জীবনে এমন কত বিচ্ছেদ, কত মৃত্যু আছে, ফিরিয়া লাভ কি? পৃথিবীতে কে কাহার…

হা য়া ৎ মা মু দ
আমরা সময়ের শিকার। সময় বদলেছে, বদলাচ্ছে, আমাদেরও বদলে দিচ্ছে। ভাগ্যিস এই বদলানোর ব্যাপারটা চুপিসারে ঘটে। মানে ব্যাপারটা এমন নয় যে, আমি বদলাবো, আমি বদলাবো, বলে কেউ সর্বক্ষণ দৌড়ঝাঁপ করছে। এই কাজটা সময় ঘটিয়ে দেয়। তা যদি না হতো, তাহলে ঐ পরিবর্তনের কাজটি ঘটে উঠত না, ঘটিয়ে তোলাও যেত না।
বুড়ো বয়সে কেউ যখন আবদার ধরে ছেলেবেলার গল্প শোনাতে হবে, তখন ভারি অসহায় বোধ করি। নিজেকে জিজ্ঞেস করিÑ তোর ছেলেবেলার গপ্পো মনে আছে? সত্যি বলছিস? আসলে বানিয়ে-বানিয়ে কিছু কথা শোনাবি তো!
আমার পক্ষে সত্যিই বলা মুশকিল, আমরা বড়ো হতে হতে ছোটবেলাটাকে মনের কৌটোয় কতখানি পুরে রাখি। আদৌ কি রাখি? রাখতে পারি কি? নিজের দিক থেকে অকপট স্বীকারোক্তি হিসেবে এটুকুই মাত্র বলা সম্ভব যে, ছেলেবেলাটুকু যদিও নিজের বটে তবু অপরের মুখ থেকে, অর্থাৎ বয়োজ্যেষ্ঠ অন্যের মুখ থেকে শুনতে-শুনতে তা তৈরি হয়ে উঠতে থাকে। যেমন, হায়াৎ মামুদ নামে এই যে মানুষটা ‘আমি’ ছোটবেলার ত্যাঁদড়ামি বিন্দুমাত্রও কিছু কি মনে রেখেছি? ‘মনে রাখা’ কথাটা অবশ্য ভারি কূটকচালে। মনে কিছু আবার ‘রাখা’ যায় নাকি? যা থাকবার সেটুকু রয়ে যায়। এটুকুই শুধু। এর বেশি কিছু নয়। ফ্রয়েড বলতেন, মনে যা থাকবার তা থাকে, তুমি রাখতে না চাইলেও থাকে। আমার এমনই ভুলো মন যে, কিছুই মনে থাকে না। অন্যে মনে করিয়ে দিলে তখন মনে পড়ে যায়।
বুড়ো বয়সে এসে পৌঁছুতে-পৌঁছুতে এতদিনে আমার একটা পরিচয় সমাজে প্রায় স্থির হয়ে গেছে। সেটা কী? না, ভদ্দরলোক সারা জীবন মাস্টারিই করে গেল, আর কিছু তো করল না। দেখার এই ধরনটা যে খুব ভালো, কিংবা আমার পছন্দসই তা কে বলল! ঐ কথার ভেতরে আরো একটা কথা লুকিয়ে রয়ে গেছে কিনা কে বলবে? সেটা হলÑ আহাম্মক না হলে ঐ একটা পেশাতেই লেগে থাকে নাকি কেউ? মাস্টারিতে ক’পয়সা মাইনে পায়! মাস্টার মানেই গরিব। আর সেজন্যই তো লোকে আমল দেয় না, পৌঁছে না। আজকাল বাংলাদেশে সম্মান হচ্ছে ঘুষখোর কোটিপতিদের ও অসাধু বিত্তবানদের। সমাজে মূল্যবোধের ধস নামার লক্ষণ মানুষের চালচলনেই ফুটে ওঠে। এখন সকলেই পয়সাকে সেলাম ঠোকে, অন্যকিছুকে নয়।
আমাদের মতো মানুষজনের জন্যে এ ভারি এক বিড়ম্বরা। কারণ আমাদের ছোটবেলা যেভাবে তৈরি হয়ে উঠেছিল, সমাজের চালচলন, লোকের দৃষ্টিভঙ্গি, ব্যস্ততাবিহীন জীবন, সমাজে যৌথ জীবনের প্রতি সম্মান ও ভালবাসাÑ সবই সম্মিলিতভাবে জীবনের অন্যরকম অর্থ শেখাত যেন। একক ব্যক্তি-মানুষের জীবন, তার রোগ-শোক-দুঃখ-বেদনা-আনন্দ সব তার নিজের বটে, তাকেই বহন করতে হয়, ঠিকইÑ তবু তার বেঁচে থাকাটা শুধু তারই বেঁচে থাকা নয়, সে বাঁচে অন্যদের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে, জীবনের মানে তাই কেবল এককের ব্যক্তিজীবন নয়, সকলের সঙ্গে মিলেমিশে এক যৌথ জীবনের একটুকরো অংশ। এসব কারণে ব্যক্তির সম্মান ও মূল্য তখন কেবল অর্থসঙ্গতির ওপর নির্ভর করত না। সমাজের চলন ছিল যৌথ জীবনের চলন ও অঙ্গীকার, ফলে ব্যক্তিকে বিবেচনা কখনো একক, ইনডিভিজুয়াল, স্বতন্ত্র হিসেবে করা হতো না।
সমাজের এই গড়নটি এখন আর নেই, ভেঙে গেছে। তাতে ভালো হয়েছে কি মন্দ হয়েছে সে তর্ক অবান্তর, কারণ ভেঙে যাওয়ার অবস্থা ভিতরে-ভিতরে তৈরি না হলে তো আর ভাঙত না। সমাজের গড়ন ভাঙে, চলন বদলায় দু’-চারজন ব্যক্তির ইচ্ছায় নয়, সামষ্টিকভাবে সকলেরই বিবেচনা ও বোধে কোথাও একটা ভাঙচুর চলতে চলতে যখন একটা স্থিরতা আসে তখন বুঝতে পারা যায় সময় বদলেছে, আগের অবস্থায় ঠিক নেই।
আজকালকার ছেলেমেয়েদের মুখেÑ তারা সবাই এখন আমার নাতি-নাতনির বয়সীÑ প্রায়ই শুনি প্রজš§ ব্যবধান বা জেনারেশন গ্যাপের কথা। কথাটা যেহেতু মিথ্যে নয়, সত্যি, তাই মনে মনে কষ্ট পেলেও না মেনেই বা যাই কোথা! বুঝতে চেষ্টা করি ব্যবধান ঠিক কোনখানটিতে হল এবং তাতে খারাপ হল না ভালো হল। খারাপ কিংবা ভালোÑ এই আপেক্ষিক মূল্যমান তো ব্যক্তিকেন্দ্রিক, ফলে কোনো চূড়ান্ত ও অপরিবর্তনীয় সিদ্ধান্তে আসা চলে না। তবে ব্যবধানটিকে তো বুঝতে হবে, নইলে চলবে কেন? তা আমি আমার নিজের মতো করে ব্যাপারটি বুঝি বৈকি! বুঝি এটাই যে, মানুষের চোখ-কান অন্য রকম হয়েছে। তার মানে দেখার ধরন পাল্টেছে এবং কানে শুনলেই সব বিশ্বাস করে না, যাচাই-বাছাই করে দেখতে চায়।
সব তো হল, কিন্তু মূল কথাটা দাঁড়াচ্ছে কী? ব্যাপারটা কি এরকম যে, আমাদের যুগের চেয়ে এখনকার ছেলেমেয়েরা আনন্দে আছে, আরামে আছে, ফুর্তিতে আছে, কোনো রকম মানসিক চাপ কি দুশ্চিন্তা নেই? আমি নিজে তো ঐ বয়সটা পেরিয়ে এসেছি সেই কবে, ফলে এদের ব্যাপার-স্যাপার আমার অনুভবে ধরা পড়া সম্ভব নয়। কিন্তু চারপাশ জরিপ করে, চারদিকে ভালোমতো তাকিয়ে, এ যুগের ধরন-ধারণ কিঞ্চিৎ হলেও ধরা যায় বৈকি। সেই হিসেব থেকে নিজের মতো করে বুঝি যে, না, তা নয়; বিষয়টি অতখানি সোজাসরল নয় যে এককথায় জবাব মিলবে।
বুঝতে হবে সমাজের গড়নটা। আমাদের ছোটবেলায় মানে এখন থেকে ৫০-৬০ বছর আগে, সমাজের চেহারা অন্যরকম ছিল। ব্যক্তির একক জীবনও কেবলই তাঁর একার ছিল না, কারণ ব্যক্তিগত স্বাতন্ত্র্যের বা প্রাইভেসির কোনো ধারণা সেকালে মানুষের মাথাতেই ঢুকত না। ভালোমন্দ বোকা-বুদ্ধিমান শিক্ষিত-নিরক্ষর সকলকেই সমাজ নিজের দেহে ঠাঁই দিত, কাউকে অচ্ছুৎ বা অপাঙ্ক্তেয় ভাবত না। বিবেচনাটি এরকম ছিল যে, সবই তো আমার, হাতের পাঁচ আঙুল কি একই রকম হয় নাকি, তো কাকে কাছে টানব আর কাকেই বা বাদ দেব। এ হল যৌথ জীবনের, সমাজে স্তরনির্বিশেষে সকলেরই একসঙ্গে থাকার, অঙ্গীকার। ব্যক্তির মহিমার ওপরে প্রাধান্য পেত সামষ্টিক বিচার ও আনুগত্য। এর ফলে সমাজের চলন মন্থর ও সংক্ষোভহীন ছিল, সন্দেহ নেই। ব্যক্তিকে সার্বক্ষণিক ইঁদুরদৌড়-প্রতিযোগিতায় নামতে হতো না; জীবনের শান্তি থাকুক বা না থাকুক স্বস্তি ছিল, সার্বক্ষণিক কোনো না কোনো মানসিক চাপের ভার সইতে হতো না।
সেই জীবন থেকে যে আমরা এখন দূরে ছিটকে সরে এসেছি স্বেচ্ছায় ও আনন্দিত চিত্তে, তা ভাববার মনে হয় কোনো কারণ নেই। মূল কারণÑ জীবনের মানচিত্র বদলেছে। জীবন এখন অন্যরকম হয়েছে। এই ‘অন্যরকম’ হওয়াটা কারোরই ইচ্ছাসাপেক্ষে ঘটেনি। কেউ এভাবে ঘটায়নি, ঘটে উঠেছেÑ নানা ঘটনা মনোজগতে বদল পৃথিবীতে ঘটতে থাকা নানা ঘটনা সমাজদেহে নানা ভাঙচুর ইত্যাদি বহু বিষয়ের মিশ্রণে, মিথস্ক্রিয়ায়। অন্যভাবে বলা যায়, আমরা সময়ের শিকার। সময় বদলেছে, বদলাচ্ছে, আমাদেরও বদলে দিচ্ছে। ভাগ্যিস এই বদলানোর ব্যাপারটা চুপিসারে ঘটে। মানে ব্যাপারটা এমন নয় যে, আমি বদলাবো, আমি বদলাবো, বলে কেউ সর্বক্ষণ দৌড়ঝাঁপ করছে। এই কাজটা সময় ঘটিয়ে দেয়। তা যদি না হতো, তাহলে ঐ পরিবর্তনের কাজটি ঘটে উঠত না, ঘটিয়ে তোলাও যেত না।
মানুষ তো বদলাতে-বদলাতে, ছোটবেলা থেকে বড়ো হতে-হতে, বুড়ো হতে-হতে, বেঁচে থাকে। আর সে যত বুড়ো হয় তার ছেলেবেলা তত দূরে সরে যেতে থাকে। অথচ ভারি একটা আশ্চর্যের ব্যাপার হল, ছেলেবেলা তার স্মৃতি থেকে কখনো মোছে না। প্রায়শই একটা সত্যি কথা শোনা যায়Ñ বৃদ্ধেরা তাঁদের শৈশব-বাল্য-তারুণ্যের গল্প বলতে ভালোবাসেন। এর কারণ একমাত্র এটাই হতে পারে যে, বয়স যত বাড়তে থাকে, মানুষ তত মৃত্যুর পানে এগোতে থাকে, তার মনের পুরোটা অতীত সময়ের নকশা এসে ভরে দিতে থাকে।
আসলে, মানুষ বাঁচে অতীত নিয়ে। বর্তমান তো এক মুহূর্তেই অতীত হয়ে যায়, তাকে ছুঁতে-না-ছুঁতেই। আর ভবিষ্যৎ তো চিরকালই অদৃশ্য, আমরা কেউ তাকে দেখতে পাই না।
অতীত নিয়ে বাঁচা মানে তো স্মৃতি নিয়ে বাঁচা। সেই বাঁচার আনন্দ অন্যরকম। বেদনার বর্তমান যখন অতীত হয়ে যায় তখন তা আর বেদনা থাকে না, বেদনার স্মৃতিও তখন একরকমের আনন্দ দেয়।
ছেলেবেলার স্মৃতি সবচেয়ে জাগ্রত হতে থাকে বুড়োকালে। ছেলেবেলায় যাই ঘটে সবই মধুর, এমন তো নয়। কিন্তু সেই বয়সের শাস্তি বা তিরস্কারও ক্রমশ স্মৃতি হতে-হতে আনন্দ ও তৃপ্তির উৎস হয়ে যায়। এই রূপান্তর কিন্তু জীবনেরই আনন্দকে চিনিয়ে দেয়।

Advertisements

Comments on: "ছেলেবেলা থেকে জীবনের ভাঙচুর" (1)

  1. সময় আর জীবন এ দুটোকে একে অপরের সাথে খাপ খেয়ে চলতে হয়। বিবর্তন আর পরিবর্তন দুটোই সমাজে আজও বিদ্যামান এবং আজীবন এ দুটোর অস্তিত্ব খুঁজে পাবেন। পরিবেশগত সংস্কৃতি আর মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক প্রচেষ্টা সমাজ ও সামাজিক মূল্যবোধে পরিবর্তন আনে। যেহেতু মানুষ সামাজিক জীব সেহেতু সমাজের পরিবর্তন তার জীবনের গতিধাসময় আর জীবন এ দুটোকে একে অপরের সাথে খাপ খেয়ে চলতে হয়। বিবর্তন আর পরিবর্তন দুটোই সমাজে আজও বিদ্যামান এবং আজীবন এ দুটোর অস্তিত্ব খুঁজে পাবেন। পরিবেশগত সংস্কৃতি আর মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক প্রচেষ্টা সমাজ ও সামাজিক মূল্যবোধে পরিবর্তন আনে। যেহেতু মানুষ সামাজিক জীব সেহেতু সমাজের পরিবর্তন তার জীবনের গতিধারাতেও পরিবর্তন আনে।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: