জীবনে এমন কত বিচ্ছেদ, কত মৃত্যু আছে, ফিরিয়া লাভ কি? পৃথিবীতে কে কাহার…

ড. ইশা মোহাম্মদ
যদি মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল কি না ‘গ-গোল’ হয়েছিল, সেটি মীমাংসার জন্য কেউ হাইকোর্টে যায় তবে অবস্থা কোন শরমে গিয়ে ঠেকবে? জাতি কেন এতো দীনহীন অপদস্থ চরিত্র নিয়ে বাঁচবে? বাঁচলে তাকে মানুষের মর্যাদায় বাঁচতে হবে। আশা করি, রাজনৈতিক ‘ব্যক্তিত্ব’ বিষয়টি সম্যক উপলব্ধি করতে পারবে। কামনা করি, এটিই যেন শরমের শেষ গল্প হয়। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি কিংবা আওয়ামী লীগকে যেন কেউ করুণা না করে। প্রতিপক্ষকেও বলতে চাই, আপনারা যতো গালমন্দই করুন না কেন, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি কিংবা আওয়ামী লীগকে করুণা করবেন না। তার পরিণতি ভয়াবহ হবে।

বিষয়টি মীমাংসিত। দুষ্টজনে মানে না। কিন্তু তাতে কিছুই যায় আসে না। তারপরও মনের ধান্ধা যায় না। বইপুস্তকে নিয়মিত মিথ্যাচার কোমলমতি বালক-বালিকাদের মন বিগড়ে দিতে পারেÑ সন্দেহের বশবর্তী হয়ে কেউ কেউ হয়তো ভেবেছে, আইনগত একটা ভিত্তি তৈরি হলে মিথ্যাচারকে সুন্দরভাবে প্রতিহত করা যাবে। তাদের বুদ্ধির মনে হয় সীমা ছিল না। তারা হাইকোর্টে গিয়েছেন। বিচারকরা বিচার করেছেন। রায় দিয়েছেনÑ স্বাধীনতার ঘোষক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। পত্রপত্রিকাগুলো নানা কিসিমের শব্দাবলী দিয়ে সংবাদটি গণগোচরে এনেছে। অনেকেই আনন্দচিত্তে বলেছেÑ যাক, ঝামেলা মিটে গেল। যারা প্রতিপক্ষ, জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়, তাদের অনেকেরই মন খারাপ হয়েছে। প্রকাশ্যে বক্তব্য দিয়েছে। মিডিয়ার কল্যাণে দেশবাসী জেনেছে এবং সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, প-িতজনেও বিপদের আশঙ্কা অনুভব করে তাদের সম্পৃক্ততাহীনতাকে প্রমাণ করার জন্য যথেষ্ট কসরত করছে। তাদের সমস্যা মুক্তিযুদ্ধের দলিলপত্রের তৃতীয় খ-ের অতিরিক্ত সংযোজন নিয়ে। হতে পারে তারা সংশ্লিষ্ট ছিল না। হতে পারে সম্মতি ছিল। কিন্তু তাতে কিছু যায় আসে না। বাংলাদেশে অসংখ্য বইপুস্তক আছে, যেখানে কেউ বলেছেন বঙ্গবন্ধু, কেউ বলেছেন জিয়াউর রহমান। সরকারি প্রকাশনা মেরামত করা যাবে হয়তো ওই রায়ে। কিন্তু ব্যক্তি দায়িত্বে প্রকাশিত বইপুস্তক থেকে কি মুছে ফেলা যাবে? হাইকোর্টের রায়ে কি সে কথা বলা হয়েছে? বলার সুযোগও সম্ভবত নেই। কেননা, বিদগ্ধজনে ‘প্রতিজনের’ বিরুদ্ধে মামলা করবে না। তাছাড়া মামলার রায়ের ভিত্তিতে বাংলাদেশের জন্মক্ষণ নির্ধারিত হবে, হাইকোর্টের রায়ে দেশ ও জাতির অস্তিত্ব নিরূপিত হবেÑ এ কেমন কথা? বাঙালি জাতি কি এতোই দৈন্যসঙ্কটে ভুগছে?
বিচারকরা রায় দিয়েছেন নথিপত্র, কাগজপত্র এবং অন্যান্য বিভিন্ন অ্যাভিডেন্সের ভিত্তিতে। যেন এটি একটি ‘গরু চুরির’ মামলা। যারা মামলা করেছেন, তাদের বোধ ও প্রজ্ঞাসীমা এবং যারা রায় দিয়েছেন তাদেরও বোধ ও প্রজ্ঞাসীমা সম্ভবত একই সমতলের কিংবা একই উচ্চতার। তা না হলে রাজনৈতিক এবং সামাজিক বিষয় নিয়ে কেনইবা তারা আদালতে গেলেন আর কেনইবা আদালত তাদের বাঞ্ছা ও বেদনার বিষয়টি ‘আইনসম্মত’ ভাবলেন। উচিত ছিল বিতর্কিত বিষয়টির রাজনৈতিক এবং সামাজিক মীমাংসার। যদিও বিষয়টি বিতর্কিত হওয়ার কোনো সুযোগই নেই। যারা ক্ষুব্ধ ছিলেন তারা বিষয়টির রাজনৈতিক মীমাংসার জন্য জনমত তৈরির চেষ্টা-চরিত্র করতে পারতেন। অনেক কষ্ট হতো, অনেক সময় লাগতো। কিন্তু তারপরও সর্বজন গ্রহণযোগ্য পরিণতি ‘প্রাপ্তি’ হতে পারতো। আর এ প্রক্রিয়া সারা বাংলার মানুষ মুক্তিযুদ্ধের প্রারম্ভকালের বিষয়ে প্রকৃত ঐতিহাসিক তথ্যসম্যক উপলব্ধি করতে পারবে, সত্যি সত্যিই বাংলার আপামর জনতা মুক্তিযুদ্ধের বিষয়-আশয় সম্পর্কে প্রকৃত ধারণা কখনই পায়নি। খ-চিত্র ছাড়া তাদের মনে করে বলার মতো কোনো গল্প নেই। সমগ্রকে প্রথম থেকেই শ্রেণিপাপীরা সাধারণ মানুষ থেকে আড়াল করে রেখেছে। উচিত ছিল গ্রামের সামান্য শিক্ষিত ও অশিক্ষিত মানুষের বোঝার ও মনে রাখার মতো করে শিশুতোষ মডেলের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস তাদের কাছে পৌঁছে দেয়া। রূপকথার গল্পের মতো করে তাদের কাছে ‘প্রকৃতকে’ তুলে ধরা। বয়স্করা পয়ারছন্দের গল্পকথা মনে রাখে। হাসান-হোসেনের কারবালার গল্পকথা তাদের মুখে মুখে আজো সমানভাবে জীবন্ত। তেমনভাবে কেউ বা কোনো গোষ্ঠী যদি এগুলো মানুষের মধ্যে পৌঁছে দিতে পারতো, তবে জাতির পিতার মুক্তিযুদ্ধের অবদান কেউ খাটো করার সুযোগ পেতো না। কেননা, সে ক্ষেত্রে গণপ্রতিরোধ ও গণঘৃণা তাদের তাড়িয়ে পগার পার করে দিতো।
সাধারণ মানুষকে মুক্তিযুদ্ধের শিখরস্পর্শী সৃষ্টির সঙ্গে একাত্ম করার রাজনৈতিক এবং সামাজিক দায়িত্ব কেউই পালন করেনি। উল্টো প্রতিটি রাজনৈতিক দলই তাদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব ও সুবিধার জন্য মুক্তিযুদ্ধকে ব্যবহার করেছে। ভুলটা এখানেই। যারা মুক্তিযুদ্ধের প্রতিপক্ষ এবং মানুষের শত্রু, তারা মুক্তিযুদ্ধকে ব্যবহারও করতে পারে, বিকৃতও করতে পারে। এ কৌশল তাদের হীনবোধের সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ। কিন্তু যারা মানুষের পক্ষে, তারা ‘ব্যবহার’ করবে কেন? তাদের উচিত ছিল দায়িত্ব পালন করা; কিন্তু তা তারা করেনি। মুক্তিযুদ্ধের দলিলপত্রাদি ১৫ খ- প্রকাশিত হয়েছে। সরকারি প্রকাশনা। কিন্তু যারা মুক্তিযুদ্ধের অংশীদার, তারা তাদের পার্টির নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির ‘ইতিহাস’ কেন রচনা করেনি। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ১৫ নয়, ৩০ খ- হতে পারে। বড় গলায় বলা যায়, ৩০০ খ-েরও হতে পারে। অসংখ্য মানুষের অবদান আছে মুক্তিযুদ্ধে। সবারটা হিসাব করা হলে ৩০০ খ- ইতিহাস ‘মিছে কথা’ হবে না। সত্য কথা হবে। কিন্তু কেউই রাজনৈতিক দায়িত্ববোধ থেকে এ কাজটি করেনি। করেনি বলেই মুক্তিযুদ্ধকে ‘গ-গোল’ বলার ধৃষ্টতা দেখানোর সাহস পায় কেউ কেউ এ বাংলায়। ভাবা যায়!
আদালতে যখন কেউ গিয়েছে তখন তাদের প্রয়োজন ছিল সব ‘ভুল’ ও উদ্দেশ্যমূলক প্রকাশনার বিরুদ্ধে মামলা করা এবং সে মতে রায় গ্রহণ করা। কেবল সরকারি প্রকাশনার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা ব্যক্তি লেখককে আটকাতে পারবে না। ভালো হতো যদি সুশীল সমাজ সমবেতভাবে এ রকম একটা মামলা করতো। যেখানে তারা দাবি করতে পারতো হাইকোর্ট যেন এই মর্মে রায় দেয়, জাতীয় স্পর্শকাতর বিষয়ে কোনো মিথ্যাচার চলবে না। যদি কেউ তেমন মিথ্যাচার করে, যাতে মানুষের মনে আঘাত লাগে, জাতীয় ও সামাজিক মূল্যবোধ ক্ষতিগ্রস্ত হয় কিংবা মিথ্যাচার করে রাজনৈতিক ফায়দা লুটের চেষ্টা করে, তারা যেন সবাই প্রতিহত হয়। যদি জাতির শিখরস্পর্শী ঐতিহ্যে কালিমা লিপ্ত হয়, তবে তা যেন শাস্তিযোগ্য অপরাধ বিবেচিত হয়। কিন্তু তেমনটি না হয়ে রায়টি খ-িত হওয়ার কারণে নানা কথার জন্ম দেয়ার সুযোগ সৃষ্টি করেছে। যেহেতু স্বাধীনতার ঘোষণার বিষয়টি সংবিধানসম্মত, তাই আদালত যথাযথ নিয়মে সাধারণ বিচারিক বিষয় হিসেবে এটাকে না নিয়ে সাংবিধানিক কিংবা বিশেষ বিচার্য বিষয় হিসেবে আমলে নিতে পারতো। সে ক্ষেত্রে আদালত জনমত জরিপেরও সুযোগ নিতে পারতেন। সে সময়কার জীবিত বাঙালিরা এখনো বেঁচে আছেন। তাদের একাংশের সাক্ষ্য নিতে পারতেন। কমপক্ষে এক কোটি সংখ্যক। তাতে অবশ্য খরচ হতো অনেক। তবুও সেটি জনগণের মনস্তাত্ত্বিক অস্তিত্বের সন্ধান হতে পারতো। তাছাড়া মুক্তিযুদ্ধ এতো বড় জাতীয় অর্জন যে, তার ‘প্রণিধানে’ ‘সমুদয়’ সম্পদ ও ‘অনন্ত’ সময় ব্যয় বৈধ। ব্যয় সাশ্রয়ী ফর্মুলাও আছে। সাংবিধানিক বিষয় যেহেতু, সেহেতু সংসদেও সাক্ষ্য দেয়ার সুযোগ তৈরি করা যায়। সে ক্ষেত্রে আদালত থেকে বিষয়টির মর্মসুর সংসদের স্পিকারের কাছে পাঠাতে হবে। স্পিকার সংসদে প্রত্যেক সাংসদকে ভোটদানে উদ্বুদ্ধ করে গোপন ভোটের মাধ্যমে গণরায় নিতে পারেন।
তবে বর্তমান সংসদ সরকারদলীয় সাংসদ দিয়ে ঠাসা। এখন ব্যক্তি সাংসদের ভোট তার প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যায় হিসেবে নিলে মোট সংখ্যা অন্যদের তুলনায় এতো বিশাল হবে যে, তাতে আওয়ামী লীগের বদনাম হয়ে যেতে পারে এই কারণে ‘সংসদে তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ’ বিধায় ভোটের ব্যবস্থা করেছে। এ থেকে উত্তরণের জন্য সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি হলো গণরায়কে মর্যাদাম-িত ও সর্বজনগ্রাহ্য করার জন্য স্বাধীনতার পরবর্তী প্রতিটি সংসদের সব জীবিত সাংসদের ভোট দেয়ার সুযোগ করে দেয়া। সে ক্ষেত্রে এক ব্যক্তির এক ভোটের হিসেবে প্রদত্ত ভোটের সংখ্যা নির্ণিত হলে সংখ্যাগরিষ্ঠের মতোই জনগণের মত হিসেবে নেয়া যাবে। এভাবেও বর্তমান সংসদের স্পিকার একটি কালজয়ী সুকর্ম করে মরতে পারেন। শুধু জাতির ঐতিহ্যে নয়, বিশ্ব গণতন্ত্রের ইতিহাসে এটি কালজয়ী হয়ে থাকবে। (কল্পনা করে লাভ নেই, সব জীবিত সাংসদের গেট টুগেদার কখনই হবে না।) রেফারেন্স দিয়েও গণরায় নেয়া যায়, তবে ওপথে যেতে না হলেই ভালো। গণরায়ই শ্রেষ্ঠ রায়। ‘জাতির জনক’ কিংবা ‘স্বাধীনতার ঘোষণার’ বিষয়গুলো ঐতিহাসিক ও ‘ক্ষণজন্মা’ ঘটনা হলেও গণরায়ের প্রয়োজন হয়েছে জোকের মুখে নুন দেয়া। গণরায় ব্যতিরেকে যে কোনো উদ্যোগই প্রতিপক্ষরা দমন-পীড়ন হিসেবে বর্ণনা করে সাধারণ মানুষের কানভারি করতে পারে। আওয়ামী লীগ তো যথেষ্ট সাহসী। তারা সাহস করে গণরায় ‘সন্ধান’ করুক না, কিন্তু তারপরও কথা আছে।
গণরায়ে কিংবা হাইকোর্টের রায়ে কে ঘোষক, তার মীমাংসা পর্যন্ত আমরা গিয়েছি। কেন? বাঙালি জাতির দৈন্য কোন স্তরে নেমেছে? বিষয়টির অন্তর্নিহিত মর্মবাণী কি শোনা যায়, ভাবুন তো একবারÑ যদি মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল কি না ‘গ-গোল’ হয়েছিল, সেটি মীমাংসার জন্য কেউ হাইকোর্টে যায় তবে অবস্থা কোন শরমে গিয়ে ঠেকবে? জাতি কেন এতো দীনহীন অপদস্থ চরিত্র নিয়ে বাঁচবে? বাঁচলে তাকে মানুষের মর্যাদায় বাঁচতে হবে। আশা করি, রাজনৈতিক ‘ব্যক্তিত্ব’ বিষয়টি সম্যক উপলব্ধি করতে পারবে। কামনা করি, এটিই যেন শরমের শেষ গল্প হয়। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি কিংবা আওয়ামী লীগকে যেন কেউ করুণা না করে। প্রতিপক্ষকেও বলতে চাই, আপনারা যতো গালমন্দই করুন না কেন, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি কিংবা আওয়ামী লীগকে করুণা করবেন না। তার পরিণতি ভয়াবহ হবে।

ড. ইশা মোহাম্মদ: শিক্ষক এবং কলামিস্ট।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: