জীবনে এমন কত বিচ্ছেদ, কত মৃত্যু আছে, ফিরিয়া লাভ কি? পৃথিবীতে কে কাহার…

sheikh-chilliভাষান্তর: মুহম্মদ জালালউদ্দীন বিশ্বাস
বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে মোল্লা নাসিরুদ্দীন, বীরবল ও গোপাল ভাঁড়ের নাম যতোটা পরিচিত, শেখ চিল্লির নাম ততোটা নয়। কারণ গোপাল ভাঁড় ছাড়া অন্য দুজন এসেছেন বিদেশি সাহিত্য থেকে সরাসরি বাংলা অনুবাদের মাধ্যমে। শেখ চিল্লির নামও অনুবাদের মাধ্যমে আসা উচিত ছিল কিন্তু সে হিসেবে আসেনি। অথচ তিনি হিন্দি-উর্দু ইত্যাদি ভারতীয় ভাষার মাধ্যমে সারা উপমহাদেশে সুপরিচিত হলেও বাংলায় ঠিক ততোটা অপরিচিত হয়ে গেছেন। শেখ চিল্লি বুদ্ধিদীপ্ত দাস্তানের সঙ্গে আমার পরিচয় বহু দিনের। আমার এ পরিচয়কে বাংলাভাষীদের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়ার জন্যই আমার এই কলমি প্রয়াস।

শেখ চিল্লি নামে এক বালক ছিল। তার মা খুব গরিব ছিলেন। তার পিতা মারা গিয়েছিলেন। তার মা বেচারি কোনোরকমে শেখ চিল্লিকে লালনপালন করেছিলেন।
শেখ চিল্লি ছিল বেশ বিদঘুটে স্বভাবের, সেই সঙ্গে সে বেওকুফও ছিল। তার বেওকুফির কারণে লোকের কাছে তার মায়ের অনেক কথা শুনতে হতো।
একদিন তিনি তার প্রতি বিরক্ত হয়ে তাকে বাড়ি থেকে বের করে দিলেন। শেখ চিল্লি বাড়ি থেকে বেরিয়ে পাশের একটি গ্রামে চলে গেল। সেখানে একটি ঝুপড়ি বানিয়ে সে একা একা বাস করতে লাগলো। এখানে সে বেশ আরামেই ছিল। সে কিছুটা প্রাণখোলা স্বভাবের হওয়ার কারণে খুব সহজেই গ্রামের লোকদের সে একজন ভালো বন্ধু হয়ে গেল। গ্রামের লোকেরাও তার বন্ধু হলো। তারা তাকে বড়ই সাহায্য করলো এবং তার দানাপানির খরচ জোগাতে লাগলো।
তার প্রাণখোলা স্বভাব ও উদার প্রকৃতির কারণে ওই গ্রামের মুখিয়ার কন্যা রাজিয়া তার ওপর আশিক হয়ে গেল। গ্রামের কিছু নওজওয়ানও শেখ চিল্লির সাহায্যকারী ছিল। তারা একদিন এক রকম চাপ দিয়ে ওই গ্রামপতির কন্যা রাজিয়ার সঙ্গে তার বিয়ে দিল। বিয়েতে শেখ চিল্লি অনেক দান-দক্ষিণা পেল। সেই সঙ্গে অনেক অলঙ্কার ও টাকা পয়সা পেল। শেখ চিল্লি বউ ও বিয়েতে পাওয়া দান-দক্ষিণা ও টাকা-পয়সা নিয়ে তার গ্রামের বাড়িতে ফিরে মায়ের সঙ্গে দেখা করলো এবং বললো, দেখো মা! আমি গ্রামপতির মেয়েকে বিয়ে করে এনেছি।
শেখ চিল্লির মা দেখলেন বেটা সত্যি-সত্যিই পাশের গ্রামের মোড়লের মেয়ে বিয়ে করে এনেছে। তার মা এও দেখলেন, শেখ চিল্লি বিয়েতে প্রাপ্ত দান-দক্ষিণা, সোনা-রুপা ও টাকাকড়িও নিয়ে এসেছে, তখন তিনি মনে মনে বেশ খুশি হলেন।
তবে তিনি এ কথাও ভালোমতো জানতেন, সে এক্কেবারেই বেকার ছেলে। পয়সা কামানোর কোনো যোগ্যতাই তার নেই। এজন্য তিনি বললেন, বেটা, তুই একেবারেই বেকার, তোর দ্বারা কিসসু হবে না।
এ কথা শুনে শেখ চিল্লি বললো, মা! আমি এতো বড় কাজ করেছি, এটাই কি কম?
মা বললেন, বেটা! এ তো বিড়ালের ভাগ্যে সিঁকে ছিড়েছে। তুই যদি নিজের মনে জেনেবুঝে কোনো কাজ করে দু’চার পয়সা কামিয়ে আনতে পারিস তাহলেই আমি বুঝবো তুই কিছু পারিস। আমার বুড়ো বয়সে কী যে হবে তাই আমি ভাবি।
এ কথা শুনে শেখ চিল্লি বললো, মা, তুমি এমন কথা বলো না। সময় এলে আমি তোমার জন্য সবকিছু করতে পারবো।

শ্বশুরবাড়িতে শেখ চিল্লি
এভাবে আরো কিছু সময় কেটে গেল। তার বউ বাপের বাড়ি গেল। এরপর একটি বছর কেটে গেল। সে একদিন শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। সে তার মাকে জিজ্ঞাসা করলো, আম্মাজি!
আমার শ্বশুরবাড়ি কোথায়? তার ঠিকানা একবার বলো, যাতে আমি ওখান থেকে একটু ঘুরে আসতে পারি। আমি ঠিকানা ভুলে গেছি।
এ কথা শুনে তার মা বললো, ব্যাটা তোর তো কোনো বুদ্ধি-সুদ্ধিই নেই। আমি যদি ঠিকানা বলি, তাহলে তুই ভুলে যাবি। এজন্য আমার কথা খেয়াল রাখলে তুই একদম সোজা তোর শ্বশুরবাড়ি পৌঁছে যাবি। এ কথা বলে তিনি বললেনÑ তুই একদম নাক বরাবর সোজা চলতে থাকবি, ডাইনে বামে কোথাও ঘুরবি না, ব্যস, তুই সোজা তোর শ্বশুরবাড়ি পৌঁছে যাবি।
এ কথা শুনে শেখ চিল্লি সোজা তার শ্বশুরবাড়ির উদ্দেশে রওনা দিল। রওনার সময় তার মা তাকে বললেনÑ বেটা, ঘরে কিছু ছাতু ছিল তা আমি বেঁধে দিয়েছি। এই পোঁটলাটা তুই সঙ্গে করে নিয়ে যা, ক্ষিধে লাগলে ছাতু গুলে খেয়ে নিস।
শেখ চিল্লি বাড়ি থেকে বেরিয়ে সোজা নাক বরাবর চলতে থাকলো। সে যখন বাড়ি থেকে সোজা ময়দানে দু’তিন ক্রোশ বেরিয়ে এলো, তখন সামনে একটি গাছ পড়লো। সে ভাবলো, মা তো নাক বরাবর চলতে বলেছিল। এ কথা ভেবে সে ওই গাছে উঠে পড়লো তারপর অন্য দিক থেকে নেমে সোজা নাক বরাবর রওনা হলো।
কিছু দূরে গিয়ে একটি নদী পড়লো। সে বড় কষ্টে ওই নদী পার হলো এবং সামনে চলতে লাগলো। এভাবে চলতে চলতে সে অবশেষে তার শ্বশুরবাড়ি এসে পৌঁছলো।
শ্বশুরবাড়ি পৌঁছানোর পর তার বেশ ভালোমতোই আদর-যতœ হতে লাগলো। তবে সে তার সঙ্গেকার ছাতু চিনি ছাড়া আর কিছু খেতে রাজি হলো না, কেন না, তার মা এটাই বলেছিলেন।
অল্প কিছু ছাতু যা অবশিষ্ট ছিল তাই খেয়ে সে রাতে শুয়ে পড়লো। রাতে তার ভীষণ খিদে পেল এবং বেশ কষ্টও পেতে লাগলো। এখন সে কী করবে? অবশেষে খিদের তাড়নায় সে বাইরে বেরিয়ে এলো এবং ময়দানে একটি গাছের নিচে শুয়ে রইলো।
ওই গাছে খুব বড় একটি মৌচাক ছিল। তাতে এতো মধু জমেছিল যে, তা থেকে মধু টুপিয়ে টুপিয়ে পড়ছিল। শেখ চিল্লি যখন ওই গাছের নিচে শুয়ে পড়লো তখন ওপর থেকে তার ওপর মধু টোপাতে লাগলো। মধুর কয়েকটি ফোঁটা যখন তার মুখে পড়লো তখন সে তা চাটতে লাগলো এবং ভীষণ খুশি হলো। কিছু ফোঁটা তার শরীরের ওপরই টোপাতে থাকলে সে পেরেশান হয়ে এদিক-ওদিক পাশ ফিরতে লাগলো।
শেখ চিল্লি বেওকুফ তো ছিলই। এ কথা সে বুঝে উঠতেই পারলো না যে, গাছ থেকে তার শরীরে আসলে কি টুপিয়ে পড়ছে? অবশেষে নিতান্ত বাধ্য হয়ে সে ওখান থেকে উঠলো এবং ঘরের ভেতরে ঢুকে এক কুঠরিতে গিয়ে শুয়ে পড়লো। ওই কুঠরির মধ্যে ধুনো করা তুলো রাখা ছিল। শেখ চিল্লি নরম নরম তুলো পেয়ে তাতে পরম আরামে শুয়ে রইলো। তার সারা শরীরে তো মধু মেখে ছিলই, এবার ওই নরম তুলো তার সারা শরীরে লেপটে গেল, ফলে তার চেহারা এক অদ্ভূত আকৃতি ধারণ করলো।
সকাল হলে শেখ চিল্লির বউ কিছু তুলো আনার জন্য ওই কুঠরিতে ঢুকলো। ততোক্ষণে শেখ চিল্লি জেগে উঠেছিল। তাকে এমনরূপে দেখে তার বউ চিৎকার করে উঠলো। সে সাহস করে তাকে বললো তুমি কে?
শেখ চিল্লি খুব জোরে তাকে ধমক দিয়ে বললোÑ চুপ। সে বাইরে ভেগে গেল এবং তার মাকে বললোÑ আম্মাজি! ওই তুলোর ঘরে ‘চুপ’ ঢুকে বসে আছে। তার চেহারা বড় ভয়ানক।
এ কথা শুনে তার মা পড়শিদের ডেকে এনে জড়ো করলো। কিছু লোক ওই কুঠরিতে ঢুকলো। শেখ চিল্লিকে দেখে তারা বললোÑ তুমি কে?
শেখ চিল্লি আবারো চিৎকার করে বললোÑ ‘চুপ’। এবার তো তার এমন রূপ দেখে সবার আক্কেল গুড়–ম হয়ে গেল। সবাই ভাবলো, ‘চুপ’ নামের এক ভয়ানক বালা ঘরে এসে ঢুকে পড়েছে। তাকে বের করার জন্য কোনো গুণীন ডাকা দরকার।
বেশ কয়েকজন ওঝা ও মৌলভী ডেকে আনা হলো। তারা সবাই মিলে কতোই না মন্ত্রতন্ত্র জপলেন কিন্তু ‘চুপ’ নামের বালা সেখান থেকে বেরুলো না। অবশেষে হার মেনে মৌলভীরা পরামর্শ দিলেন, আপনারা এই বাড়িঘর ত্যাগ করে অন্য জায়গায় চলে যান। নইলে এই বালা আপনাদের সর্বনাশ করে দেবে।
শেখ চিল্লি শ্বশুরবাড়ির লোকেরা সেই বাড়িঘর ছেড়ে অন্য জায়গায় চলে গেল। শেখ চিল্লি এবার সুযোগ বুঝে সেই রাতেই ওই কুঠরি থেকে বেরিয়ে বাইরের দিকে ভেগে গেল।
রাস্তায় কয়েকজন চোর দেখা গেল। সামনে এক কৃষকের অনেক ভেড়া ইত্যাদি বাঁধা ছিল। শেখ চিল্লি চোরদের ভয়ে দৌড়ে ওই ভেড়া-ছাগলের মাঝখানে ঢুকে বসে পড়লো। ওদিকে চোররাও ভেড়া-ছাগলের কাছে এসে পৌঁছলো।
চোররা বেশ কিছু ভেড়া চুরি করলো। তাদের মধ্যে শেখ চিল্লিকে তুলোমাখা দেখে বড় সাইজের কোনো দুম্বা-ভেড়া মনে করে তাকেও নিয়ে পালিয়ে গেল। পালাতে পালাতে তারা নদীর কিনারায় এসে পৌঁছলো। ইতিমধ্যে রাতের আঁধার কাটতে শুরু করেছিল। তারা সব ভেড়াকে মাটিতে বসিয়ে দিল। এ দেখে শেখ চিল্লি বললোÑ আমাকে একটু আস্তে বসাও।
তার আওয়াজ শুনে চোরদের হাড় হিম হয়ে গেল। তারা মনে করলো ভেড়ার বেশে কোনো ভয়ানক বালা এ কথা বলছে। তারা শেখ চিল্লিকে পানিতে ফেলে দিয়ে পালিয়ে গেল। ওদিকে পানিতে মধু ধুয়ে যাওয়ার কারণে শেখ চিল্লির দেহে লেপটে থাকা তুলো সাফ হয়ে গেল। সে দেহ ভালো করে ধুয়ে স্নান করে সাফসুতর হয়ে পুকুর থেকে উঠে তার শ্বশুরবাড়ি চলে এলো। সে তার শ্বশুরের নতুন বাড়িতে গিয়ে শ্বশুরের সঙ্গে দেখা করলো এবং বললোÑ আপনি আগের বাড়ি ছেড়ে এলেন কেন?
শ্বশুর বললেনÑ আমার পুরনো বাড়িতে ‘চুপ’ নামে একটি ভূত ঢুকেছে।
শেখ চিল্লি তাড়াতাড়ি গিয়ে কিছুৃ মন্ত্র পড়ে দিল। তারপর ফিরে এসে বললোÑ সে ভূত চলে গেছে। তারপর তারা আবার পুরনো বাড়িতে ফিরে এলেন।
শেখ চিল্লির খুব আদর-যতœ হলো। সে শ্বশুরবাড়িতেই থাকতে লাগলো।
একদিন সে তার শ্বশুরকে বললোÑ আমি একটা ব্যবসা করতে চাই। আমাকে একটা গাড়ি বানিয়ে দিন। আমি দিনে কাঠ কাটবো আর গাড়ি বোঝাই করে বাজারে বিক্রি করবো। শ্বশুর একটি গরুর গাড়ি বানিয়ে দিলেন। শেখ চিল্লি জঙ্গল থেকে কাঠ টানার জন্য গাড়ি জুড়লো, গরুর গাড়ি নিয়ে সে চলতে লাগলো। তো কিছু দূর গিয়ে গাড়ি চুর-রা চু, চুর রা-চু আওয়াজ তুলতে লাগলো। শেখ চিল্লি ভাবলো, আজ আমার কারবারের প্রথম দিন, আর এ শালার গাড়ি এখনই অলক্ষুণে আওয়াজ তুলতে শুরু করেছে। সে কুড়াল দিয়ে গাড়িটি কেটে টুকরো টুকরো করে তাকে সেখানেই ফেলে দিয়ে সামনের বনে কাঠ কাটতে চলে গেল।
শেখ চিল্লি একটি মোটা গাছ দেখে এতেই চড়ে বসলো। একটা বেশ মোটা ডালে বসে সেটি কাটতে কাটতে ক্লান্ত হয়ে ওই ডালেই চুপচাপ বসে রইলো। একটু জিরিয়ে নিয়ে সেই ডালটিই আবার কাটতে শুরু করে দিল।
এমন সময় একটা লোক ওই গাছের তলা দিয়ে যাচ্ছিল। সে যখন শেখ চিল্লিকে ডাল কাটতে দেখলো তখন খুব মনোযোগ দিয়ে দেখলো, সে যে ডালে বসে রয়েছে, ঠিক ওই ডালটিই সে কাটছে।
পথিক বললোÑ ওরে মূর্খ! তুই যে ডালে বসে আছিস ওই ডালটিই তো কাটছিস। বলি, তোর কি বাঁচার ইচ্ছা আছে?
শেখ চিল্লি বললো, আরে যা যা! নিচে আমি কীভাবে পড়তে পারি?
তারপর ওই ব্যক্তি ওখানেই দাঁড়িয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর ডাল কেটে গেল এবং শেখ চিল্লিও নিচে এসে পড়লো। তখন শেখ চিল্লি তাকে বলতে লাগলোÑ আপনাকে তো বেশ জ্ঞানী লোক বলেই মনে হয়? আচ্ছা বলুন তো আমি কবে মরে যাবো?
এ কথা শুনে ওই লোক বললোÑ এসব আমি জানিনে। কিন্তু শেখ চিল্লি নাছোড়বান্দা। সে তার পেছন দিক দিয়ে টেনে ধরলো। তখন নিজের জান বাঁচানোর জন্য লোকটি বললো, তুই আজ সন্ধ্যাবেলায়ই মরে যাবি।
এ কথা বলে লোকটি তো চলে গেল। এবার শেখ চিল্লি ভাবলো আজ সন্ধ্যাতেই যদি আমাকে মারা যেতে হয় তো ভালোই, তার আগেই আমার কবরটা খুঁড়ে রাখি যেন আমার মৃত্যুর পর কবর খোঁড়ার জন্য আত্মীয়স্বজনদের কোনো কষ্ট করতে না হয়।
এমনটি ভেবে সে ওই জঙ্গলেই একট গর্ত খুঁড়ে তাতেই শুয়ে রইলো।
ওইদিক থেকে একটি লোক যাচ্ছিল তার কাছে একটি মটকা ছিল। সে বলতে বলতে যাচ্ছিল যে, এই মটকাটি আমার বাড়ি পৌঁছে দিলে তাকে আমি দুই পয়সা দেবো।
এ কথা শুনে শেখ চিল্লি কবর থেকে ঝটপট উঠে পড়লো এবং বললোÑ নিয়ে এসো, আমি তোমার মটকা নিয়ে যাবো।
এ কথা শুনে ওই লোকটি মটকা শেখ চিল্লির হাতে তুলে দিল। শেখ চিল্লি সেটি মাথায় নিয়ে চলতে লাগলো। রাস্তায় সে চলছিল আর কল্পনা করছিল, এ কাজের মজুরি হিসেবে আমি দুই পয়সা পাবো। দুই পয়সা দিয়ে একটি ডিম কিনবো। সেই ডিম থেকে একটি মুরগি জন্মাবে। ওই একটি মুরগি থেকে আরো অনেক মুরগি জন্মাবে। ওই মুরগিগুলো বেচে একটি ছাগল কিনবো। ওই ছাগল থেকে আরো অনেক ছাগল হবে। ওই ছাগলগুলো বেচে একটি গাভী কিনবো। ওই গাভী থেকে আরো অনেক গাভী হবে। সেগুলো বেচে একটি ঘোড়ী কিনবো। ওই ঘোড়ী থেকে আরো অনেক ঘোড়ী হবে। সেগুলো বেচে অনেক টাকা পাবো। সেই টাকা দিয়ে একখানি বাড়ি বানাবো। তারপর একটি ঘোড়ায় বসে বাজারে ঘুরতে বেরুবো। তারপর ব্যবসা করে অনেক ধনদৌলত কামাবো। তারপর সন্ধ্যাবেলা বৈঠকখানায় বসে হুঁক্কার নল মুখে দিয়ে মনের সুখে গড়গড়া টানবো। আমার বউ আমার কাছে আমার ভৃত্য মারফত খানা খাওয়ার জন্য ডাক পাঠাবে।
ওই সময় হুঁক্কা টানতে টানতে খুব জোরে মাথা নাড়তে নাড়তে বলবোÑ এখন আমি খানা খাবো না।
শেখ চিল্লি যেইমাত্র আপন খেয়ালে জোরের সঙ্গে মাথা নাড়লো অমনি সেই মটকা মাথা থেকে পড়ে গিয়ে ভেঙে চুমরার হয়ে গেল আর তার ভেতরের সব মাল মাটিতে পড়ে নষ্ট হয়ে গেল। এর ফলে ওই ব্যক্তি শেখ চিল্লিকে খানিক উত্তম-মধ্যম দিয়ে দিল। শেখ চিল্লির স্বপ্নও টুটে গেল।

সওদাগর শেখ চিল্লি
শেখ চিল্লির মা একদিন বললেনÑ বেটা! এভাবে আর কতোদিন চলবে? তোমার একটা ব্যবসা-বাণিজ্য করা উচিত। এ কথা বলে তিনি বাজার থেকে খদ্দরের একটি থান কিনে এনে শেখ চিল্লিকে দিয়ে বললেনÑ এই থান বাজারে গিয়ে বিক্রি করে এসো।
শেখ চিল্লি বললোÑ মা! এই থান কতো দামে বিক্রি করবো? আমার তো কিছুই জানা নেই।
মা বললেনÑ বেটা! এতে জানার তো তেমন কিছু নেই। দু’পয়সা উঁচুতে রেখে বেচে দিও।
শেখ চিল্লি বাধ্য হয়ে থান নিয়ে বাজারে গিয়ে এক পাশে বসে গেল।
এক গ্রাহক শেখ চিল্লির কাছে এলো এবং শুধালো, কী ভাই, এ থানের কতো দাম?
শেখ চিল্লির মায়ের কথা মনে এলো।
সে বললোÑ এতে দরদামের কী আছে ভাই! দু’পয়সা উপরে দু’পয়সা নিচে রেখে নিয়ে নাও।
গ্রাহক দেখলো সে এক মহামূর্খের পাল্লায় পড়েছে, সেজন্য সে তার পকেট থেকে চার পয়সা বের করে দু’পয়সা তো থানের ওপরে রাখলো আর দু’পয়সা থানের নিচে রেখে দিল।
শেখ চিল্লি ওই থান গ্রাহককে দিয়ে দিল আর সে ওই চার পয়সা তুলে নিয়ে বাড়ি চললো।
সে রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে দেখল এক ব্যক্তি তরমুজ বিক্রি করছে। ওই বড় বড় ফল দেখে শেখ চিল্লি বিক্রেতাকে শুধালোÑ ভাই, এ কী জিনিস?
বিক্রেতা তার চেহারাসুরত দেখেই বুঝে নিল এ এক মহামূর্খ, সে বললোÑ ভাই, এ হলো হাতির ডিম।
শেখ চিল্লি এ কথা শুনে মনে মনে বড় খুশি হলো। বললোÑ ভাই, এর দাম কতো?
বিক্রেতা বললোÑ খুব সস্তা। এর দাম মাত্র দু’পয়সা।
ওই সময়ে তরমুজ এক পয়সা করে বিক্রি হতো। শেখ চিল্লি দু’পয়সা দিয়ে ওই তরমুজ কিনে নিল এবং মনে মনে এ কথা ভেবে খুব খুশি হলো যে, দু’পয়সায় হাতির ডিম পাওয়া গেছে। এবার বাড়ি গিয়ে ওই ডিমে তা দেবো। এ থেকে হাতির বাচ্চা বেরিয়ে এলে তার সেবা করবো। সে যখন বড় হবে তখন বেচে দিয়ে অনেক টাকা কামাবো।
শেখ চিল্লি পথ চলছিল। এমন সময় তার বাহ্যক্রিয়া চাপ দিল। সে তরমুজ নিয়ে একটি ক্ষেতে ঢুকে পড়লো। তারপর, তরমুজটি রেখে সে বাহ্যক্রিয়ায় বসে পড়লো।
এমন সময় একটা গেছো ইঁদুর তার পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেল।
শেখ চিল্লি তাকে দেখে ভাবলোÑ এ তো হাতির বাচ্চা বলেই মনে হচ্ছে। সে উঠে তাকে ধরার জন্য দৌড়ে গেল কিন্তু গেছো ইঁদুর কার হাতে কবে ধরা দিয়েছিল! সেও লাফ দিয়ে একদিকে বেরিয়ে গেল।
শেখ চিল্লি হাত মলতে মলতে বাড়ির দিকে চললো।
পথিমধ্যে তার ভীষণ ক্ষিধে পেল। তখন সে একটি রুটি-পুরির দোকানে ঢুকে দু’পয়সার রুটি ও সবজি নিয়ে খেতে বসে পড়লো। যেইমাত্র মুখে সে এক গ্রাস তুললো অমনিই একটি কুকুর লেজ নাড়তে নাড়তে তার সামনে এসে দাঁড়াল। কুকুরটা ভীষণ ক্ষুধার্তÑ এই ভেবে সে সেই খাদ্য সব তার সামনে ঢেলে দিল।
কুকুর যখন সবটাই চেটেপুটে খেয়ে ফেললো তখন সে বাড়ির দিকে রওনা দিল।
বাড়ি এসে দেখল তার মা বাড়িতে নেই। সে ঘরে ঢুকে তার বউকে সব কথা বলতে লাগল।
এসব কথা শোনার পর তার বউ রাগে লাল হয়ে উঠলো। বললোÑ গোল্লায় যাও তুমি, জ্যান্ত হাতির বাচ্চা তুমি হারিয়ে এসেছো। সে যদি বাড়ি থাকতো তাহলে আমি তার পিঠে কী মজায় না চড়ে বসতাম।
এ কথা শোনামাত্রই শেখ খাওয়া ছেড়ে তার বউকে মারতে শুরু করলো। সে বললোÑ হারামজাদি! হাতির বাচ্চাটি এতো ছোট, আর তোমার মতো মহিষ তাতে চেপে বসলে সে বাঁচতো? মরে যেতো না?
এ ঝামেলা তখনো চলছিল। এমন সময় তার মা বাড়ি এসে ঢুকলেন। তিনি যখন পুত্রবধূর কান্নার আওয়াজ শুনতে পেলেন তখন তিনি এসে বললেনÑ এসব কী হচ্ছে বলে মা খুব বকাঝকা করলেন।
এ কথা শুনে শেখ চিল্লি থান বেচা থেকে নিয়ে হাতির ডিম কেনা পর্যন্ত সব কথা তার মাকে শুনিয়ে দিল।
শেখ চিল্লির মা এ কথা শুনে রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে উঠলেন। তিনি তাকে যাচ্ছেতাই করলেন। তারপর বললেনÑ বেইমান! তোকে আমি আমার সব জমানো পুঁজি দিয়ে বাজার থেকে থান কিনে তোকে বেচতে দিয়েছিলাম আর তুই কি না এই সর্বনাশ করে বাড়ি এসেছিস? যতোক্ষণ না থান ফিরিয়ে আনবি ততোক্ষণ তোকে ঘরে উঠতে দেবো না। এ কথা বলে তিনি তাকে উত্তম-মধ্যম দিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দিলেন।
শেখ চিল্লি বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়লো। চলতে চলতে সে ওই দোকানের কাছে সেই কুকুরটিকে দেখলো, যাকে সে রুটি খেতে দিয়েছিল। ব্যস আর যায় কোথায়? শেখ চিল্লি দিল তাকে মার। সে বাড়িতে যে মার খেয়েছিল, তার সব রাগ ওই কুকুরের ওপর গিয়ে পড়লো। মার খেয়ে কুকুর একদিকে পালিয়ে গেল।
মারতে মারতে শেখ চিল্লিও তার পেছন পেছন ছুটতে লাগলো। মারের কবল থেকে বাঁচার জন্য ছুটতে ছুটতে কুকুরটি একটি বাড়ির ভেতর ঢুকে পড়লো।
শেখ চিল্লিও তার সঙ্গে ঢুকে গেল।
ওই সময় বাড়ির মালকিন তার গয়নার বাক্স খুলে সাজ-সজ্জায় বসেছিল। ব্যস, ঠিক ওই সময়ে সে তার পড়শির বাড়ির দিকে গিয়েছিল। কিন্তু সে বাক্স বন্ধ করতে ভুলে গিয়েছিল। কুকুর যখন ওই কামরায় ঢুকলো তখন শেখ চিল্লি ওই খোলা বাক্স দেখলো। তার মধ্যে অনেক গয়নাগাটি ও টাকা-পয়সা ছিল। তা দেখে সে তার কাঁধের গামছাটি মাটিতে পাতলো। তারপর সব গয়নাগাটি ও টাকা-পয়সা তাতে ঢেলে বেঁধে নিয়ে সহজে বেরিয়ে এলো।
বাড়ি এসে সে সব জিনিসপত্র তার মাকে দিয়ে দিল। এতো ধনদৌলত দেখে তার মা খুব খুশি হলেন। শেখ চিল্লি ওই ধনদৌলত পাওয়ার সব ঘটনা তার মাকে জানালো।
তার মা সব ধনদৌলত বাড়ির উঠানে গর্ত করে তাতে সব পুঁতে ফেললেন।
কিন্তু ওই সময় তার খেয়াল এলো যে, শেখ চিল্লি তো এক মহা বোকা। না জানি, এ কথা সে কখন কাকে বলে ফেলে। তখন তো মহাবিপদে পড়ে যেতে হবে।
এ কথা ভেবে তিনি বাজারে একটি লোক পাঠিয়ে দুই টাকার ধানের তুষ কিনে আনালেন আর কিছু মিষ্টি মিঠাই এনে তার সঙ্গে মাখিয়ে রাতে যখন শেখ চিল্লি ঘুমিয়ে পড়লো তখন তিনি সেখানে সেগুলো ছড়িয়ে দিলেন।
তারপর যখন সকাল হলো তখন শেখ চিল্লিকে ডেকে তুলে বললেনÑ দেখ বেটা! আজ আমাদের উঠানে ধানের তুষ আর মিঠাই বর্ষণ হয়েছে।
শেখ চিল্লি এ কথা শুনে দৌড়ে উঠানে গিয়ে ধানের তুষ আর মিঠাই খুঁটে খুঁটে খেতে লাগলো।
এদিকে যার বাড়িতে চুরি হয়েছিল, সে শহর কোতোওয়ালকে চুরির খবর জানিয়ে দিল। খোঁজখবর হতে লাগলো। যখন তিনি খুঁজতে খুঁজতে শেখ চিল্লির বাড়িতে এসে হাজির হলেন তখন শেখ চিল্লি তার বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ছিল।
শহর কোতোওয়াল তাকে জিজ্ঞাসা করলেনÑ তুমি জানো এ চুরি কে করেছে?
শেখ চিল্লি সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিলÑ এ চুরি তো আমিই করেছিলাম।
তখন শহর কোতোওয়াল জিজ্ঞাসা করলেনÑ সে সব মাল কোথায়।
শেখ চিল্লি বললোÑ যে দিন রাতে আমাদের বাড়ির উঠানে ধানের তুষ আর মিঠাই বর্ষণ হয়েছিল ওই দিন রাতেই তো আমার মা সেগুলো উঠানে পুঁতে ফেলেছিল।
এ কথা মনে করে যে, আসলে এটা একটা পাগল-ছাগল, সিপাইরা সঙ্গে সঙ্গ চলে গেল।
এভাবে শেখ চিল্লির মায়ের জান বেঁচে গেল। বেশ কিছুদিন যাবৎ সেই ধন দিয়ে তাদের ভালোই চললো।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: