জীবনে এমন কত বিচ্ছেদ, কত মৃত্যু আছে, ফিরিয়া লাভ কি? পৃথিবীতে কে কাহার…

কা মা ল লো হা নী
গাজী ভাই ভাষা আন্দোলন ও সর্বস্তরে বাংলার প্রচলনে ছিলেন প্রচণ্ড আবেগপ্রবণ এবং অঙ্গীকারাবদ্ধ। তিনি কিন্তু বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্টে বাংলাভাষায় লিপিবদ্ধ করার প্রস্তাব দেন। বাংলায় নিজে আরজি লিখেছিলেন এবং সওয়াল-জওয়াব বা জেরাও বাংলায় করার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। এমনকি কোনও হাইকোর্ট বা সুপ্রিমকোর্টে মাতৃভাষায় সব কাজ পরিচালনা হয় কিনা আমার জানা নেই। কিন্তু তিনি করে দেখিয়েছেন

ভাষা সংগ্রামী, বীর মুক্তিযোদ্ধা, গণসংস্কৃতি পত্তনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব, প্রগতিশীল ছাত্র রাজনীতির অগ্রণী পুরুষ গাজীউল হক ৮০ বছর বয়সে পূর্ব হাজীপাড়ার নিজ বাসভবনে ১৭ জুন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। যে নায়ক সক্রিয় ছিলেন আন্দোলন-সংগ্রামে সারাটি জীবন। তাকে শ্রদ্ধা, বিনম্র।
২.
উনিশশো বায়ান্ন। একুশে ফেব্র“য়ারির সকাল। ঢাকা শহরের স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রী সকলেই জমায়েত হয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ে মধুর ক্যান্টিনের সামনে একটি আম গাছ তলায়। সকলেই উদ্বিগ্ন কারণ শহরে ১৪৪ ধারা জারি করেছে মুসলিম লীগ শাসনের মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমিন এবং পূর্ব পাকিস্তানের চিফ সেক্রেটারি আজিজ আহমদ। মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা রক্ষা এবং অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার দাবিতে আন্দোলনরত তরুণ ছাত্রসমাজ আজ সিদ্ধান্ত নেবে, তারই ওপর নির্ভর করছে ভাষা সংগ্রামের ভবিষ্যৎ।
ওদিকে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের বৈঠক বসেছে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের বাইরে রাজনীতিবিদ আবুল হাশিমের সভাপতিত্বে। ১৪৪ ধারা ভেঙে ভাষার লড়াই অব্যাহত থাকবে কিনা, সেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে। মোহাম্মদ তোয়াহা, ওলি আহাদ যুব সম্প্রদায়ের পক্ষে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করার পক্ষে মত প্রকাশ করছেন যুক্তিতর্ক দিয়ে। ছাত্র প্রতিনিধি আবদুল মতিনসহ সকলেই দৃঢ়চিত্তে লীগ অপশাসনের এই কুকীর্তিকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে ১৪৪ ধারা ভেঙে আন্দোলন এগিয়ে নেয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করছেন। কিন্তু সর্বদলীয় নেতা, রাজনৈতিক প্রতিনিধিরা সকলেই বলছিলেনÑ বর্তমান অবস্থায় মুসলিম লীগ শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার মতন শক্তি লীগবিরোধীদের নেই। সুতরাং ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করতে গিয়ে মূল আন্দোলনটাকেই ভেস্তে দেয়া ঠিক হবে না। পরিষদের সম্পাদক কাজী গোলাম মাহবুব তুলে ধরলেন ভঙ্গ না করার যুক্তি। অবশেষে ছাত্র যুব প্রতিনিধিদের বক্তব্য ধোপে টিকল না এবং সিদ্ধান্ত হল : ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করা সঠিক সিদ্ধান্ত হবে না। এমনকি সেদিন এমন এক অবিবেচক সিদ্ধান্ত নেয়া হল যে, যে মুহূর্তে ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ না করার সিদ্ধান্ত অমান্য করবে, তখন থেকেই বিনা ঘোষণায় সর্বদলীয় পরিষদটি বাতিল হয়ে যাবে। অনড় ছাত্র প্রতিনিধি ফিরে গেলেন বিশ্ববিদ্যালয়ে।
তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলা ছাত্রছাত্রীদের বিপুল সমাবেশে পরিণত হয়েছে। অপেক্ষমাণ সকলেও, কি হয় সিদ্ধান্ত। ওরা প্রস্তুত জুলুমশাহীকে পর্যুদস্ত করতে।
আমতলায় শুরু হল সেই যুগান্তকারী ছাত্রসভা। সভাপতির আসনে বসলেন প্রগতিশীল ছাত্রনেতা গাজীউল হক। সৌম্যদর্শন যুবক, কণ্ঠে তাঁর জলদ গম্ভীর আওয়াজ। বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা কর্ম পরিষদের আহ্বায়ক আবদুল মতিন পরিস্থিতি এবং সর্বদলীয় বৈঠকের ১৪৪ ধরা ভঙ্গ করতে অনীহা সবিস্তারে ব্যাখ্যা করে দীর্ঘ বক্তব্য রাখলেন এবং সমাবেশকে জানালেন ছাত্র প্রতিনিধিদের ভূমিকা এবং ভঙ্গের পক্ষে দৃঢ়চিত্ত সিদ্ধান্তের কথা। তারপর ছেড়ে দিলের সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের ওপর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে। উপস্থিত ছাত্রছাত্রী স্কুল কি বিশ্ববিদ্যালয়ের, সকলেই একই কণ্ঠে ১৪৪ ধারা ভাঙার পক্ষে রায় দিলেন। সভাপতি গাজীউল হক সিদ্ধান্ত ঘোষণা করলেনÑ সেই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তÑ যা বাঙালি জাতির গৌরবতিলক হয়ে রইল।
ছাত্রছাত্রীদের ওই সিদ্ধান্ত বাংলা ভাষাভাষী সকল নাগরিকের ঐতিহাসিক পট পরিবর্তনÑ বাঙালি জাতিসত্তাকে নব উত্থানে জাগ্রত করেছিল। যে ভূখণ্ডকে দ্বিখণ্ডিত করা হয়েছিল সেই গৌরবোজ্জ্বল বাংলার পূর্ব অংশ মাতৃভূমির আঁচল থেকে ছিনতাই করে ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতির আসুরিক পত্তন ঘটেছিল সেই পূর্ববঙ্গে, শুরু হয়েছিল মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক শোষণ। বাংলার যে সাধারণ মানুষ ভেবেছিল মুসলমানদের জন্য পৃথক অঞ্চল পেলেই সুখী হতে পারবে, তাদের গণতান্ত্রিক এবং প্রগতিবাদী সহযাত্রীরা বিরোধিতা করলে সাধারণ মানুষ ভেবেছিলেন এই দেশভাগ বুঝি তাঁদের স্বস্তি-শান্তি দেবে। কিন্তু অল্প সময়েই সবাই অনুধাবন করলেনÑ না ভুলের মাশুল গুনতে হবে। পাকিস্তান রাষ্ট্র জš§ নেয়ার মাত্র তিন সপ্তাহ পরেই কিন্তু চৈতন্যোদয় ঘটতে থাকল, কারণ মুসলিম লীগ সাম্প্রদায়িক শক্তি ও তার নেতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর উটপাখীর মতন আচরণে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিলেন বাংলার মানুষ। ১৯৪৮ সালেই ক্ষোভ ও ভাষা সংগ্রাম সূচিত হয়েছিল, তারই রক্তক্ষয়ী এবং ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের নায়ক হয়ে গেলেন গাজীউল হক। ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের অগ্রসেনানীদের একজন হয়েছিলেন তিনি।
সেদিনের সিদ্ধান্ত, কৌশলী দশজনা মিছিল এবং হায়েনার হামলা নূরুল আমিনের গুলিতে হত্যা হলেন তরুণ তাজা প্রাণÑ সালাম, বরকত, রফিকউদ্দিন, জব্বার, সালাহ উদ্দিন। একসার জ্বলন্ত নাম, বাংলার মানুষের হƒদয়কে প্রচণ্ডভাবে হেনেছিল, তাই সাহসের দুর্বার গতি আমাদের শোষণের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে, সাম্প্রদায়িকতাকে পরাভূত করার যুদ্ধে কিংবা ইঙ্গ-মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে রুখে দেবার যে কঠিন প্রতিরোধ, সেই মহতী আন্দোলনেও গাজীউল হক সামনের সারিতে ছিলেন, বিছানা নেয়ার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত।
৩.
তাই তো সেদিন দেশমাতৃকার মুক্তির লক্ষ্যে যূথবদ্ধ হলেন দেশবাসী, মুক্তির মন্ত্রে দীক্ষিত হলেন সকলে, সবাই দাঁড়ালেন এক দণ্ডে। গাজীউল হক সেই সেদিনেরÑ একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের আরেক অধিনায়ক যুদ্ধপ্রস্তুতি পর্বে। বগুড়ায়। ভয়ডর উপেক্ষা করে মুক্তির জন্য যুদ্ধে এগিয়ে যাবার শপথে শহরবাসীকে ঐক্যবদ্ধ করলেন তিনি। দিনরাত্রির নিত্যসহচর ছিলেন তিনি। জনগণের নিবেদিতপ্রাণ এই মুক্তি সংগ্রামীকে অপপ্রচারেরও সম্মুখীন হতে হয়েছিল নিজেদেরও মধ্যে। কিন্তু এসব উপেক্ষা করেই গাজীউল হক স্থিরলক্ষ্যে পৌঁছবার উদ্দেশ্যের অভিযাত্রী থেকে গেলেন আজীবন। কারণ পাকিস্তান নামের সাম্প্রদায়িক দেশটির মুসলিম লীগ নেতৃত্ব যে জুলুম ও পূর্ব বাংলার সম্পদ অপহরণ শুরু করেছিল অথচ অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক বৈষম্য ঘটিয়ে শোষণের চাকা সচল রাখতে সচেষ্ট ছিল, তার বিরুদ্ধে সংগঠিত বাংলার সব মানুষ সংঘবদ্ধ হলেন একাত্তরে, বঙ্গবন্ধুর ডাকে। বাধলো লড়াই। মাত্র ন’মাসেই বিশ্বের অন্যতম দুর্ধর্ষ সেনাবাহিনী পাকিস্তানি সৈন্যরা পরাজিত হল মুক্তিসেনাদের হাতে। গাজীউল হক ওই মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম ‘গাজী’। দেশমাতৃকাকে বাঁচাবার এবং হানাদার পাকিস্তানি সেনা বাহিনীর হাত থেকে অপহƒত বাংলাকে পুনরুদ্ধার করতে এবার ঝাঁপিয়ে পড়লেন প্রচারে, গণমাধ্যমে। টাঙ্গাইলের মান্নান ভাইয়ের নেতৃত্বে সাপ্তাহিক ‘জয় বাংলা’ পত্রিকা কলকাতার পার্ক সার্কাসের বালুহাক্কাক লেন থেকে বেরুতে যখন শুরু করল, তখন প্রখ্যাত ছাত্র নেতা, রাজনৈতিক সংগঠক এবং আইনজীবী গাজীউল হক দেশের জন্য লড়াইয়ে একজন হকার হয়ে গড়ের মাঠের আশপাশ ঘিরে প্রচার করতে থাকলেন আর বিক্রি করতে থাকলেন ‘জয় বাংলা’ নিজেরই হাতে। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রেও হলেন নিয়মিত কথক। তখন মনে আছে, ধাঙর বাজারের কাছে একটি বাসায় থাকতেন গাজী ভাই, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের আমরা অনেকেই যেতাম তার বাসায়। আপ্যায়ন করতেন ভাবী। চালের আটার রুটি আর গরুর ভোনা মাংস। যুদ্ধদিনের সীমিত সাধ্যের মধ্যে এ যে কত বড় পরম পাওয়া, আজ তা বুঝতে পারব না। তবু দেশ মুক্ত হবার পর বহু দিনই চালু ছিল এই রেওয়াজ। বড় মাপের আইনজীবী, বিপুল আয়ের এক কমিটেড রাজনীতিক। সঙ্গতি তার ছিল তো বটেই কিন্তু তা সত্ত্বেও ওদের দুজনারই মনটা ছিল বিশাল।ঃ এ প্রসঙ্গে মনে পড়ছে তার গভীরতম বন্ধু মোহাম্মদ সুলতানের কথা। সুলতান স্ত্রী নূরজাহান ভাবী মৃত্যুবরণ করেছিলেন বহু আগেই। কিন্তু এক্ষেত্রে বন্ধু সুলতানকে কী দারুণভাবে যে বন্ধুত্ব দিয়েছিলেন ছেলেমেয়েদের গড়ে তুলতে, তার হিসাব মেলানো ভার। আবার সুলতান ভাই মৃত্যুবরণ করলেও তার পরিবারের দুই ছেলে ও দুই মেয়েকে কী অনন্য পিতৃøেহই না দিয়েছিলেন তিনি। গাজীউল হকই ছিলেন ওদের অভিভাবক। আমৃত্যু গাজীভাই সম্পা-শুক্তিদেরই অভিভাবক ছিলেন। রাজনৈতিক সংস্কৃতির এ যে কি অপরিমেয় শক্তি, মানুষকে আপন করে নেয়ার তা কেবল আমরা দুটি পরিবারকে চিনি, তারাই জানি। গাজী ভাই যে কী অসাধারণ দৃষ্টান্ত রেখে গেলেন, তা কেবল সমাজে দেদীপ্যমান, ভাস্বর হয়েই থাকবে না, যেদিন আমরা সৎ মানুষ হতে পারব সেইদিন অনুসরণ কিংবা অনুকরণ করতেও শিখব। একটি নয়, ভূরি ভূরি উদাহরণ দেয়া যাবে এ প্রসঙ্গে।

৪.
ভুল বুঝেছে মানুষ, কতিপয় সমালোচনা করেছে বটে, কিন্তু গাজীউল হক তার নির্দিষ্ট পথযাত্রায় ক্লান্ত হননি। আবার নিবেদিতপ্রাণ কর্মী-সংগঠক যখন অঙ্গীকারাবদ্ধ রাজনৈতিকে পরিণত হয়েছেন, মেধা এবং পরিশ্রম দিয়ে দেশপ্রেমকে সাজিয়েছিলেন, নিরন্তর আন্দোলনে জীবন অতিবাহিত করে গেলেন, পেয়েছেন কি প্রতিদান? নাকি প্রতিহিংসাই তার সঙ্গী হয়েছিল? গাজীউল হক তো তাদের একজন যারা পাকিস্তান নামক এক বিষবৃক্ষ ও বিষাক্ত ফলের বিরুদ্ধে সূচনাকাল থেকেই গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পত্তন করেছিলেন। সামন্তবাদ এবং ঔপনিবেশিকতাবাদকে রুখে দিয়ে সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্তকে প্রতিহত করতে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলেন। ছাত্রজীবনেই এ সংগ্রাম প্রচণ্ড বেগে প্রবিষ্ট হয়েছিল ছাত্র ও যুবসমাজের ভেতর। তখন কিন্তু এই গাজী ভাইরা বিড়ি শ্রমিক ইউনিয়ন, কিংবা কৃষক কমিটি এবং ট্রেড ইউনিয়নও করতেন রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার কারণে। পাকিস্তানবিরোধী গণআন্দোলন যখন তৈরি হচ্ছিল ছাত্রনেতা গাজীউল হকরা ভেবেছিলেন এদেশে অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির পত্তন করতে হবে। পূর্বপাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন গড়ে তুলেছিলেন ৫২-র ভাষা আন্দোলনের পরপরই। এমনি পর্যায়ে পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টিরও সংস্পর্শে আসেন। কিন্তু কাজ করছিলেন মওলানা ভাসানীর একজন দক্ষ সংগঠক হিসেবে। ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিই ছিল তার কর্মতৎপরতার কেন্দ্রবিন্দু। কিন্তু পরবর্তীকালে আইনব্যবসায় ব্যস্ত হয়ে যাওয়ায় সরাসরি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সক্রিয় না থাকলেও বঙ্গবন্ধুর প্রতি অগাধ শ্রদ্ধাবোধ তাকে বাঙালি জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের চারটি মৌলস্তম্ভের প্রতি তিনি আকর্ষিত হন। ফলে আওয়ামী লীগ ও আওয়ামী ফাউন্ডেশনের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে যান।
সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে আজীবন লড়াকু মানুষটি কোনও দিনও ওই স্বৈরাচার ও মৌলবাদের কার্যক্রম গ্রহণ কিংবা সহ্য করতে পারতেন না। যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড ঘৃণা পোষণ করতেন। মনেপ্রাণে ওই একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী অপশক্তিকে জামায়াত, শিবির, আলবদর, আল শামসের বিচার ও শাস্তির দাবিতে সোচ্চার ছিলেন। পেশায় আইনজীবী, নেশায় গণতান্ত্রিক রাজনীতির উপাসক গাজীউল হক দেশমাতৃকার জন্য জীবন উৎসর্গ করতেও দ্বিধান্বিত ছিলেন না।
৫.
গাজী ভাই ভাষা আন্দোলন ও সর্বস্তরে বাংলার প্রচলনে ছিলেন প্রচণ্ড আবেগপ্রবণ এবং অঙ্গীকারাবদ্ধ। তিনি কিন্তু বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্টে বাংলাভাষায় লিপিবদ্ধ করার প্রস্তাব দেন। বাংলায় নিজে আরজি লিখেছিলেন এবং সওয়াল-জওয়াব বা জেরাও বাংলায় করার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। এমনকি কোনও হাইকোর্ট বা সুপ্রিমকোর্টে মাতৃভাষায় সব কাজ পরিচালনা হয় কিনা আমার জানা নেই। কিন্তু তিনি করে দেখিয়েছেন। এই আন্দোলন নিরবচ্ছিন্নভাবে চালিয়েছিলেন বলেই অনেকেই উদ্বুদ্ধ হয়েছেন। সে জন্য ‘একুশে চেতনা পরিষদ’ গঠন করেছিলেন এবং ১৯৭১ সালের প্রথম দিকে সাভারে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রে ‘ভাষাসৈনিক সমাবেশ’ আয়োজন করেছিলেন। এ জন্য জেলায় জেলায় সফর করেছিলাম আমরা। গাজীভাই ছিলেন সঙ্গে আমি এবং গণস্বাস্থ্যের শফিক আহমদ ছিলেন। প্রায় ৩৫০ জন ভাষাসৈনিক এসেছিলেন সেই সমাবেশে। আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ সম্মেলন উদ্বোধন করেছিলেন সাভার স্মৃতিসৌধে। শেষ করেছিলাম কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে।
এই তো সেই মিনার, বায়ান্নর শহীদদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে স্থাপিত হয়েছিল এবং জাতির প্রতিবাদী মঞ্চ হিসেবে রূপ নিয়েছে, নানা সংকটে সমস্যায় এই শহীদ মিনার দিয়েছে সাহস। সেই মহান পথপ্রদর্শক কীর্তির এক মহানায়ক অবশেষে অন্তিম যাত্রায় এই চত্বরেই এলেন ১৮ জুন সকাল ১০-৩০ মিনিটে। অগুণতি মানুষের নিবেদিত শ্রদ্ধা নিয়ে চলে গেলেন বগুড়ার সুলতানিগঞ্জে, বাবার পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত হয়েছেন।ঃ শেষ রক্তিম অভিবাদন জানাই তাকে, যিনি ছিলেন অকুতোভয় সেনানী আমাদের সকলের।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: