জীবনে এমন কত বিচ্ছেদ, কত মৃত্যু আছে, ফিরিয়া লাভ কি? পৃথিবীতে কে কাহার…

ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন:
রাজীবের সঙ্গে আমার গত ডিসেম্বরে সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে পরিচয়। বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ শাখার সাধারণ সম্পাদক হিসেবে সে তার কর্মীবাহিনী নিয়ে নির্বাচনি কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করতো, আমি সেসব কাজের কিছুটা সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করতাম। নির্বাচনে মহাজোটের ভূমিধস বিজয়ের পর ঢাকায় অবস্থানকালে ছাত্রলীগের আহ্বানে বেশ কয়েকবার স্মৃতি বিজড়িত মেডিক্যাল হোস্টেলে গেছি, প্রতিবারই মূল উদ্দেশ্য ছিল এই প্রজন্মের ছাত্রদের সঙ্গে আড্ডা। সেইসব আড্ডার ফাঁকে ফাঁকে সবাইকে রাজনীতির পাশাপাশি নিয়মিত পড়াশুনা করার পরামর্শ দিতাম, সাংস্কৃতিক ও খেলাধূলায় অংশগ্রহণ করতে বলতাম। প্রতিশোধ নয়, ক্ষমার ঔদার্যে ক্যাম্পাসের পরিবেশ সুষ্ঠু রাখার কথা বলতাম। ওরা আমার সঙ্গে একমত হয়েছিল যে প্রচলিত পথে ছাত্র রাজনীতি করে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দিন বদলের সংগ্রামে সফল হওয়া যাবে না। আমি থাকাকালিন ওরা জুনিয়র ছাত্রদের জন্য ব্যাডমিন্টন প্রতিযোগিতা ও ভালবাসা দিবসের সন্ধ্যায় বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। আমরা পুরনো ছাত্ররাও সেখানে গিয়েছি, ওদের বিশেষ অনুরোধে আমি স্বরচিত প্রেমের কবিতা পাঠ করেছি। এভাবেই রাজীবসহ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে আমার একটা চমৎকার সম্পর্ক তৈরি হয়। আমরা যারা একসময়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে ছাত্রলীগ করেছি, তাদের সম্মিলিত উদ্যোগে ছাত্রলীগের নিজেদের মধ্যে বিরাজিত কোন্দলও একসময় মিটিয়ে ফেলা হয়। মাঝে মাঝে খবর নিয়ে জানতাম ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে ছাত্রলীগ এখন ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করছে, দূর থেকে শুনে ভালো লাগত।

কিন্তু মেডিক্যাল ছাত্রলীগের সেই ঐক্যবদ্ধ যাত্রা বেশিদিন থাকেনি, এর মধ্যে শনির দশার মতো সুইডেন থেকে এসে হাজির হলো ঢাকা মেডিক্যালের ছাত্রলীগের প্রাক্তন নেতা ডা. বিদ্যুৎ বড়ুয়া। এসেই সে আবার গ্র“পিংয়ের রাজনীতিকে উস্কে দিতে লাগল। এরই পরিণতিতে গত ৩০ মার্চ সোমবার রাতে বিদ্যুৎ বড়-য়া ঢাকা মেডিক্যালের শহীদ ডা. ফজলে রাব্বি হোস্টেলে এসেছে পুলিশ প্রহরায়, তার সঙ্গে ৫০/৬০ জন বহিরাগতসহ মেডিক্যাল ছাত্রলীগের কয়েকজন কর্মী ছিল। রাজীবকে নির্মম প্রহার শেষে তিনতলা থেকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে, আরো ১৫/২০ জনকে মারাত্মকভাবে নির্যাতন করে বিদ্যুৎ বড়-য়া উদ্ধত ভঙ্গিতে বলেছে, ‘হোস্টেলে কিছু ময়লা জমেছিল, পরিষ্কার করে দিয়ে গেলাম’। শুনেছি রাজীবকে সবচেয়ে নৃশংসভাবে প্রহার করেছে ব্যাচ কে-৬১-এর আরিফ। এই আরিফ ক’দিন আগেও ছাত্র শিবিরের সক্রিয় কর্মী ছিল। নির্বাচনের পর থেকে সে সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের কর্মীদের সঙ্গে চলাফেরা করে। স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে শিবির কর্মী আরিফের কি অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল? বহিরাগত হিসেবে কারা এসেছিল বিদ্যুতের সঙ্গে, তাদের রাজনৈতিক পরিচয়ই বা কী? এত বড় একটা পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড ঘটাতে কারা বিদ্যুৎকে নেপথ্যে থেকে প্রশ্রয় দিয়েছে? হোস্টেলের সংঘর্ষের পর বিদ্যুতের সঙ্গে হামলায় অংশগ্রহণকারী মেডিক্যাল ছাত্র সৈয়দ মামুন মোস্তফা বনি মধ্যরাতে তার ফেস বুকে লিখেছে ‘মিশন অ্যাকোমপলিশ্ড (অভিযান সম্পন্ন)।’ এর কয়েকদিন আগে বিদ্যুৎ তার ফেসবুকে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সোহেল তাজ, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হাসান মাহমুদ, সাবেক প্রতিমন্ত্রী মহিউদ্দিন খান আলমগীর, আওয়ামী লীগ নেতা ডা. জাহাঙ্গীর সাত্তার টিংকুসহ অনেক প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে তোলা ছবি আপলোড করেছে। অনেকেরই ধারণা এইসব ছবি আপলোড করে বিদ্যুৎ তার প্রতিপক্ষকে নিজের রাজনৈতিক গুরুত্ব বোঝাতে চেয়েছে।

তিনতলা থেকে নিক্ষিপ্ত হয়ে রাজীব বিনা চিকিৎসায় হোস্টেলের মাটিতে পড়েছিল প্রায় ঘণ্টা তিনেক, তাকে হাসপাতালে নিতে দেয়নি বিদ্যুতের সন্ত্রাসী বাহিনী। তারপর বিভিন্ন হাসপাতালে ব্যর্থ চিকিৎসা শেষে গত ৩১ মার্চ, মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে ৬টায় সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়। সূত্রমতে, তার মৃত্যু হয়েছিল আরো অনেক আগেই। বিদ্যুৎ বড়-য়া বাহিনীর হাতে রাজীবের মৃত্যু নানান সংকট মোকাবিলায় ব্যতিব্যস্ত বর্তমান সরকারকে নিঃসন্দেহে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে দিয়েছে। বিচার প্রত্যাশার তালিকায় এখন বাড়ল আরো একটি নাম, রাজীব হত্যার বিচার চাই। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্য বড় মায়া হয়। তিনি যতই আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন মহাজোটের নির্বাচনি প্রতিশ্র“তি বাস্তবায়ন করতে, দিন বদলের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে, ততই যেন বাইরের চিহ্নিত ও ঘরের বিভীষণদের দ্বারা বাধাগ্রস্ত হচ্ছেন!

এবার অস্ট্রেলিয়া আসার আগে ঢাকায় থাকার শেষ দিনগুলোতে রাজীব আমাকে একটা এসএমএস করেছিল, ‘ভাইয়া, অনেক দিন ধরে রাজনীতি করছি কিন্তু কেউ আপনার মতো করে আমাকে ভালবাসেনি।’ ছাত্র রাজনীতির অনেক সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও তা থেকে উত্তরণে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের ভেতরে একটা প্রচেষ্টা দেখতে পেতাম। পাশাপাশি রাজীবের তারুণ্যদীপ্ত, সরলতায় ভরা মুখটা দেখে মনে হতো ও আমার প্রিয় অনুজ, কখনো কখনো মনে হতো ও আমার সন্তান। আমাদের সম্পর্কের ভিত্তি বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক আদর্শ হলেও অল্প সময়েই তাকে আমি খুব ভালবেসে ফেলেছিলাম। ভালবাসার মানুষগুলো কেন জানি খুব দ্রুত আমাকে ছেড়ে চলে যায়, সেই তালিকায় সর্বশেষ নাম আবুল কালাম আসাদ রাজীব। আজ দূর প্রবাসে রাজীবের মৃত্যুর খবর শুনে অসহায়ের মতো সেই এসএমএস-এর প্রেক্ষিতে বলতে ইচ্ছে করছে, ভালবাসা নয় রাজীব, তথাকথিত রাজনীতির নামে ‘এই নাও মৃত্যু তোমাকে দিলাম’।

লেখক: কবি ও চিকিৎসক

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: