জীবনে এমন কত বিচ্ছেদ, কত মৃত্যু আছে, ফিরিয়া লাভ কি? পৃথিবীতে কে কাহার…

hanluফরহাদ আহমেদ
তার নাম হাঙ্গলু। এক বিরল প্রজাতির হরিণ। রেড ডিয়ার নামের হরিণের উপশাখা এ প্রজাতিটি কেবল ভারত শাসিত কাশ্মিরেই দেখা মেলে। এক সময় এর সংখ্যা বিপজ্জনক পরিমাণ কমে এলেও বর্তমানে তা অবিশ্বাস্যভাবে বেড়ে গেছে।
মার্চ মাসে পরিচালিত এক জরিপে জানা গেছে, এ বিপদাপন্ন প্রাণীর সংখ্যা ১৭৫টি। তার পরিমাণ বেড়ে যাওয়া হয়তো স্বাভাবিক কিন্তু কর্তৃপক্ষ বলছেন, এটা আশাবাদী ব্যাপার।
হাঙ্গলুর সংখ্যা বাড়তে শুরু করে দুই দশক আগে যখন এলাকাটিতে রক্তাক্ত সংগ্রাম শুরু হয়নি।
ওয়াইল্ড লাইফের কর্মকর্তারা বলছেন, সে সময় শ্রীনগরের বাইরে দাচিগাম ন্যাশনাল পার্কে প্রায় ৮০০র মতো এ হরিণ ছিল।
সে সময় এ এলাকার আশপাশে যারা বাস করতো তারা বলেন, এ এলাকাটি ছিল হাঙ্গলুর জন্য একটা সাধারণ বিচরণ ক্ষেত্র। তাদের দেখা যেতো সরিষা ক্ষেতে এবং সবজির বাগানে। তারা শস্যের ক্ষতি করতো। কারণ সেগুলো তাদের খাবার ছিল।
মোহাম্মদ মালিক বলেন, তিনি ১৯৮৬ সালে তার ক্ষেতে হাঙ্গলু হরিণকে বাঁধাকপি খেতে দেখেছেন।
এ সমস্যাকে কিভাবে সমাধান করা যায় তার জন্য আমদের একটা পারিবারিক সভা ডাকতে হয়েছিল। আমরা পানির মধ্যে একটা চাকা রেখে দিয়েছিলাম যার মধ্যদিয়ে শব্দ তৈরি হতো। এ শব্দ শুনে ভয় পেয়ে হরিণ পালিয়ে যেতো।
মোহাম্মদ কাসিম ওয়ানি যার বয়স এখন ৯০ তিনি ওয়াইল্ড লাইফের একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। তিনি বলেন, এখানকার শেষ রাজবংশ যখন রাজত্ব করতো তখন থেকে প্রায় ৬০ বছর আগে ৩০০০ হাঙ্গলু ছিল।
হাঙ্গলু চারদিকে ছড়িয়ে বাস করতো। আমি তাদের লোলাব, কুপওয়ারা, গুরেজ, তিতিওয়াল, উরি, কুলগাম, পহেলগাম এবং অন্য এলাকায় দেখেছি।
এক সময় আমি হাঙ্গলুর দলে ২০০ এমনকি ৫০০টা হাঙ্গলু চড়তে দেখছি। আজ যখন আমি হাঙ্গলুর কথা ভাবি আমার হৃদয় ব্যথায় ভরে ওঠে।
তিনি বলেন, ১৯৪৭ সালের রাজতন্ত্রের পতনের পর হাঙ্গলুর পতন শুরু হয়। তাদের সংখ্যা কমে আসতে শুরু করে। আমলারা খেলার ছলে হাঙ্গলু শিকার করতে শুরু করে।
শিকার ছাড়াও হাঙ্গলুরা বিপদের সম্মুখীন হয়, যখন মানুষ বন উজাড় করতে থাকে।
১৯৭০ সালের শুরুতে ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অফ নেচার অ্যান্ড নেচারাল রিসোর্স নামের প্রতিষ্ঠান প্রথম এ এলাকায় হাঙ্গলুর সংখ্যা গণনা করে এবং তারা আবিষ্কার করে এদের সংখ্যা প্রায় ১৭০-এর কাছাকাছি।
এরপর সরকার নানাভাবে এর সংখ্যা বৃদ্ধি করার উদ্যোগ নেয়। যার মধ্যে ছিল বন্যপ্রাণী আইন প্রণয়ন। তারা বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের জন্য এটি পূর্ণ মন্ত্রণালয় স্থাপন করে। ফলে এলাকায় এ হরিণের সংখ্যা চারগুণ বৃদ্ধি পায়
কিন্তু ১৯৮০ সালে এ এলাকায় এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে এতে হাঙ্গলুর অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়ে।
তারা যেখানে সন্তান উৎপন্ন করতো সেই দাচিগাম এলাকায় সংঘর্ষ বাধলে তাদের সন্তান উৎপাদন ব্যাহত হতে থাকে। ওয়াইল্ড লাইফের লোকেরা সে সময় খুব কমই এ এলাকায় প্রবেশ করার সাহস দেখাতো।
এই ঘটনার সুযোগ নিয়ে যাযাবররা তাদের ভেড়া এখানে চড়াতে চলে আসে। ফলে হাঙ্গলুদের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ওয়াইল্ড লাইফের মধ্য কাশ্মিরের অন্যতম ব্যক্তি রাশিদ নাকেশ। তিনি বলেন, সম্প্রতি যে সংখ্যা পাওয়া গেছে তা হাঙ্গলুর মিলনের জন্য ভালো। এর মধ্যে মেয়ে হাঙ্গলুর সংখ্যাও বাড়ছে। ফলে প্রাণীটির গ্রহণযোগ্য বৃদ্ধি ঘটবে।
ওয়াইল্ড লাইফ বিভাগ ৪.৬৮ মিলিয়ন ডলারের এক প্রজেক্ট হাতে নিয়েছে যাতে হাঙ্গলুদের নিরাপত্তা এবং বৃদ্ধি নিশ্চিত করা যায়।
পাঁচ বছরের এ প্রজেক্টের মধ্যে রয়েছে সার্ভে এবং শুমারি বা গণনা এবং তাদের অভ্যাস নিয়ে গবেষণা। এর সঙ্গে চিতা এবং কালো ভাল্লুকও রয়েছে।
এই প্রজেক্টে সবচেয়ে আধুনিক ছবি তোলার প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে স্যাটেলাইট বা উপগ্রহ কেন্দ্র থেকে তোলা ছবি এবং জিআইএস বা জিওগ্রাফিকার ইনফরমেশন সিস্টেম।
পুনরায় বনায়নের মধ্যদিয়ে এবং মাটি ও পানি সংরক্ষণের দ্বারা তাদের আচরণও উন্নত করা সম্ভব হয়েছে। তার সঙ্গে আগুন প্রতিরোধ করার ও মাংসাশীদের থেকে প্রতিরোধ করার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
এমন কাঠামো তৈরি করা হয়েছে যাতে তা অবৈধ শিকার এবং মাঠ নষ্ট না হয়।
স্থানীয়দের সচেতনতা বাড়ানোর জন্য উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ওয়াইল্ড লাইফের কর্মকর্তারা বলছেন, যেটুকু হাঙ্গলুর সংখ্যা বেড়েছে তার পেছনে স্থানীয়দের সচেতনতা রয়েছে। স্থানীয়রা বাকারওয়ালা নামের যাযাবরদের নির্দিষ্ট স্থানে পশু চরাতে মানা করেছে যা হাঙ্গলুদের বিচরণ ক্ষেত্র।
ওয়াইল্ড লাইফ বিভাগ এছাড়াও একটি প্রজনন কেন্দ্র তৈরি করছে। এটি শিকারগা তারালে অবস্থিত। এটি শ্রীনগরের দক্ষিণে অবস্থিত।
এ প্রজনন সেন্টারের জন্য ভারতীয় চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ টাকা প্রদান করছে। জন্ম নেয়ার পর হাঙ্গলুকে তার পছন্দমতো আবাসস্থলে ছেড়ে দেয়া হবে তার সঙ্গে তার ঘাড়ে একটা বেল্ট পরিয়ে দেয়া হবে যাকে বলা হয় স্যাটেলাইট কলার। ফলে উপগ্রহের মাধ্যমে প্রাণীটি কোথায় রয়েছে তা ধরা যায়।
মি. নাকেশ বলেন, এ সেন্টার প্রাণীটির জেনেটিক স্টক তৈরি করবে যাতে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে এর সংখ্যা কমে আসে।
বিজ্ঞানী খুরশেদ আহমেদ সম্প্রতি হাঙ্গলুর ওপর সাত বছরের এক গবেষণা শেষ করেছেন। তিনি বলেন, এ প্রাণীটি টিকে থাকে এখন অন্য যেকোনো কিছুর চেয়ে রাজনীতির ওপর বেশি নির্ভর করছে। এ ইচ্ছা এবং স্থানীয়দের সচেতনতা ছাড়া এ প্রাণীটি আর হয়তো পাঁচ থেকে ছয় বছর পর হারিয়ে যাবে।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: