জীবনে এমন কত বিচ্ছেদ, কত মৃত্যু আছে, ফিরিয়া লাভ কি? পৃথিবীতে কে কাহার…

পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়
এই লেখা প্রকাশের সময় মধ্য আষাঢ় পেরিয়ে যাবে। ততদিনেও বৃষ্টি হয় কিনা ঈশ্বর জানেন। ছোটবেলা থেকে শুনেছি আষাঢ়ের প্রথম দিনেই বৃষ্টি হয়। সত্যি আগে বৃষ্টি হয়েছে। ঝমঝমিয়ে ঝরেছে আষাঢ়ের ঢল। এবারে আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে ঝমঝম করে কেন, ঝিরঝির করেও বৃষ্টি ঝরেনি। সনাতন ধর্মাবলম্বীরা বলেন, রথযাত্রার দিন বৃষ্টি হবেই হবে। এবারে তাও হয়নি। আকাশ গুমরে থাকছে ঠিকই, ভ্যাপসা গরমে জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠছে, কিন্তু বৃষ্টি হচ্ছে না। প্রায় মধ্য আষাঢ় এখন, অথচ প্রকৃতির কী অদ্ভুত আচরণ। রীতিমতো খরায় পুড়ছে দেশ। তপ্ত রোদে ফেটে চৌচির হচ্ছে মাটি। গাছের পাতা পর্যন্ত নড়ে না। পিচের রাস্তায় পা ফেলার জো নেই। নদী-পুকুর-খাল শুকিয়ে খটখটা। দু’এক জায়গায় সামান্য জল যেখানে আছে সেখানে দুপুরে তা টগবগ করে ফুটছে চায়ের কেটলির মতো। শস্যক্ষেত, মাঠ-ঘাট যেন শক্ত লোহা। তাপমাত্রা বাড়ছে পাগলের মতো। সেই সঙ্গে অসহ্য লোডশেডিংয়ে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে। তীব্র গরমে হাঁসফাঁস করছে মানুষ এবং প্রাণীকুল। চিড়িয়াখানার পশুরা গরম সহ্য করতে না পেরে চৌবাচ্চার স্বল্প জলে শরীর ডুবিয়ে বসে থাকছে। এরকম ছবি পত্রিকার পাতায় দেখেছি। হিটস্ট্রোকে মারা গেছে মানুষ। বেড়েছে অসুখ-বিসুখ। বিশুদ্ধ পানীয় জলের অভাবে দেশের কোন কোন অঞ্চল কারবালা হয়ে গেছে। রাজধানীর বনেদি এলাকাতেও দিনের পর দিন জল সরবরাহ বন্ধ থাকার খবর পাই। আবহাওয়া অফিস বলছে, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে এ বছর কাক্সিক্ষত বৃষ্টির সম্ভাবনা কম। সময়মতো বৃষ্টি না হওয়ার ফলে আউশ-আমনের চাষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং হচ্ছে। ‘আল্লাহ মেঘ দে পানি দে’ কৃষকের করুণ প্রার্থনায় কোন কাজ হচ্ছে না। চাতকপাখির মতো আমরা সবাই আকাশপানে চেয়ে থাকছি। জলবতী মেঘের দেখা নেই, বৃষ্টি নেই, জল নেই।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অপ্রতুল জল সরবরাহের খবর প্রায়ই পত্রপত্রিকায় পড়ি, টেলিভিশনে সচিত্র প্রতিবেদন দেখি। কী দুঃসহ জীবনযাপন সেসব দুর্গত এলাকার জনসাধারণের। এরকম দুরবস্থা কবে যে রাজধানীজুড়ে দেখা দেবে কে জানে! বেশ ক’বছর আগে লেখালেখির প্রয়োজনে জল, জলবায়ু, পরিবেশ নিয়ে কিছু বিদেশী বইপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করেছিলাম। জেনেছিলাম, একজন শহরবাসীর জন্য রোজ দেড়শ’ লিটার জলের প্রয়োজন। কাপড়-চোপড় এবং খাওয়ার বাসনকোসন ধোয়া এবং øানের জন্য মাথাপিছু জলের প্রয়োজন পঁচাশি লিটার। রান্নাবান্না ও পানের জন্য চাই পনের লিটার। মলমূত্র পরিষ্কার এবং এ জাতীয় কাজে চাই পঞ্চাশ লিটার। এত গেল প্রত্যক্ষভাবে প্রয়োজনের হিসাব। পরোক্ষভাবে মাথাপিছু জলের প্রয়োজন আরও বেশি। শস্য উৎপাদন, পশুপালন এবং অন্যান্য প্রয়োজনে জল অপরিহার্য। একটা ছোট মুরগিকে বড় করে লাঞ্চ বা ডিনারের টেবিলে খাদ্য হিসেবে আনার পেছনে দরকার হয় ষোল হাজার লিটার জল। একটা হাঁস কিংবা মুরগিকে একটি মাত্র ডিম প্রসব করানোর জন্য দরকার ছয়শ’ লিটার জল। একজন মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীর সারা বছর যে বইখাতা লাগে তা তৈরি করতে খরচ হয় প্রায় সাত হাজার লিটার জল। একটি সাত কিংবা আটশ’ সিসির গাড়ি নির্মাণে যে পরিমাণ ইস্পাত লাগে তা তৈরি করার জন্য প্রয়োজন তিন লাখ লিটার জল। যাক, জল বৃত্তান্ত আর বলতে চাই না।
নদীমাতৃক এই দেশে আগে নিত্যদিনের জলের প্রয়োজন অনেকাংশেই মিটত নদীনালা, খাল-বিল থেকে। রাজধানীর আশপাশেই তো বেশ ক’টি ভরাট নদী ছিল। রাজধানী শহরের ভেতর দিয়ে কুলকুল বয়ে যেত বেশ ক’টি প্রশস্ত খাল। আজ তার চিহ্ন শুধু পড়ে আছে। অনেকখানে চিহ্নও নেই। মনুষ্যসৃষ্ট তথাকথিত নগরায়ন, শিল্পায়নের ফলে নদী-খাল নিশ্চিহ্ন হয়েছে, ধ্বংসপ্রায় হয়েছে। বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, তুরাগ, বংশী ইত্যাদি নদীর দিকে তাকানো যায় না, কাছে যাওয়া যায় না। নদী চুরি আর আশপাশের শিল্প-কারখানার বর্জ্য, রাসায়নিক পদার্থ জমে জমে এসব নদীর জলের রঙই পাল্টে গেছে। নদীতীরবর্তী জনপদে ছড়িয়ে পড়ছে নানারকম অসুখ-বিসুখ। এ প্রসঙ্গে অল্প কথায় একটা সত্য ঘটনা বলি। এটা চল্লিশ দশকের ঘটনা। প্রশান্ত মহাসাগরের কূলে মিনামাটা নামের এক খাঁড়িতে দিনের পর দিন পার্শ্ববর্তী কারখানাগুলো থেকে বেরিয়ে আসত বিষাক্ত পারদ এবং তা খাঁড়ির মাছের দেহে ঢুকত। খুব অল্প সময়ের ভেতর এই বিষাক্ত পারদ গিয়ে ঢুকলো উপকূলের বাসিন্দাদের দেহে। প্রথম প্রথম বোঝা না গেলেও মাত্র দশ-কুড়ি বছরের মাথায় বিষাক্ত পারদের প্রভাবে মানবদেহে অত্যন্ত জটিল এবং জীবনঘাতী রোগের প্রকাশ ঘটল। মিনামাটা খাঁড়ির নামানুসারে জীবনঘাতী রোগটির নাম দেয়া হল ‘মিনামাটা’। এই প্রথম উন্নত বিশ্বের টনক নড়ল। তারা বুঝল যে পরিবেশ নষ্ট হলে জনপদ বিপন্ন হয়, মানুষ অসহায় হয়ে পড়ে। আর পরিবেশ, পরিপার্শ্ব সুরক্ষা করার দায়িত্ব মানুষকেই নিতে হয়। কানাডার মরিস স্ট্রঙের নেতৃত্বে বিশ্বের রাজনৈতিক প্রধানদের নিয়ে মানব পরিবেশ শীর্ষক আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হল সুইডেনের স্টকহোমে। বলতে গেলে সেই থেকে পরিবেশ সম্পর্কে গণসচেতনতার কাজ শুরু হল বিশ্বজুড়ে। উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে যুক্ত হল অনুন্নত দেশগুলোও। কিন্তু সুফল এলো কই! মানুষ নির্বিচারে গাছ কাটল, বন উজাড় হল, পাহাড় ধ্বংস করল, ভূবৈচিত্র্য নষ্ট হল। নদী দখল করে সম্পত্তি বাড়াল। খাল দখল করে গড়ে তুলল অবৈধ বসতি, মিল কারখানা। বিষাক্ত রাসায়নিক দ্রব্য আর ব্যবহƒত নোংরা বর্জ্যে দূষিত হল নদীর জল। নিশ্চিহ্ন হল নানারকম মাছ এবং জলজ প্রাণী। যত্রতত্র গড়ে উঠল ভূমিদস্যুদের অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং ইটের ভাটা। কালো, বিষাক্ত ধোঁয়ায় ছেয়ে গেল জনপদের আকাশ। সবকিছু মিলিয়ে ঘটল অস্বাভাবিক পরিবেশ বিপর্যয়।
প্রধানমন্ত্রী পরিবেশ বিপর্যয় রোধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন। প্রতিটি নাগরিককে এ ব্যাপারে উদ্যোগ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। আশা করি এর সুফল পাওয়া যাবে।
যখন লেখাটি শেষ করছি অবশেষে তখন বৃষ্টি এলো।
পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায় : অভিনেতা ও লেখক

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: