জীবনে এমন কত বিচ্ছেদ, কত মৃত্যু আছে, ফিরিয়া লাভ কি? পৃথিবীতে কে কাহার…

মো. মইনুল ইসলাম
ভাষাসৈনিক গাজীউল হক কিছুদিন আগে পরলোক গমন করেছেন। তার আত্মার মাগফেরাত কামনা করে পঞ্চাশ এবং ষাটের দশকের দেশ ও রাজনীতির কিছু কথা বলার জন্যই বর্তমান লেখার সামান্য প্রয়াস। গাজীউল হক সাহেব আমাদের প্রিয় গাজী ভাই হয়ে উঠেছিলেন, তার সময়ের দেশ ও মানুষের দাবি বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার সংগ্রামের একজন পুরোধা ব্যক্তিত্ব হিসেবে। ‘৫২-এর ভাষা আন্দোলনে তখনকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যে কয়জন তরম্নণ ছাত্র অগ্রণী ভূমিকা পালন করে তার মধ্যে গাজী ভাই একজন। আর যে কয়জনের নাম মনে পড়ে তার মধ্যে মতিন ভাই ও সুলতান ভাইকে ভোলা যায় না। তবে আরও কিছু নাম শুনেছি, তাদের মধ্যে জনাব অলি আহাদ ও বিচারপতি হাবিবুর রহমানের (সাবেক প্রধান বিচারপতি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান) নাম উলেস্নখ করতে হয়। সময়ের বিরাট ব্যবধান ও স্মৃতির দুর্বলতার কারণে আরও কিছু নাম স্মরণ করতে পারছি না। তবে তাদের কিছু কনিষ্ঠ ছাত্র তাদের নেতৃত্ব দ্বারা ভাষা আন্দোলনকে ক্রমাগত গতিশীল এবং বলিষ্ঠ করে বাংলা ভাষাকে শুধু রাষ্ট্রভাষাই নয় সামপ্রদায়িক এবং সমরতান্ত্রিক পাকিসত্দানি রাষ্ট্রের প্রেক্ষাপট থেকে বাঙালিদের জন্য একটি অসামপ্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। সময়ের সেই সব সাহসী মানুষকে এখানে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করতে হয়।

আমার মতে, ভাষা আন্দোলনের তাত্তি্বক এবং নৈতিক প্রেরণার অন্যতম প্রধান উৎস ছিল তখনকার কমিউনিস্ট পার্টি এবং তাদের ছাত্র সংগঠন পূর্ব পাকিসত্দান ছাত্র ইউনিয়ন। এ দুটি সংগঠনের আনত্দরিকতা এবং ত্যাগ-তিতিক্ষার কারণে তারা অচিরেই তৎকালীন শক্তিশালী দল আওয়ামী লীগের সহযোগী শক্তি হয়ে দাঁড়ায়। ফলে তারা মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ভালবাসা এবং সহযোগিতা লাভ করে। পাকিসত্দানের সময়কালে সোহরাওয়ার্দী সাহেবের জীবদ্দশায় আমাদের মনে হয়েছে তার (জনাব সোহরাওয়ার্দীর) প্রভাবের কারণে আওয়ামী লীগের একটি অংশ পাকিসত্দানি রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে পূর্ব বাংলার মানুষের জন্য কিছু রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সুবিধা আদায় করতে পারলেই সন্তুষ্ট থাকত। ভাষা আন্দোলনের পথ ধরে পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসনের যে দাবিটি জোরালো হয়ে ওঠে তার প্রতি সোহরাওয়ার্দী সাহেব যে আনত্দরিক ছিলেন না, তা আমাদের কাছে পরিস্ফুট হয়ে ওঠে যখন তিনি পাকিসত্দানের প্রধানমন্ত্রী হয়ে ঢাকায় আসেন এবং হেলিকপ্টারযোগে সলিমুলস্নাহ হলের সামনে নেমে ঘোষণা দেন যে পূর্ব পাকিসত্দান প্রায় শতকরা ৯৫ ভাগ স্বায়ত্তশাসন পেয়ে গেছে।

তাছাড়া তখনকার বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদের মোড়ল মার্কিনিদের সামরিক চুক্তি সিয়াটো এবং সেন্টোর (বাগদাদ প্যাক্ট) পক্ষে সোহরাওয়ার্দী সাহেবের ওকালতি তখনকার সাম্রাজ্যবাদবিরোধী বামপন্থি দল ও নেতৃবৃন্দ স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে পারেনি। কারণ এ চুক্তিগুলো ছিল পাকিসত্দানি সামরিক শাসক গোষ্ঠীর পৃষ্ঠপোষক। অন্যদিকে ছিল এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলন দমন-পীড়নের যন্ত্র। পাকিসত্দানের সামরিক শাসন ও পূর্ব বাংলায় অব্যাহত অর্থনৈতিক শোষণ এবং রাজনৈতিক দমন-পীড়নের ফলে এদেশের সচেতন রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের কাছে এটা ক্রমশই সুস্পষ্ট হয়ে উঠছিল, সোহরাওয়ার্দী সাহেব প্রধানমন্ত্রীর বা ওই জাতীয় রাষ্ট্রীয় পদ পেলে পূর্ব বাংলার জনগণের স্বায়ত্তশাসনের দাবির প্রতি সমর্থন এবং প্রয়োজনীয় আন্দোলন-সংগ্রামে তিনি আওয়ামী লীগকে নিয়োজিত হতে দেবেন না। এমনকি আওয়ামী লীগের বামপন্থি অংশও সেটা বুঝতে পেরেছিল। বিষয়টি আরও পরিস্ফুট হয়ে ওঠে মওলানা ভাসানী আয়োজিত কাগমারী সম্মেলনে। সেখানে ভাষার দাবির চেয়েও বেশি গুরম্নত্ব পায় আঞ্চলিক বৈষম্য ও পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসনের দাবি। কাগমারী সম্মেলনেই মওলানা অকপটে পাকিসত্দানি সামরিক জানত্দাকে জানিয়ে দেন, এভাবে শোষণ-নির্যাতন চালাতে থাকলে পূর্ব বাংলার মানুষ একদিন পশ্চিম পাকিসত্দানি শাসক গোষ্ঠীকে ‘আসসালামু আলাইকুম’ জানাতে বাধ্য হবে। তখন পাকিসত্দানি শাসকগোষ্ঠী ও এদেশের বাঙালি দালালেরা মওলানাকে রাষ্ট্রদ্রোহী বলে আখ্যায়িত করতে লাগল। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের একাংশও ছিল। তখনকার ইত্তেফাকের সংখ্যাগুলো দেখলেই এ ব্যাপারে আরও বিসত্দারিত তথ্য পাওয়া যাবে।

তখন মওলানা ও তার অনুসারীরা ভারত ও রাশিয়ার চর এবং কাগমারীতে পাকিসত্দানবিরোধী ষড়যন্ত্র হয়েছে বলে কিছুলোক দেশব্যাপী সোরগোল করেছিল। আজও যখন বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতবিরোধী প্রচারণা দেখি এবং কথা কথায় দেশবিরোধী ষড়যন্ত্র এবং স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বিপন্নের আওয়াজ শুনি তখন পাকিসত্দান আমলের তখনকার দেশ ও জনগণবিরোধী দালাল এবং দুর্বৃত্তদের কথাই মনে পড়ে, যাদের কাছে দেশ ও দেশের মানুষ নয় ক্ষমতা ও সম্পদ অর্জনই মুখ্য বিবেচ্য বিষয় ছিল। তখন উপায়টি ছিল পাকিসত্দানের দালালি করা এবং হিন্দু, কমিউনিস্ট ও হিন্দুস্থানের বিরম্নদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তোলা। নূরম্নল আমিন, মোনায়েম খান, সবুর খান, হামিদুল হক চৌধুরী, ফজলুল কাদের চৌধুরী জাতীয় বাঙালি দালালরা তাই ইসলাম বিপন্ন, পাকিসত্দান বিপন্ন ইত্যাদি ধোয়া তুলে সামরিক এবং নায়ক একনায়ক ইসকান্দার মির্জা, আইয়ুব খান এবং ইয়াহিয়া খানদের প্রিয়পাত্র হওয়া এবং মন্ত্রী-মিনিস্টার হওয়াকেই মোক্ষ লাভ মনে করত।

অন্যদিকে পাকিসত্দানি শাসকগোষ্ঠীর সামরিক শাসন ও নির্যাতনের বিরম্নদ্ধে বাঙালির ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও অর্থনীতিকে রক্ষা এবং বিকশিত করার জন্য একদল দেশপ্রেমিক মানুষ জীবন বাজি রেখে আন্দোলন-সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ভাষা আন্দোলন দিয়েই তার শুরম্ন। আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ই তার সূতিকাগার। গাজী ভাই, মতিন ভাই, সুলতান ভাইরা এমনিভাবে পরবর্তী প্রজন্মের আমাদের মতো ছাত্রদের কাছে তাদের দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগের কারণে ভাই হয়ে ওঠেন। এই বড় ভাইয়েরাই পরবর্তীকালে বারী ভাই (এসএ বারী এটি), সাখাওয়াত ভাই (লন্ডন প্রবাসী ব্যারিস্টার), সাত্তার ভাই, কাজী আনওয়ারম্নল আজিম, আমির আলী সাহেব ও সা’দ উদ্দিন সাহেবদের মতো নিবেদিত প্রাণ বাম দেশপ্রেমিক ছাত্রনেতাদের জন্ম দেয়। এরা সবাই ছিলেন ছাত্র ইউনিয়নের নেতাকর্মী। পরে দেখলাম বারী ভাই তার বাম চরিত্রকে বিসর্জন দিলেন এবং জিয়াউর রহমানের সামরিক শাসনের ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপির মন্ত্রিসভায় উপ-প্রধানমন্ত্রিত্ব গ্রহণ করলেন। সা’দ উদ্দিন সাহেব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জামায়াত-বিএনপি সাদা দলের সঙ্গে অনত্দর্ভুক্ত হয়ে গেছেন।

পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বেশকিছু ছাত্রকে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের সঙ্গে এদেশের সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির মন্ত্রে উজ্জীবিত করে। এর জন্য সর্ব প্রকার ত্যাগ এবং তিতিক্ষার পরীক্ষা দিতে তারা কোন ত্রম্নটি করেনি। একথা বলতে গিয়ে আবারও গাজী-মতিন-সুলতান ভাইদের কথা মনে পড়ে। এসব ছাত্রনেতা ভাষা আন্দোলনে তাদের সংগ্রাম, ত্যাগ-তিতিক্ষা ও জেল-জুলুম ভোগ করার কারণে যেমন আমাদের কাছে শ্রদ্ধাভাজন বড় ভাই হয়ে ওঠে, তেমনি দেশের শিক্ষিত তরম্নণদের কাছে হয়ে ওঠে অনুকরণীয় আদর্শ। তাই আজও তারা যেমন আমাদের কাছে ভাই বলে গভীর শ্রদ্ধায় এবং ভালবাসায় স্বীকৃত, তেমনি ভাষাসৈনিক তথা জনগণের সংগ্রামী নেতা হিসেবে সারাদেশে পরিচিত এবং নন্দিত। আমাদের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে তাদের নাম চিরকাল অমস্নান হয়ে থাকবে।

মতিন ভাই সেকালের সাক্ষী হয়ে এখনও জীবিত আছেন এবং দেশবাসী তাকে ভাষা মতিন আখ্যায়িত করে দেখে খুশি হন। কিন্তু আজকাল সুলতান ভাইয়ের নাম তেমন শুনি না। ‘৫২-এর ভাষা আন্দোলনে মোহাম্মদ সুলতানের অনন্য অবদানের কথা ভোলার নয়। এই স্বল্পবাক নিবেদিত প্রাণ ভাষাসৈনিক পুঁথিপত্র নামে একখানা বই ও পত্রপত্রিকার দোকান দিয়েছিলেন। তখনকার আহসানউলস্নাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের (বর্তমান বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়) পূর্ব-উত্তর কোণে ছোট এই বইয়ের দোকানটিতে নানাবিধ বাম প্রগতিশীল বই-পুসত্দক ও পত্রপত্রিকা পাওয়া যেত। বিশেষ করে কলকাতার বামপন্থি লেখকদের লেখায় আমাদের সময়কার তরম্নণদের বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদ, তাদের মিত্র পাকিসত্দানি সামরিক জানত্দার বিরম্নদ্ধে এবং সমাজতন্ত্রের পক্ষে উদ্বুদ্ধ করত।

আগেই বলেছি, গাজী-মতিন-সুলতান ভাইরা আমাদের বড় ভাই হয়ে উঠেছিল তাদের দেশপ্রেম, আদর্শবাদিতা, ত্যাগ এবং সংগ্রামের কারণে। এর বিপরীতে আরেক দল ভাল ছাত্রের একমাত্র ধ্যান-জ্ঞান ছিল কর্মজীবন উন্নয়ন। পাকিসত্দান কেন্দ্রীয় সুপিরিয়র সার্ভিস প্রাপ্তি এবং তার পথ ধরে এদেশের আপামর জনগণের মাথার উপরে ‘বক মাঝে হংস যথা’ বিচরণ করা। দেশের অগণিত সাধারণ মানুষের মঙ্গল ও মুক্তির প্রয়াসে নিবেদিত প্রাণ গাজী-মতিন-সুলতানের কর্ম ও জীবন তাই সব দেশ এবং কালের সংগ্রামী জননেতাদের জীবনকেই প্রতিনিধিত্ব করে। স্বৈরাচারী পাকিসত্দানি শাসকগোষ্ঠীর জেল-জুলুম-হুলিয়া জাতীয় অমানবিক নির্যাতনের শিকার হয়েই গাজী ভাইয়েরা পাকিসত্দানের ভাঙন এবং বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পথ রচনা করেন। সেই যাত্রাপথকে সাফল্যম-িত করে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব, তার দল আওয়ামী লীগ এবং তাদের সহযোগী ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টিসহ বাম দলগুলো এবং সর্বোপরি এদেশের আপামর মানুষ। ‘৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর ত্রিশ লাখ শহীদের রক্ত এবং ৩/৪ লাখ নারীর সম্ভ্রমের বিনিময়ে ধর্মের নামে ভ-ামি ও গণহত্যার নায়ক পাকিসত্দানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসরদের পরাজিত করে অসামপ্রদায়িক এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র রচনার প্রত্যয় নিয়ে জন্ম হয় বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র।

আজকে যখন ছাত্ররাজনীতির বেহাল অবস্থা দেখি, তখন পঞ্চাশ এবং ষাটের দশকের ছাত্র রাজনীতি ও নেতাদের কথা বেশি করে মনে পড়ে। তখনকার আদর্শবাদী, ত্যাগী এবং সংগ্রামী ছাত্রদের বিপরীতে এখন দেখি ছাত্র নামধারী কিছু দস্যু এবং দুর্বৃত্ত ছাত্রনেতার নাম ধারণ করে আসর মাত করতে ব্যসত্দ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা জীবনে এ ধরনের কতিপয় ছাত্রনেতার সন্ত্রাসী কর্মকা- দেখে মনে প্রশ্ন জেগেছে_ এই কি সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যেখানে গাজী-মতিন-সুলতানসহ আরও বহু সংগ্রামী, দেশপ্রেমিক ছাত্রনেতার জন্ম দিয়েছিল। আশির দশকের শেষের দিকে ছাত্রদলের সেই ডাকসুর ভিপির মুখটি এখনও ভীতির সঞ্চার করে। ‘ভিপি’ সাহেবের নেতৃত্বে ৫/৬ জন ছাত্রনেতার অবৈধ এবং অছাত্র সুলভ কাজ-কর্মে বিশ্ববিদ্যালয়সহ পার্শ্ববর্তী জনজীবনে বিরাজ করত চরম অশানত্দি এবং অরাজকতা। চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, তদবিরবাজি, প্রতিপক্ষের সঙ্গে সংঘর্ষ এবং বন্দুকযুদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসসহ আশপাশের এলাকায় বিরাজ করত অশানত্দি ও নিরাপত্তাহীনতা। বহুদিন বেলা ২টার দিকে কলা ভবনের লাউঞ্জে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অভুক্ত অবস্থায় কাটিয়েছি, কারণ ওই ছাত্রনেতাদের বন্দুকযুদ্ধের কারণে কার্জন হল হয়ে শিক্ষকদের গাড়ি কলা ভবনে ঢুকতে পারেনি। একদিন মধুর ক্যান্টিনের পাশে অস্ত্র চালনারত ছাত্রটিকে ইলিয়াস বলে চিনিয়ে দিয়েছিল আমারই এক কনিষ্ঠ সহকর্মী।

আজকাল যখন টিভিতে এই তথাকথিত ডাকসু নেতাদের (বর্তমানে বিএনপি নেতা) জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষার সংগ্রামে দেশবাসীকে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান জানাতে দেখি, তখন টিভি বন্ধ করে দেয়া ছাড়া আর কোন পথ থাকে না। জাতীয়তাবাদ ও গণতন্ত্রের কথা যখন এ ‘মহাত্মাদের’ মুখে শুনি তখন মনে হয় ‘ধরণী দ্বিধা হও’। ভূতের মুখে রাম নাম আর কত শুনব এদেশে! আমরা না শুনতে চাইলেও জাতীয়তাবাদের মহারাণীর কাছে এরাই হলো, ‘আমার সোনার ছেলেরা’। আর ছাত্রলীগের নেতাদের অপকীর্তিও অবহেলা করার মতো ছিল না। তারাও ধোয়া তুলসী পাতা ছিল না এবং এখনও নয়।

গাজী ভাই দিয়েই শুরম্ন করেছিলাম এবং তিনিই আলোচনার মুখ্য বিষয়। একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা দিয়ে তাই শেষ করতে চাই। বোধ হয় ৯৮/৯৯ সালের দিকে একটি কাজে হাইকোর্টে গিয়েছিলাম। দেখি গাজী ভাই দ্রম্নত গতিতে চলে যাচ্ছেন। যেহেতু গাজী ভাই, তাই দ্বিধা না করে ডাকলাম, ‘গাজী ভাই কেমন আছেন?’ ব্যসত্দ গাজী ভাই থামলেন এবং বললেন, গাজী ভাই শুনলাম, তুমি ভাই কে? আমার পরিচয় দিলাম এবং বললাম, ‘৫৫-৫৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম এবং ছিলাম আপনার একজন ভক্ত এবং অনুসারী। উত্তরে বললেন, তাই! আমাদের ভাই ডাকার লোক এখন কমে গেছে। খুশি হলাম তোমাকে দেখে। এখন আমি ব্যসত্দ। সময় করে এবং জানিয়ে একদিন এস। অবশ্য আর যাওয়া হয়নি।

উদার, স্নেহপরায়ণ এবং ভ্রাতৃবৎসল সেই গাজী ভাইয়ের তেমন কোন পরিবর্তন হয়নি। জীবনের শেষ প্রানত্দে এসে এখনও পথ চেয়ে আছি নতুন গাজী ভাইদের আগমনের। রাজনীতি ও ছাত্র সমাজে সত্য, সততা, গণমানুষের অধিকার এবং কল্যাণ কামনার আদর্শে উজ্জীবিত একদল মানুষের প্রত্যাশা নিয়েই বাকি দিনগুলো বেঁচে থাকতে চাই। রবীন্দ্রনাথের প্রতি বিশ্বসত্দ থেকে বলব, ‘মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ।’ জয়তু গাজী ভাই।

[লেখক : সাবেক অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়]

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: