জীবনে এমন কত বিচ্ছেদ, কত মৃত্যু আছে, ফিরিয়া লাভ কি? পৃথিবীতে কে কাহার…

গাছেরও বিয়ে হলো। যেনতেন প্রকারে নয়, রীতিমতো মহাধুমধামের সঙ্গে গতকাল শুক্রবার বট ও পাকুড়গাছের বিয়ে হলো সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার নলুয়া গ্রামে। বিয়ে উপলক্ষে গরু জবাই করে ভুরিভোজেরও ব্যবস্থা করা হয়েছিল অতিথিদের জন্য। বিয়ের উদ্যোক্তারা বলেছেন, পূর্বপূরুষদের প্রথা অনুসারে এই বিয়ের আয়োজন করা হয়েছে। এখানে আগেও বট ও পাকুড়গাছের বিয়ে হয়েছে।
এলাকাবাসী জানায়, নলুয়া গ্রামের সাইদুল ও পার্শ্ববর্তী বাড়াবিল গ্রামের জানু ফকির ১৯৯৪ সালে একসঙ্গে গ্রামের বাজারে বট ও পাকুড়গাছের চারা রোপণ করেন। গাছ দুটি ইতিমধ্যেই বড় হয়ে উঠেছে। ১৫ বছর পূর্তি হওয়ার পর এলাকার রেওয়াজ অনুযায়ী মুরব্বিদের পরামর্শে দুটি গাছের মধ্যে বিয়ের ব্যবস্থা করা হয়। নলুয়া প্রাথমিক দুগ্ধ উৎপাদন সমবায় সমিতির পক্ষ থেকে এই বিয়ের অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। বিয়ের অনুষ্ঠানে আশপাশের শত শত নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর উপস্িথত হয়ে আনন্দে মেতে ওঠে। অনুষ্ঠানে দাওয়াত দেওয়া হয় স্থানীয় সাংসদ, উপজেলা চেয়ারম্যান, পৌর মেয়রসহ সুধীদের। গরু জবাই করে ভুরিভোজের ব্যবস্থাও করা হয়। এতে খরচ হয় প্রায় ২০ হাজার টাকা। বাদ্যযন্ত্র, মাইকে গান-বাজনা−বাদ পড়েনি কিছুই বিয়ের আয়োজন থেকে।
বরকনের আদলে কনে হিসেবে বটগাছটিকে লাল শাড়ি ও বর হিসেবে পাকুড়গাছটিকে সাদা পাঞ্জাবি পরিয়ে বিয়ের কাজ সম্পন্ন হয়। সেই সঙ্গে উৎসাহীরা রংবেরঙের কাগজ দিয়ে সাজিয়ে তোলে গাছ দুটিকে। পুরো বাজারে শামিয়ানা টানিয়ে এলাকাবাসীর বসার ব্যবস্থা করা হয়।
গাছ রোপণকারী জানু ফকির প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের পূর্বপুরুষেরা এভাবেই গাছের সঙ্গে গাছের বিবাহ দিতেন। আমার বয়স হয়েছে। যেকোনো সময় মরে যেতে পারি। সে কারণে বেঁচে থাকতেই বিয়ে দেখার জন্য এই আয়োজন করা হলো।’ অপর রোপণকারী সাইদুল ইসলাম বলেন, ‘বটগাছকে মেয়ে গাছ এবং পাকুড়গাছকে ছেলে গাছ হিসেবে দেখা হয়। এমন একটি বিয়ের অনুষ্ঠান করা হবে চিন্তা করেই ১৯৯৪ সালে আমরা দুজন যুক্তি করে গাছ দুটি রোপণ করেছিলাম। ভেবেছিলাম বটগাছের কাছে আমার স্ত্রীকে বসিয়ে পাকুড় গাছের কাছে আমি নিজে বসে ইসলামি শরিয়ত মোতাবেক পুনরায় আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ের কাজ সম্পন্ন করব। যা হোক দুটি গাছের মধ্যে বিয়ে সম্পন্ন হওয়ায় আমাদের মনের আশা পূর্ণ হলো।’
বিয়ে পড়ানোর দায়িত্বে ছিলেন স্থানীয় আলেম মো. আয়ুব আলী। তিনি জানান, ‘এটি ইসলামি শরিয়ত মোতাবেক বিয়ের অনুষ্ঠান নয়। আদিম যুগে ইশারায় বিবাহ হতো। সেই প্রথা অনুসারে দুটি গাছকে সম্মান দেখাতে এলাকার মুরব্বিদের রেওয়াজ ঠিক রাখার জন্যই তাদের নির্দেশে এই অনুষ্ঠানিকতা করা হলো।’
এ বিষয়ে এলাকার নলুয়া গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা মান্নান শিকদার বলেন, ‘এই বিয়ের অনুষ্ঠানে যে এত লোকসমাগম হবে, তা আমারা ভাবিনি। সকল স্তরের মানুষের স্বতঃস্কুর্ত অংশগ্রহণ অনুষ্ঠানকে প্রাণবন্ত করে তুলেছে। তবে আমরা ইসলামি শরিয়তের পরিপন্থী কোনো কাজ করছি না। মুরব্বিরা অগে থেকেই এই প্রথা চালু রেখে গেছেন। আমরা সেগুলো অনুসরণ করছি মাত্র।’
বিয়ের অনুষ্ঠানে উপস্িথত শাহজাদপুরের পৌর মেয়র হালিমুল হক বলেন, ‘বট ও পাকুড়গাছ আমাদের বাঙালি সংস্কৃতির ঐতিহ্য। এটি শুধু বিয়ে অনুষ্ঠান নয়, বৃক্ষরোপণ অভিযানের ধারাকে আরও জনপ্রিয় করতে এই অনুষ্ঠান ভুমিকা রাখবে।’

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: