জীবনে এমন কত বিচ্ছেদ, কত মৃত্যু আছে, ফিরিয়া লাভ কি? পৃথিবীতে কে কাহার…

কামাল লোহানী
নির্বাচনী প্রতিশ্র“তি অনুযায়ী যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করার কঠোর, দৃঢ়প্রতিজ্ঞ সিদ্ধান্ত নিয়েছে মহাজোট সরকার এবং জাতীয় সংসদ। এতে কেবল ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর দেশব্যাপী নির্বাচনের মাধ্যমে এ দেশের সরলপ্রাণ, সংকল্পবদ্ধ সাধারণ মানুষ যে অনন্য রায় দিয়েছেন তাকে সম্মান প্রদর্শনই নয়, দেশবাসীর দীর্ঘ প্রতীক্ষিত প্রত্যাশা পূরণের এক বলিষ্ঠ সংকল্প ব্যক্ত হয়েছে। আপামর জনসাধারণ এই সিদ্ধান্তকে আন্তরিক অভিনন্দন জানিয়েছেন।
এতো কোনো প্রতিহিংসা নয়, কোনো সন্ত্রাস নয়, এ কেবল পাপ স্খালনের দৃঢ়প্রত্যয়। বাংলাদেশ নামে অপহৃত ভূখণ্ডের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বকে যারা আজো স্বীকার এবং গ্রহণ করতে চায় না, তাদেরই বিরুদ্ধে জনগণের এক প্রত্যয়দৃপ্ত অঙ্গীকার। ওরা এই পূর্ব বাংলাকে ধর্মের নামে দখল করে শোষণ-শাসন করছিল, চালিয়েছিল হত্যা, লুণ্ঠন, রাহাজানি তারই তেইশ বছরের বঞ্চনা-অবহেলা আর নিপীড়ন-নির্যাতনের অসহনীয় দুঃখ-দুর্দশাকে পরিহার করে নিজ ভূমে আর পরবাসী না থাকার সিদ্ধান্তে সংকল্পে চূড়ান্ত লড়াইÑ একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন এ দেশের আবাল বৃদ্ধ বনিতা। শ্রমিক-কৃষক ছাত্র-যুবক মেয়ে-মরদের ফারাক ছিল না, সকলেই অস্ত্র তুলে নিয়েছিলেন হাতে, নির্ভীক জীবনযুদ্ধ। সেই যুদ্ধকে যারা অপব্যাখ্যা, বিকৃত করতে ষড়যন্ত্র চালায়, তাদের বিরুদ্ধেই জনগণের এ গণরায়। এর প্রতি অবমাননা দেখিয়ে কোনো গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক শক্তিই দেশে রাজনীতি চর্চা করতে পারবে না। মুক্তিযুদ্ধ শেষে আমরা যদি বিশ্বের মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে এই মৌলবাদী-সাম্প্রদায়িক অপশক্তিকে এ দেশে প্রশ্রয়-আশ্রয়, রাজনৈতিক তৎপরতা চালাবার সুযোগই না দিতাম এবং তাদের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা আর দেশদ্রোহিতার ঘৃণ্যতম অপরাধের বিচার করে তাদের শাস্তির বিধান করতাম, তবে আজ প্রিয়তম স্বদেশ যে বিপন্নতায় নিক্ষিপ্ত হয়েছে, তা হতো না। আমরা ভিয়েতনাম, উত্তর কোরিয়ার মতন উন্নত শক্তিশালী দেশে পরিণত হতে পারতাম। কোনো বিরোধী বিদেশী বৃহৎ শক্তি আমাদের দেশের মধ্যে ঢুকে দেশীয় রাজনীতি, সংস্কৃতি এবং অর্থনীতিকে বিলুপ্ত করে নিজেদের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী রাজনৈতিক শক্তির উত্থান ঘটিয়ে বিকৃত মানসিকতা এবং কৌশলে থাবা বিস্তার করতে পারতো না। একটু লক্ষ্য করলেই দেখবেন প্রিয় পাঠক, যেখানে যে দেশে তারা ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করেছে, আগ্রাসী আর সন্ত্রাসী মানসিকতা এবং ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে চেয়েছে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে সম্প্রসারিত করে যুদ্ধসাজে সজ্জিত করতে, নিজেদের সমরাস্ত্র উৎপাদন ও বাড়তি অস্ত্রের বাণিজ্যকে ছড়িয়ে দিতে, সেই সব দেশের আজ কী নির্মম পরিণতি! বিগত পঞ্চাশ-ষাট বছরের ইতিহাস ঘাঁটলে ইঙ্গ-মার্কিন, ফরাসী সাম্রাজ্যবাদের লোলুপ দৃষ্টি, সেই লক্ষে সংঘাত-সংহার, যাদের উদ্দেশ্য ছিল রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার, তাদের সাম্প্রতিক ইরাক গণহত্যা ও নির্মম যুদ্ধাভিযানের কথা কি ভোলা য়ায়? ভুলতে পেরেছি কি কোরিয়ার যুদ্ধের কথা, ভিয়েতনামের দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রামের কাহিনী, কিংবা সোভিয়েত ইউনিয়নকে টুকরো টুকরো করার সহিংস উপাখ্যান? বসনিয়া কিংবা আফগানিস্তানে পাকিস্তানে কি না অঘটন ঘটিয়ে চলেছে তারপরও ভারত করেছে পরমাণু চুক্তি তারই সাথে, সামষ্টিক স্বার্থোদ্ধারে। কিন্তু আমরা ছোট্ট দেশ অথচ গণশক্তি আমাদের প্রবল। আমরাতো ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র আর বাঙালি জাতীয়তবাদের স্লোগানে মূলমন্ত্র জপে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর হাত থেকে প্রিয়তম স্বদেশকে পুনরুদ্ধার করেছিলাম। ঐ পাকিস্তানি হানাদাররা মদদ সহযোগিতা পেয়েছিল নিজভূমে পরবাসী ঘাতক-দালাল-পিশাচ শক্তির; যাদের আমরা চিনি জামাত, শিবির, আলবদর, আল শামস বলে। আমরা চিনেছি এই মৌলবাদী অপশক্তিকে সেই পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আগ থেকেই, দেখেছি ওরা কেমন করে পাকিস্তান আমলে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের বিরোধিতা করেছে। খবরের কাগজের পাতায় পাতায়? লেখা আছে জামাতী নৃশংসতার কথা। হত্যা আর ধর্ষণ এবং এ অপকর্মে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নিগানদার হিসেবে স্থানীয় এই হায়েনার দলের কথা।
সেই ধর্মান্ধ অপশক্তি আজ দেশে নব্য জাতীয়তাবাদী, বাংলাদেশ ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির দলবাজির স্বার্থে প্রশ্রয় পেয়ে কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে এই তিরিশ বছরে তার মর্মান্তিক ইতিহাসও আমাদের জানা। তিন দশক ধরে ওরা আবারো সেই পাকিস্তানিদের সঙ্গেই জোট বেঁধে ঘোট পাকিয়ে প্রভু মার্কিনি যুদ্ধবাজদের সবক নিয়েই নিজেদের ধর্মোন্মাদ শক্তিকে সংগঠিত করেছে। জঙ্গিবাদ সন্ত্রাস ছড়িয়ে দিয়েছে একই পদ্ধতিতে। শুরু হয়েছে গোপনেÑপ্রকাশ্যে হত্যা, চক্রান্ত, অভিযান। আবার মরছেন এ দেশের গণতান্ত্রিক ও অসম্প্রদায়িক জনগণ। হত্যা চলছে। ষড়যন্ত্র অব্যাহত। জনপ্রিয় মহাজোটকে বিব্রতকর পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হচ্ছে বারংবার। এই মাত্র পাঁচ মাসে যে অপঘাত-সংঘাতের নারকীয়তা মোকাবেলা করেছে মহাজোট সরকার, তাতেই প্রমাণ মেলে প্রভুর পদলেহনকারী এই অপশক্তি কী ঘৃণ্য কৌশলেই না এগিয়ে চলেছে এ দেশের জনগণের বিরুদ্ধে নতুন ছোবল মারার জন্য। এই অন্ধ মৌলবাদীরা দেখেছে এবং জানে এ দেশের জনগণের শক্তির প্রাবল্য। মুসলিম লীগের দুঃশাসন, তারপর সামরিক শক্তি দোর্দণ্ড প্রতাপের বিরুদ্ধে দেখেছে তো একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, এমনকি ভোলার কথা নয় নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী গণউত্থানও।
তারপরও দেখেছি কতোটা পাকিস্তান নির্ভর এই ধর্মাশ্রয়ী ‘রাজনীতি’। এখনো তাদের রাজনীতি পাকিস্তানকেই ঘিরে। আর পাকিস্তানও আলবদর, আল-শামসÑ যারা যুদ্ধাপরাধী, তাদের রক্ষা করতে আজো নানা কৌশলে এবং মাধ্যমে নানা ধরনের সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে বলেই অনুমিত হচ্ছে। মাঝেমধ্যে পাকিস্তানি সরকার একাত্তরের ‘ঘটনা’র জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছে বক্তব্যেÑবিবৃতিতে কিন্তু আজো আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা প্রদর্শন করেনি। নেপথ্য কারণ ইদানীং সুস্পষ্ট হয়ে গেছে। পাকিস্তানের সচেতন নাগরিক বাংলাদেশের অভ্যুদয়কে অভিনন্দন জানিয়েছেন, তার জন্য তাদেরকে জেল-জুলুমও সহ্য করতে হয়েছে। অথচ সরকার আজো সেই সাম্প্রদায়িক অপশক্তিকে মদদ দিয়ে যাচ্ছে। তারই নির্লজ্জ প্রকাশ ঘটলো গত রোববার ৭ জুন খোদ পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদেই। বাংলাদেশের একটি মিডিয়া প্রতিনিধিদল গেছে সফরে। তাদের সঙ্গে আলাপে পাকিস্তান সরকারের অতিরিক্ত সচিব পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা বলেছেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে চাইলে রাষ্ট্রীয় সম্পর্ক নাকি শীতল হতে পারে। সে বিষয়ে খেয়াল রাখার পরামর্শও তিনি দিয়েছেন। এই অতিরিক্ত সচিব স্বাধীন স্বার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাকগলাতে যে স্পর্ধা দেখিয়েছে, তার নিন্দা করছি আমরা সকলে। আঁতে বুঝি ঘা লেগেছে, তাই ওদের চিত্ত চঞ্চল হয়ে উঠেছে। এক পাকিস্তানি প্রবীণ সাংবাদিক মুক্তিযুদ্ধেরই যেক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবং বলেছেন, অবিভক্ত পাকিস্তানেই বঙ্গবন্ধুর নাকি ক্ষমতা গ্রহণ করা উচিত ছিল। এ ‘ভদ্রলোকে’র ঔদ্ধত্য আমাকে হতবাক করেছে। তাহলে কি একাত্তরে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা কী করেছিল, তা তিনি জানেন না? জানলে কী করে এ কথা বলবার মতন ধৃষ্টতা দেখান? আরেকজন প্রবীণ সাংবাদিক তো একাত্তরের যৌক্তিকতা মেনেই নিয়েছেন, পাকিস্তানের অগুনতি সচেতন মানুষের মতন।
আমার তো ধারণা, ওরা-পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর যুদ্ধাপরাধীরা ভারতের মধ্যস্থতায় রেহাই পেয়ে দেশে ফিরে যেতে পারায় আজ তাদের গলার আওয়াজ বেশ উচুঁতে উঠেছে, ঔদ্ধত্যের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। তার ওপর আমেরিকার শাসক শ্রেণীর মতলবাজ ও যুদ্ধোন্মাদ চক্রের আগ্রাসী স্বার্থতো রয়েছেই। ওরা দ্বিমুখী নীতির কারণে একদিকে মুসলিম মৌলবাদী জঙ্গি সহিংসতার শিকার হওয়ায় ক্ষুব্ধ-ক্রুদ্ধ। অথচ বিশ্বের দেশে দেশে সমাজতান্ত্রিক শক্তিকে পর্যুদস্ত করার নানান চক্রান্ত, ফন্দিফিকির আঁটে এবং এঁটেই চলেছে। ক্ষমতার অহঙ্কারে শক্তির দাপটে মার্কিন পরাশক্তি গায়ের জোরে যা খুশি তাই করে বেড়াচ্ছে। যা করতে চাইছে, তাই চাপিয়ে দিচ্ছে বিশ্বের যে কোনো রাষ্ট্রের ওপর। যখন যা মন চাইছে, তাই করে ফেলছে। কারণ মার্কিনি পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থার কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী এ মুহূর্তে নেই। তাই স্পর্ধা তাদের সীমাহীন। সোভিয়েত ইউনিয়ন সমাজতান্ত্রিক দেশ হিসেবে যে বিপুল শক্তির উৎস হয়ে রুশ জনগণ এবং পৃথিবীর মুক্তিকামী মানুষের দোর্দণ্ড প্রতাপশালী বন্ধু ছিল, তার বিরুদ্ধে সুদীর্ঘকাল চক্রান্ত চালিয়ে বন্যার প্রবল তোড়ের মতন ডলার তেলে, গোপন ষড়যন্ত্রের খাল কেটে তার ভিত্তিকেই নড়বড়ে করে ফেলেছিলে।
সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক গণঅভিযানে আতঙ্কিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র রুশ জনগণবিরোধী দখল মতলব এঁটেছিল, সাত দশক ধরে পাল্টা প্রচার-প্রাচারণা চালিয়ে সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির ভেতরে ঢুকে পরিকল্পিত কর্মসাধন করতে সবসময় তৎপর ছিল। সত্তরের দশকে বাংলার মুক্তিকামী মানুষের বিপুল সাহসের উৎস হয়ে দুনিয়া জোড়া চ্যালেঞ্জের মোকাবেলায় সোভিয়েত ইউনিয়ন বাংলাদেশের জনগণের মুক্তি আকাক্সক্ষাকে বাস্তবে রূপায়িত করতে নির্দ্বিধায় বাংলার নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে অন্যতম সহায়ক মহান শক্তির দায়িত্ব পালন করেছিল। ফলে বাংলাদেশ যেমন, তেমনি সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে মার্কিনি ক্ষোভ জমে উঠেছিল। তারা দাপটের সঙ্গে সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির ভেতরে স্খলন ঘটাতে, ইয়েলেৎসিন আর গর্বাচেভের মতন ‘শিখণ্ডি’ খুঁজে পেয়েছিল। ওদের হাতেই পতন ঘটিয়েছিল সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রপুঞ্জের। পূর্ব ইউরোপীয় সমাজতান্ত্রিক পথে যাত্রামুখী দেশগুলোকে খতম করে সোভিয়েতকেই ভেঙে টুকরো টুকরো ফেলে দিলো। আনন্দ-উল্লাসে বগল বাজিয়েছিল মার্কিন পুঁজিগোষ্ঠী, ভেবেছিল ‘কমিউনিজম’ খতম করে দিলো। কিন্তু পুঁজিবাদকে খতম করবে যে ‘সংঘবদ্ধ গণশক্তি’ তার উত্থান ঠেকাতে আর পারলো না, পারছে না। এখন তো খোদ আমেরিকার দক্ষিণে নতুন নতুন সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে একের পর এক। কিউবা, ভেনেজুয়েলা, বলিভিয়া, নিকারাগুয়াতো বটেই, এমনকি আর্জেন্টিনা, ব্রাজিলেও সাধারণ মানুষ যেন অনুধাবন করতে পারছেন, ঐসব গণশক্তিতে উত্থিত রাষ্ট্রসমূহের উত্তাপে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছেন।
এছাড়া নিজের দেশে মার্কিনিদের বেকারিত্বের চরম অভিশাপ, দেশে দেশে চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধে মার্কিনি তরুণ সেনাদের নিরন্তর মৃত্যু দেশব্যাপী ক্ষোভের সঞ্চার করছে- সর্বোপরি অর্থনৈতিক মহামন্দা যেন তাদের মাথার ঘায়ে পাগল কুকুরের মতন হণ্যে করে তুলেছে। তবুও ইরাকে সাদ্দাম উৎখাত, আফগানিস্তানে তালেবান বিরোধী অভিযান এমন সব সহিংস মানবিকতা বিরোধী যুদ্ধে যে ব্যাপক গণহত্যা চলছে, তা মার্কিনিদের বেঁচে থাকার যেন বড় দাওয়াই। কিন্তু এসব বিশ্বব্যাপী যে ঘৃণার উদ্রেক করেছে জনমনে, তার কথা তারা ভাবছে না ক্ষমতা, শক্তি আর অস্ত্রের দাপটে।
এই উগ্র যুদ্ধোম্মাদ পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই উপমহাদেশে চড়াও হয়েছে। পাকিস্তানকে কব্জা করে ফেলেছে। ভারতকে পরমাণু চুক্তিতে জড়িয়ে জনসাধারণ থেকে সরাবার কোশেশ করে যাচ্ছে। আর নেপালে রাজতন্ত্র উৎখাতকারী প্রগতিশীল শক্তিকে খর্ব করার জন্য ভারত সমর্থক কংগ্রেসকে ব্যবহার করছে শক্তি বলয় নির্মাণে। কিন্তু বাংলাদেশে ওই যুদ্ধবাজ মার্কিন চক্র দারুণ কৌশল অবলম্বন করে রাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থা, অর্থশক্তি, সংস্কৃতিতে অনুপ্রবেশ করে সর্বত্রই গণবিরোধী ধারা তৈরির কোশেশ চালিয়ে যাচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সফলতাও অর্জন করেছে তো বটেই। ধ্বংসের প্রায় শেষ প্রান্তে এসে পুঁজিবাদী যুদ্ধশক্তি যেখানে যেভাবে পারছে, সেভাবেই নিজেদের অনুপ্রবেশ ঘটাচ্ছে এবং চক্রান্ত-ষড়যন্ত্র অব্যাহত রেখেছে জনগণের বিরুদ্ধে। এই ঘৃণ্যশক্তির মদদে ঐ যুদ্ধাপরাধী অপশক্তি জামাত-শিবির ও তাদের সৃষ্ট মুক্তিযুদ্ধবিরোধী পরাজিত শক্তি ক্রমশ আমাদের প্রিয় স্বদেশ ভূমিকে ‘ইসলামী প্রজাতন্ত্রে’ পরিণত করার স্বপ্ন দেখছে। কিন্তু যতো বড় পরাশক্তিই হোক না কেন, হোক না সে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী তাকে প্রতিরোধ করার একমাত্র শক্তিই হলো গণশক্তি। সে গণশক্তি একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ করে জান লড়িয়ে বিজয় অর্জন করেছে। একইভাবে এবারে জাতীয় নির্বাচনে সাধারণ মানুষ নির্ভয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ করে প্রমাণ করেছেন জনগণই সকল শক্তির উৎস। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে এবারের নতুন ভোটার তরুণ শক্তি, যাদের অবদান সংগ্রামে, ইতিহাসের প্রতি অধ্যায়ে লিপিবদ্ধ হয়ে আছে, তথা তাদেরকেই অবহেলা অবজ্ঞায় হেয় প্রতিপন্ন করার কৌশল নিয়েছিল একদল চিহ্নিত রাজনৈতিক শক্তি এবং সবসময় এই তরুণ্যকে তারা সংগ্রাম-সংঘর্ষের শক্তি বলেই চিত্রিত করতে চেয়েছে। ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করার চক্রান্তও কম করেনি, করছে না। এই তরুণ ভোটারদের বৈপ্লবিক সিদ্ধান্তে যেন ‘একাত্তরের গণরায়’ই প্রতিফলিত হয়েছে। যুদ্ধজয়ের বিপুল উদ্ভাস এবার প্রধান রাজনৈতিক শক্তি মহাজোটকে শক্তি দিয়েছে এ দেশকে সুখী সমৃদ্ধশালী একটি প্রত্যাশিত রাষ্ট্র- ‘সোনার বাংলা’ প্রতিষ্ঠায়। তাদের যে যুদ্ধাপরাধ বিরোধী সুস্পষ্ট রায়, জাতীয় সংসদে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত, মন্ত্রিসভার গৃহীত কর্মসূচি এসবই জনগণের প্রত্যাশার একটি ধারাপ্রবাহ সৃষ্টি করেছে যা কিনা, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীদের বিচার এবং শাস্তিবিধানের পথকে সুগম করেছে। মহাজোট সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্র“তি বাস্তবায়নে এই একটি অনন্য সাধারণ পদক্ষেপ সূচিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই পরাজিত শক্তির মদদদাতারাও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। পাকিস্তান যে মন্তব্য করেছে সে ব্যাপারে আমাদের সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত সরকার ইতিমধ্যে কেবল ঘোষণাই করেনি, বরঞ্চ কর্মপ্রয়াসে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণেও দৃঢ়পদক্ষেপে এগিয়ে চলেছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী, আইনমন্ত্রীÑসকলেই দৃঢ় মনোভাব প্রকাশ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ প্রশ্নে অনড়, অবিচল। তার এই আমলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবেই। কারণ জনগণ রায় দিয়েছেন। নির্বাচনী ইশতেহারে এমনই প্রতিশ্র“তি ছিল। একের পর এক বর্তমান সরকারকে নানা প্রতিকূলতার চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের পথে এগুতে হচ্ছে।
এরমধ্যে অবশ্য যুদ্ধাপরাধী বিচারের দাবি চান, এমন কেউ কেউ ভাবছেন আমাদের দেশের আইনে ওদের বিচার সম্ভব নয়। কিন্তু আমরা বহুদিন থেকেই বলে আসছি এমনকি বিজ্ঞ আইনজীবী ও আইন বিশেষজ্ঞরাও দৃঢ় মত প্রকাশ করেছেন, বঙ্গবন্ধু প্রণীত, ১৯৭৩ সালের ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্র্যাইব্যুনাল এ্যাক্টেই এ বিচার বাস্তবসম্মতভাবে সুচারুরূপে সম্পন্ন করা সম্ভব। কারো কাছে এ বিচারের জন্য আইনি সহায়তা চাওয়ার প্রয়োজন নেই। জগৎ জোড়া জনগণ আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে অকৃপণ সহযোগিতা করেছিল, তারাও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবি করেছে এবং এখনো করছে। পাকিস্তানের জনগণের মধ্যেও এমন প্রতিক্রিয়া রয়েছে।
আর যুদ্ধাপরাধ যারা দেশে দেশে করে বেড়ায়, গণহত্যা করে চলে বেধড়ক, সেই মার্কিন প্রশাসন সাম্রাজ্যবাদী মন-মানসিকতা নিয়েই একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল এবং বাংলাদেশের অভ্যুদয় ও মুক্তিযুদ্ধের অগ্রযাত্রাকে স্তব্ধ করে দিতে সামরিক হামলারও হুমকি দিয়েছিল। যারা বাংলাদেশ অর্জনের পর কৌশলে এ সাম্প্রদায়িক পরাজিত শক্তিকেও মদদ দিয়ে চলেছে, সন্ত্রাসী দমনের কর্মসূচি নেয়ার কথা বলেও, তাদের সহযোগিতা বা বিরোধিতা কি আমাদের প্রয়োজন আছে? রাষ্ট্রীয় সম্পর্কোন্নয়নে যদি প্রয়োজন থাকেও তাদের সহযোগিতা এক্ষেত্রে প্রয়োজন যে একেবারেই নেই, তা দেশের জনগণ নির্বাচনে রায়ের মাধ্যমে বলে দিয়েছেন। তেমনি মার্কিনি তৎপরতা এবং যুদ্ধাপরাধী বিচারের বিষয়ে তাদের মন্তব্য পরামর্শ এ দেশের কোনো মানুষের কাছেই গ্রহণযোগ্য নয়। আজতো ওদের ছত্রছায়ায়ই সেই পরাজিত শক্তি ডানা মেলেছে। প্রশ্রয়দাতারা ওদের বাঁচাবার চেষ্টাতো করেই যাবে, এটা তাদের কমিটমেন্ট ওদেরই কাছে। কারণ গণবিরোধী চক্র বা তথাকথিত রাজনৈতিক ধর্মসন্ত্রাসী শক্তি যদি না থাকে, তাহলে মার্কিনি মতলবও যে হাসিল করা সম্ভব নয়।
পৃথিবীর বহুদেশ কিন্তু ওদের খবরদারি অস্বীকার করেও টিকে আছে, শুধু তাই নয়, উন্নতিসাধন করে বিশ্বের কাছে দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লিখিত হচ্ছে। বাস্তবেও দেখছি তাই। ওদেরই নাকের ডগায় খোদ দক্ষিণ আমেরিকাতে মার্কিনি হস্তক্ষেপ, কূটনৈতিক অসদাচরণের পরেও একটি একটি করে কিউবা, ভেনেজুয়েলা, বলিভিয়া, নিকারাগুয়া এমনকি ব্রাজিল-আর্জেন্টিনাও জনগণের শাসনে সমৃদ্ধশালী ও সুরক্ষিত সার্বভৌমত্বের দেশ হিসেবে জগতে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে, প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে। এ উদাহরণ আমাদেরই সামনে। মার্কিনিরা নিজ দেশে বেকারিত্বের অভিশাপ মোচন করতে ব্যর্থ হচ্ছে, যুদ্ধে অকারণে নিহত ও পঙ্গুত্ব বরণকারী পরিবারের বিপুল আন্দোলনকে সামাল দিতে নাজেহাল হচ্ছে, অথচ ওরাই স্বস্তির নীড় ছোট ছোট গরিব রাষ্ট্রগুলোকে গিলে খেতে চাইছে, নিজেদের দাপট অক্ষুণœ রাখার উদ্দেশ্যে। কিন্তু দুনিয়া জুড়ে এই যুদ্ধোন্মাদ শক্তিকে রুখে দিতে মুক্তি সংগ্রামী মানুষ একাট্টা হয়েছেন। আমরা কি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও শাস্তিবিধান করে প্রমাণ করতে পারি না যে, আমরা স্বাধীন, মুক্ত দেশের নাগরিক?
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতেই হবে। জনগণ কিন্তু পাহারায় কারণ রাষ্ট্র পরিচালনায় দায়িত্বপ্রাপ্ত মহাজোটের ওপর যে সাধারণ মানুষ ভরসা রেখেছে।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: