জীবনে এমন কত বিচ্ছেদ, কত মৃত্যু আছে, ফিরিয়া লাভ কি? পৃথিবীতে কে কাহার…

59543_Untitled-1খালেদ হামিদী
প্রথমে অদ্বৈত মল্ল বর্মণ, তারপর মোহাম্মদ রফিক কবিতায় আঞ্চলিক ভাষা চাড়িয়ে দেন নদী-অববাহিকার মানুষের অস্তিত্বের সঙ্কট ও সংগ্রামের প্রতি তাদের দায়বদ্ধতার ফল হিসেবে। তৃতীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে ভাষার আঞ্চলিকতার স্বাদ মেলে সৈয়দ শামসুল হকের ‘পরানের গহীন ভিতর’ কাব্যগ্রন্থে। সামাজিক-রাজনীতিক বোধের পরিবর্তে এ কাব্যে আঞ্চলিক ভাষা রোমান্টিকতায় পুলকিত ও সাঙ্গীতিক। দীর্ঘকাল পরে, গেল শতকের আশির দশকের শেষে কিংবা নব্বইয়ের শুরুতে আবির্ভূত ব্রাত্য রাইসুর কবিতায় পরিদৃষ্ট হয় ঢাকা শহরে প্রচলিত কথ্য ভাষার কিছু ক্রিয়াপদ এবং গালমন্দের আংশিক ব্যবহার। এতে তিনি এক প্রকার চমকও সৃষ্টি করেন বটে।

আঞ্চলিক ভাষা কখনো কখনো মৌখিকভাবেও সমাজের উচ্চ শ্রেণীর সকৌতুক পরিহাসের শিকার হয়। কিন্তু প্রমিত ভাষা বা একটি জাতীয় ভাষা শাসক-শোষক শ্রেণীর জবান হয়ে উঠতে পারে না। ওই জাতীয় বা প্রমিত ভাষার আওতার ভেতরে উচ্চ শ্রেণী কিছু ‘বুলি’ সৃষ্টি করে মাত্র। তবে আঞ্চলিক ভাষা এর বিভিন্নতাহেতু অভিন্ন প্রমিত ভাষার মতো সর্বজনবোধ্য নয় বলেই কি এ ভাষায় ‘জাতীয় সাহিত্য’ রচিত হয় না? আর অবহেলিত, সুবিধাবঞ্চিত জনপদের জবান হিসেবেও আঞ্চলিক ভাষা কি শোষিতের? না। একটি গ্রামের কৃষকদের ভাষা ওই গ্রামের মোড়ল এবং ফড়িয়াদেরও তো সেবা প্রদান করে। আর ‘জাতীয় সাহিত্য’ কি সুবিধাপ্রাপ্তদেরই প্রতিনিধিত্বশীল? হ্যাঁ, জাতীয় বা জাতীয় পর্যায়ে রচিত সাহিত্য বেশিরভাগই মধ্যবিত্তেরই রচনা। কিন্তু তা একশভাগই জনগণবিমুখ নয়। প্রসঙ্গত স্মর্তব্য যে, জোসেফ স্ট্যালিন ভাষার শ্রেণীচরিত্র সম্পর্কিত বিভ্রান্তির নিরসন করেন তার ‘ভাষাতত্ত্বে মার্কসবাদ প্রসঙ্গে’ শীর্ষক এক গভীর ও স্বচ্ছ প্রবন্ধে। তিনি বলেন : ‘ভাষা উপরিকাঠামো থেকে পুরোপুরি আলাদা। উপস্থিত সমাজের অভ্যন্তরে ভাষা এই বা ওই পুরনো বা নতুন কোনো ভিত্তিরই ফল নয়; উপরন্তু তা সংশ্লিষ্ট সমাজটির ইতিহাসের সমগ্র বিকাশধারার, বহু শতাব্দী-ব্যাপ্ত বিবিধ ভিত্তির ইতিহাসের, উৎপন্ন ফল।…এর সৃষ্টি হয়েছিল কোনো একটি বিশেষ শ্রেণীর প্রয়োজন পূরণের জন্য নয়, গোটা সমাজের, গোটা সমাজের সব শ্রেণীর প্রয়োজন পূরণের জন্য।’ (ওই; শিল্প ও সাহিত্য প্রসঙ্গে : মার্কস থেকে মাও; পীযূষ দাশগুপ্ত সম্পাদিত) একই প্রবন্ধে তিনি এও বলেন : ‘সংকরীকরণের ফলে সচরাচর দুটি ভাষার মধ্যে একটি অভ্যুদিত হয় বিজয়ী হিসেবে, অক্ষুণœ রাখে তার ব্যাকরণ-প্রণালি ও বুনিয়াদি শব্দভা-ারকে এবং বিকাশ লাভ করতে থাকে তার বিকাশের অন্তর্নিহিত নিয়মাবলী অনুসারে; অন্যদিকে বাকি ভাষাটি ক্রমে ক্রমে হারায় তার গুণ এবং ক্রমে ক্রমে মরে যায়।’ (ওই) সাহিত্যে, বিশেষত কবিতায়, আঞ্চলিক বা কথ্য এবং প্রমিত ভাষার একত্র ব্যবহার এ জন্যই বোধ হয় সবসময় সার্থক হয় না। তবে আঞ্চলিক ও প্রমিতের সংকরীকরণের ফলে স্থানীয় জবানটির অবলুপ্তির আশঙ্কা তেমন থাকে না এ জন্য যে, এটি জাতীয় ভাষার ব্যাকরণেরই আয়ত্তাধীন। কিন্তু প্রমিত ও আঞ্চলিক, জাতীয় ও বিজাতীয় ভাষাসমূহের মধ্যে একটি যখন অপর কোনোটির ওপর আধিপত্যবাদী, দমনকারী এবং স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠে তখন দলিত জবানের মানুষদের আন্দোলনে ফেটে পড়তে হয়। আমাদের ইতিহাসে এভাবেই দ্রোহ, প্রতিরোধ ও প্রাণদানের গৌরবে অমর হয়ে ওঠে বায়ান্নর মহান ভাষা আন্দোলন। এদিকে আমাদের একেকটি আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতি যেমন উপনিবেশিতের উপনিবেশিত ভাষা-সংস্কৃতি হিসেবে এখনো নানামাত্রিক নিগ্রহের শিকার, তেমনি, আমাদেরই গ্রামীণ জনপদসমূহের ভাষাগুলোও কম অবহেলিত নয়। সেক্ষেত্রে বরং ঘটছে আরেক বিপদ। গ্রামে গ্রামে ধনতন্ত্রের শকট পৌঁছে যাওয়া ছাড়াও ব্রাত্যজনের জবানেরও ঘটছে পণ্যায়ন। বর্তমানে বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে প্রচারিত একাধিক বিজ্ঞাপনে আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহারের মধ্যে তা দুঃখজনকভাবে প্রমাণিত। এসব বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা আমাদের কবিতায় কথ্য ও আঞ্চলিক ভাষার আংশিক কিংবা পূর্ণাঙ্গ ব্যবহারের স্বরূপ সংক্ষেপে বুঝে নেয়ার প্রয়াস পেতে পারি।
প্রথমে অদ্বৈত মল্ল বর্মণ, তারপর মোহাম্মদ রফিক কবিতায় আঞ্চলিক ভাষা চাড়িয়ে দেন নদী-অববাহিকার মানুষের অস্তিত্বের সঙ্কট ও সংগ্রামের প্রতি তাদের দায়বদ্ধতার ফল হিসেবে। তৃতীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে ভাষার আঞ্চলিকতার স্বাদ মেলে সৈয়দ শামসুল হকের ‘পরানের গহীন ভিতর’ কাব্যগ্রন্থে। সামাজিক-রাজনীতিক বোধের পরিবর্তে এ কাব্যে আঞ্চলিক ভাষা রোমান্টিকতায় পুলকিত ও সাঙ্গীতিক। দীর্ঘকাল পরে, গেল শতকের আশির দশকের শেষে কিংবা নব্বইয়ের শুরুতে আবির্ভূত ব্রাত্য রাইসুর কবিতায় পরিদৃষ্ট হয় ঢাকা শহরে প্রচলিত কথ্য ভাষার কিছু ক্রিয়াপদ এবং গালমন্দের আংশিক ব্যবহার। এতে তিনি এক প্রকার চমকও সৃষ্টি করেন বটে। ব্যঙ্গ-পরিহাসই রাইসুর কবিতার প্রধান উপজীব্য হলেও তার হাতে নিন্দনীয় পক্ষ বা বিষয়গুলোই শনাক্ত হয় কেবল, তারই সমর্থন বা ভালোবাসার বিষয় কিংবা পক্ষ সম্পূর্ণই অনুল্লিখিত থেকে যায়। ফলে রাজনীতিক-দার্শনিক উদ্দেশ্যহীনতা বা নৈরাজ্যবাদেই তা পর্যবসিত হয়। এদিকে রাইসুরই সমসাময়িক কবি জহির হাসান পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদবিরোধিতায় অটুট থেকেও নিজের প্রচারবিমুখতার ফলে মিডিয়াকে এড়িয়ে চলায়, রাইসুর চেয়ে দ্বিগুণ পরিমাণে গ্রন্থিত হওয়া সত্ত্বেও, অনেকখানিই নেপথ্যে থেকে যান। অথচ জহিরের কাব্যেই কথ্য ও আঞ্চলিক ভাষা লাভ করে সবচেয়ে বেশি ছন্দাশ্রয়ী পুনর্জন্ম।
জহির হাসানের প্রথম কাব্য ‘পাখিগুলো মারো নিজ হৃদয়ের টানে (ফেব্রুয়ারি ২০০৩)’ প্রমিত ভাষায়ই রচিত, দু’তিনটি কবিতায় আঞ্চলিক ভাষার সামান্য ব্যবহার ছাড়া। তার দ্বিতীয় এবং এখন পর্যন্ত শেষ কাব্যে, ‘গোস্তের দোকানে’ এসে, যশোরের প্রত্যন্ত অঞ্চলের ভাষার প্রতি তার দরদ এমন গভীর ও ব্যাপক হয় যে তা তারই সৃজনশীলতার প্রবাহের অনুবাদে নিরঙ্কুশ হয়ে ওঠে। ফলে বিশ্বধনবাদ-সাম্রাজ্যবাদের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ প্রভাবে ব্রাত্যজনের ক্রমশ সঙ্কটাপন্ন ভাষা, সংস্কৃতি ও অস্তিত্বের প্রতি জহিরের মমত্ব, তারই প্রখর কবিত্বযোগে, ‘গোস্তের দোকানে’র শুরু থেকে শেষ অব্দি, স্পষ্টতা থেকে ক্রমান্বয়ে স্বচ্ছতা লাভ করে। তবে জহির যশুরে জবানটির নিরবচ্ছিন্ন ব্যবহারে ব্রতী হননি। কিছু প্রমিত বাংলার পাশাপাশি গুটি কয়েক ইংরেজি ও হিন্দি শব্দও তিনি প্রবাহিত করেন তার উল্লিখিত ভাষাস্রোতে। এবার দেখা যাক, জহির হাসান কীভাবে প্রমিত ভাষার প্রচলিত শ্রেয়বোধের বিপরীতে ওই আঞ্চলিক জবানটিকে নিজের কবিত্ব, রাজনীতিক উপলব্ধি ও অঙ্গীকারের উপযোগী করে তোলেন অবলীলায়-(১) ‘কী হলো আমার/আমি দিন দিন মহৎ হতেছি!/আমার কী হলো/আমি ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়তিছি/খুদের মতন,…’ (গোস্তের দোকানে : ৩; গোস্তের দোকানে) (২) ‘সঙ্গে সঙ্গে মনে হইলো মুঝে সেই কবে/কানমলা খেয়েছিনু কতরূপে আজও খাই বোধ হয়/তা সাংকেতিকে!…..-তেঁতুল গাছের নিচে/ওলকচু গাছ/পাশে হলুদের বন/একটা শেয়াল দৌড় দিয়া কোথা যেন যায় চিরকাল!’ (ঐ :৯; ঐ) (৩) ‘এ দেশেতে কিছু নাই।/মনে হয় ভাঙা প্রকা- জাহাজ থাকি কত কত/পদহীন বদ দিন আঙলায়ে হুড় হুড় আসতেছে!…..আমি ডিভি লটারির আমরিকা যাবো।…..এই দেশে চাকে মধু নাই/কেমন কেবলি দিনে রাত এক্সাইল এক্সাইল/লাগতেছে!’ (ঐ : ১৩; ঐ) (৪)‘ কেউ চিরকাল গায় :/অসাম্যের টুপি থেকে জরি খসে পড়বেই একদিন!’ (ঐ : ২৩; ঐ) (৫) ‘আমি কুকুরের সামনে দু’কেজি গোস্ত ছুড়ে দিয়া/দূর থেকে দেখি-অপমানে-/সে তাকায়ে থাকে গোস্তের দোকানে/ঝুলন্ত গোস্তের টানে-/আমার গোস্তের পর মাথা রেখে ক্ষুধা পেটে/ঘুমিয়ে পড়েছে ঐ কুত্তা-/এই দৃশ্যদৃষ্টে কিবা করি ভ্যাবাচেকা আমি এইখানে-/পৃথিবীর ছোট্ট এই গোস্তের দোকানে!’ (ঐ : ২৯; ঐ)
আমাদের কবিতা কারো কারো হাতে প্রাগুক্ত ধরনের নৈরাজ্যবাদের চমক কেবল হয়ে ওঠেনি, জহিরের পূর্ববর্তী কালপর্বের, ‘পুলিপোলাও’ কাব্যখ্যাত সুব্রত অগাস্টিন গোমেজের হাতে, অপ্রচলিত, আভিধানিক এবং মধ্যযুগীয় শব্দ ব্যবহারের বাহুল্যে, হয়ে উঠেছে চাতুর্যপূর্ণ এবং চটকদার। পাশাপাশি কবিরূপী পদ্যকারদের হাতেও এভাবে, গত বিশ বছরে, আমাদের কবিতা হয়ে উঠেছে আত্মরতির অনুবাদ। এই প্রেক্ষাপটে জহিরের সক্রিয়তা নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী। তাই তার প্রতীক-রূপকও স্পষ্টতই সামাজিক বাস্তবতার প্রতিফলক হলেও এক ঐহিক সুদূরের আহ্বানে অসামান্য ব্যঞ্জনাময়। তাই তেঁতুল গাছ, ওলকচু এবং হলুদের বনের অপরূপ নিসর্গেও বঞ্চনার শেয়াল ‘দৌড় দিয়া কোথা যেন যায় চিরকাল!’ বঞ্চিতগণ অপেক্ষাকৃত উচ্চ বাজার দরে বিক্রি হতে চলে যান ‘ডিভি লটারির আমরিকায়’। আলোচ্য কবির কাব্যে শোষকের বিবেচনায় দলিত কি ধরা দেয় ‘কুত্তা’রূপে, যার ক্ষুধার মুখে অমানবিক পরিহাসের মাংস ছুড়ে দিলে ক্ষুধার্ত অবস্থায়ও সে ঘুমিয়ে পড়ে ওই গোস্তের ওপর? এই ঘটনায়, কবি নিজেকে।
‘ভ্যাবাচেকা’ আখ্যা দিলেও এই দৃশ্যে মর্মাহত পাঠক ‘কিবা করি’ ব’লে তার সঙ্গে কণ্ঠ মেলান ‘পৃথিবীর ছোট্ট এই গোস্তের দোকানে!’ মোচড় এবং দ্ব্যর্থবোধকতায়ও কবিতাটি এমন উত্তীর্ণ যে সহজে ভুলবার নয়।
লক্ষণীয় যে, জহির হাসান কেবল প্রমিত ভাষার শ্রেয়বোধ পরিত্যাগ করেন না, কবি হিসেবে শ্রেণীচ্যুতও হতে চান অভাবিতপূর্বরূপে : ‘কার ঠেলা খেয়ে রাত এসে গেছে/বটগাছে তাকে দেখা গেল।/ওগো বট, তোমার ডালেতে আজ রাত্রি আর আমি/শুয়ে রব।…..তোমার শরীর ভালো নয় জেনে/তোমার তলায় শুয়ে পড়লাম।/কী করি এই যে কুকুরটা ওয়ে শুতে চায়/মোর পাশে!/তাই বলে ভুলবশে স্বামী-স্ত্রী/ভাবিও না আমাদের! (ঐ : ২০; ঐ) শুধু তাই নয়, নিজ শ্রেণীচ্যুতির আকাক্সক্ষায় তিনি শোষিত-দলিতের সমাজে ‘ছড়িয়ে ছিটিয়ে’ মিশে যান ‘খুদের মতন’।
আলোচ্যমান গ্রন্থের দ্বিতীয় অংশ ‘দারোগার চিঠি’র ৭ সংখ্যক কবিতায় ‘পুঁজিবাদের এক শাদাগাড়ি’ বৃষ্টিতে রাস্তায় জমে থাকা ‘পচা পানি’ কবির ‘শার্টের শাদা ক্যানভাসে’ ‘অ্যাবস্ট্রাক্ট আর্ট’ এঁকে চলে যায়। কবি এর পিছু দৌড়ে যান। ‘এই আর্ট পুরা সাবকন্সাশ/আপনের আঁকা/নিয়া যান প্লিজ’ বলে তিনি ‘খরগোশ’ হয়ে দৌড়াতে থাকেন ‘গাড়িটার পিছনের পিছনে/দক্ষিণ দিকে আর উত্তর দিকে।’ গ্রন্থের তৃতীয় ও শেষ অংশ ‘বদরিকা’-র ২২ সংখ্যক কবিতায় একজন গ্রামবাসী বলেন : ‘হে নগর, তুমি আর পা/বাড়াইও না/ধানক্ষেত/তোমারে/ডরায়!’ এ অনবদ্য। প্রায় পৌনে এক শতাব্দী আগে লেখা জীবনানন্দ দাশের ‘উনিশ শো চৌত্রিশের’ (অগ্রন্থিত কবিতা; প্রকাশিত-অপ্রকাশিত কবিতাসমগ্র/জীবনানন্দ দাশ; আবদুল মান্নান সৈয়দ সঙ্কলিত ও সম্পাদিত; ফেব্রুয়ারি ১৯৯৪) কবিতায় বিভিন্ন নগরজুড়ে ধাবমান একটি মোটরকার গ্রাম বাংলায় ক্ষেতের পাশ ঘেঁষে ছুটে যায়। দাশ বাবু একে ‘অন্ধকার’ বলে অভিহিত করেন একাধিকবার। এদিকে সম্প্রতি পত্রিকান্তরে প্রকাশিত ভূমেন্দ্র গুহর সাক্ষাৎকার থেকে আমরা এও জানতে পারি, জীবনানন্দ দাশের ‘রূপসী বাংলা’ তৎকালীন বৃটিশ উপনিবেশের কবলে বাংলার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তথা ওই উপনিবেশবিরোধী চেতনারই ফল। অথচ পশ্চিমা ও বঙ্গীয় তিরিশি আধুনিকতার স্রোতে আমাদের অনেক কবিই নানাভাবে ভেসে যান। বর্তমান পরোক্ষ মার্কিন উপনিবেশ দূরে থাক, সর্বশেষ প্রত্যক্ষ পাকিস্তানি উপনিবেশের কাব্যিক বিরোধিতাও আশানুরূপ পরিমাণে পরিদৃষ্ট হয়নি আমাদের কবিতায়। জহির হাসান এই অভাবের জায়গাগুলো, বলতে গেলে, নীরবেই উপলব্ধি করেন প্রবলভাবে। তিনি এও টের পান, ধনতন্ত্র ও সাম্রাজ্যবাদের ভয়াবহ আস্ফালনের এই যুগে গ্রামবাংলার সংস্কৃতি কেবল নয়, গ্রামীণ ভাষাও হুমকির সম্মুখীন। বিজ্ঞাপনে এই ভাষার প্রাগুল্লিখিত ব্যবহারে এও প্রতীয়মান হয় যে, কৃষক, তার ভাষা ও সংস্কৃতিও পণ্য এবং ধানক্ষেত পরিণত হবে পণ্যের বাজারে। তাই লীয়মান অপরূপ বাংলা আর বাংলার সঙ্কটাপন্ন মানবজীবন গহিন মমতায় ভিড় করে জহিরের কবিতায় : (১) ‘পাখি ডাকছে।/পাতা নড়ছে।/চাঁদ ডুবছে।/কুয়াশা ভাসে ভোরে।/হরিণের শিং থেকে একটু উপরে।’ (দারোগার চিঠি:৯; গোস্তের দোকানে) (২) ‘আমরা কোথায়? বেঁচে না নাবেঁচে/কাকে জিজ্ঞেস করবো,/কেউ এসে বলে দিক শুধু!’ (ঐ:১০; ঐ) (৩) ‘ডলার দিয়ে গো কাগজের নৌকা বানাও/তাতে চড়ি ভাসো স্বপ্নে আসো চেষ্টা করি’ (ঐ:১৩; ঐ) (৪) ‘কাম নাই ক্রিয়াপদে। সেক্স মানুষে দেয়নি জোড়া।’ (ঐ:১৯: ঐ) (৫) ‘এ জীবনে যদি নদী পার হতে পারি/জাতিসংঘের চাকরি ছেড়ে দেব।’ (ঐ:২৮; ঐ) (৬) ‘আমি শেষমেশ চমৎকার/মার জরায়ুতে টিউমার/কিছু টাকা ধার/খুব দরকার!’ (বদরিকা : ১১: ঐ) (৭) ‘নিম্নমধ্যবিত্ত পেট পুরে খাবো জেসসাসের/সামনে মাটিতে বসে তাতে পরনে লুঙ্গি থাকুক আর/না থাকুক!’ (ঐ:১৫; ঐ) (৮) ‘…কিন্তু যারা দিগন্তকে টেনে/লাম্বা করছেন তাগের খিদের রুটিগুলা/রোদে শুকানোর জন্যে আগেভাগে/তোমাদের মেঘগুলান সরাও!’ (ঐ:১৭; ঐ) (৯) ‘ঝড় উঠে গেছে রেগেমেগে/বৃষ্টির দাবড় খেয়ে ভিজে ভিজে বাড়ি যাব/আজ ছাগলের সাথে,/জ্বর তাতে আসুক আর না/আসুক!’ (ঐ:২৪; ঐ) (১০) ‘ও কুকুর কাছে আয়/ও কদম্ব বুকে আয়/কেন জানি বিনা কারণেই তোদের নিকট/সাধারণ ক্ষমা চাইতে মন চাচ্ছে।’ (ঐ:২৮; ঐ)
তবে আলোচ্যমান কাব্যটি চট্টগ্রাম বা সিলেটের ভাষায় লিখিত হলে তা পাঠকসকলের বোধগম্য (সারফেস মিনিং বোঝার ক্ষেত্রে) যেমন হতো না, ভাষাশ্রয়ী কাব্যিকতার আস্বাদনও এভাবে ঘটতো কিনা হলফ করে বলা যায় না। আর জহিরের ‘মুঝে’-এই হিন্দি শব্দের একাধিক ব্যবহার, যার অর্থ ‘আমাকে’, সঠিক হয়নি। ওপরে উদ্ধৃত একটি দৃষ্টান্ত এক্ষেত্রে পুনরায় স্মর্তব্য : ‘সঙ্গে সঙ্গে মনে হইলো মুঝে সেই কবে/কানমলা খেয়েছিনু…’। এখানে শেষ শব্দের স্থলে ‘দিয়েছিল’ হলে যথার্থ হতো। নিয়মানুগ বাক্য গঠনের ক্ষেত্রে তিনি শব্দ সংস্থানের প্রচল মাঝে মাঝে উল্টে-পাল্টে দেন। কার্ল মার্কস যে বলেন : ‘বুর্জোয়ারা তাদের দোকানদারি বোল দিয়ে কলুষিত করেছে একক জাতীয় ভাষাকেও’ (এ কথা স্মরণ করেন স্ট্যালিন তার প্রাগুক্ত প্রবন্ধে), জহির কি এজন্যই এভাবে চাপ সৃষ্টি করেন প্রমিত ভাষার ব্যাকরণ কিংবা প্রচলের ওপর? এই গ্রন্থে বহুল পরিচিত বাংলা ছন্দ ছাড়াও একাবলী ছন্দেও কবিতা লেখেন। তবে এভাবে দেখা যায়, ভাষার আঞ্চলিকতায় প্রমিত ভাষার কাব্যরুচিও ব্যাহত হয় না। কাব্যিকতার শর্তটি বুর্জোয়ায়িক বা বড়জোর মধ্যবিত্তের হলেও জহির তার অভিন্ন শ্রেণীর পাঠক সমাজের প্রতিও শ্রদ্ধাশীল। তাই তার পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদ ও উপনিবেশবাদবিরাধিতা পাঠককে আরো চমকে দেয়, যখন তিনি বলেন : ‘আমি মরে যেতে চাই নিজ মনোবলে।’ (ঐ:৪; ঐ) কিংবা ‘ঐ তো লোকটা পাশ দিয়া ধানক্ষেতে/একটা কুকুর পিছু পিছু যাচ্ছে/তবু লোকটা মনিব নয় ওর!/কেন জানি মন চাচ্ছে বাউল আবদুল করিম শাহের গান শুনি/আর নেচে নেচে ফের/বৃটিশবিরোধী আন্দোলন করি!’ (ঐ:৫; ঐ)

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: