জীবনে এমন কত বিচ্ছেদ, কত মৃত্যু আছে, ফিরিয়া লাভ কি? পৃথিবীতে কে কাহার…

রুহিনা তাসকিন
ধানমন্ডি ৩২ নম্বর সড়কের শেষ মাথায় চলে যেতে হবে আপনাকে। একটি ছোট দোকানের পাশেই বাড়িটি। এমনভাবেই বলা হয়েছিল ঠিকানা। গিয়ে কোনো দোকান পাইনি। কিন্তু সব বাড়ির মধ্যে কেন যেন মনে হচ্ছিল, একমাত্র এটাই হতে পারে কবির বাড়ি। এমনকি বাইরের নামফলকটিও দেখিনি। তার আগেই একজন বললেন, ‘কেঁচিগেট দিয়ে ঢুকে দোতলায় চলে যান।’ একবারও জিজ্ঞেস করলেন না নাম-পরিচয়, কেন এসেছি। কবি সুফিয়া কামালের ‘সাঁঝের মায়া’র দরজা সবার জন্যই এখনো এমন অবারিত।
২০ জুন ছিল কবি সুফিয়া কামালের ৯৮তম জন্নবার্ষিকী। এ উপলক্ষে ২৭ জুন সাঁঝের মায়া ট্রাস্টের পক্ষ থেকে আয়োজন করা হয় এক ঘরোয়া অনুষ্ঠানের। কবির বাড়ি ‘সাঁঝের মায়া’য় (১৯৩৭ সালে প্রকাশিত কবির প্রথম কাব্যগ্রন্েথর নামে বাড়িটির নাম) সেদিন একত্র হয়েছিলেন তাঁর পরিবারের সদস্যরা, পরিবারের বন্ধুরা। কবির প্রিয় মানুষেরা স্নৃতিচারণা করলেন, গাইলেন কবির প্রিয় গান। কাছের মানুষদের মনে এখনো কত প্রবলভাবে বেঁচে আছেন কবি সুফিয়া কামাল, সেদিন উপস্িথত থাকতে না পারলে বোঝা যেত না।
২.
ইটের রাস্তা ধরে এগিয়ে যাওয়া। পাশে কচি ঘাসের সবুজ লন। গাছ ভর্তি কামরাঙা, নিচেও পড়ে আছে অনেক। নাম না-জানা আরও গাছ তো আছেই। সাঁঝের মায়ায় ঢুকেই তাজা বাতাস আর সবুজ গাছপালার এমন অভ্যর্থনা পাওয়া যায়। আর ভেতরে আছেন সেই মানুষটি। সবার ‘আম্মা’, ‘খালাম্মা’। সবাই আসতে পারে তাঁর কাছে। কাজের কথা বলতে অথবা স্রেফ মন খুলে দুটো কথা বলতে। ব্যস্ততার কমতি ছিল না তাঁর, তবু সবার জন্য তাঁর সময় ছিল। এ জন্যই বোধ হয় সেদিনের অনুষ্ঠানে সুলতানা সারওয়াত জামান বললেন, ‘সবাই ভাবত, তিনি বুঝি আমাকেই সবচাইতে বেশি ভালোবাসেন, আমিই তাঁর সবচাইতে বেশি প্রিয়।’ কতখানি বড় মন হলে সবাইকে এভাবে এতখানি জায়গা দিয়ে দেওয়া যায়!
৩.
অনুষ্ঠানের শুরুতে কবির ছেলে সাজেদ কামাল মায়ের লেখা একটি কবিতা থেকে আবৃত্তি করে শোনালেন। যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণের পর কবির মনের অবস্থা বোঝা যায় এ কবিতা থেকে। সেই সময়ই তিনি আঁচ করতে পেরেছিলেন আজকের যুক্তরাষ্ট্রের মানবধ্বংসী রূপ।
কবির পারিবারিক বন্ধু ও চিকিৎসক আখতার আহমেদ শোনালেন কবির সুগন্ধিপ্রীতির কথা। আখতার আহমেদ মাঝে মাঝে আসতেন নিনা রিচি ব্র্যান্ডের একটি সুগন্ধি মেখে। কাছে এলেই কবি বলতেন, ‘কী আতর মেখেছিস, দারুণ তো!’ কবির মৃত্যুর পর তাই তাঁর মরদেহের পায়ে আখতার আহমেদ মাখিয়ে দেন সেই সুগন্ধি।
অ্যারোমা দত্তের কথায় জানা যায়, কী দারুণ রসিক ছিলেন কবি। অ্যারোমা দত্তের একবার যাওয়ার কথা ব্রিটেনে। সেখানে প্রিন্স চার্লসের সঙ্গে এক সম্মেলনে যোগ দেবেন। কবি বললেন, ‘না না, যাবার দরকার নেই। ছেলের স্বভাব-চরিত্র মোটেও ভালো না।’ বাড়ির সবার সেদিন হাসি থামতে লেগেছিল অনেকক্ষণ। আরেকবার অ্যারোমার যাওয়ার কথা জার্মানি। সুফিয়া কামাল বললেন, ‘আমার জন্য একটা সেভেন সেভেন সেভেন কোলন এনে দিস তো।’ চোখ কপালে তুলে অ্যারোমা জিজ্ঞেস করলেন, ‘সেটা দিয়ে তুমি কী করবে!’ ‘মাথায় দেব, আগে তো এটা মেখেই বড় করে খোঁপা বাঁধতাম চুলে। সুগন্ধ থাকত সারা দিন।’ গম্ভীর মুখে জানালেন কবি। এবারও সবার হাসি থামানো মুশকিল।
এমনই ছোট ছোট ঘটনায়, স্নৃতিকথায় বেরিয়ে আসে মানুষটির অন্য রূপ। সেদিন আরও স্নৃতিচারণা করেন সৈয়দ আবুল মকসুদ, শামসুন নাহার রহমান, নার্গিস জাফর প্রমুখ।
অনুষ্ঠানে আবৃত্তি করেন ঝর্ণা সরকার ও আহকামউল্লাহ।
সবশেষে গানের পালা। প্রথমেই গাইতে আসেন বাঁশরী ভদ্র। নিয়মিত গানের চর্চা ছেড়ে দিয়েছেন। তবু কবির স্নৃতির উদ্দেশে সেদিন গাইলেন। মইনউদ্দীন নাজির থাকতেন একই পাড়ায়। একটি গান গেয়ে জানালেন, “আমি কোনো নিয়মিত গানের শিল্পী নই। আমি হলাম পাড়ার গায়ক। খালাম্মা আমাকে বলতেন ‘মনু চাচা’। আর সবার মতো আমিও ভাবতাম, আমার গানই বোধ হয় খালাম্মার সবচেয়ে বেশি পছন্দ।” অন্যরা যখন গাইছিলেন, তখন একদম পেছনের সারিতে বসে ছিলেন রুপু খান। কবির স্েমহধন্য আরেকজন পারিবারিক বন্ধু। গাইবার খুব ইচ্ছা, কিন্তু ঠান্ডা লেগেছে বলে ইতস্তত করছিলেন। সবার অনুরোধে গাইতে এলেন। অদ্ভুত সুন্দর গলায় গাইলেন, ‘তোমায় নতুন করে পাব বলে হারাই ক্ষণে ক্ষণে’। শেষে বললেন, ‘এ অনুষ্ঠানে গান গাইব না, ভাবতেই পারছিলাম না। খালাম্মার খুব প্রিয় গান। খালাম্মার কথা ভেবেই গাওয়া।’
বুলবুল ইসলাম গাইতে এসে বললেন, “আজ দুজনার দুটি পথ’ আর ‘তোমায় নতুন করে পাব বলে’ এই গান দুটোই গাইব বলে ভাবছিলাম। কিন্তু আগেই অন্যরা গেয়ে ফেললেন।” পেছন থেকে একজন বললেন, ‘কোনো সমস্যা নেই। যেকোনো রবীন্দ্রসংগীতই গাইতে পারেন। সবই খালাম্মার প্রিয়।’ শেষে গাইতে এলেন ইফফাত আরা দেওয়ান। গাইলেন সুফিয়া কামালের পছন্দের কয়েকটি গান।
অনুষ্ঠানে সুলতানা সারওয়াত জামান দাবি জানান সুফিয়া কামালের নামে একটি ফাউন্ডেশন করার। সুফিয়া কামাল স্নারকগ্রন্থ বের করার ঘোষণাও দেওয়া হয়। অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের নেতৃত্বে এরই মধ্যে এর কাজও শুরু করে দেওয়া হয়েছে। আত্মীয়-বন্ধু ও কাছের মানুষদের এতে লেখা দেওয়ার জন্য আহ্বান জানানো হয়। প্রয়োজনে শ্রুতলিখনও করা হবে।
৪.
হাসি-আনন্দ-গানে এভাবেই সেদিন সাঁঝের মায়ায় কবিকে মনে করলেন তাঁর আপনজনেরা। হারানোর বিষাদের সুর ছিল না সেখানে; বরং কাছের সব মানুষের মিলনমেলায় কবির স্নৃতি আরও উজ্জ্বলভাবে ধরা পড়ল।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: