জীবনে এমন কত বিচ্ছেদ, কত মৃত্যু আছে, ফিরিয়া লাভ কি? পৃথিবীতে কে কাহার…

ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন
সাম্প্রতিক কালের রাজনীতিতে ২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেন বিষয়ক আলোচনা ঘুরেফিরে বারবারই আসছে। গত ১৫ জুন সদ্য বিদায়ী সেনাপ্রধান জেনারেল মইনের বিদায়কে ঘিরে আরেকদফা আলোচনায় এসেছে ওয়ান-ইলেভেন। এবারে ওয়ান-ইলেভেনের নেপথ্য নায়ক অভিহিত করে রাজনীতিবিদদের একাংশ তার বিচার ও শাস্তি দাবি করেছে।

ওয়ান-ইলেভেন-এর উপযোগিতা নিয়ে বিতর্ক বিদ্যমান। কী হতো যদি ইয়াজউদ্দিনের ব্যর্থ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ২২ জানুয়ারির সাজানো নির্বাচনটা হয়েই যেতো? সাজানো নির্বাচন পরবর্তী তীব্র সরকারবিরোধী আন্দোলন, রাজপথে হানাহানি ও দেশব্যাপী অনিশ্চয়তা বাড়তো বলেই সবার ধারণা। তবে এই আন্দোলনের ফলে একটা গণঅভ্যুত্থান সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারতো, যার ফলে নিজামী-খালেদা সরকারের পতন হতো। সেক্ষেত্রে ওয়ান-ইলেভেন চারদলীয় জোট সরকারকে অন্তত গণঅভ্যুত্থানের মুখে পতনের হাত থেকে রক্ষা করেছে বলেই কোনো কোনো রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করেন। যদিও ওয়ান-ইলেভেনের পরে বিএনপির বেশ কিছু কেন্দ্রীয় নেতাকে দুর্নীতসহ বিভিন্ন অভিযোগে কারাগারে যেতে হয়েছে। বোধগম্য কারণেই বর্তমান মহাজোট সরকারের আমলে মওদুদ আহমেদ, নাজমুল হুদাসহ বিএনপির নেতারা সুযোগ পেলেই ওয়ান-ইলেভেনের সমালোচনায় মুখর হন। ওয়ান-ইলেভেনের পরে গ্রেপ্তার ও নির্যাতিত দুয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতাও মাঝেমধ্যে তাদের সঙ্গে তাল মিলান।
রাজনীতিতে ওয়ান-ইলেভেনের আবির্ভাব নিয়ে যতো বিতর্কই থাকুক না কেন, সেদিন জনমনে তা স্বস্তিও নিয়ে এসেছিল। কেবল স্বস্তি নয়, ওয়ান-ইলেভেন একই সঙ্গে জনগণের চোখে বুনেছিল বহুমুখী স্বপ্নের বীজ। সেই স্বপ্নগুলো ছিল দুর্নীতিমুক্ত মাতৃভূমির, শুদ্ধ রাজনীতি ও গণতন্ত্রের এবং সুখী সমৃদ্ধশালী একটি বাংলাদেশের। জনগণ স্বপ্ন দেখেছিল, পাশাপাশি দেশে একটি পরিবর্তনের সূচনাও হয়েছিল। কিন্তু এক বছরের মধ্যেই জনগণের স্বপ্নের সঙ্গে ওয়ান-ইলেভেন পরবর্তী পরিবর্তনের দ্বন্দ্ব স্পষ্ট হয়ে উঠলো। একদিকে দুর্নীতিবাজ বলে ব্যবসায়ীদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে, আবার নির্যাতনের ভয় দেখিয়ে সেইসব ব্যবসায়ীর কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে ওয়ান-ইলেভেনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রভাবশালীদের কারো কারো বিরূদ্ধে। রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে ঢালাও অপপ্রচার চালিয়ে দেশকে বিরাজনীতিকরণের অভিসন্ধিও কখনো কখনো প্রকট হয়ে উঠেছে। প্রচলিত রাজনীতিবিদদের বাদ দিয়ে রাজনীতির মাঠের টোকাইদের লাইম লাইটে আনার অপচেষ্টাও মানুষ ভালোভাবে গ্রহণ করেনি। ফলে মানুষের স্বপ্নাতুর চোখগুলো ক্রমশ সন্দেহের কুয়াশায় ভরে গেছে।
ওয়ান-ইলেভেন পরবর্তী ক্ষমতার কেন্দ্রে পরস্পরবিরোধী শক্তি ক্রিয়াশীল ছিল বলেই মনে হয়। তাদের মধ্যে একদল ছিল কট্টরপন্থী, এদের গৃহীত বিভিন্ন বিতর্কিত পদক্ষেপের কারণে এক বছরের মাথায় ফখরুদ্দীন আহমদ সরকারের উদ্দেশ্যের সততা নিয়ে মানুষ সন্দিহান হয়ে পড়ে। একারণেই সে সময়ে কতিপয় উপদেষ্টাকে সরিয়ে দেয়া হয়। পর্যায়ক্রমে সেনাবাহিনীর উচ্চ পর্যায়েও পরিবর্তন আনা হয়। পিছু হটতে থাকে ওয়ান-ইলেভেন নিয়ে ভিন্ন খেলায় মেতে ওঠা নেপথ্যের রাঘব বোয়ালরা।
সর্বোপরি, ফখরুদ্দিন সরকারের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল মাইনাস টু’র নামে শেখ হাসিনা এবং খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তারের মাধ্যমে রাজনীতি থেকে মাইনাস করার অপচেষ্টা। এই লক্ষ্যে তথাকথিত ভাড়াটে কিছু সাংবাদিক ও কর্পোরেট মিডিয়ার মাধ্যমে হাসিনা-খালেদার বিরূদ্ধে জনমত গঠনের ব্যর্থ চেষ্টা বরং বুমেরাং হয়েই ফিরে এসেছে। তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার উপমহাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় উত্তরাধিকারের রাজনীতি এবং শীর্ষ নেত্রী হাসিনা-খালেদার দীর্ঘদিনের জনসম্পৃক্ততা ও গ্রহণযোগ্যতা অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছিল। তারা সম্ভবত তাদের সাধ্যের পরিধিটাও মাপতে পারেনি। সাময়িক ক্ষমতা পেয়ে ‘ধরাকে সরা জ্ঞান করা’ শুরু করেছিল তাদের কেউ কেউ। দুর্নীতি দমনের কথা বলে নিজেরাও দুর্নীতির মধ্যে জড়িয়ে গিয়েছিল। ওয়ান-ইলেভেন সংশ্লিষ্টরা তাই জনগণকে যে স্বপ্ন দেখিয়েছিল, নিজেদের সীমাবদ্ধতার জন্য সেখানে তারা তাদের নিয়ে যেতে পারেনি। তবে মন্দের ভালো হলো যে, দেরীতে হলেও তারা তাদের করণীয় বুঝতে পেরেছিল। তাদের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব ছিল ছবিসহ একটি উন্নতমানের ভোটার তালিকা। এই ভোটার তালিকার কারণেই গত ২৯ ডিসেম্বরের সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হতে পেরেছিল।
ওয়ান-ইলেভেন নিয়ে রাজনীতিতে দীর্ঘদিন আলোচনা-সমালোচনা চলবে। তবে ওয়ান-ইলেভেনের ভালো মন্দ যাই থাকুক, এর আবির্ভাবের মধ্য দিয়ে জনগণের চোখে যে রাশি রাশি স্বপ্ন জেগে উঠেছিল, সেই স্বপ্নগুলো আজো রয়ে গেছে। সেই স্বপ্নের ধারাবহিকতায় দিনবদলের স্বপ্ন দেখিয়ে বর্তমান শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতায় এসেছে। এখন এই সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দিন বদলের সনদ বাস্তবায়ন। রাজনীতি, কৃষি, শিল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ সকল ক্ষেত্রেই চাই কার্যকরী পরিবর্তন, সন্ত্রাস-দুর্নীতি দমনে চাই সাফল্য, দেশব্যাপী সীমাহীন লোডশেডিংয়ের প্রেক্ষিতে বিদ্যুত পরিস্থিতির উন্নয়ন আজ অনিবার্য হয়ে উঠেছে। একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার আজ সময়ের দাবি, সেটি নিয়েও কোনো রকমের টালবাহানা করা যাবে না, এদের বিচার করতেই হবে। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের রায় বাস্তবায়ন করার দাবি তো দেশবাসীর পাশাপাশি আওয়ামীলীগেরও দীর্ঘদিনের দাবি, এর তো কোনো বিকল্প নেই।
এইসব স্বপ্নের প্রতিটির কথাই বর্তমান সরকারের দিনবদলের সনদে লিপিবদ্ধ করা আছে। প্রতিটি নির্বাচনের আগেই বড় বড় রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে মেনিফেস্টো ঘোষণা এ দেশে নতুন কিছু নয়, যেমন নতুন নয় নির্বাচনের পরে ক্ষমতায় গিয়ে নির্বাচনী প্র“তিশ্র“তি বেমালুম ভুলে যাওয়া। কিন্তু এখন দিন বদলেছে। মিডিয়া ও সুশীল সমাজও অনেক ক্ষেত্রে ভালোভাবেই তদারকির দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। কথা দিয়ে কথা না রাখার পরিণতিও আখেরে ভালো হয় না। এই সত্য আমাদের মূল রাজনৈতিক দলগুলো নিশ্চয়ই আমাদের চেয়েও ভালো জানেন।
বর্তমান সরকারের দিনবদলের সনদ বাস্তবায়নে এক বা একাধিক অঙ্গীকারাবদ্ধ রাজনৈতিক সংগঠনের প্রয়োজন। আওয়ামী লীগসহ মহাজোটের শরীক রাজনৈতিক দলগুলো কি পরিবর্তনের স্বপক্ষে স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তুত? ক্ষমতায় শুরুতেই ছাত্রলীগের কতিপয় নেতা-কর্মী বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যে তাণ্ডব চালিয়েছে তাতে বর্তমানের সরকারের ভাবমূর্তি যথেষ্ট ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। অথচ ছাত্র রাজনীতির সেই জলুস এখন আর নেই। বর্তমান সরকারকে ক্ষমতায় আনতেও ছাত্রলীগের তেমন উল্লেখযোগ্য কোনো ভূমিকা ছিল না। বিগত জোট সরকারের আমলেও রাজপথে তাদের তেমন সক্রিয় দেখা যায়নি। অথচ ক্ষমতায় আসতে না আসতেই তাদের সন্ত্রাসী কার্যকলাপে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে বর্তমান সরকারের ভাবমূর্তি। শুধু ছাত্রলীগের কতিপয় নেতা-কর্মীই না, দেশের অনেক স্থানেই আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা টেন্ডারবাজি ও সন্ত্রাসী কার্যকলাপের জন্য মাঝেমধ্যেই পত্রিকার শিরোনাম হচ্ছে। এইসব নেতা-কর্মী দলের জন্য উপকারের চেয়ে বরং বোঝা হয়েই দাঁড়াচ্ছে।
এইসব তথাকথিত দলীয় নেতা-কর্মীকে কঠোর হাতে নিয়ন্ত্রণের এখনই সময়। অতীতের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারে গিয়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভালো কাজ করলেও লঘু পাপে গুরু দণ্ড পায়। জামাত-বিএনপির আমলে সন্ত্রাস-দুর্নীতি-চাঁদাবাজি ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়ে কুটির শিল্পের রূপ নিলেও মিডিয়ার কল্যাণে তারকা সন্ত্রাসীর উপমা এখনো সেই হাজারী কিংবা শামীম ওসমানই।
দিনবদলের লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে মন্ত্রিসভা গঠন করেছেন, তা প্রায় সবাইকেই চমকে দিয়েছে। চমকের এই মন্ত্রিসভার অনেকেই মন্ত্রী হিসেবে নতুন মুখ। তাঁদের অধিকাংশই আবার প্রশংসনীয় সততারও অধিকারী। সততার পাশাপাশি তাদের কাছে এখন প্রত্যাশা মন্ত্রণালয় চালানোর ব্যাপারে দক্ষতা। দক্ষ মন্ত্রী হতে হলে নবীন হিসেবে যতোটা সময় প্রয়োজন, তা তারা ইতিমধ্যে পেরিয়ে এসেছেন। এখন তাই, নবনির্বাচিত সরকারের প্রতিটি মন্ত্রীকেই স্ব স্ব মন্ত্রণালয় পরিচালনার ক্ষেত্রে দক্ষতা দেখাতে হবে। সমমনা সবার অংশগ্রহণে বর্তমান সরকারকে দিন বদলের লড়াইয়ে সফলভাবে নেতৃত্ব দিতে হবে। এক্ষেত্রে তাদের ব্যর্থ হওয়ার কোনো অবকাশ নেই। তারা ব্যর্থ হলে জাতির পতাকা ফের খামছে ধরবে পুরোনো শকুন।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: