জীবনে এমন কত বিচ্ছেদ, কত মৃত্যু আছে, ফিরিয়া লাভ কি? পৃথিবীতে কে কাহার…

সৈয়দ বোরহান কবীর:
জেনারেল মইন উ আহমেদ গত ১৫ জুন অবসর গ্রহণ করেছেন। সেনাপ্রধান হিসেবে তার অবসর গ্রহণের পরপরই দেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি জেনারেল মইনের বিচার দাবি করেছেন। বিএনপির সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতাও মইনের বিচার চাইছেন। আওয়ামী লীগের যারা বিচার চাইছেন তারা তাদের ব্যক্তিগত ক্ষোভ থেকে এ বিচার চাইছেন, এটা স্পষ্ট। ওয়ান ইলেভেনের পর নির্যাতিত হয়েছেন, নিগৃহীত হয়েছেনÑ এজন্যই ক্ষোভ থেকে ড. মহিউদ্দিন খান আলমগীর জেনারেল মইনের বিচারের দাবিতে সোচ্চার। কিন্তু বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে ড. আলমগীরকে পাশবিক কায়দায় নির্যাতন করা হয়েছিল, তা কি তিনি ভুলে গেলেন? বিচার চাইলে তো তার বিএনপি-জামায়াতেরও বিচার চাওয়া উচিত। ড. আলমগীরের ক্ষোভের আয়ু এত ছোট্ট কেন?

আমি আব্দুল জলিলের বক্তব্য আমলে নিতে চাই না, কারণ ৩০ এপ্রিলের ট্রাম্পকার্ড থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত তিনি কখন কী বলেছেন, তা নিজেও হয়তো বলতে পারবেন না। তিনি বলেন, অন্যের নির্দেশে তোতা পাখির মতো। আব্দুল জলিল গত কয়েক বছর বাংলাদেশের রাজনীতিতে একমাত্র বিনোদন। তার কথা শুনে আমরা সবাই আমোদিত হই। তিনিও উপেক্ষিত হওয়ার বদলে এরকম বাণী দিয়ে প্রমাণ করেন তিনি আছেন। তাই তাদের বিচারের দাবি এবং বিএনপির বিচারের দাবি এক উদ্দেশ্যে নয়।

বিএনপি বিচার দাবি করছে দলগতভাবে, ঐকমত্যের ভিত্তিতে। বিএনপির সংসদীয় দলের সভায় চাকরি বিধি এবং সংবিধান লংঘনের অভিযোগে জেনারেল মইনকে বিচারের মুখোমুখি করার দাবি করা হয়েছে। বিচারের দাবিতে বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম জিয়াসহ শীর্ষস্থানীয় একাধিক নেতা বিভিন্ন বক্তব্য রেখেছেন, তারা জেনারেল মইনসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা করারও ঘোষণা দিয়েছেন। সাবেক এ সেনাপ্রধানের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো হলো এরকমÑ জেনারেল মইন সংবিধান লঙ্ঘন করেছেন, তিনি তার চাকরির মেয়াদ একবছর বাড়িয়েছেন, দু’বছর জরুরি আইন জারি করে নাগরিক অধিকার হরণ করেছেন ইত্যাদি।

সংবিধান একটি রাষ্ট্রের পবিত্র দলিল। সংবিধানকে সমুন্নত রাখা প্রতিটি রাজনৈতিক দলের পবিত্র দায়িত্ব। বিএনপি এ দাবি করে সঠিক কাজ করেছে। বিএনপিকে এজন্য অভিনন্দন। বাংলাদেশের প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দল যদি সংবিধান সমুন্নত রেখে কাজ করে তাহলেই দেশের গণতান্ত্রিক ধারা বিকশিত হয়। তাই, বিএনপি যখন জেনারেল মইনকে সংবিধান লঙ্ঘনকারী হিসেবে চিহ্নিত করে তার বিচারের দাবি করে তখন আমরা বিশ্বাস করতে চাই, বিএনপি আদর্শিকভাবে সকল অসাংবিধানিক তৎপরতার বিরুদ্ধে। কিন্তু আমাকে গভীর দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, এ অবস্থান বিএনপির নীতিগত অবস্থান নয়। ব্যক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান।

একমাস আগে বিএনপি ৫ম সংশোধনী মামলায় আপিল বিভাগে পক্ষভুক্ত হয়েছে। মহামান্য হাইকোর্ট সম্প্রতি এক রায়ে সংবিধানের ৫ম সংশোধনীকে সংবিধানের মূল চেতনার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ এবং অসাংবিধানিক বলে অভিহিত করে ঐ সংশোধনীকে ‘অবৈধ’ ঘোষণা করেছে। ১৯৭৯ সালে সংবিধানের ৫ম সংশোধনী পাস করা হয়। ৫ম সংশোধনী বর্তমান সংবিধানের ৪র্থ তফশিলে, ১৫০ অনুচ্ছেদ অন্তর্ভুক্ত। এর ৩ (ক) উপ-অনুচ্ছেদ এবং ১৮ উপ-অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট থেকে ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল তারিখের মধ্যে সকল ফরমান, ফরমান আদেশ, সামরিক আইন প্রবিধান, সামরিক আইন আদেশসহ সবকিছুকে বৈধতা দেয়া হয়।

সংবিধানকে লঙ্ঘন করে বুলেটের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল, ক্ষমতা দখল করে প্রতিপক্ষকে হত্যা, সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক দল গঠন এবং ক্ষমতায় থেকে নির্বাচন করে রাবার স্ট্যাম্পের পার্লামেন্টের মাধ্যমে সব অবৈধ তৎপরতাকে বৈধতা দেয়ার সূত্রপাত হয়েছিল সংবিধানের ৫ম সংশোধনীর মাধ্যমে। ’৭৯-র এপ্রিলে জাতীয় সংসদে ঐ ৫ম সংশোধনী বিল পাস হয়। মাত্র ৩৯ জন সদস্য নিয়ে সেদিন আওয়ামী লীগ ঐ কালো সংশোধনীর বিরোধিতা করেছিল। মজার ব্যাপার হলো, এই সংবিধান সংশোধন বিল ১৯৭৯-এর ৪ এপ্রিল উত্থাপিত হয়, ৫ এপ্রিল এটি পাস হয়, ৬ এপ্রিল রাষ্ট্রপতি এতে স্বাক্ষর করেন। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বিরোধী দলের নেতা আসাদুজ্জামান খান, বিলটির তীব্র বিরোধিতা করে বলেন, ‘এর মাধ্যমে গণতন্ত্রের কবর রচনা করা হবে। এর ফলে যে কেউ বন্দুকের জোরে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করবে, সংবিধান লঙ্ঘন করে অবৈধ কাজ করবে। পর তা বৈধতা দিয়ে দেয়া হবে। এই বিল গণতন্ত্রকে বিপন্ন করবে।’

সংখ্যার জোরে সেদিন বিএনপি আওয়ামী লীগের ওয়াক আউটকে পাত্তা না দিয়ে ঐ বিলটি পাস করে। এর ফলে খন্দকার মুশতাক এবং জিয়াউর রহমানের অবৈধ সামরিক শাসনকে বৈধতা দেয়া হয়। জিয়াউর রহমান সেনাপ্রধান থেকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক এবং রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন। বিএনপির পণ্ডিত ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ যদি অনুগ্রহ করে বলতেন, তিনি ঐ অসাংবিধানিক শাসনেরও পাপমোচন চান কিনা, তাহলে খুশি হতাম।

মরহুম আসাদুজ্জামান খান ’৭৯-র এপ্রিলে যে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, এর সত্যতা পেতে জাতিকে বেশি দিন দেরি করতে হয়নি। ’৮২-র ২৪ মার্চ তৎকালীন সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ একই পথে সামরিক আইন জারি করেন। দীর্ঘ ৪ বছর অবৈধভাবে দেশ পরিচালনা করে ’৮৬ তে সপ্তম সংশোধনীর মাধ্যমে এরশাদ তার সকল অপকর্মকে বৈধতা দেন।

৫ম সংশোধনী মামলার বীজ রোপিত হয়েছিল অবশ্য ১৯৮৯-৯০ সালে। এ সময় এরশাদ সংবিধানের ১০০ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে ঢাকার বাইরে হাইকোর্ট স্থাপন করেন। সংবিধানের এ অষ্টম সংশোধনীকে চ্যালেঞ্জ করা হয়। মহামান্য আপিল বিভাগ এক ঐতিহাসিক রায়ে এরশাদের হাইকোর্ট বিভাজনকে অসাংবিধানিক বলে অভিহিত করেন। আপিল বিভাগে এ ঐতিহাসিক রায় যারা দিয়েছিলেন, তাদের অন্যতম একজন ছিলেন, বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমেদ। বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমেদ তার রায়ে বলেছিলেন ‘কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সংবিধানের মূল চেতনা (ঋঁহফধসবহঃধষ ঢ়ৎরহপরঢ়ষব) পরিপন্থী কোনো সংশোধনী গ্রহণযোগ্য নয়। বিচারপতি হাবিবুর রহমানও তার দীর্ঘ রায়ে সংবিধানের যথেচ্ছ কাটাছেঁড়াকে অসাংবিধানিক বলেছিলেন। ঐ রায়ে এটাও বলা হয়েছিল, এসব সংবিধান সংশোধনীকে কেউ চ্যালেঞ্জ করেনি বলেই এখনো এগুলো টিকে আছে।’

প্রয়াত আইনজীবী ব্যারিস্টার ইশতিয়াক আহমেদ এই রায়কে ‘সংবিধান রক্ষায় আলোকবর্তিকা’ বলে উল্লেখ করেছিলেন। ঐ পথেই অনেক পরে ৫ম সংশোধনীকে চ্যালেঞ্জ করা হলে হাইকোর্ট, ৫ম সংশোধনীকে অবৈধ ঘোষণা করে। এরপর ড. ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে এই মামলায় হাইকোর্টের রায়কে শিরোধার্য মেনে নেয়। এটর্নি জেনারেল আপিল বিভাগে বলেন, ‘৫ম সংশোধনী একটি অবৈধ আইন। সরকার মনে করে এই সংশোধনী গণতন্ত্র এবং সংবিধান পরিপন্থী তাই তারা এই মামলা না চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’

আপিলকারী মামলা না চালাতে চাইলেও একটি কালো আইনের পক্ষে দাঁড়ায় বিএনপি। বিএনপি মহাসচিব মামলার পক্ষভুক্ত হওয়ার একটি আবেদন করলে আপিল বিভাগ তা গ্রহণ করে। এই পক্ষভুক্তির মাধ্যমে বিএনপি দলগতভাবে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। তা হলো, তারা অবৈধ প্রক্রিয়ায় ক্ষমতা দখলের পক্ষে, তারা সামরিক আইন জারির পক্ষে। তারা সামরিক শাসনের মাধ্যমে নাগরিক অধিকার হরণের পক্ষে। তারা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হত্যার পক্ষে, তারা প্রহসনের বিচারের নামে রাতের আঁধারে কারাগারে গণফাঁসির পক্ষে।

৫ম সংশোধনীর পক্ষে অবস্থান নিয়ে আবার সংবিধান লঙ্ঘনের অভিযোগে তাদের নিযুক্ত সেনাপ্রধান এবং রাষ্ট্রপতির বিচার দাবি কি ব্যাঙের সর্দির মতো ব্যাপার হয়ে গেল না?

গণতন্ত্রে বিশ্বাসী প্রতিটি নাগরিকই চান, গণতন্ত্র নিরবচ্ছিন্ন এবং নিরন্তর ধারায় বহমান থাকুক। আর সেটা করতে গেলে আমাদের উৎসে যেতে হবে। ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট জাতির জনককে সপরিবারে হত্যার মাধ্যমে অবৈধ ক্ষমতা দখলের যে পালাবদল ১৯৯০ পর্যন্ত হয়েছে, সেগুলোকে আইনের চোখে বেআইনি, সংবিধান লঙ্ঘন হিসেবে স্বীকার করে নিতে হবে। তাহলেই গণতন্ত্রের জন্য রক্ষাব্যূহ তৈরি হবে। এই প্রক্রিয়ায় সব অবৈধ শাসনকে চিহ্নিত করার মাধ্যমেই গণতন্ত্রকে রক্ষা করা সম্ভব। তাই, বিএনপিকে একটু পিছিয়ে যেতে হবে।

আমরা বিশ্বাস করতে চাই, জিয়াউর রহমানের বিএনপি এবং বেগম জিয়ার বিএনপি এক নয়। একটির জš§ ক্যান্টনমেন্টে, ‘মানি ইজ নো প্রব্লেম’ তত্ত্বের আলোকে, রাষ্ট্রীয় কোষাগার উজাড় করা টাকায়। অন্যটি এরশাদের অবৈধ শাসনের বিরুদ্ধে গণতন্ত্রের সংগ্রামে বেড়ে ওঠা দল।

তাই মইন উ আহমেদের বিচারের আগে, বিএনপিকে আÍশুদ্ধি করতে হবে, আদর্শের আয়নায় দাঁড়িয়ে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করতে হবে। কারণ শুধু ’৭৫-এ নয় ২০০৬ সালেও ‘অসাংবিধানিক’ প্রক্রিয়ার সূচনা হয়েছিল বিএনপির হাতেই। কোন অভিপ্রায়ে বেগম জিয়া ৬ জন জ্যেষ্ঠ সামরিক অফিসারকে ডিঙিয়ে সেদিন জেনারেল মইনকে সেনাপ্রধান করেছিলেন? কোন অভিপ্রায়ে ‘রাষ্ট্রপতি’ পদকে অসম্মানিত করে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছিল? কেন এক ব্যক্তিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান করার জন্য প্রধান বিচারপতির চাকরির বয়স বাড়ানো হলো? কেন ইয়াজউদ্দিনকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান করতে সেদিন বিএনপি মরিয়া হয়েছিল? কেন নির্বাচন কমিশনে কয়েকজন সার্কাসের ক্লাউনকে বসানো হয়েছিল?

জেনারেল মইনের বিচারের আগে, বিএনপিকে জাতির সামনে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ঝেড়ে-কেশে দিতে হবে। বিএনপিকে বলতে হবে, তারা কি তাদের আদর্শিক অবস্থান থেকে জেনারেল মইনের বিচার চান, নাকি তিনি অনুগত ভৃত্য হতে পারেননি এ জন্য বিএনপির এত রাগ?

লেখক: নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত

ই-মেইল: poriprekkhit@yahoo.com

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: