জীবনে এমন কত বিচ্ছেদ, কত মৃত্যু আছে, ফিরিয়া লাভ কি? পৃথিবীতে কে কাহার…

ফ য় জু ল ল তি ফ চৌ ধু রী

বনলতা সেন
হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে,
সিংহল সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে মালয় সাগরে
অনেক ঘুরেছি আমি; বিম্বিসার অশোকের ধূসর জগতে
সেখানে ছিলাম আমি; আরো দূর অন্ধকারে বিদর্ভ নগরে ;
আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন,
আমারে দুদণ্ড শান্তি দিয়েছিল নাটোরের বনলতা সেন।
চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা,
মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য; অতিদূর সমুদ্রের পর
হাল ভেঙে যে নাবিক হারায়েছে দিশা
সবুজ ঘাসের দেশ যখন সে চোখে দেখে দারুচিনি-দ্বীপের ভিতর,
তেমনি দেখেছি তারে অন্ধকারে; বলেছে সে, ‘এতদিন কোথায় ছিলেন ?’
পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন।
সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতন
সন্ধ্যা আসে; ডানার রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল;
পৃথিবীর সব রঙ নিভে গেলে পাণ্ডুলিপি করে আয়োজন
তখন গল্পের তরে জোনাকির রঙে ঝিলমিল;
সব পাখি ঘরে আসে- সব নদী- ফুরায় এ-জীবনের সব লেনদেন;
থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।

জীবনানন্দ দাশের ‘বনলতা সেন’ কবিতাটি প্রথম প্রকাশ করেছিলেন বুদ্ধদেব বসু তার কবিতা পত্রিকায়, পৌষ ১৩৪২ সংখ্যায় (ডিসেম্বর, ১৯৩৫)। পাণ্ডুলিপির হিসেবে ১৯৩৩ খৃস্টাব্দে কবিতাটি লিখিত হয়েছিল বলে জানা যায়। তারপর বনলতা সেন কাব্যগ্রন্থে এটি অন্তর্ভুক্ত হয়। জীবনানন্দ তার তৃতীয় কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশ করেছিলেন ১৯৪২ খৃস্টাব্দে, এর প্রচ্ছদনাম রেখেছিলেন বনলতা সেন।
‘বনলতা সেন’ কবিতাটি সম্ভবত বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বহুল পঠিত কবিতাগুলোর একটি। জীবনানন্দের বিরুদ্ধে দুর্বোধ্যতার অভিযোগ উত্থাপিত হওয়ার বেশ আগেই কবিতাটি প্রকাশিত হয়েছিল। অথচ শেষ দিককার কবিতায় যে-দুর্গম সান্ধ্যভাষা পরিলক্ষিত হয় এ কবিতায়ও তা অনুপস্থিত নয়। কিন্তু এমন-ই এক দুর্মর রোমান্টিকতা কবিতাটির অবয়বে পরিব্যাপ্ত যা পাঠককে সহজে আচ্ছন্ন করে; ফলে কবিতাটির আন্তর্ভাষ্য নিয়ে চিন্তার প্রণোদনা পাঠকের হƒদয়ে সহজে প্রশ্রয় লাভ করে না।
তবে কবির জীবনে বনলতা সেন নামীয় কোনও রমণীর বাস্তব উপস্থিতি ছিল কি-না এবং কখন কীভাবে সে কবিকে দু’দণ্ডের শান্তি দিয়েছিল সে-কৌতূহল সাধারণ-অসাধারণ সকল শ্রেণীর পাঠককেই শুরু থেকে ভাবিয়ে এসেছে। কখনও নাটোর যাননি কবি, তবে কেন এ মফস্বল শহরটির নামোল্লেখ? নাটোরের হলেও বনলতা সেনের সঙ্গে কবির দেখা হয়েছিল অন্যত্র তবে? বরিশালে বা কলিকাতায়?
বনলতা সেন ছাড়াও জীবনানন্দের কাব্যে বেশ কিছু নারী চরিত্রের উপস্থিতি আছে; যেমনÑ শ্যামলী, সুরঞ্জনা, সুচেতনা, সরোজনী, শেফালিকা বোস, সুজাতা ও অমিতা সেন। তবে ১৯৩২ সালে লিখিত এবং প্রায় অর্ধশতাব্দীকাল অন্তরালবাসী কারুবাসনা নামীয় উপন্যাসে প্রথম বনলতা সেন নামটি পাওয়া যায়। অধিকন্তু ‘হাজার বছর ধরে খেলা করে’, ‘একটি পুরোনো কবিতা’ এবং ‘বাঙালি পাঞ্জাবী মারাঠি গুজরাটি’ শীর্ষক আরও তিনটি কবিতায় এ নামটি আছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যেতে পারে যে,কারুবাসনা উপন্যাসটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৮৬ খৃস্টাব্দে। এর ভাষা-ভঙ্গিতে অনবগুণ্ঠিত আত্মজৈবনিকতা সেকালের পাঠকমনে বিশেষ কৌতূহলের উদ্রেক করেছিল।
বনলতা সেন রক্ত মাংসের কোনও মানবী না-কি নিছকই কল্পিত কোনও কবিতা-নারী এ প্রশ্নটি অবসিত না-হলেও রহস্যের কিনারা হয়েছে কিছু। কয়েক বৎসর আগে জীবনানন্দের পাণ্ডুলিপি উদ্ধারক ডা. ভূমেন্দ গুহ কবির লিটেরেরি নোটস গবেষণা করে জানিয়েছেন, কবির জীবনে প্রেম এসেছিল সন্দেহ নেই। দিনলিপি বা লিটেরেরী নোটস-এ ওয়াই (ণ) হিসেবে উল্লিখিত মেয়েটিই কবির কাক্সিক্ষত নারী। সে শোভনা- কবির কাকা অতুলান্ত দাশের মেয়েÑ ঘরোয়া নাম বেবী। ১৯৩০ খৃস্টাব্দে লাবণ্য দাশকে বিয়ের আগেই এই বালিকার প্রতি জীবনানন্দ গভীর অনুরাগ অনুভব করেছিলেন। একটি উপন্যাসে শচী নামেও একে দেখতে পাওয়া যায়। শোভনাকে নিয়ে জীবনানন্দের অনুরাগ উন্নীত হয়েছে অনুক্ত প্রেমে, লাবণ্য দাশের সঙ্গে দাম্পত্যজীবন আদৌ সুখকর না-হওয়ায় এই প্রেম তীব্রতর হয়ে ক্রমশ একপ্রকার অভিভূতিতে পর্যবসিত হয়েছিল।
পরিলক্ষিত হয়, নানা কবিতায় এই অচরিতার্থ প্রেমের করুণ সঙ্গীত ধ্বনিত হয়েছে। এই শোভনাই পৃথিবীর রাঙা রাজকন্যাদের মতো রূপ নিয়ে চলে গেছে দূরে (‘হায় চিল’)। তাকে লক্ষ্য করেই কবি লিখেছেন : জানি আমি তোমার দু’চোখ আজ আমাকে খোঁজে না আর পৃথিবীর পরে- (‘অঘ্রাণ প্রান্তরে’)। তাকে লক্ষ্যে রেখেই জীবনানন্দ বলেছেন, ‘আমি যদি হতাম বনহংস/বনহংসী হতে যদি তুমিঃ ’। এই শোভনাকেই স্মরণ করে জীবনানন্দর স্বীকারোক্তি, ‘হƒদয়ের খেলা নিয়ে তার কাছে করেছি যে কত অপরাধ’ (‘ধানকাটা হয়ে গেছে’); লিখেছেন, ‘তোমার সৌন্দর্য নারী অতীতের দানের মতন’ (‘মিতভাষণ’)। এ শুধু বনলতা সেন কাব্যগ্রন্থ থেকে (সিগনেট সংস্করণ)।

‘বনলতা সেন’ কবিতাটি নিবিষ্ট পাঠকের জন্য কয়েকটি প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারে। প্রথম পঙ্ক্তিতে কবি জানাচ্ছেন : ‘হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে।’ কী অর্থ এই হাজার বছর ধরে পথ হাঁটার? তারপর আছে সেই অবিস্মরণীয় চরণদ্বয় : ‘পৃথিবীর সব রঙ নিভে গেলে পাণ্ডুলিপি করে আয়োজন/তখন গল্পের তরে জোনাকির রঙে ঝিলমিল;’- কী মানে এই ‘পাণ্ডুলিপি করে আয়োজন’ কথাটির? তদুপরি- কেন এতসব ছাপিয়ে বনলতা সেনের প্রসঙ্গ- এ প্রশ্ন তো রয়েছেই। অন্যদিকে জীবনানন্দ গবেষক ক্লিন্ট সিলি ‘সিংহল সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে মালয় সাগরে/অনেক ঘুরেছি আমি’ এ পঙ্ক্তিটি নিয়েও মাথা ঘামিয়েছেন ঢের। মালয় সাগর বলতে জীবনানন্দ কি প্রকৃতপক্ষেই ‘মালয় সাগর’ বুঝিয়েছেন?- এই ছিল তার প্রশ্ন।
২.
বলা হয়ে থাকেÑ কবিতা তা-ই, যা কি-না অনুবাদের মাধ্যমে হারিয়ে যায়। বলা হয়ে থাকেÑ অনুবাদ নারীর মতো; কেননা সে যদি হয় সুন্দর তবে তার বৈশিষ্ট্য হবে অবিশ্বস্ততা; আর যদি কি-না সে হয় বিশ্বস্ত, তার থাকবে না কোনও সৌন্দর্য। এ সবই বিতর্কসাপেক্ষ মন্তব্য। তবু এ কথা সম্ভবত ঠিক যে, সব অনুবাদকই মূলানুগত্যের ওপর জোর দিয়ে থাকেন। মূলের প্রতি যতদূর সম্ভব বিশ্বস্ত থাকার স্বার্থেই অনুবাদককে প্রতিটি পঙ্ক্তির নিহিতার্থ সম্যক উপলব্ধি করে নিতে হয়। অর্থকরণে ফাঁক রয়ে গেলে পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ করা সম্ভবপর হয় না।
সেই পঞ্চাশের দশক থেকে শুরু করে আজ অবধি নানা হাতে ‘বনলতা সেন’ কবিতাটির কত না অনুবাদ হয়েছে। প্রথম অনুবাদটি করেছিলেন মার্টিন কার্কম্যান। অব্যবহিত পরেই কবি নিজে করেছেন এর অনুবাদ। আরও যাদের হাতে কবিতাটি অনূদিত হয়েছে তাদের মধ্যে রয়েছেন সনৎ ভট্টাচার্য, পুরুষোত্তম লাল ও শ্যামশ্রী দেবী, ম্যারি ল্যাগো (তরুণ গুপ্তর সহযোগে), চিদানন্দ দাশগুপ্ত, হায়াৎ সাইফ, ক্লিনটন সিলি, আনন্দ লাল, সুকান্ত চৌধুরী, ফয়জুল লতিফ চৌধুরী, অনুপম ব্যানার্জি, অঞ্জন বসু, ফখরুল আলম, জো উইন্টার, অরুণ সরকার, ডি কে ব্যানার্জি, অমিতাভ মুখার্জি এবং জয়দেব ভট্টাচার্য। অনুবাদগুলো পাঠ করলে অনুবাদকদের উপলব্ধির প্রভেদ এবং অর্থায়নের ভিন্নতা প্রতিভাসিত হয়।
ধরা যাক, প্রথম পঙ্ক্তিটির কথা : ‘হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে।’ স্পষ্ট ঘটমান বর্তমান ক্রিয়াপদটি অধিকাংশ অনুবাদকের বিবেচনায় অতীত বা পুরাঘটিত বর্তমানে পর্যবসিত হয়েছে। এতে কবির অভীষ্ট বক্তব্যের হের-ফের হয় বৈ-কী। ক্লিন্ট সিলি আশির দশকে করা অনুবাদে অতীতকাল ব্যবহার করেছিলেন; তবে সম্প্রতিকৃত (২০০৮) অনুবাদে তিনি ঘটমান বর্তমান কালই ব্যবহার করেছেন। বর্তমান লেখক সম্পাদিত এসেইজ অন জীবনানন্দ দাশ (২০০৯) নামীয় গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত ‘শিফটিঙ সিজ এন্ড বনলতা সেন’ শীর্ষক নিবন্ধে নতুন অনুবাদটি রয়েছে।
প্রথম পঙ্ক্তির এই ‘আমি’ তো কবি নন, এই ‘আমি’ আবহমান মানুষ যে মহীনের ঘোড়ার মতো আজো পৃথিবীতে অস্তিত্ববান। এই পঙ্ক্তিটি যে কত তাৎপর্যময়, তা বোঝাতে গিয়ে শিবনারায়ণ রায় বলেছেন, “হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথেÑ এ রকম করে মানুষের অস্তিত্বের ধারণা জীবনানন্দর আগে পৃথিবীর অন্য কোনও কবির মুখে শোনা যায়নি।” আসৃষ্টি ভ্রমণজনিত যে ক্লান্তির কথা আমরা শুনতে পাই তা জীবনানন্দের ব্যক্তিক্লান্তি আদৌ নয়। এ ক্লান্তি আবহমান মানুষের, পৃথিবীর আদি থেকে যে বিদ্যমান, সারা পৃথিবীর নানা স্থানজুড়ে যার অস্তিত্ব নানা সভ্যতার অবকাশে।
পয়ার অবধৃত কবিতাটিতে তিনটি স্তবক আর প্রতিটিরই শেষ চরণে বনলতা সেন নামটি একবার করে এসেছে। প্রথম স্তবকের শেষে কবি লিখেছেন, ‘আমারে দুদণ্ড শান্তি দিয়েছিল নাটোরের বনলতা সেন’। আর এ সূত্রেই অনিবার্যভাবে যে-প্রশ্নটি বারংবার উত্থাপিত হয়েছে তা হল, কী প্রক্রিয়ায় কবিকে দু’দণ্ডের শান্তি দিয়েছিল বনলতা সেন? এ-কি নাটোরের রতিপারঙ্গম বারবনিতাদের সংসর্গে লভ্য দু’দণ্ডের শান্তি যার ইঙ্গিত আকবর আলী খান দিয়েছেন? অন্যদিকে কবি স্বয়ং অনুবাদ করেছেন অঃ সড়সবহঃং যিবহ ষরভব ধিং ঃড়ড় সঁপয ধ ংবধ ড়ভ ংড়ঁহফং/ও যধফ ইধহধষধঃধ ঝবহ ড়ভ ঘধঃড়ৎব ধহফ যবৎ রিংফড়সÑ আর এই ভাবে কবির হাতে ‘শান্তি’ রিংফড়স-এ পরিণত হওয়ায় জীবনানন্দের কবিতাপাঠে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন ব্যতিরেকে কখনও-কখনও ভুল ব্যাখ্যায় উপনীত হওয়ার আশংকা থেকে যায়।
দ্বিতীয় স্তবকে ‘এতদিন কোথায় ছিলেন?’ প্রশ্নটি করেছে বনলতা সেন তার পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে। মার্টিন কার্কম্যান এর আক্ষরিক অনুবাদ করেছিলেন ব’লে আপত্তি করেছিলেন জীবনানন্দ। পাখির নীড় দিন শেষের আশ্রয়- এই প্রতীকতাই উদ্দীষ্ট ছিল কবির; কেননা বনলতা সেন-এর চোখে ছিল নিঃসহায় কবির জন্য সে রকম আশ্রয়েরই আশ্বাস। অথচ বিস্ময়কর হলেও সত্য যে, নিজে অনুবাদ করার পর্যায়ে কবি এই উদ্দেশ্যটি সম্পূর্ণাংশে বিসর্জন দিয়েছেন। আমাদের অনুমান করে নিতে হয়, অনূদিত পাঠটি খসড়া মাত্র, জীবনানন্দ তা চূড়ান্ত করে যাননি।

‘বনলতা সেন’ কবিতাটি আদ্যোপান্ত নিটোল একটি স্থাপত্য, যার সম্ভবত কোনও শব্দ বা পঙ্ক্তিই প্রতিস্থাপনযোগ্য নয়। তথাপি ‘পৃথিবীর সব রঙ নিভে গেলে পাণ্ডুলিপি করে আয়োজন/তখন গল্পের তরে জোনাকির রঙে ঝিলমিল’ এই অংশটির একটি অদ্ভুত আকর্ষণ আছে। তবে এখানে যে অর্থনির্মলতার বিশেষ অভাব রয়েছে তা স্বীকার করে নিতে হয়। পদস্থাপনায় গদ্যীয় ধারাবাহিকতার অভাবেই এই ধোঁয়াশার উদ্ভব। মার্টিন কার্কম্যান পাণ্ডুলিপি আর গল্পের বিষয়টি বুঝে উঠতে না-পেরে অনুবাদের সময় তা সম্পূর্ণাংশে অগ্রাহ্য করতে বাধ্য হয়েছিলেন। ১৯৬৫-তে অনুবাদের সময় ম্যারি ল্যাগোর অবশ্য কোনও ভুল হয়নি; তিনি হয়তো জীবনানন্দের স্বকৃত অনুবাদটি দেখে প্রয়োজনীয় ইঙ্গিত পেয়ে থাকবেন। কিন্তু মার্টিন কার্কম্যানের মতো ক্লিন্ট সিলিও ‘বনলতা সেন’-এর অনুবাদ করতে গিয়ে ‘দিন শেষে গল্পের পাণ্ডুলিপি নিয়ে তৈরি হওয়ার’ বিষয়টি পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেননি। অবশ্য প্রায় তিরিশ বছর পর সম্প্রতি, ২০০৮-এ, পরিমার্জনার সময় তিনি ‘পাণ্ডুলিপি’ শব্দটির প্রতি সুবিচারের চেষ্টা করেছেন।
উল্লেখ্য, ‘বনলতা সেন’ কবিতাটির একটি খসড়া পাওয়া গিয়েছিল জীবনানন্দের পাণ্ডুলিপির মধ্যে। দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় সংকলিত জীবনানন্দ কাব্য সংগ্রহ গ্রন্থের ‘খসড়া, পাঠান্তর, আনুষঙ্গিক কবিতা’ অংশে সেটি ‘শেষ হ’ল জীবনের সব লেনদেন’ শিরোনামে মুদ্রিত। খসড়া থেকে চূড়ান্ত কবিতার দুরত্ব যোজনপ্রতীম। জীবনানন্দ তার রচনা নিয়ে ঘষা-মাজা করতেন নিরন্তর। এ প্রক্রিয়াটি এতই নিবিড় ছিল যে, কখনও কখনও খসড়া আর চূড়ান্ত রূপের মধ্যে সমিলতা খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হয়ে দাঁড়ায়। এই পার্থক্য বড় কথা নয়, কী করে এই পার্থক্য সৃষ্টি হল সেটিই পর্যালোচনার বিষয়।
অনুবাদকের দায়িত্ব যে কত গভীর তা বিভিন্ন হাতে ‘মালয় সাগর’-এর সঠিক ইংরেজি অনুবাদ বিষয়ে লিখিত একটি নিবন্ধে ক্লিন্ট সিলি অবহিত করেছেন। মালয় সাগর নামে কোনও সাগরের অস্তিত্ব নেই পৃথিবীর মানচিত্রে। তবে সিংহল সমুদ্র থেকে কোন্ দিকে ছিল উল্লিখিত এই অভিযাত্রা? মালয় সাগর বলে জীবনানন্দ কি তবে মালয় উপদ্বীপের সন্নিহিত সমুদ্রাংশের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন? বিভিন্ন আনুষঙ্গিক বিষয় বিবেচনায় নিয়ে শেষাবধি সিলি এই সিদ্ধান্তে উপনীত যে, প্রকৃতপক্ষে দক্ষিণ ভারতের মালাবার উপকূল অর্থেই প্রকৃতপক্ষে মালয় সাগর লিখেছিলেন জীবনানন্দ।
৪.
শেষ হ’ল জীবনের সব লেনদেন
শেষ হ’ল জীবনের সব লেনদেন,
বনলতা সেন।
কোথায় গিয়েছ তুমি আজ এই বেলা
মাছরাঙা ভোলেনি তো দুপুরের খেলা
শালিখ করে না তার নীড় অবহেলা
উচ্ছ্বাসে নদীর ঢেউ হয়েছে সফেন,
তুমি নাই বনলতা সেন।
তোমার মতন কেউ ছিল কি কোথাও?
কেন যে সবের আগে তুমি চলে যাও।
কেন যে সবের আগে তুমি
পৃথিবীকে করে গেলে শূন্য মরুভূমি
(কেন যে সবার আগে তুমি)
ছিঁড়ে গেলে কুহকের ঝিলমিল টানা ও পোড়েন,
কবেকার বনলতা সেন।
কত যে আসবে সন্ধ্যা প্রান্তরে আকাশে,
কত যে ঘুমিয়ে রবো বস্তির পাশে,
কত যে চমকে জেগে উঠবো বাতাসে,
হিজল জামের বনে থেমেছে স্টেশনে বুঝি রাত্রির ট্রেন,
নিশুথির বনলতা সেন।
[জীবনানন্দ কাব্য সংগ্রহ, সম্পা: দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়, ঢাকা: গতিধারা। ১৯৯৯। পৃ: ৬২৪]
হয়তো ‘বনলতা সেন’ প্রেমের কবিতা-ই যেমনটি সাধারণভাবে বিবেচনা করা হয়। ‘শেষ হ’ল জীবনের সব লেনদেন’ নামীয় উপরিউদ্ধৃত খসড়াটির অভিমুখে রয়েছে নিশ্চিত প্রেমকাতরতা। কিন্তু জীবনানন্দ বিপুলভাবে এই কাতরতা অতিক্রম করেছেন। তার বোধিতে যে সময়চেতনা প্রোথিত তার গাঢ় সংশ্লেষে ‘বনলতা সেন’ হয়ে উঠেছে একটি আধুনিক কবিতা; আবহমান মানুষের নিরর্থক অস্তিত্বের প্রশ্ন এ কবিতায় একটি দার্শনিক মাত্রা যোগ করেছে। ‘কবিতার কথা’ প্রবন্ধে তিনি লিখেছিলেন, কবির হƒদয়ে থাকবে কল্পনা এবং কল্পনার অভ্যন্তরে চিন্তা ও অভিজ্ঞতার স্বতন্ত্র সারবত্তা। জীবনানন্দের কবি-সত্তার স্বাতন্ত্র্য আজ প্রতিষ্ঠিত সত্য। আবেগোত্থিত অনুভব থেকেই বিশুদ্ধ কবিতার জš§বীজ সৃষ্টি হয় বটে কিন্তু কল্পনা ও চিন্তার প্রণোদনায় তার অত্যাবশ্যক রূপান্তর ঘটে। নিরুদ্দেশ প্রেমাস্পদের জন্য আকুলতা থেকেই এ কবিতার সূচনা। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রেলযাত্রায় রাতের অন্ধকারে দেখা কোনও এক রূপসী বনলতা সেন-এর স্মৃতি। জীবিকার অন্বেষায় ক্লান্ত কবি পৃথিবীতে মানুষের নিরুদ্দেশ অস্তিত্বের মধ্যে কল্পনা করেছেন মানুষের গভীর ক্লান্তি। আত্মস্থ করেছেন আদি মানবের অনুভব। এই ভাবে হƒদয়ের আবেগ স্বীয় কল্পনা ও চিন্তায় পরিশ্র“ত হয়ে লাভ করেছে একটি আধুনিক কবিতার উৎকৃষ্ট আদল।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: