জীবনে এমন কত বিচ্ছেদ, কত মৃত্যু আছে, ফিরিয়া লাভ কি? পৃথিবীতে কে কাহার…

ফ জ ল শা হা বু দ্দী ন
মাঝে মাঝে আমার অদ্ভুত সব কথা মনে হয়। মানুষকে নিয়ে, প্রকৃতিকে নিয়ে। প্রকৃতিকে অতিক্রম করে যে প্রকৃতি, তাকে নিয়ে। যেমন আকাশ, যেমন উধাও মেঘপুঞ্জের জগৎ। যেমন অন্তরীক্ষকে নিজের রক্তের ভেতর ডেকে আনার যে অসম্ভব বাসনা তাকে অকারণে প্রশ্রয় দেয়ার ইচ্ছা­ এই সব। ইচ্ছে হয় বাতাসের শব্দকে শুনি সকালে-বিকেলে মধ্যদিনের রৌদ্রালোকের নিচে অপরাহ্ণের ছায়ায় কিংবা গভীর রাত্রিতে চন্দ্রালোকের সর্বগ্রাসী আলোর স্পর্শের একান্ত গগনে।
মাঝে মাঝে আমার অসম্ভব কত যে কিছু করতে ইচ্ছে হয়।
আমাদের এই যে বাংলাদেশ তাকে দেখতে বাসনা হয়­ জীবনানন্দের মতো। কমলালেবুর মতো রৌদ্র যাকে কখনও দেখিনি­ ইচ্ছে হয় জীবনানন্দের কবিতার আত্মার ভেতর দিয়ে চলে যাই, সেই আমার হলুদ রৌদ্রের শরীরে পিঠ দিই সোনালি রৌদ্রের বিপরীতে। আর আম্মার কাঁঠালগাছটির মতো যত কাঁঠালবৃক্ষ আছে এই বঙ্গলোকে দেখি তাদের পাতারা সব ঝরিতেছে ভোরের বাতাসে। দেখি, ঝরতে থাকবে চিরকাল।
কত কিছু যে দেখতে ইচ্ছে হয়­ কত কিছুকে যে ভালোবাসতে ইচ্ছে হয়। আসলে বিধাতা ধরিত্রীকে তো ভালোবাসার একটি অরণ্য করেই নির্মাণ করেছেন।
শুধু আমরাই সব সময় বুঝতে পারি না। সবুজ পাতাকে দেখি না, ঝরা পাতাকে শুনি না।
আমাদের সফল ভুবন তো ভালোবাসারই অন্য নাম। তাকেও বুঝতে চাই না।
যত জীবন আছে সারা বিশ্বলোকে তারা তো আসলে একটি ক্রমাগত ভালোবাসার অপ্রতিরোধ্য লেখার মধ্যেই নিমগ্ন।
আমার ভালোবাসা নদীকে নিয়ে, তোমার ভালোবাসা আকাশের দিকে ধাবিত। অন্য আর একজনের ভালোবাসা পুষ্পে পুষ্পে আন্দোলিত।
কেউ চাঁদের আলোতে দেখতে চায় প্রেমিকার অস্খিরতা­ আবার অন্য কেউ একটি শুকনো পাতার জন্য পাগল হয়ে আছে, যে পাতার অবিশ্বাস্য শব্দ তাকে ডুবিয়ে রাখে মহাকালের মর্মরে। সেই শব্দের অন্তর্গত হাহাকারে সে এবাদতকে স্খিত করতে চায়।
আমি যখন বেশ ছোট সেই সময় একবার আমি গ্রামে আমার নানার বাড়িতে গিয়েছিলাম বেড়াতে। নবীনগরের শাহপুর নামের একটি গ্রাম। দেখলাম সেই গ্রামে এত কিছু আছে দেখার আর গভীরভাবে ভালোবাসার­ যার অন্ত নেই। অন্তত আমার কাছে তখন তা-ই মনে হয়েছিল। যেমন আমার নানার বাড়ির বড় পুকুর­ অনেক বড়­ সবাই বলত দীঘির মতোন বড়। চার দিকে গাছের সমারোহ­ যার মধ্যে কদম ফুলের গাছ আছে। আর দীঘির যে পাড়টা প্রায় জঙ্গলের মতো, সেখানে আছে হিজল ফুলের মাতাল উৎসব। আর পুকুর ভরা ছলছল করা পানির এদিক ওদিকজুড়ে ছিল সবুজ হেলেঞ্চার বন। বনে বনে বাতাসের সাথে উদ্দাম ছিল প্রজাপতি আর অসংখ্য ফড়িংয়ের বর্ণাঢ্য তরঙ্গ। যেন বিধাতার বাসনারা সব হেসে চলেছে অবিরাম।
সেই কিশোরে প্রথম এলাম আমি বাংলাদেশের গ্রাম আর তার প্রকৃতির কাছে­ সম্ভবত এত ঘনিষ্ঠভাবে এতটা কাছে আগে কখনো আসিনি। আমার দৃষ্টি আবিষ্ট হলো, আমার চিত্ত নেচে উঠল অসম্ভব এক আনন্দের উজ্জ্বলতায়­ ময়ূরের মতো নিজেকে ছড়িয়ে দিতে চাইল জগতের সকল আলোতে সকল বর্ণে এবং সকল মুগ্ধতার অচিন্তনীয় প্রভায়।
সেই কৈশোরকালে এত কিছু আমি নিশ্চয়ই তখন উপলব্ধি করিনি। তবুও এখনো মনে হয় তখন নিশ্চয়ই ভেবেছিলাম­ এই গ্রাম, এই বৃক্ষরাজি, এই ছায়ার প্রসারিত আন্দোলন­ এই হিজলের অবিশ্বাস্য লাল হেলেঞ্চা বনের এত ঘনিষ্ঠ সবুজ এই পক্ষী, এই চিল এবং এই ঘাসফুলের ভালোবাসা­ এখান থেকে এবার আমি অবশ্যই এমন কিছু নিয়ে যাবো­ নিয়ে যেতে পারব­ যা আমার সারা জীবনের পাওয়া হয়ে থাকবে। সঞ্চয় হয়ে থাকবে। এখনো মনে আছে আমার সেই দীঘি­ তাকে যে কত রকমে আমি দেখেছি। সেই ফড়িং আর সেই প্রজাপতি। সেই বাঁশবন আর পাতিহাঁসের দল।
কিন্তু হায়!
যা ভেবেছিলাম তা কিন্তু হয়নি। কিছুই হলো না তার কথা ছিল যা কিছু ঘটার।
দু’দিনের মধ্যেই কেমন করে যেন সব কিছু বদলে গেল। পাল্টে গেল।
একদিন অপরাহ্ণে মেঘে মেঘে ছেয়ে গেল আকাশ­ শুধু শাহপুর গ্রামের নয়, যেন সারা পৃথিবীকে গ্রাস করতে চাইল অসম্ভব মেঘেদের অচিন্তনীয় ছুটোছুটি। প্রবল বাতাসে লণ্ডভণ্ড হলো চার দিক। বিদ্যুৎ চমকালো­ মনে হলো অসংখ্য অগ্নিশিখার সব চাবুক।
আর এইসব কিছুর সাথে যেন এক তুমুল প্রতিযোগিতা করে নামল বৃষ্টি।
এবং বিরামহীন বজ্রপাতের ক্রুদ্ধ চিৎকার।
আকাশে আকাশে গগনে গগনে বুঝি অন্তরীক্ষের ওপার থেকেও।
আমি ভয় পেয়ে গেলাম।
বললাম, আবু ভাই এখন কী হবে।
আমাদের আব্বাস ভাই-সকলের আবু ‘ভাইসাব’ আমাকে দু’হাতে জড়িয়ে ধরে বললেন, ডরাইস না। থাকব-না বেশিক্ষণ। এরপর শুধু বৃষ্টি।
বৃষ্টির শব্দ খুব ভালো লাগে। টিনের ওপর একটানা গানের মতো।
তোরও ভালো লাগব।
মনে হবে আকাশের সঙ্গে কথা বলতাছিস। বাতাস গান গাইতেছে তোর সঙ্গে।
এবং হলোও তা-ই।
রাত হতে হতে তুফানের তাণ্ডব কমতে থাকল। যে বাতাসকে এই ক’দিন ধরে দেখেছি গ্রামের ফুল আর পাখি আর পাতাদের সাথে কথা বলতে সেই বাতাস এ কী ভয়ঙ্কররূপে লণ্ডভণ্ড করল সব কিছু। গ্রাম গাছ লেবুবন সব।
ক্রমে ঝড়ের চিৎকার কমে গিয়ে কেমন যেন শান্ত হতে শুরু করল চার দিক।
আবু ভাই বললেন, তুফান কমে গেছে। এখন শুধু বৃষ্টি।
শুধুই বৃষ্টি, ক্রমাগত বৃষ্টি, অবিরাম বৃষ্টি­ অìধকার রাতে কেমন যেন সব কিছুকে ডুবিয়ে দিচ্ছে এই বৃষ্টি।
আব্বাস ভাইকে বললাম, এই বৃষ্টির ক্রমাগত শব্দ থামবে কখন?
আব্বাস ভাই বললেন, জানি না। কেউ জানে না কখন থামবে এই বৃষ্টির কান্না।
আমি বললাম, কান্না কেন?
মাথার ওপরে যে বিশাল আকাশ তার কান্নাই তো বৃষ্টি হয়ে নামে পৃথিবীতে।
আব্বাস ভাই আরও বললেন, এই বৃষ্টির শব্দ শুনতে শুনতে তোর ঘুম এসে যাবে­ ঘুমিয়ে পড়বি নিজের অজান্তে।
সত্যি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম বৃষ্টির শব্দে নিজেরই অজান্তে। সে দিন শুধু মধ্যরাতে আমার ঘুম ভেঙেছিল একবার। তখনও অবিরাম বৃষ্টি। অìধকারে সেই শব্দের মধ্যে কেমন যেন একটা নেশা মেশানো ছিল। মনে হয়েছিল এই বৃষ্টি কোনো দিন থামবে না। এই বৃষ্টি থামলে পৃথিবী মরে যাবে।
আবু ভাই বলেছিলেন­ এই বৃষ্টি তিন দিন, কখনও সাত দিন আবার কখনও বা দশ দিন ধরেও হতে পারে।
এবার তিন দিন পরে বৃষ্টি থামল। তবে আকাশে শুধু ছায়া। গাছে গাছে শুধু ছায়ারা খেলা করে চলল­ ছায়াদের এত জীবন্ত আমি আগে কখনও দেখিনি।
যখন অপরাহ্ণ এলো­ কে যেন একজন বলল, আজ আর রৌদ্র দেখা যাবে না। রোদ উঠবে না।
রোদ উঠল তার পরদিন। অর্থাৎ বৃষ্টির পঞ্চম দিনে।
আর সেই রৌদ্রে সারা পৃথিবী যেন নতুন এক অবয়ব নিয়ে ঝলমল করে উঠল।
রৌদ্রকে ভালো লাগল আমার, বেশ ভালো লাগল। তবুও মনে হলো এই যে ঝড় এবং তার ছোবল­ এই বৃষ্টি অবিরাম আর তার শব্দের কোরাসে ধরিত্রীর অবগাহন এ যেন কোনো দিনই ভুলে যাবার নয়।
এত দিন পরে এখন আমার বলতে খুব ভালো লাগছে আমি সেই ঝড়ের রাতে সেই ক্রমাগত বৃষ্টির অভিসারের কথা আজো ভুলিনি।
ভুলতে পারিনি। হয়তো পারব না কোনো দিনই।
সেই কৈশোরকালের স্মৃতি ভুলবার নয়। কখনও নয়।
পরবর্তীকালে জীবনের নানা সময়ে নানাভাবে আমি বৃষ্টির অবিশ্রান্ত ধারাকে প্রত্যক্ষ করেছি, অনুভব করেছি, অনুধাবন করেছি এবং এক সময় এই বৃষ্টি এবং রবীন্দ্রনাথের গানের ভাষায় এই বৃষ্টির সুবাস আমার চিত্তে এক বিপুল বৈভবের মতো গ্রথিত হয়ে গেল।
প্রথম যৌবনে যখন কবিতা রচনায় নিবদ্ধ হই তখন প্রকৃতির বিভিন্ন অনুষঙ্গের মতো বৃষ্টিও আমাকে প্রবলভাবে পেয়ে বসেছিল। আর সেই সময় আমার কেবলই মনে হতো এই বাংলার যত সìধ্যার মেঘমালা আর শ্রাবণ রাত্রির নিরবচ্ছিন্ন বৃষ্টি তার সবচেয়ে প্রবল ও প্রতাপান্বিত প্রতিনিধি হলেন রবীন্দ্রনাথ। সকল গানে আর অজস্র কবিতায়। মনে হতো রবীন্দ্রনাথ সবই লিখে ফেলেছেন, আমাদের নতুন করে আর কিছু লেখার অবকাশ নেই। তবুও বৃষ্টি নিয়ে লিখেছি তখন­ অনেক কবিতা­ বেশ কিছু গল্প এবং একটি উপন্যাসও। সে সময়কার প্রায় সব লেখাই আমার বিক্ষিপ্ত হয়ে হারিয়ে গেছে। বৃষ্টি ছিল তখন আমার সবচেয়ে প্রিয় প্রসঙ্গ।
ইতিহাসের আর ধর্মগ্রন্থের সবচেয়ে প্রিয় মানুষ আমার­ হজরত নূহ আ:। আর সবচেয়ে প্রিয় ঘটনা তার মহাপ্লাবন। বিধাতার ইচ্ছায় ধরিত্রী প্লাবিত হলো­ বৃষ্টি হলো ক্রমাগত চল্লিশ দিন আর চল্লিশ রাত। তারপর পানি স্খিত হলো বিধাতার নির্দেশে। এই মহাপ্লাবনের মধ্যে ডুবে থাকল বিশ্বলোক একশত পঞ্চাশ দিন ধরে। এবং তারপর শুদ্ধ হলো পৃথিবী। পাখি উড়ে গেলো আর ফিরে এলো না নূহের নৌকায়। প্লাবনের পানি নেমে গেছে পর্বতশৃঙ্গ থেকে।
আমার একটি কবিতা আছে সেই প্রথম যৌবনের লেখা।
‘কবিতাটির নাম ‘একদিন তৃষäার্ত বৃষ্টিতে।’
আমার বয়স তখন আঠারো বিশ বছর হবে।
সেই কবিতায় লিখেছিলাম­
তুই নেমে এলি আমার নগ্নতার মধ্যে
বৃষ্টি ফোঁটার মতো নগ্ন হয়ে­ ঝড়ের চিৎকারের মতো নগ্ন হয়ে
তখন বৃষ্টি ছিল আকাশে আর বাতাসে ছিল উন্মত্ততা­
কবিতা শেষ হয়েছিল এভাবে­
ক্রমে সìধ্যা হলো বৃষ্টি নামলো আরও জোরে
এক পাল কালো কুকুরের মতো অìধকার ছুটোছুটি
করতে লাগলো চার দিকে
তুই আমাকে টেনে নিয়ে আমার হাত ধরে
বেরিয়ে পড়লি সেই বৃষ্টির ব্যাপ্তিতে
নিজেরি উন্মাদনায় মোহিনী তুই বেরিয়ে পড়লি
উৎক্ষিপ্ত প্রগলভ নিজেরি আনন্দে নিমজ্জিত
অপার বর্ষণে­
তুই এলি সেই কুটিরের মধ্যে আমার কাছে
যাকে মনে হয়েছিল প্রাচীন কোনো নক্ষত্রের মতো দ্বীপ
ঘাসের উপর দিয়ে হেঁটে হেঁটে আমরা ভিজলাম।
এবং শেষের পঙ্ক্তিতে
আমরা শুধু ভিজবো
ভিজবো ভিজবো ভিজবো
এগিয়ে যাবো নিজেদের তৃষäার্ত অìধকারের দিকে
এখন এই বার্ধক্যের খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে বলতে পারি অনায়াসে বৃষ্টিকে ভালো না বেসে একজন কবির আর কোনো উপায় নেই।
কেননা বৃষ্টি মানেই পানি।
আর পানি মানেই জীবন­ ক্রমাগত বেঁচে থাকা।
বিধাতা সবকিছুর মধ্যেই চার ভাগের তিন ভাগ চোখের জলের মতো পানি দিয়ে ভরে দিয়েছেন।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: