার বাচ্চা! আমার কেউ নাই? আমি কি এতিম? তোর মতো এতিম? নির্লজ্জ পাষণ্ড কোথাকার! টিভি দেখতে দেয় না। গান শুনতে দেয় না! এতটুকু স্বাধীনতা নেই আমার! কেন? ওহ্ মা! মাগো! মা গো!’ কান্নার সিকোয়েন্স! হঠাৎ অসহ্য লাগল আনহারের। কিন্তু সে শাউট করল না। ঠাণ্ডা গলায় বলল, ‘তুমি চলে যাও। এখনই চলে যাও। তোমার কাপড় চোপড় পরে নিয়ে যাবে কেউ। আর যা যা আছে।’

‘যাবই তো! যাবই তো! তোর মতো একটা নোংরার সঙ্গে থাকব? ওহ্ মাগো! মাগো! মাগো! সব আমার কপাল! সব কপাল! না হলে তোকে বিয়ে করি আমি? তোর মতো একটা জানোয়ার জংলীকে?’

আবার রক্তচাপ। উচ্চ রক্তচাপ। রাগ আটকানোর কঠিন চেষ্টা করল আনহার। ঠাণ্ডা গলায় বলল, ‘ভুল হয়ে গেছে! বিয়ের আগে তুই বলেছিলি না, তুই আরেকজনের সঙ্গে ইনভলবড? তারপরও আমি কেন বিয়ে করলাম তোকে? আমি তোর প্রেমে পড়েছিলাম বলে? চার বছর ধরে একটা রিলেশন, আমি কেনঃ কীভাবে কেন?’
এই সময় নক হল দরজায়।

বুয়া।
সুমাইয়া উঠল না। আনহার দরজা খুলল। বুয়া বলল, ‘কী ভাইয়া? এত সক্কালে উইট্টা পরছেন দিহি? ঘুমান নাই রাইতে? আপায় কি উঠছে?’
‘উঠেছে বুয়া। আগে এখন দুইকাপ চা বানাও তুমি।’
‘আপায়ও খাইব?’
‘হুঁ।’

‘না।’ তীক্ষ একটা চিৎকার দিল সুমাইয়া।
বুয়া হা করে আনহারকে দেখল।
অভ্যস্ত অবশ্য এতদিনে বুয়াও।
আনহার বলল, ‘চা বানাও তুমি।’
বুয়া নিঃশব্দে রান্নাঘরে ঢুকল। আনহার ফের বেডরুমে ঢুকল।
ফুঁসছে সাপিনী।

‘আমিই চলে যাচ্ছি।’ আনহার বলল।
সুমাইয়া নড়ল না। কিছু বলল না।
টিভিরুম লাগোয়া তাদের বাথরুম।
বাথরুম থেকে প্যান্ট পরে এল আনহার।
‘আমি যাই।’

‘যাবি মানে? কোথায় যাবি তুই?’ লাফ মেরে উঠে দাঁড়াল সুমাইয়া, ‘অ্যাই কুত্তার বাচ্চা! কোথায় যাবি তুই?’
এই সময় চা নিয়ে এল বুয়া, ‘এমা! কী অইছে আপা?’
‘কিছু হয়নি, আপনি যান বুয়া! শুয়োরের বাচ্চা!’

দিশাহারা দেখাল বুয়াকে, ‘আবার কী হইল? আবার কী হইল? ছিড আছে কইতো হের মাথায়! একলা একলা থাকলেও আতকা এমন চিক্কুর দেয় শুনি। আমি মনে কল্লাম হেইরম বুজি। কী হইছে এহনে, ভাইয়া?’
আনহার বলল, ‘বুয়া, তুমি যাও।’

‘যাবে কেন? যাবে কেন? তোর সঙ্গে কত প্রেম আমার, তোর বুয়া দেখে যাবে না? এই বুড়ি! তুই দাঁড়া।’
সুমাইয়াকে ‘ঋভুর শ্রাবণের’ বুলবুলি পাগলির মত দেখাল। বুদ্ধদেব গুহর একটা ছোটদের উপন্যাস। ‘ঋভুর শ্রাবণ’ প্রথম ছাপা হয়েছিল পূজাবার্ষিকী আনন্দমেলায়। লাল শাড়ি পরা বুলবুলি পাগলির একটা আশ্চর্য ছবি এঁকেছিলেন আর্টিস্ট সুব্রত গঙ্গোপাধ্যায়।

বৃষ্টির মধ্যে লাল বুলবুলি পাগলি। সেই ছবি দেখছিল, মনে থেকে গেছে আনহারের। সুমাইয়াকে এখন একদম সুব্রত গঙ্গোপাধ্যায়ের আঁকা সেই বুলবুলি পাগলির মতো দেখাচ্ছে। লাল শাড়ি যদিও পরে নেই সে। এখন কী করবে সুমাইয়া পাগলি?
উঠে এমন জাপটে ধরল আনহারকে!

এবং একটা চুমু!
বুয়া পালাল।
নিমেষে উধাও সব রাগ-রোগ। আনহার হাসল।
‘হাসে আবার! হাসে আবার!’

‘তুই চলে যা।’ আনহার বলল, ‘তুই না আর আমার সঙ্গে থাকবি না?’
‘থাকব না-ই তো। না-ই তো। তোর সঙ্গে কেউ থাকে?’
‘তুই থাকবি! আমার ইচ্ছা অনুসারে থাকবি! রাকায়েত-ফাঁকায়েত নিয়ে সিকোয়েন্স বানানো যাবে না!’
‘ইহ্! বাপের সম্পত্তি, না?’

‘কুত্তার সম্পত্তি।’ আনহার হাসল।
সুমাইয়াও হাসল।
সুমাইয়া পাগলি!
‘এক মিনিট।’

ঘরের দরজা বন্ধ করে দিল আনহার।
‘অ্যাই! আশ্চর্য! মাথা খারাপ? বুয়া আছে না?’
‘বুয়া জানে না? কিছু বোঝে না? এছাড়া নাস্তা বানাতে বুয়ার পোনে এক ঘণ্টা- এক ঘণ্টা লাগবে। টাইম ইজ এনাফ?’

‘অসভ্য লোক! তুই একটা অসভ্য লোক।’ নিঃশ্বাস উষ্ণ হয়ে এলো সুমাইয়ার। এবং আনহারের।
‘হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে আমার কোনওদিন দেখা হবে না?’ সুমাইয়া বলল, ‘আমি ঠিক তাকে বলব। তুই আমাকে কখনও তার একটা নাটকও দেখতে দিস না।’

তাদের পত্রিকায় হুমায়ূন আহমেদের একটা ইন্টারভিউ করেছিল সে। মাঝে মধ্যে এখনও যায় হুমায়ূন আহমেদের বাসায়। রহস্যময় একজন মানুষকে দেখতে। তার কাছে কমপ্লেইন করবে সুরাইয়া? করুক। পরে! আনহার এখন হিসহিস করে বলল, ‘দুটো নাটকেরই সিডি বের হবে, বাবা। আমি তোকে কিনে এনে দেব! এখন আয়।’

‘আয় মানে? আয় মানে কী?’
‘আয় মানে কী তুমি বোঝ না?’ নিঃশ্বাস আরও একটু উষ্ণ হয়ে এল আনহারের, ‘তারপর আমরা দ্য সুইট লাইফ দেখব।’
‘কী?’

‘ফেলিনির লা ডলচে ভিটা দেখব।’
‘আচ্ছা, দেখব।’
‘মার্সেলো মাস্ত্রোয়ানিকে দেখব।’
‘আচ্ছা, দেখব।’

‘আমরা অ্যানিটা অ্যাকবার্গকে দেখব!’
‘আচ্ছা দেখব! এখন আয়!’ নিঃশ্বাস আরও একটু উষ্ণ হয়ে এল সুমাইয়ার।
আরও উষ্ণ হল আনহারের।
আরও উষ্ণ হল সুমাইয়ার।
আরও উষ্ণ।
এমন উষ্ণ মনমরা সকালটা একটা ঝলমলে উষ্ণ সকাল হল!

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: