জীবনে এমন কত বিচ্ছেদ, কত মৃত্যু আছে, ফিরিয়া লাভ কি? পৃথিবীতে কে কাহার…

অধ্যাপক ডা. এ কে এম ফজলুল হক
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। আধুনিক ও বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ। তার পরও তার যত আক্ষেপ ও অনুশোচনা। মনে হয় কোনো পাপ করেছি। নইলে আজ এভাবে একটা বিব্রতকর অবস্খায় পড়লাম কেন? কী সেই অনুশোচনা? কী সেই পাপ? আমাদের দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ এখনো পাইলস হওয়াকে একটি গোপন রোগ হিসেবে মনে করেন। কেউ কেউ বলেন, এটি কি কাউকে বলা যায়? আমার স্ত্রীও জানে না যে, আমার পাইলস হয়েছে। মূল সমস্যা হলো চিকিৎসকের কাছে এসে পাইলসের গোপন স্খানটি দেখাতে হবে এখানেই যত সমস্যা। অনেকেই এটিকে অশ্লীলতা হিসেবে ভাবেন। কারো হার্টে কোনো অসুবিধা হলে বা টনসিলে ব্যথা হলে যে কারো সাথে খোলামেলা আলাপ করেন অথচ পাইলসের ব্যাপারে সম্পূর্ণ উল্টো। আধুনিক এক যুবকের কথা বলছি। চেম্বারে ঢুকে প্রথমে তার সঙ্গী সবাইকে বাইরে যেতে বললেন তারপর স্ত্রীকেও। এরপর রুমে আমি এবং সেই যুবক রোগী। আমাকে অনুরোধ করলেন চেম্বারের পর্দাঘেরা অংশে যেতে। আমি কিছু বারণ করছি না। ভাবছি হয়তো তার গোপন কোনো রোগ বা যৌনরোগ আছে। আশ্চর্য হলাম তখন যখন রোগীটি খুবই বিব্রতভাবে আমাকে বললেন, স্যার, আমার মলদ্বার দিয়ে রক্ত যায়। আমি খুবই বিব্রতকর অবস্খায় আছি। আমার স্ত্রীকেও জানাতে চাই না। দয়া করে আমাকে একটু চিকিৎসা দিন।
অন্য একজন রোগী, বয়স ৬০। হাউজিংয়ের অফিসার ছিলেন। বহু বছর আগে ঢাকা শহরে এক হাতুড়ে চিকিৎসকের হাতে মলদ্বারে ইনজেকশন নিয়েছেন। পরে খোঁজখবর নিয়ে জেনেছেন, মলদ্বারে নাইট্রিক অ্যাসিড ইনজেকশন দেয়া হয়েছে। ওই ইনজেকশন দেয়ার পর মলদ্বারের আশপাশে মাংস পচে গিয়ে মলদ্বার এমনই সরু হয়েছে যে, তিনি আর মলত্যাগ করতে পারেন না। সামান্য ছিদ্র দিয়ে সব সময় পায়খানা চুইয়ে পড়ে। ভেতরে সর্বদা তুলার প্যাড পরে থাকেন। তাকে বললাম, দেশে আইন রয়েছে, শরীরে অ্যাসিড দিলে তার সাজা হয়। আপনি বিচার চান। রোগীর উত্তর ছিল এরূপ­ ‘স্যার, বয়স হয়েছে। মেয়েজামাই আছে, নাতি আছে। সমাজে এটি জানাজানি হয়ে গেলে মুখ দেখাতে পারব না। তাই এ ঘটনা প্রকাশ করতে চাই না। আপনি দেখুন কিছু করতে পারেন কি না।’
এ কারণে আমাদের দেশে পাইলসের হাতুড়ে চিকিৎসার এত প্রসার। প্রতিদিন মলদ্বারে হাতুড়ে অপচিকিৎসার জটিলতা নিয়ে রোগীরা আমাদের কাছে আসেন। যখন তিনি বুঝতে পারেন যে, অপচিকিৎসায় তার মলদ্বার মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তখন লোকলজ্জার ভয়ে এবং নিজের বোকামির কথা ভেবে কেউই হাতুড়ে ডাক্তারের বিচার চাইতে যান না। সবারই একই কথা হাতুড়ে চিকিৎসার কুফল আমাদের জানা ছিল না এবং সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন হওয়ার কারণে কেউই নিজের দুরবস্খার কথা পর্যন্ত প্রচার করতে চান না।
অনেকেই বলেন, স্যার, আমার পাইলস অপারেশন হয়েছে শুনে সহকর্মীদের অনেকেই বলল, তারও বহু দিন যাবৎ এ সমস্যা আছে কিন্তু কাউকে দেখাননি। এসব সহকর্মী আগে কখনো এ ব্যাপারে মুখ খোলেননি।
অনেক রোগী বিশেষত মহিলা রোগীরা বছরের পর বছর ভোগেন কিন্তু কাউকে দেখান না। শেষ পর্যন্ত যখন বয়স বেড়ে যায় ৬০-৭০ হয়, তখন আর সহ্য করতে পারেন না। শরীরে অন্যান্য রোগ যেমন­ ডায়াবেটিস, স্ট্রোক ইত্যাদি হয়েছে তখন ছেলে বা নাতিপুতিদের নিয়ে আসেন এবং বলেন, দীর্ঘ ২৫ বছর যাবৎ উনি কাউকে দেখাবেন না বলে জেদ ধরেছিলেন এখন আর সহ্য করতে পারছেন না। এই ভোগান্তির মূল কারণ কুসংস্কার।
দেশের একজন নামকরা উপাচার্যের স্ত্রীর পাইলস হয়েছে বহু বছর যাবৎ। কিন্তু তিনি ডাক্তারকে দেখাবেন না। শেষে এমন অবস্খা যে পায়খানা না করলেও রক্ত যায়। তার কয়েক ছেলেমেয়ে ডাক্তার ও ইঞ্জিনিয়ার। শেষ পর্যন্ত তাকে দেখলাম এবং বললাম, বিনা অপারেশনে তিনি ভালো হবেন। কিন্তু রোগী বিশ্বাস করলেন না। অত:পর দু’বার তার রিংলাইগেশন পদ্ধতিতে বিনা অপারেশনে পাইলস চিকিৎসা করায় তিনি সম্পূর্ণ ভালো হন। এর পর তিনি মন্তব্য করলেন, ভেবেছিলাম পাইলস নিয়েই কবরে যাবো এবং দেখলাম এত সহজে ভালো হওয়া যায়। কেন যে অযথা এত ভুগলাম।
সম্মানিত রোগীদের জ্ঞাতার্থে বলছি, মলদ্বারের প্রতিটি রোগ বিজ্ঞানসম্মত এবং এর প্রতিটি রোগই চিকিৎসায় সম্পূর্ণরূপে ভালো হয়। বিশেষ করে পাইলস ৯০ শতাংশ বিনা অপারেশনে ভালো করা যায়। বিগত নয় বছরে ২ হাজার ৩৪৫ জন রোগীকে রিংলাইগেশন পদ্ধতিতে বিনা অপারেশনে চিকিৎসা করে আমি দৃঢ়ভাবে আস্খাবান যে শতকরা ৯০ শতকরা পাইলস রোগী বিনা অপারেশনে ভালো হন।
লেখক : প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, কলোরেকটাল সার্জারি বিভাগ, বঙ্গবìধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।
চেম্বার : জাপান-বাংলাদেশ ফেন্সন্ডশিপ হাসপাতাল, ৫৫, সাতমসজিদ রোড, ধানমন্ডি, ঢাকা। ফোন : ০১৭১৫০৮৭৬৬১, ০১৭২৬৭০৩১১৬

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: