জীবনে এমন কত বিচ্ছেদ, কত মৃত্যু আছে, ফিরিয়া লাভ কি? পৃথিবীতে কে কাহার…

bibhutibhushanড. শম্ভুনাথ গাঙ্গুলি
তিন বন্দ্যোপাধ্যায়ের মধ্যে যতোটুকু মিল, তার চেয়ে অমিল অনেক বেশি। বিভূতিভূষণ যে মানবজগৎ সৃষ্টি করেছিলেন তা সারল্যে অসাধারণ। শরৎচন্দ্রের বহু নরনারীতে জটিলতা আছে। কিন্তু বিভূতিভূষণে নেই। শ্রেণী হিসেবে বিভূতিভূষণের মানুষেরা অধিকাংশ নিম্ন মধ্যবিত্ত। এ নিম্ন মধ্যবিত্তদের নিয়ে লিখতে গিয়ে ‘জননী’তে ‘পুতুল নাচে’ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় অতিরিক্ত জটিল, সঙ্কেতাশ্রয়ী। তারাশঙ্করের লোকজন একবারে নিম্নস্তরের শ্রমজীবী অথবা পড়ন্ত জমিদার। মনস্তাত্ত্বিক জটিলতায় মানিকের সমকক্ষ না হলেও বিভূতিভূষণের তুলনায় এমনকি শরৎচন্দ্রের তুলনায়ও তারাশঙ্কর এগিয়ে। তারাশঙ্করের মানুষেরা একটু বেশি আদিম-বলিষ্ঠ-বর্বর। মানিকবাবুর শ্রমজীবীরাও যেমন পদ্মানদীর মাঝিতে বাইরে অনেক শান্ত, ভেতরে যদিও বক্র। বিভূতিবাবুর মানুষেরা সরল, শান্ত, ক্ষুদ্র, প্রাত্যহিক জীবনের ঘনিষ্ঠ পরিচয়ে যখন তারা অরণ্যাচারী, তখনো সহিষ্ণু এবং নির্বিরোধ। এতো পৃথক হলেও এ তিন শিল্পী মানুষকে এবং জীবনকে এমন একটা জায়গা থেকে দেখেছেন, যেটা নিঃসংশয়ে রবীন্দ্র-শরৎ যুগের পরবর্তী।

পূর্বকালীন-সমকালীন
বাংলা গদ্যসাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ তখনো দোর্দ-প্রতাপ নিয়ে বর্তমান। ১৯২৯ সালে তার ‘চতুরঙ্গ’ এবং ‘ঘরে বাইরে’ উপন্যাস দুটি প্রকাশিত হয়। আরো অনেক কিছু বাকি। বুদ্ধির দীপ্তিতে, পরিশীলিত বৈদগ্ধ্যে বাংলা গদ্য তখন অভিজাত। অভিজাত্য যতোটা, হৃদয়বেদ্যতা ততোটা ছিল কি? তখন রবীন্দ্র প্রভাবের প্রতাপের মধ্যেও শরৎচন্দ্র ছিলেন সবচেয়ে জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক। তার উপন্যাসগুলোর বেশিরভাগ ১৯২৫-এর মধ্যে প্রকাশিত হয়। সেগুলোতে বুদ্ধির তীক্ষèতার তুলনায় আবেগ-আপ্লুত, সহজ-জীবন-রসিকতা অনেক বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। বাঙালি মধ্যবিত্তের জীবন-মন, তার সংস্কার-বিদ্রোহ এবং বিদ্রোহী রোধের সীমাবদ্ধতা, তার ভাবালুতা, কর্মবিমুখতা এসবই শরৎচন্দ্র নিপুণভাবে এঁকেছিলেন বলেই জনপ্রিয়তার শিখরে উঠতে পেরেছিলেন এবং আশ্চর্যের ব্যাপার এই যে, তার মৃত্যুর পরে ৬০ বছর হলেও বাঙালি জীবনধারায় নানা উল্টো হাওয়া বইলেও আজো তিনি সমান জনপ্রিয়। গল্পকার রবীন্দ্রনাথ বাঙালি পাঠকের মাথায় শিরোভূষণ হয়ে রইলেন, শরৎচন্দ্র ঠাঁই পেলেন হৃদয়ে-প্রাণের পরম আত্মীয় হয়ে। বাঙালি যা শুধু, তা-ই তিনি আঁকেননি, বাঙালি স্বপ্নে, নিভৃত কল্পনায় যা হতে চায় তার ছবিটিও এঁকেছেন। এর ওপর ছিল তার গল্প বলার অসাধারণ ক্ষমতা। গাঁথুনির ঢঙটি বঙ্কিমচন্দ্র থেকে ধার করলেও মহিমার উচ্চ আসন থেকে স্টাইলকে এবং স্টোরিটেলিংকে তিনি সাধারণের সমতলে নামিয়ে আনলেন।
রবীন্দ্রনাথের অপার মহিমা এবং শরৎচন্দ্রের নিñিদ্র অধিকারের ফাঁক দিয়ে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় কি মন্ত্রে আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গে ১৯২৯ সালে বাঙালি পাঠককে জয় করে নিয়েছিলেন, তার সম্যক বিচার আজো হয়নি। জয় যে করেছিলেন বাংলা সাহিত্য নিয়ে যারাই ভাবেন, তারাই স্বীকার করেন। কিন্তু কীভাবে, সেই তত্ত্বটি বিশ্লেষণ করে দেখার যোগ্য।
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় ও মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় মোটামুটি একই সময়ে বাংলা কথাসাহিত্যে তিনটি অভ্রভেদী চূড়ারূপে বিরাজ করেছেন। তারাশঙ্করের ঔপন্যাসিক পরিণতি কিঞ্চিৎ দেরিতে হলেও ১৯৩৫-এর মধ্যে তিনি অসামান্য কয়েকটি ছোটগল্প লিখেছিলেন এবং মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বয়সে কিছুটা ছোট হলেও ১৯৩৬-৩৭ এর মধ্যে ‘দিবারাত্রির কাব্য’, ‘পদ্মানদীর মাঝি’, ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’র মতো বই লিখে ফেলেছিলেন। আর বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলা গল্প-উপন্যাসে এবং ভ্রমণ সাহিত্যে, যে ভ্রমণ সাহিত্য উপন্যাসোপম, তাতে সাহিত্যরসের একটা নতুন দরজা খুলে দিয়েছেন। রবীন্দ্র-শরতের যুগে তারা বাংলা গল্প সাহিত্যে রবীন্দ্র-শরতোত্তর আধুনিকতার হাওয়া বইয়ে দিয়েছিলেন। তাদের সমকালে বাংলা কথাসাহিত্যে আরো কয়েকজন উন্নতমাপের শিল্পী এসেছেন, যেমন বনফুল, বুদ্ধদেব বসু, প্রেমেন্দ্র মিত্র, বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, প্রবোধকুমার সান্যাল, সুবোধ ঘোষ, মনোজ বসু, শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়, সতীনাথ ভাদুড়ী প্রমুখ। হাস্যরসের শ্রেষ্ঠ শিল্পী পরশুরামও মোটামুটি একই সময়ের লোক। তবু তাকে আলোচনায় টানছি না, তার জায়গাটি স্বতন্ত্র বৃত্তের মধ্যে। উল্লিখিত লেখকদের মধ্যে প্রেমেন্দ্র-সুবোধের কিছু ছোটগল্প একেবারে প্রথম শ্রেণীর রচনা। অন্য লেখকেরা প্রায় সবাই বেশ উঁচু মানের কথাশিল্পী, সবারই স্বাতন্ত্র্য আছে। আবার রবীন্দ্রোত্তর আধুনিকতার দিক থেকে ঐক্যও আছে। তাদের রচনার মধ্যে মাঝে মাঝে প্রথম শ্রেণীর সৃষ্টির সন্ধান মেলে। কারো কারোর মধ্যে আছে ব্যতিক্রমী ঔজ্জ্বল্য। তবু সমগ্রতার বিচারে তারা উল্লিখিত তিন বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে পৌঁছাতে পারেন না।
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এ ঘটনাটি খুবই বিস্ময়কর যে, রবীন্দ্রপ্রভাবমুক্ত এবং শরতোত্তর লেখকদের মধ্যে আমরা এতো গ্রন্থকারের নাম করতে পারছি, যারা খুবই উন্নতমানের শিল্পী। তারা সবাই কিন্তু ১৯৩০ থেকে ১৯৫০-৫৫-এর মধ্যে তাদের শ্রেষ্ঠ রচনাগুলো রেখে গেছেন। কোনো একটা ভাষায় মাত্র কুড়ি-পঁচিশ বছরের একটি কালপর্যায়ে এ জাতীয় সমুন্নত বহু সংখ্যক গ্রন্থকার একই সঙ্গে দেখা দেয়াটা অত্যন্ত বিস্ময়কর। আবার তারই মধ্যে তিন তিনজন কথাসাহিত্যিক বিশ্বের শ্রেষ্ঠ কথাকারদের প্রতিস্পর্ধী দক্ষতা দেখাতে পেরেছিলেন।
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আবির্ভাবের রহস্যটি বুঝে দেখার আগে সমকালীন বাংলা কথাসাহিত্যের প্রেক্ষাপটটি আরেকবার দেখে নেয়া যেতে পারে। ১৯২৩ সালে ‘কল্লোল’ পত্রিকা প্রকাশিত হয়। বেশ কয়েক বছর পত্রিকাটি চলে। সহযোগী ‘কালী-কলম’-এর সঙ্গে মিলে এ পত্রিকার লেখকরা একটি সাহিত্য-আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন। তারা কাব্য এবং কথাসাহিত্যে উচ্চকণ্ঠে রবীন্দ্রবিরোধিতা করেছিলেন এবং রবীন্দ্র-ভাবনার পরিপন্থী জীবন ও সাহিত্যাদর্শের সন্ধানে নেমেছিলেন। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের তীক্ষèতা, সমাজবন্ধনের অস্বীকৃতি বোহেমিয়ান জীবনের আকর্ষণ, রুগ্ণ মানসিকতার প্রতি প্রবণতা, প্রথম যুদ্ধোত্তর ইউরোপীয় সাহিত্যের বাস্তবতার অনুসরণ, বিশেষত রুশ ও স্ক্যান্ডেনেভীয় কথাসাহিত্যের অনুগমন তাদের অভীষ্ট ছিল। রবীন্দ্র-পরবর্তী বাংলা সাহিত্য কোন পথে মুক্তি পাবে, সেদিক থেকে ‘কল্লোল’ গোষ্ঠীর ভূমিকা কতোটা তাৎপর্যপূর্ণ হবেÑ তখন সে সত্য কেউ জানেনি। বাংলা সাহিত্যের ঐতিহাসিক নিয়তি দুই গ্রামাশ্রয়ী অরণ্যাশ্রয়ী শিল্পী এবং মানব চিত্তের গহনতায় ভ্রমণশীল লেখকের মধ্য দিয়ে মুক্তি ঘটালেন। কল্লোলের সব চেষ্টা ক্ষণস্থায়ী বুদবুদের মতো মিলিয়ে গেল। তারাশঙ্কর বাংলার অন্ত্যজ গ্রামীণদের জৈব অস্তিত্বের মুক্তির খোঁজ পেলেন। বিভূতিভূষণ গাছগাছালির গ্রাম, অরণ্যপাহাড়ির মনুষ্যবাস এবং বৃক্ষাদির মতো সরলতায় নতুন সত্য আবিষ্কার করলেন। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় মানুষের অবচেতনার জটিলতায় এক অভিনব সত্যের মুখোমুখি হলেন। বাংলা কথাসাহিত্যে রবীন্দ্রোত্তর যুগে এ তিন মুক্তিদাতা কেউ ‘কল্লোল’ গোষ্ঠীর ছিলেন না এবং কল্লোলের যেসব লেখকেরা নবযুগ প্রতিষ্ঠায় তাদের সহযোগী হয়ে উঠেছিলেন, তারা হয় কল্লোল-পরবর্তী বিকাশের ফল, না হয় ক্বচিৎ ব্যতিক্রমী সত্য।
এ তিন বন্দ্যোপাধ্যায়ের মধ্যে যতোটুকু মিল, তার চেয়ে অমিল অনেক বেশি। বিভূতিভূষণ যে মানবজগৎ সৃষ্টি করেছিলেন তা সারল্যে অসাধারণ। শরৎচন্দ্রের বহু নরনারীতে জটিলতা আছে। কিন্তু বিভূতিভূষণে নেই। শ্রেণী হিসেবে বিভূতিভূষণের মানুষেরা অধিকাংশ নিম্ন মধ্যবিত্ত। এ নিম্ন মধ্যবিত্তদের নিয়ে লিখতে গিয়ে ‘জননী’তে ‘পুতুল নাচে’ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় অতিরিক্ত জটিল, সঙ্কেতাশ্রয়ী। তারাশঙ্করের লোকজন একবারে নিম্নস্তরের শ্রমজীবী অথবা পড়ন্ত জমিদার। মনস্তাত্ত্বিক জটিলতায় মানিকের সমকক্ষ না হলেও বিভূতিভূষণের তুলনায় এমনকি শরৎচন্দ্রের তুলনায়ও তারাশঙ্কর এগিয়ে। তারাশঙ্করের মানুষেরা একটু বেশি আদিম-বলিষ্ঠ-বর্বর। মানিকবাবুর শ্রমজীবীরাও যেমন পদ্মানদীর মাঝিতে বাইরে অনেক শান্ত, ভেতরে যদিও বক্র। বিভূতিবাবুর মানুষেরা সরল, শান্ত, ক্ষুদ্র, প্রাত্যহিক জীবনের ঘনিষ্ঠ পরিচয়ে যখন তারা অরণ্যাচারী, তখনো সহিষ্ণু এবং নির্বিরোধ। এতো পৃথক হলেও এ তিন শিল্পী মানুষকে এবং জীবনকে এমন একটা জায়গা থেকে দেখেছেন, যেটা নিঃসংশয়ে রবীন্দ্র-শরৎ যুগের পরবর্তী।

দুই
বৈচিত্র্যে ঐক্য
১২ সেপ্টেম্বর ১৮৯৪ সালে কাঁচড়াপাড়া-হালিশহরের কাছে মুরারিপুর গ্রামে বিভূতিভূষণের জন্ম। মৃত্যু ১ নভেম্বর ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে। তার প্রথম বই ‘পথের পাঁচালী’ ১৯২৯ সালে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। এক বছর আগে থেকে পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে এটি বের হয়। তিনি তার ২১ বছরের সাহিত্যিক জীবনে অবিরাম সাহিত্য সৃষ্টি করে ৬১টি গ্রন্থ প্রকাশ করেছিলেন। অপ্রকাশিত রচনার সংখ্যাও কম নয়। তার রচনার মধ্যে উপন্যাস, ছোটগল্প, ভ্রমণ ও দিনলিপি জাতীয় রচনা, অনুবাদাত্মক কাহিনী যেমন রয়েছে, তেমনি কিশোরদের জন্য কিছু গল্প এবং জ্ঞানবিজ্ঞান জাতীয় পুস্তকও আছে। তার উপন্যাসগুলোর মধ্যে আছে পথের পাঁচালী (১৯২৯), অপরাজিত (১৯৩২), দৃষ্টিপ্রদীপ (১৯৩৫), আরণ্যক (১৯৩৯), আদর্শ হিন্দু হোটেল (১৯৪০), বিপিনের সংসার (১৯৪১), দুই বাড়ি (১৯৪১), অনুবর্তন (১৯৪২), দেবযান (১৯৪৪), কেদার রাজা (১৯৪৫), অথৈ জল (১৯৪৭), ইছামতি (১৯৫০), অশনি সঙ্কেত মৃত্যুর পরে প্রকাশিত। বিভূতিভূষণের মতো জনপ্রিয় ঔপন্যাসিকের পক্ষে ২১ বছরে মাত্র ১৩টি উপন্যাসের প্রকাশ লেখকের লেখনী-সংযমের পরিচয় দেয়।
এর পাশে আরো কিছু তথ্য রাখলে তার মনের হদিস কিছুটা পাওয়া যাবে। তিনি ছোটদের জন্য কাহিনী লিখেছিলেন অনেক, সেগুলো পুস্তক আকারে প্রকাশিত হয়েছিল যেমনÑ ‘চাঁদের পাহাড়’, ‘মরণের ডঙ্কা বাজে’, ‘মিসমিদের কবচ’, ‘হীরা-মানিক জ্বলে’, ‘সুন্দরবনে সাত বছর’ এবং অনেক ছোটগল্প। ছোটদের কথা ভেবেই তিনি ‘আইভান হো’ উপন্যাসটির একটি ক্ষুদ্রায়তন অনুবাদ করেছিলেন। ‘বিচিত্র জগৎ’ নাম দিয়ে ১৯৩৭ সালে তিনি ভূগোল-বিজ্ঞান জাতীয় নানা কৌতূহলোদ্দীপক বিষয়বস্তু নিয়ে একটি বই লিখেছিলেন। এটিরও লক্ষ্য ছিল কিশোর পাঠক। বড়দের জন্য যারা লিখে বিখ্যাত হন, তাদের অনেকেই ছোটদের জন্যও কিছু লিখে থাকেন। কিন্তু বিভূতিভূষণের সমকালীন অপর দুই বিখ্যাত কথাসাহিত্যিক তারাশঙ্কর ও মানিক কিশোর-সাহিত্য সম্পর্কে উৎসাহী ছিলেন না। তারাশঙ্কর বেশি বয়সে কয়েকটি গল্প লিখলেও তাতে শিল্পীর ক্ষমতার প্রতিফলন ঘটেনি। এদিক থেকে বিভূতিবাবু ছিলেন ব্যতিক্রম। তিনি অপু নামক এক কিশোরের হাত ধরে বাংলা সাহিত্য জগতে আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন। এ কিশোর অপুদের বাদ দিয়ে শুধু বয়স্ক পাঠকের মনোরঞ্জনের জন্য সাহিত্য রচনা তিনি করতে চাননি। উল্লেখ্য, শুধু উপরোক্ত উপন্যাস (কিশোর), গল্প এবং বিচিত্র সন্দর্ভগুলো ছাড়াও তার অনেক গ্রন্থেরই চমৎকার কিশোর সংস্করণ প্রকাশ করেছিলেন। বিভূতিভূষণ দিনলিপি জাতীয় রচনায় বাংলা সাহিত্যে একটি অভিনব ক্ষেত্রপ্রস্তুত করেছিলেন। অনেক সময়ই এ দিনলিপিগুলো ভ্রমণের সঙ্গে মিশে গেছে এবং ভ্রমণ কাহিনীর একটি অভিনব স্বাদও এনেছে। এ জাতীয় রচনার একটি তালিকাÑ ‘অভিযাত্রিক’ (১৯৪১), ‘স্মৃতির রেখা’ (১৯৪১), ‘তৃণাঙ্কুর’ (১৯৪৩), ‘ঊর্মিমুখর’ (১৯৪৪), ‘বনে পাহাড়ে’ (১৯৪৫), ‘উৎকর্ণ’ (১৯৪৬), ‘হে অরণ্য কথা কও’ (১৯৪৮)। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে বিভূতিবাবুর এ ভ্রমণ ডায়রিগুলো একটি নতুন শাখার সৃষ্টি করেছে। যদিও লেখক উপন্যাসাদি নাও লিখতেন একজন শ্রেষ্ঠ ভ্রমণ-সাহিত্যের রচয়িতা হিসেবে তার আসন সুস্থির থাকতো।
বিভূতিভূষণ ছোটগল্প লিখেছেন অনেক। ২০০টির বেশি। ‘মৌরীফুল’ (১৯৩২), ‘যাত্রাবদল’ (১৯৩৪), ‘কিন্নর দল’ (১৯৩৮), ‘উপলখ-’ (১৯৪৫), ‘বিধুমাষ্টার’ (১৯৪৫) প্রভৃতি গ্রন্থে তার ছোটগল্পগুলো সংকলিত হয়ে প্রকাশিত হয়েছিল। সমকালীন লেখকদের মধ্যে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ও শ’দুয়েক ছোটগল্প লিখেছিলেন। তারাশঙ্করের গল্পের সংখ্যা দুশ’র কাছাকাছি। বিভূতিভূষণের ছোটগল্পগুলো তারাশঙ্করের তুলনায় তো বটেই, মানিকবাবুর তুলনায়ও আকারে খুবই ছোট ছোট।
উপন্যাস ও ছোটগল্প, ভ্রমণ-দিনলিপি এবং কিশোরদের উপযোগী রচনা-গদ্য সাহিত্যে এ চারটি কীর্তিস্তম্ভের ওপর বিভূতিভূষণের সাহিত্যিক কৃতিত্ব। এ চারটি কিন্তু একে অপরের থেকে কোনো অর্থেই ভিন্ন নয়। সুরে, বিষয়-নির্বাচনে, প্রশান্ত চিত্তের সহৃদয়তায় এগুলো যেমন সরস তেমনি জীবনরসে পূর্ণ। বিভূতিভূষণের অস্তিত্ব জুড়ে আমৃত্যু-প্রথম আবির্ভাবের পর থেকে ২১ বছর ধরে শ্রীমান অপু বিরাজিত। তার বিস্ময়ভরা দৃষ্টি দিয়ে বিভূতিভূষণ চারপাশের মানুষকে, প্রকৃতিকে দেখছেন এবং আনন্দিত হয়েছেন। সুখে দুঃখে তার সমান আনন্দ, কারণ বালকের মন সহজে দুঃখের স্মৃতি ভুলে যায়। অভাব-অভিযোগের মধ্যেও একটা সুখের কল্পরাজ্য তৈরি করে নেয়। বিভূতিভূষণ তার নিজের ব্যক্তিত্বের উপাদান নিয়ে অপুকে তৈরি করেছিলেন, একথা অনেকেই বলেছেন। অপুর যে জীবনকাহিনী তিনি ‘পথের পাঁচালী’ এবং ‘অপরাজিত’তে বেশ বিস্তৃতভাবে বিবৃত করেছেন তার সঙ্গে লেখক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মিল-অমিল দুই-ই আছে। অনেক কথাসাহিত্যিক তার কোনো কোনো নায়কের মধ্যে নিজেকে কমবেশি রেখেছেন। বিভূতিভূষণ ও অপুর ভাবনায় কল্পনায় বারবার উঁকি দিয়েছেন, এরূপ মনে করার কারণ আছে। তারাশঙ্কর যেমন তার ‘ধাত্রীদেবতা’র শিবনাথে। তবে এসব ক্ষেত্রে সাদৃশ্যকে অনেক দূর পর্যন্ত খুঁজে দেখার তাৎপর্য নেই। ঘটনার সঙ্গে ঘটনা মিলিয়ে লেখক তো আর চরিত্র দৃষ্টি করেন না, তার নায়কের মধ্যে লেখকের অন্তর্ব্যক্তিত্ব প্রতিফলিত হয়। বিভূতিভূষণের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে এবং একটু গভীরভাবেই হয়েছে। এই দিন থেকে বিভূতিভূষণের অপু বিভূতিভূষণের অন্তর্জীবনের ব্যক্তিরূপ। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিল্পী-প্রকৃতির শক্তি এবং সীমাবদ্ধতা এখানেই। তিনি কিশোর বালকের চোখে জীবনকে দেখেছেন। সেই যুগে চিন্তার উত্তাপে মানুষের মন শুকিয়ে এসেছে, অতি জটিল আত্মখ-নে মানুষ সব শান্তি প্রীতি পূজা বিসর্জন দিয়েছেন, সেই যুগে তিনি একেবারে ঘরের মধ্যে পরিবারের কেন্দ্রে সদ্যোজাত শিশুতে, তার বড় হয়ে ওঠা শৈশবে-কৈশোরে মুক্তির মন্ত্র আবিষ্কার করেছেন, এটা যুগন্ধর সমকালীন সাহিত্যিকদের প্রতি তার এক রকমের চ্যালেঞ্জও বটে।
বিভূতিভূষণের শিল্পীদৃষ্টিকে বালকসুলভ বলছি প্রাণপূর্ণতা স্বচ্ছতা উজ্জ্বল কৌতূহল এবং দুশ্চিন্তার ব্যাধি থেকে মুক্তির কথা মনে রেখে। এই তুলনাকে প্রসারিত করে আমাদের বক্তব্যকে ভুল বোঝা ঠিক হবে না। বিভূতিভূষণের মন বালকের মতো অপরিণত এ কথা বলা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। তিনি গ্রামীণ বালকের সহজাত নিসর্গ-সংসর্গ থেকে অরণ্যের স্তরে নিমগ্নচিত্ত ঋষিকল্প মহিমায় উন্নীত হয়েছিলেন। অথবা এমনও বলা যায়, বালক যেমন জন্মের সঙ্গে সঙ্গে গ্রাম জীবনের ঝোপঝাড় সুন্দর অসুন্দর তৃণ পুষ্প এসব কিছুর আত্মীয় হয়ে ওঠে, বিভূতিভূষণ মনের এক প্রান্ত সেই সুরে বেঁধেছেন এবং প্রায় একই সঙ্গে, বলা যায় উপন্যাস লেখা শুরু করার অল্পদিনের মধ্যে আদিম বন পাহাড়ের রূপের ও সত্যের সন্ধান করেছেন। তার চিত্তের দ্বিতীয় সুর এই অরণ্যের সুর। একদিকে নিসর্গের আপনজন গ্রামীণ বালক, অন্যদিকে আরণ্যকে ঋষি। একের সারল্য সহজাত, অপরের সহজাত। বিভূতিভূষণের সৃষ্টি মানব-সংসার যা নিশ্চন্দপুরে অথবা লবটুরিয়ায় রূপায়িত তাও প্রকৃতপক্ষে নিসর্গ-প্রাণ।

তিন
লৌকিক-অলৌকিক
বিভূতিভূষণের শিল্পী ব্যক্তিত্বের পরিচয় নিতে গেলে আরো একটি দিকে লক্ষ্য না করে পারা যায় না। একদিকে একান্ত লৌকিক জীবন অতিসাধারণ ও প্রাত্যহিক, পরিচিত প্রকৃতি, বাস্তব অরণ্য-যার ভূগোল আছে, অন্যদিকে আছে অলৌকিক, অতি প্রাকৃতের প্রতি আকর্ষণ। তিনি একালের শিল্পী হয়েও ধর্মে আস্থাবান ছিলেন এবং পরলোক, জ্যোতিষবিদ্যা, মৃত্যুর পরবর্তী অস্তিত্ব এবং অন্যান্য বিবিধ অতিপ্রাকৃতে বিশ্বাস করতেন। তার দুটি গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাস দেবযান এবং দৃষ্টিপ্রদীপ অতি লৌকিক জগতেরই কথা। দেবযানের বিষয়বস্তু আলোচনা করতে গিয়ে জনৈক সমালোচক বলেছেনÑ
‘দেবযান’-এ মানুষের দেবতা হয়ে ওঠার যে কথা আছে সেই বিবর্তনবাদের ওপর অরবিন্দ-বার্গসেঁর বিবর্তন তত্ত্বের প্রভাব বর্তমান। ব্রহ্মা-, জড়জগৎ, উদ্ভিদ, প্রাণী এবং মানুষ-মানুষের মধ্যে আবার স্থূল মানবিক শক্তি থেকে অতিমানবীয় শক্তি, এই বিভিন্ন স্তর পারস্পর্যের মধ্যে দিয়ে সৃষ্টি বিকশিত হয়েছে। জন্ম মৃত্যুর মধ্যদিয়ে জীবনীশক্তির অগ্রগতির তাৎপর্য এই। উচ্চ মানবিক শক্তির অধিকারী না হলে এই অতিমানবীয় স্তরের অধিবাসীদের দেখা এবং তাদের ভাষা বোঝা সম্ভব নয়।
এই গ্রন্থটিতে লেখক উপনিষদ গীতা অরবিন্দের দিব্যজীবন এবং হেনরি বার্গসেঁর লেখার উদ্ধৃতি দিয়েছেন। ওই দার্শনিক প্রত্যয়গুলোর দ্বারা তিনি গভীরভাবে প্রভাবিতও হয়েছেন। তবে দার্শনিক তত্ত্বের চেয়েও রচনাটিতে বড় হয়ে উঠেছে শিল্পীর সুগভীর কেওতুহ, অচেনাকে চেনার আগ্রহ, না-দেখা বস্তুর মধ্যে থেকে আকণ্ঠ আনন্দরস পানের ব্যগ্রতা। কখনো কখনো মনে হয় দেবযানের অতি লৌকিকতার পথে পথে যে অনৈসর্গিক নিসর্গের ধ্যান, তার সঙ্গে কিশোর-বালক অপুর অদম্য আগ্রহ নিয়ে নিশ্চিন্দপুরে আগাছার জঙ্গলে ঘুরে বেড়ানোর গভীর ঐক্য আছে। দেবযানের পথিক-দেবতার লক্ষ লক্ষ আলোকবর্ষ ধরে পথ-পরিক্রমার বর্ণনা দিয়েছেন লেখকÑ
দেবতা তার ভ্রমণের কাহিনী বলতে লাগলেন… কতো লক্ষ বৎসর পূর্বে তিনি বেরিয়েছেন বিশ্বভ্রমণে। কতো গ্রহ, উপগ্রহ, নক্ষত্র, কতো ছায়াপথ, নীহারিকাপুঞ্জ মানসগতিতে ভ্রমণ করেছেন। আলো বা বিদ্যুতের যেখানে পৌঁছতে লক্ষ লক্ষ বৎসর লাগে- সে সব নক্ষত্রম-লী পার হয়েও লক্ষ আলোকবর্ষ দূরের অঞ্চলে চলে গিয়েছেন তখনও দেখেছেন বহু দূরে আর এক অজানা বিশ্বের সীমান্তবর্তী ক্ষীণালোক তারকাম-লী। (দেবযান, ১ম সংস্করণ, পৃ-৩৯২)।
পথিক-দেবতার এই অজানা রূপের জগতে নতুন এবং নতুনতর বস্তু এবং দৃশ্যের সন্ধানে ঘুরে বেড়ানো পাঠককে সেই অপুর কথাই মনে করিয়ে দেয়। পথিক-দেবতা নিজে বলেছেÑ
ঐ রজনীর তারালোকে ব্যাপ্তির মধ্যে বনপুষ্পের সুবাস ও এই নব উদ্ভূত গ্রহের বনানির নির্জনতা ও বহিরঙ্গের কুজনের মধ্যে, বিশ্বের রহস্যের মধ্যে আমি তাঁর নিত্যসঙ্গী হয়ে থাকবার প্রার্থনা জানিয়েছিলাম মনে মনে। (দেবযান)
‘পথের পাঁচালী’র অপুর থেকে এই দেব-পুরুষের মনের ভাবনায় কিন্তু কোনো মৌলিক পার্থক্য নেই। দৃষ্টিপ্রদীপের নায়ক দিব্যদৃষ্টির অধিকারী। এই দিব্যদৃষ্টির সাহায্যে সে আকাশ পাহাড় মেঘ রাজ্যের মধ্য দিয়ে জ্যোতির্ময় পথ, দূরবিস্তৃত নদী ওপারের গাছপালা সব দেখতে পেতো। কখনো অতীত বা ভাবী ঘটনাও দেখতো। লেখক কল্পনা করেছেন উপন্যাসটির নায়ক তার শৈশবের নিষ্পাপ মনোভাবের জন্যই এই জীবনাতীত মহাজীবনের পথ দেখতে পায়। ড. সুকুমার সেন দৃষ্টিপ্রদীপের নায়ক জিতু অপুরই একটি পরবর্তী সংস্করণ, যেখানে বালকের উপলব্ধি অস্পষ্টভাবে সাধকের তত্ত্বরোধকে ছুঁতে চেয়েছে। অপু এবং জিতুর উপলব্ধি দুটি অংশ উদ্ধৃত করা হচ্ছে- তাতে এই সাদৃশ্য এবং পরিণতিজনিত পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে উঠবে।

পথের পাঁচালীর অপু
হঠাৎ একদিন ওপারের সবুজ খড়ের জমির শেষে নীল আকাশটা যেখানে আসিয়া দূর গ্রামের সবুজ বন রেখার উপর ঝুঁকিয়া পড়িয়াছে, সেদিকে চাহিয়া দেখিতে তাহার মনটা যেন কেমন হইয়া যাইতো সে সব কথা বুঝাইয়া বলিতে জানিত না। শুধু তাহার দিদি ঘাট হইতে উঠিলে সে বলিত- দিদি দিদি দ্যাখ, দ্যাখ, ঐ দিকে- পরে সে মাঠের শেষের দিকে আঙুল দিয়া দেখাইয়া বলিত- ঐ যে? ঐ গাছটার পেছনে? কেমন অনেক দূর না? দুর্গা হাসিয়া বলিতÑ অনেক দূরÑ তাই দেখেছিলি? দুর তুই একটা পাগল!
(চলবে)

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: