জীবনে এমন কত বিচ্ছেদ, কত মৃত্যু আছে, ফিরিয়া লাভ কি? পৃথিবীতে কে কাহার…

নৃপেন্দ্রনাথ চক্রবর্ত্তী
মানুষের প্রাচীনতম শিল্পকর্মগুলোর মধ্যে মৃৎশিল্প নিঃসন্দেহে অন্যতম। এমনকি পাথরের গায়ে পাথর ঘষে আগুন জ্বালাতে শেখারও বহু আগে মানুষ আয়ত্ত করেছিল মৃৎশিল্পের ধারণাকে।
মৃৎশিল্পের মূল উপাদান মাটি আর পানি। এই দুই সহজ উৎসের নিরন্তর প্রবাহই মানুষকে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছিল প্রথম মৃৎপাত্র তৈরির।
মানুষের তৈরি আদি মৃৎপাত্র ছিল অনেকটা বর্তমানকালে কুমারের তৈরি মৃৎপাত্র আগুনের পোড়ানোর আগে যে অবস্থায় থাকে অনেকটা সে পর্যায়ের।
পরে আগুনের ব্যবহার আয়ত্ত করার পর ক্রমান্বয়ে মানুষ ওই মৃৎপাত্রকে আগুনে পুড়িয়ে সেগুলোকে ব্যবহারের অধিকতর উপযোগী করে তৈরি করতে শেখালো। তারপর নানা স্তরে অতিক্রম করে আজকের এ উৎকর্ষতার পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে। মৃৎশিল্পের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ঐতিহ্য যেমন সুপ্রাচীন তেমনি নকশা-নমুনা ও বৈচিত্র্যেও অনন্য।
বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী এই মৃৎশিল্পকে আশ্রয় করে শত শত বছর আগে থেকেই এখানে গড়ে উঠেছে একটি পেশাজীবী শ্রেণী। যাদের আমরা বলি পাল অথবা কুমার। এই কুমারদের বসবাস বাংলাদেশের সর্বত্র হলেও কতিপয় বিশেষ এলাকায় এদের গোত্রভিত্তিক অবস্থান যথেষ্টই চোখে পড়ে। ফরিদপুরের আটরশি, মালিগ্রাম, মাদারীপুরের খালিয়া, গোয়াল বাথান, গোপালগঞ্জের তারাশি, তাঁতিহাটি, কুমিল্লার চম্পকনগর, বল্লভপুর, ঢাকার সাভার ও ধামরাই, রাজশাহীর পুরো বরেন্দ্রাঞ্চলÑ এসব বিশেষ বিশেষ এলাকা অন্যতম। যুগ যুগ ধরে বংশ পরম্পরায় নিজেদের হৃদয়ের ঐশ্বর্য আর নিপুণ হাতের স্পর্শ মিলিয়ে এরা তৈরি করে আসছে হাজারো রকমের মৃৎপাত্র। যার মধ্যে বিভিন্ন ধরনের হাঁড়ি, পাতিল, বাসন-কোসন, ঘটি-বাটি, খেলনা, পুতুল, ফুলদানি, টব, চায়ের কাপ, ফুলের টব অন্যতম। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের শখ, রুচি ও চাহিদার ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন আসার ফলে এসব মৃৎপাত্রের ব্যবহার মনে কিছুটা কমে আসছিল। কিন্তু হাল আমলে কর্পোরেটদের হাত ধরে নতুন মাত্রা পাচ্ছে। তবে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের ফলে বিভিন্ন ধাতব ও তৈজসপত্র ব্যাপক পরিসরে মৃৎপাত্রের স্থান দখল করে নিলেও গ্রাম বাংলার অধিকাংশ মানুষের কাছে বিভিন্ন ধরনের মৃৎপাত্র এখনো অন্যতম ব্যবহার্য সামগ্রীর মর্যাদায় অধিষ্ঠিত।
মৃৎশিল্প ও মৃৎপাত্রের ব্যবহার একদিকে স্বাস্থ্যসম্মত, অন্যদিকে কম ব্যয়বহুল। তাছাড়া বিশেষ স্বাতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্যের কারণে কিছু কিছু মৃৎপাত্রের জনপ্রিয়তা সর্বকালীন। যেমন পানি ঠা-া রাখার সুরাই বা কলসি। গুড়ের কলস, দইয়ের হাঁড়ি ইত্যাদি। মাটির পাতিলে রান্না করা খাবার দীর্ঘক্ষণ সংরক্ষণ করা যায়।
আধুনিক প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ ও প্রয়োগের ফলে গুণগত মান ও উৎকর্ষতার ক্ষেত্রে মৃৎশিল্প আজ বহুদূর এগিয়ে গেছে। মৃৎশিল্প বলতে আজ আর শুধু শখের হাঁড়ি, মাটির বদনা কিংবা রান্নার হাঁড়ি পাতিলকেই বোঝায় না। অতি উন্নত মানের আধুনিক ও রুচিশীল তৈজসপত্র এবং অন্যান্য সামগ্রীই আজ মৃৎশিল্পীদের হাতে তৈরি হচ্ছে। বহুক্ষেত্রে মৃৎশিল্প আজ কুটির শিল্পের গ-ি পেড়িয়ে যন্ত্রচালিত আধুনিক ক্ষুদ্রশিল্পে রূপ পরিগ্রহ করেছে। আর এসব যন্ত্রচালিত কারখানায় তৈরি উন্নতমানের মসৃণ মৃৎপাত্র অতি সহজেই আধুনিক ক্রেতার দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম।
বাংলাদেশেও সাম্প্রতিককালে এ জাতীয় উন্নতমানের মৃৎপণ্য তৈরি হচ্ছে এবং এগুলোর ব্যাপক বাজার চাহিদাও লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
শৌখিন ক্রেতার রুচি ও চাহিদার সঙ্গে সঙ্গতি রক্ষা করতে গিয়ে এসব কারখানায় দৈনন্দিন ব্যবহার্য সামগ্রী ছাড়াও তৈরি হচ্ছে গৃহসজ্জার নানা উপকরণ। বিভিন্ন ধরনের খেলনা ও পুতুল, প্রতিমা, জীবজন্তু ও মানুষের প্রতিকৃতি এবং আরো অনেক কিছু।
এসব মৃৎশিল্প কারখানা স্থাপিত হওয়ার ফলে মৃৎশিল্প পণ্যের যেমন উন্নতি ঘটেছে, তেমনি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও জাতীয় আয় বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও তা উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে।
বাংলাদেশের মৃৎশিল্পে বর্তমানে প্রায় কয়েক লাখ লোক কর্মরত আছেন এবং জাতীয় অর্থনীতির ক্ষেত্রে এদের অবদান বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে।
মৃৎশিল্পের উন্নয়নের লক্ষ্যে বিভিন্ন পর্যায়ে ইতিমধ্যেই ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সংস্থা, বিসিকসহ বিভিন্ন সংস্থা মৃৎশিল্পীদের দক্ষতা বৃদ্ধি, মান উন্নয়নের লক্ষ্যে তাদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ প্রদান করে থাকে।
তাছাড়া সেখান থেকে উন্নতমানের নকশা ও নমুনা সরবরাহ এবং অন্যান্য আর্থিক, বিপণন ও কারিগরি সহায়তা প্রদানেরও ব্যবস্থা রয়েছে। বিসিক ও বিভিন্ন সংস্থার দেয়া এসব সুযোগ-সুবিধা কাজে লাগিয়ে দেশের মৃৎশিল্পীরা ইতিমধ্যে এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধনে সক্ষম হয়েছেন। অদূর ভবিষ্যতে আরো ব্যাপক সংখ্যক মৃৎশিল্পীকে এ সহযোগিতা কর্মসূচির আওতায় আনা সম্ভব হলে তা এদেশের মৃৎশিল্পের উন্নয়নের ধারায় নতুন মাত্রা যোগ করতে সক্ষম হবে বলে আশা করা যায়।
এমনকি এরূপ প্রত্যাশা পোষণ করাটাও অমূলক হবে না যে, পরিকল্পনা অনুযায়ী অগ্রসর হওয়া গেলে বাংলাদেশে উৎপন্ন মৃৎপণ্য খুব শিগগিরই হয়তো বিদেশে রফতানি করাও সম্ভব হবে।
যেমনটি চীন, সিঙ্গাপুর, ভারত প্রভৃতি নিকটবর্তী এশীয় দেশগুলো থেকে হচ্ছে। মৃৎশিল্পের জন্য অত্যন্ত উপযোগী বিশেষ বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন বাংলাদেশের বিশেষ বিশেষ এলাকার এঁটেল মাটিতে মৃৎশিল্পের ব্যাপক সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে।
আশা করা যায়, সে সম্ভাবনা আমরা আরো দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগাতে সক্ষম হবো।
স্বীকার করাতে দ্বিধা থাকা উচিত নয় যে, দেশের মৃৎশিল্পের ক্ষেত্রে বর্তমানে কিছু কিছু সমস্যা বিদ্যমান রয়েছে।
যেমন গরিব উদ্যোক্তার জন্য পুঁজি সমস্যা আর সাধারণভাবে কাঁচামাল, জ্বালানি ও মান নিয়ন্ত্রণের সমস্যা ইত্যাদি।
এ ব্যাপারে সরকার তথা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সচেতন তৎপরতার ফলে এসব সমস্যাও অচিরেই দূরীভূত হবে । এদেশের শিল্পায়নের অগ্রগতির ধারায় বাংলাদেশের মৃৎশিল্প একটি বিশেষ আসনের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হতে পারলে তা শুধু সংশ্লিষ্ট মৃৎশিল্পীদের জন্যও তা একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হবে।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: