জীবনে এমন কত বিচ্ছেদ, কত মৃত্যু আছে, ফিরিয়া লাভ কি? পৃথিবীতে কে কাহার…

মুনতাসীর মামুন
প্রগতি লেখক ও শিল্পী সংঘের একটা অভিঘাত পড়েছিল তৎকালীন তরুণদের মধ্যে। সংঘ লেখকদের মধ্যে অসাম্প্রদায়িকতা বোধ, ফ্যাসি ও নাৎসিবাদের বিরুদ্ধে মতাদর্শ, মানবতা বোধ প্রভৃতি সৃষ্টি করেছিল। উল্লেখ্য, পঞ্চাশ ও ষাট দশকের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলন, পাকিস্তানবাদবিরোধী জনমত সৃষ্টিতে যেসব সাহিত্যিক অবদান রেখেছিলেন, তাদের একটা বড় অংশ প্রগতি লেখক ও শিল্পী সংঘের কর্মকা-ের সঙ্গে জড়িত ছিলেন এবং তাদের অনেকেই এখন সক্রিয়।

প্রগতি লেখক ও শিল্পী সংঘ
ঢাকার প্রগতিশীল সাহিত্য আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল গত শতকের তৃতীয় দশকে ঢাকায় স্থাপিত ‘প্রগতি লেখক ও শিল্পী সংঘ’। বিশ শতকের ত্রিশ-চল্লিশ দশক ছিল বিশ্বব্যাপী ফ্যাসি ও নাৎসিবিরোধী প্রগতিশীল লেখক-শিল্পী সংস্কৃতসেবীদের আন্দোলনের সময়।
হিটলার-মুসোলিনি যখন ক্ষমতার শীর্ষে, তখন প্যারিসে মানবতাবাদী প্রগতিশীল লেখক-শিল্পীরা একটি সম্মেলনের আয়োজন করেন। উদ্যোক্তাদের মধ্যে ছিলেন ম্যাক্সিম গোর্কি, রঁমারল্যাঁ, আন্দ্রে জিদ, আদ্রে মালরো, ই এম ফরস্টার প্রমুখ। তারা গঠন করেন ‘ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অফ রাইটার্স ফর দ্য ডিফেন্স অফ কালচার অ্যাগেইনস্ট ফ্যাসিজম’। এর সূত্র ধরে বিভিন্ন দেশে এর শাখা বা সহযোগী সংগঠন গড়ে উঠতে থাকে।
এ পরিপ্রেক্ষিতে লন্ডনে ১৯০৫ সালের নভেম্বরে ভারতীয় ও বৃটিশ লেখকদের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে উপস্থিত ছিলেন ই এম ফরস্টার, হ্যারল্ড লাস্কি, হার্বাট রিড, রজনী পাম দত্ত, সাজ্জাদ জহীর, মূলক রাজ আনন্দ, ভবানী ভট্টাচার্য প্রমুখ। নানা আলোচনার পর তারা একটি ইশতেহার প্রকাশ করেন ডিসেম্বরে। এরই সূত্র ধরে ভারতে প্রগতি লেখক ও শিল্পী সংঘ গঠিত হয়। চার বছর পর ঢাকায় স্থাপিত হয় এর শাখা।
এখানে উল্লেখ্য, বিভিন্ন সময় এর নাম পরিবর্তিত হয়। ১৯৩৫ সালে লন্ডনে বৈঠকে সাহিত্যিকরা এ সংগঠনের নাম ‘প্রগতি সাহিত্য সংঘ’ রাখার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। যখন ইশতেহার প্রকাশিত হয় তখন প্রস্তাবিত নাম রাখা হয় ‘প্রগতি লেখক সংঘ’। ১৯৩৬ সালে লক্ষেèৗতে এ সংগঠন স্থাপনের জন্য একটি সম্মেলন আহ্বান করা হয় জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনের সময়। ১৯৩৫ সালের ১০ এপ্রিলের এ সভায় সভাপতিত্ব করেন বিখ্যাত হিন্দি লেখক মুন্সী প্রেমচান্দ। সভায় সংগঠনের নামকরণ করা হয় ‘নিখিল ভারত প্রগতি লেখক সংঘ’। এর সভাপতি নির্বাচিত হন প্রেমচান্দ, সম্পাদক সাজ্জাদ জহীর। ১৯৪২ সালে ঢাকায় লেখক সোমেন চন্দ নিহত হলে কলকাতায় সম্মেলনের সময় সংগঠনের নামকরণ হয় ‘ফ্যাসিস্টবিরোধী লেখক ও শিল্পী সংঘ’। ১৯৪৫ সালে কলকাতায় আবার এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘প্রগতি লেখক ও শিল্পী সংঘ’।
নিখিল ভারত সম্মেলনের পর ১৯৩৬ সালের ২৫ জুন কলকাতায় এর শাখা স্থাপনের জন্য এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেদিন ছিল ম্যাক্সিম গোর্কির মৃত্যুতে শোকসভা। ওই সভায় গঠিত হয় ‘নিখিল বঙ্গ প্রগতি লেখক সংঘ’। সভাপতি নির্বাচিত হন ড. নরেশচন্দ্র সেনগুপ্ত। সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক সুরেন্দ্রনাথ গোস্বামী। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন পৃষ্ঠপোষক।
১৯৩৭ সালে প্রগতি লেখক সংঘ ‘প্রগতি’ নামে একটি সঙ্কলন প্রকাশ করে। সেখানে সভাপতি নরেশচন্দ্র সংগঠনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিলেন। তিনি লিখেছিলেন, ‘প্রগতি লেখক-সংঘ সাহিত্য ও সমাজে প্রগতিকামীÑ সে অভীপ্সিত প্রগতি সাধনের পক্ষে সংঘর উপায় সাহিত্য। যে সাহিত্যের পুষ্টি ও সমৃদ্ধি সংঘ কামনা করেন তাহা সমাজের প্রগতির অনুকূল হইবেÑ কিন্তু তাহা সাহিত্য হওয়া চাইÑ সাহিত্য রস ভূমিষ্ঠ হওয়া চাই। সার্থক সাহিত্য প্রগতিশীল হইতে বাধ্য। প্রগতি ছাড়া সাহিত্যই হয় না।… প্রগতি লেখক সংঘের লক্ষ্য সেই সাহিত্যের পুষ্টি ও অভ্যুদয় থাকে সমাজ ও জীবনের একটা বৃহত্তর, পূর্ণতর আদর্শের আলোকে বর্তমানকে ভাঙ্গিয়া গড়িতে চায়।’
ফ্যাসিবাদ-নাৎসিবাদের ধ্বংসযজ্ঞের কথা মনে রেখে তিনি আরো লিখেছিলেনÑ ‘মানবের মানবত্বকে আশঙ্কিত ধ্বংসের মুখ হইতে রক্ষা করিতে হইলে সর্বমানবের সংহত চেষ্টার প্রয়োজন। মানবের সকল শক্তির আজ প্রয়োজন হইয়াছে সংহত হইয়া এই দুর্ধর্ষ ধ্বংসপ্রচেষ্টার গতিরোধ করিবার। যাহার বাহুতে বল আছে, চিত্তে আছে যার ধীশক্তি ও ভাবুকতা, কণ্ঠে আছে যার বাগ্মিতা, লেখনী যার শক্তিমানÑ সকলের সমবেত চেষ্টার আজ প্রয়োজন। মানবের সভ্যতা, সংস্কৃতি ও প্রগতিকে দৃপ্ত শক্তির মূর্ত অকল্যাণের হস্তে আসন্ন ধ্বংস হইতে রক্ষা করিবার।’
১৯৩৭ সালে সাজ্জাদ জহীর, সুরেন্দ্রনাথ গোস্বামী ও হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় ঢাকায় আসেন সংগঠনের শাখা স্থাপনের উদ্দেশ্যে। প্রধানত কমিউনিস্ট কর্মীদের সঙ্গেই তাদের যোগাযোগ হয়। তাদের একটি কমিউনিস্ট পাঠচক্র ছিল। এর প্রকাশ্য নাম ছিল ‘প্রগতি পাঠাগার’। পরিচালনা করতেন রণেশ দাশগুপ্ত। যুক্ত ছিলেন আরো অনেকে। এদের সঙ্গেই মূলত সাজ্জাদ জহীরদের আলোচনা হয়। আলোচনার দু’বছর পর ১৯৩৯ সালে গঠিত হয় ‘প্রগতি লেখক ও শিল্পী সংঘ’, ‘প্রগতি পাঠাগারের’ সঙ্গে যারা যুক্ত ছিলেন তারাই সংঘ পরিচালনায় এগিয়ে আসেন। তাদের মধ্যে ছিলেন রণেশ দাশগুপ্ত, কিরণশঙ্কর সেনগুপ্ত, সত্যেনসেন, সোমেন চন্দ প্রমুখ। অন্তিমে সোমেন চন্দই হয়ে ওঠেন এর মুখ্য সংগঠক। রণেশ দাশগুপ্ত লিখেছিলেনÑ
‘ঢাকায় প্রগতি লেখক সংঘের শাখা স্থাপিত হয়েছিল একটা সন্ধিক্ষণে। শাখা স্থাপনের প্রস্তুতির মুখে ছিলেন কয়েকজন তরুণ লেখক। যারা ভাবছিলেন প্রগতি লেখক সংঘের সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ও গণমুখী ঘোষণাপত্র অনুযায়ী অবিলম্বে কিছু করা দরকার। যারা এ প্রয়োজন অনুভব করছিলেন, তাদের মধ্যে সবচেয়ে তরুণ বয়সী ছিলেন সোমেন চন্দ, যার বয়স তখন আঠারো আর সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ ছিলেন সতীশ পাকড়াশী বাংলার অগ্নিযুগের পথিকৃৎদের একজন, যার বয়স সে সময়ে পঁয়তাল্লিশ অতিক্রম করেছে। সোমেনের দুই সমবয়সী বন্ধু একেবারে গোড়ার দিকে উদ্যোক্তাদের মধ্যে ছিলেন। একজন কিরণশঙ্কর সেনগুপ্তÑ সে সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র অতি আধুনিক কবিতা লিখে নাম করেছিলেন… অপরজন অমৃত কুমার দত্ত।… এদের সঙ্গে একত্রিত হয়েছিলেন রণেশ দাশগুপ্ত, তার বয়স তখন ২৭। পুরানো ঢাকা শহরের দক্ষিণ মৈশু-ী মহল্লায় প্রগতি পাঠাগার ছিল সংঘের প্রথম কেন্দ্র।’
১৯৩৯ সাল থেকে সংগঠন গড়ার প্রস্তুতি নিয়ে ১৯৪০ সালের মাঝামাঝি গে-ারিয়া হাইস্কুল মাঠে সম্মেলন করে প্রগতি লেখক ও শিল্পী সংঘের উদ্বোধন করা হয়। সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন কাজী আবদুল ওদুদ। রণেশ দাশগুপ্ত সংগঠনের সম্পাদক ও সোমেন চন্দ সহসম্পাদক নির্বাচিত হন।
শুরু থেকে পুরনো পাঠচক্রের আদর্শ অনুযায়ী প্রগতি লেখক ও শিল্পী সংঘও পাক্ষিক বা সাপ্তাহিক সাহিত্য চক্রের আয়োজন করতো। চল্লিশ দশকের সেসব বৈঠকের স্মৃতিচারণ করেছেন কিরণ শঙ্কর সেনগুপ্ত। লিখেছেন তিনিÑ “… ইতিপূর্বেই অবশ্য ঢাকায় প্রগতি লেখক সংঘের উদ্যোগে আরো দু’চারটি স্মরণযোগ্য সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল রমনা ও পুরানা পল্টন সংলগ্ন এলাকায়। অধ্যাপক সত্যেন্দ্রনাথ বসু, অধ্যাপক মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, অধ্যাপক অমিয়কুমার দাশগুপ্ত, অধ্যাপক পৃথ্বিশ চক্রবর্তী প্রভৃতি কোনো কোনো সভায় উপস্থিত থেকে আমাদের উৎসাহিত করেছিলেন। এখন আমার এই ভেবে অবাক লাগে যে, সাম্প্রতিককালের কলকাতার কিছু লেখক প্রগতি সাহিত্যের আন্দোলন সম্পূর্ণভাবে তাদের কীর্তি হিসেবে প্রচারে আগ্রহী, ঢাকার প্রগতি লেখক সংঘের প্রায় ১০ বছরের নিরবচ্ছিন্ন আন্দোলন সম্পর্কে কোনো সুচিন্তিত বা বিস্তৃত আলোচনা তাদের কারুর কারুর প্রকাশিত গ্রন্থাদিতে পাওয়া যাচ্ছে না।”
১৯৪০ সালের ডিসেম্বরে জগন্নাথ কলেজে অনুষ্ঠিত সংঘের প্রথম বার্ষিক সম্মেলনের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি উপর্যুক্ত মন্তব্য করেছিলেন। ওই সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেছিলেন বুদ্ধদেব বসু। ওই সময় কলকাতায় প্রকাশিত ‘প্রগতি’ সঙ্কলনের আদলে ঢাকা থেকে ‘প্রগতি সংঘের’ উদ্যোগে ‘ক্রান্তি’ নামে একটি সঙ্কলন প্রকাশিত হয়। প্রগতি সংঘের সঙ্গে যারা যুক্ত তারাই শুধু সঙ্কলনে লিখেছিলেন। সংঘের দ্বিতীয় অধিবেশন হয় ১৯৪১ সালে ব্যাপ্টিস্ট মিশনে। এ সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ করে জার্মানি। প্রগতি লেখক সংঘের উদ্যোগে গঠিত হয় সোভিয়েত সুহৃদ সমিতি।’ এ সমিতির উদ্যোগে ১৯৪২ সালে ঢাকায় একটি ফ্যাসিবাদবিরোধী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সোমেন চন্দ ৮ মার্চ সে সভায় যোগদানের উদ্দেশ্যে রওনা হলে পথিমধ্যে খুন হন। সারা বাংলায় এ হত্যা প্রবল অভিঘাতের সৃষ্টি করে।
এরই প্রতিক্রিয়ায় ঢাকার সংঘের মুখপত্র হিসেবে ১৯৪২ (১৫ জ্যেষ্ঠ, ১৩৪৯) সালে কিরণশঙ্কর সেনগুপ্ত ও অচ্যুত গোস্বামীর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় পাক্ষিক ‘প্রতিরোধ’। “এই সময় সত্যেন সেন, অজিত কুমার গুহ, সরলানন্দ সেন, অমিত সেন, রণেশ দাশগুপ্ত, মুনীর চৌধুরী, সরদার ফজলুল করিম, সানাউল হক, সৈয়দ নূরুদ্দিন, রমেশ মজুমদার এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন অধ্যাপক ‘প্রতিরোধ’ প্রকাশের ব্যাপারে নানা দায়িত্ব গ্রহণ করে এই পত্রিকার প্রকাশ অন্তত কয়েকটি বছর অব্যাহত রাখতে সাহায্য করেছিলেন।” সোমেন চন্দের মৃত্যুর পর সংঘের দায়িত্ব নিয়েছিলেন অচ্যুত গোস্বামী।
১৯৪৫ সালে সংঘ ‘পূর্ববঙ্গ সাহিত্য সম্মেলনের’ আয়োজন করে ব্যাপ্টিস্ট মিশন হলে। কলকাতা থেকে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য ও গোপাল হালদার এসেছিলেন সম্মেলনে। উল্লেখ্য, সংঘ শুধু হিন্দু লেখকদের নয়, মুসলমান প্রগতিশীল লেখকদেরও জড়ো করতে পেরেছিল, যার ফলে সংঘের সঙ্গে জড়িতরা ঢাকাকেন্দ্রিক একটি নতুন প্রগতিশীল সাহিত্য আন্দোলনের সূত্রপাত করতে পেরেছিলেন। এটি আরো পরিষ্কার হয়ে ওঠে ১৯৪৬-১৯৪৯ সালে সংঘের কর্মকা-ে। এ সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ বা অন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠরত তরুণ সাহিত্যিকরা সংঘে যোগ দেন। তাদের মধ্যে ছিলেন শামসুর রহমান খান, সুলতানুজ্জামান খান, অরবিন্দ সেন, আমিনুল ইসলাম (এই প্রথম একজন শিল্পীর নাম পাওয়া যায় সংঘের সঙ্গে জড়িত হিসেবে), হাসান হাফিজুর রহমান, আবদুল্লাহ আল মুতী শরফুদ্দিন, আলাউদ্দিন আল আজাদ, কল্যাণ দাশগুপ্ত, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর প্রমুখ। পরবর্তীসময়ে সংঘে আলোচনায় যোগ দিয়েছেন বা সাহিত্য সভায় রচনা পাঠ করেছেন এমন কয়েকজন হলেন মুজাফফর আহমদ চৌধুরী, সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ, কামালউদ্দিন, ওসমান জামাল, সরলানন্দ সেন, অজিত গুহ, আখলাকুর রহমান প্রমুখ।
১৯৪৭-এর পর ঢাকা ছেড়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের অনেকে চলে যান। যে কমিউনিস্ট পার্টির কর্মীরা সংঘ গড়ে তুলেছিলেন তাদের অনেকেও চলে যান। পার্টির অবস্থাও তখন জোরদার ছিল না। এ সময় সাময়িকভাবে সংঘের সম্পাদক ও সহ-সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন মুনীর চৌধুরী ও আবদুল্লাহ আল মুতী শরফুদ্দিন। ১৯৫০ সালেই কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে দ্বন্দ্ব, পূর্ববঙ্গে ইসলামপন্থী ও পাকিস্তানপন্থী লেখকদের আবির্ভাব, অনেকের দেশত্যাগÑ এ সবকিছু মিলিয়ে ‘প্রগতি লেখক ও শিল্পী সংঘ’ বিলুপ্ত হয়ে যায়।
প্রগতি লেখক ও শিল্পী সংঘের একটা অভিঘাত পড়েছিল তৎকালীন তরুণদের মধ্যে। সংঘ লেখকদের মধ্যে অসাম্প্রদায়িকতা বোধ, ফ্যাসি ও নাৎসিবাদের বিরুদ্ধে মতাদর্শ, মানবতা বোধ প্রভৃতি সৃষ্টি করেছিল। উল্লেখ্য, পঞ্চাশ ও ষাট দশকের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলন, পাকিস্তানবাদবিরোধী জনমত সৃষ্টিতে যেসব সাহিত্যিক অবদান রেখেছিলেন, তাদের একটা বড় অংশ প্রগতি লেখক ও শিল্পী সংঘের কর্মকা-ের সঙ্গে জড়িত ছিলেন এবং তাদের অনেকেই এখন সক্রিয়। বিশ্বজিৎ ঘোষ যিনি এ বিষয়ে গবেষণা করেছেন, যথার্থই বলেছেনÑ ‘সংঘের এক যুগের কর্মকা-ের বিশ্লেষণ করলে স্পষ্টতই লক্ষ্য করা যাবে যে, সেই আমলেই সংবেদনশীল তরুণ-চিত্তে এবং প্রতিবাদী প্রত্যয়ের সংগঠন গড়ার কাজে কী বিপুল প্রেরণার বীজ উপ্ত করেছিলেন তারা। পাকিস্তানি এস্টাবলিশমেন্টের চ-প্রহারে একসময়ে লেখক ও শিল্পী সংঘের বিলুপ্তি ঘটে। তবে সেই যে বাম রাজনীতির উদ্বোধন আর শিল্পী সাহিত্য-সংস্কৃতির অঙ্গনে প্রগতিপন্থী ভাবনার অভ্যুদয়Ñ দুয়ে মিলিয়ে আমাদের যাত্রাপথের সঠিক ঠিকানা আমরা সেদিন পেয়েছিলাম।’

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: