জীবনে এমন কত বিচ্ছেদ, কত মৃত্যু আছে, ফিরিয়া লাভ কি? পৃথিবীতে কে কাহার…

babaআজ বাবা দিবস। প্রতি বছর জুনের তৃতীয় রোববার বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই (প্রায় ৫২টি দেশে) দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। অন্যান্য দেশে বিভিন্ন দিনে দিবসটি পালন করা হয়। বাবার প্রতি সন্তানের ভালোবাসা প্রকাশের জন্য দিনটি বিশেষভাবে উৎসর্গ করা হয়ে থাকে। যদিও বাবার প্রতি সন্তানের ভালোবাসা প্রকাশের জন্য বিশেষ কোনো দিনের প্রয়োজন হয় না, তবুও মা দিবসের অনুকরণে পৃথিবীব্যাপী পালিত হয় বাবা দিবস। এ দিবসটি নিয়ে বিশেষ করে পশ্চিমা সমাজে বেশ একটা আনন্দঘন পরিবেশ লক্ষ্য করা যায়। বাবার জন্য কেক অর্ডার দেয়া, গিফট কেনা, ঘর সাজানো, পার্টি আয়োজন করাÑ এ ধরনের আরো নানা উপায়ে তারা বাবা দিবসটিকে পালন করে থাকে। পাশ্চাত্যের মতো বড় পরিসরে, জাঁকজমকভাবে আমাদের দেশে বাবা দিবস পালিত না হলেও, অল্প পরিসরে কিন্তু ঠিকই পালিত হয় বাবা দিবস। তাছাড়া নতুন প্রজন্মের কাছে মা দিবস বা বাবা দিবসের ধারণাগুলো দিনকে দিন বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

বাবা দিবসের সূচনা
মা দিবসের মতো বাবা দিবস পালনও কিন্তু হঠাৎ করেই শুরু হয়নি। মা দিবসের ধারণাটি মানুষ যেমন প্রথম প্রথম একেবারেই গ্রহণ করতে চায়নি, অনেক চেষ্টার পর মিস অ্যানা জার্ভিসকে মা দিবসের দাবি প্রতিষ্ঠা করতে হয়; ঠিক তেমনি বাবা দিবসকে একটি আলাদা দিবস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতেও বেশ বেগ পেতে হয়। মা দিবসের মতো বাবা দিবসকে একটি দিবস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতেও একটি নারীর ভূমিকা ছিল সবচেয়ে বেশি। তিনি হচ্ছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনের মেয়ে মিস সোনোরা লুইস স্মার্ট ডড (গং ঝড়হড়ৎধ খড়ঁরংব ঝসধৎঃ উড়ফফ)। ১৯১০ সালের ফাদারস ডে বা বাবা দিবস পালনের ধারণা সোনোরার মাধ্যমে প্রথম আমেরিকাতেই শুরু হয় এবং পরবর্তী সময়ে তা পৃথিবীর বহু দেশেই ব্যাপ্তি লাভ করে। সোনোরা চেয়েছিলেন জুনের কোনো এক রোববার বাবা দিবস পালন করবেন। তাই তিনি ১৯ জুনকে বেছে নিয়েছিলেন বাবা দিবস হিসেবে। সেই হিসেবে ১৯১০ সালের ১৯ জুন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে বাবা দিবস পালিত হয়। অবশ্য তার আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া প্রদেশের রবার্ট ওয়েব ১৯০৮ সালের ৫ জুলাই বাবা দিবস পালনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। তবে তার সে বাবা দিবস পালনের উদ্যোগটি আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পায়নি বলে মিস সোনোরাকেই ফাদারস ডে বা বাবা দিবসের প্রবক্তা হিসেবে ধরা হয়ে থাকে।

বাবা দিবসের প্রয়োজনীয়তা
আপাত দৃষ্টিতে অনেকের কাছেই মা দিবস বা বাবা দিবস পালনের বিষয়টি খুব একটা গুরুত্ব পায় না। তাই বলে এ ধরনের দিবসগুলো একেবারেই যে অপ্রয়োজনীয়, তেমনটা কিন্তু মোটেও বলা যাবে না। সন্তানের জন্য বাবার ভালোবাসা অসীম। মোগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা সম্রাট বাবর সন্তানের প্রতি পিতার ভালোবাসার এক অনন্য উদাহরণ হয়ে আছেন। তিনি সন্তান হুমায়ুনের জীবনের বিনিময়ে নিজের জীবন ত্যাগ করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেননি। এমন স্বার্থহীন যার ভালোবাসা, সেই বাবাকে সন্তানের খুশির জন্য জীবনের অনেক কিছুই ত্যাগ করতে হয়। বাবা দিবসে সন্তানদের সামনে সুযোগ আসে বাবাকে অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে ধন্যবাদ জানানোর। তাছাড়া বাবা দিবস পালনের ফলে সমাজে এবং পরিবারে বাবাদের যে অবদান তা যে সমাজ এবং নিজের সন্তানরা মূল্যায়ন করছে, এ বিষয়টিও বাবাদের বেশ আনন্দ দেয়। তাছাড়া অনেক সন্তানই আছে, যারা বাবা-মায়ের দেখাশোনার প্রতি খুব একটা মনোযোগী নয়। মা দিবস বা বাবা দিবস তাদের চোখের সামনের পর্দাটি খুলে ফেলে বাবা-মায়ের প্রতি তার দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এ ক্ষেত্রে তাই বলা যায়, পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় করতে বাবা দিবসের আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। মোটকথা আমাদের পরিবার তথা সমাজে বাবার যে গুরুত্ব তা আলাদাভাবে তুলে ধরাই বাবা দিবস পালনের মূল উদ্দেশ্য।

ফাদারস ডে সেলিব্রেশন
প্রথমদিকে ফাদারস ডে বা বাবা দিবসের খুব একটা গ্রহণযোগ্যতা না থাকলেও দিনে দিনে এটা মানুষের কাছে অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠে। বাবা দিবসের সূচনা যে দেশ থেকে, সেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে শুরু করে লাতিন আমেরিকার দেশ আর্জেন্টিনা, ব্রাজিলসহ বেলজিয়াম, ফ্রান্স, জার্মানি, জাপান, নিউজিল্যান্ড, নরওয়ে, ভারত এবং বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বহু দেশেই এখন বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে পালিত হয় বাবা দিবস।
ফাদারস ডে সেলিব্রেশনের ক্ষেত্রে দেশ ভেদে দেখা যায় বৈচিত্র্য। বিভিন্ন দেশে বিভিন্নভাবে পালিত হয় এ দিবসটি। ফাদারস ডে সেলিব্রেশনের মূল বিষয় হচ্ছে গিফট। অর্থাৎ এদিনে ছেলেমেয়েরা তাদের বাবাদের কোনো না কোনো গিফট দিতে খুব পছন্দ করে। আর বাবারাও ছেলেমেয়েদের কাছ থেকে গিফট পেয়ে বেশ অভিভূত হয়ে যান। এ গিফট দেয়ার ক্ষেত্রেও দেশ ভেদে দেখা যায় ভিন্নতা। কোনো কোনো দেশে ছেলেমেয়েরা বাবাকে ফুলের তোড়া উপহার দিয়ে বাবা দিবসের শুভেচ্ছা জানায়, আবার কোনো কোনো দেশে ফাদারস ডে কার্ড গিফট করে বাচ্চারা। আবার কোথাও কোথাও বাবাকে ছেলেমেয়েরা নেকটাই ও উপহার দেয়। অনেকে আবার ফাদারস ডে উপলক্ষে স্পেশাল কেক কাটার আয়োজনও করে। আমাদের দেশেও ফাদারস ডে সেলিব্রেশনের ক্ষেত্রে বাবাকে উইশ করা বা শুভেচ্ছা জানানো, কার্ড দেয়া বেশ প্রচলিত। কার্ড ছাড়াও গিফট হিসেবে ফাদারস ডে মগ, টি-শার্ট ইত্যাদি বেশ প্রচলিত।
একটি শিশুর জন্য বাবা হচ্ছেন সবচেয়ে বড় শক্তি। পরিবারে একটি শিশু তার নিষ্পাপ চোখে বাবাকে দেখে পরিবারের সবচেয়ে ক্ষমতাধর, জ্ঞানী, স্নেহশীল এবং পরিবারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে। মেয়ে শিশুরা জীবনের শুরুতেই আদর্শ পুরুষ হিসেবে বাবাকেই কামনা করে। অন্যদিকে ছেলে শিশুরা জীবনের শুরুতে বাবাকে দেখে শক্তির উৎস হিসেবে। তাই ছেলে শিশুরা চায় বাবার মতোই শক্তি অর্জন করতে তথা পরিবারের সর্বময় কর্তা হতে। এছাড়া শিশু যখন বাড়ন্ত অবস্থায় থাকে, তখন বাবা তার মূল্যবান উপদেশ দিয়ে সন্তানদের জীবনের পথ বাতলে দেন। তাই বলা যায় মানবজীবনে বাবার অবদান এবং গুরুত্ব অপরিসীম। তাই আসুন আমরা আজ এ বাবা দিবসে নিজেদের বাবাকে একবারের জন্য হলেও যেন বলি ‘বাবা তোমাকে অনেক অনেক ভালোবাসি’।
সাইদুর রহমান
sydurbd@gmail.com

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: