জীবনে এমন কত বিচ্ছেদ, কত মৃত্যু আছে, ফিরিয়া লাভ কি? পৃথিবীতে কে কাহার…

ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন:
২০০৪ সালের ১৮ জুলাই দৈনিক প্রথম আলোতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন অধ্যাপক মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার ‘বিরোধীদলীয় নেত্রীর বক্তব্য আত্মঘাতী’ শীর্ষক একটি নিবন্ধ লিখেছিলেন। নিবন্ধটি প্রকাশের ১২ দিন আগে অর্থাৎ ঐ বছরের ৬ জুলাই তুরস্ক থেকে ফিরে আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনা ধানমণ্ডির কার্যালয়ে সাংবাদিক সম্মেলনে তাকে প্রদত্ত হুমকি ও দেশের সাম্প্রতিক অন্যান্য বিষয়ে কথা বলেছিলেন। উক্ত সাংবাদিক সম্মেলনে উচ্চারিত বিভিন্ন বক্তব্যই ছিল অধ্যাপক ইয়াহ্ইয়া আখতারের উপরোল্লিখিত নিবন্ধের মূল প্রতিপাদ্য। ওই নিবন্ধে লেখক দুর্বল কিছু যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন এদেশে শেখ হাসিনার জীবনের প্রতি হুমকির ব্যাপারটা মোটামুটি ভিত্তিহীন, অনেকটা আওয়ামী লীগেরই সাজানো নাটক। দেশবাসীর সহানুভূতি অর্জনের জন্য এ নাটকটি শেখ হাসিনাসহ দলের অনেকেই নাকি এতবার করেছেন যে তা ইতোমধ্যেই বেশ পুরনো হয়ে গেছে। ঠিক ওই সময়ে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার কেন এরকম একটি নিবন্ধ লিখেছিলেন তা আজো আমার বোধগম্য হয় না। এটি কি সেসময়ে দেশবাসীকে বিভ্রান্ত করার কোনো অপকৌশল ছিল? অথচ ১৯৮১ সালের মে মাসে বাংলাদেশে পদার্পণের পর থেকেই বহুবার শেখ হাসিনাকে হত্যার ব্যর্থ চেষ্টা করা হয়েছে, সেই থেকে ঘাতকের বুলেট (কিংবা গ্রেনেড) তাকে আজো তাড়া করে ফিরছে।

প্রথম আলোতে নিবন্ধটি প্রকাশের এক মাস তিনদিন পরে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট মৌলবাদী সন্ত্রাসী জঙ্গিরা শেখ হাসিনার জনসভায় নৃশংস গ্রেনেড হামলা চালায়। সেই হামলায় শেখ হাসিনা অলৌকিকভাবে বেঁচে গেলেও আওয়ামী লীগ নেত্রী আইভি রহমানসহ বহু নেতাকর্মী নিহত হন, আহতও হন অনেকে। একুশে আগস্টের গ্রেনেড হামলায় বিগত জোট সরকারের আমলে গড়ে ওঠা ক্ষমতার বিকল্প কেন্দ্র হাওয়া ভবনের হাত ছিল বলে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বারবার অভিযোগ করা হয়েছে। সম্প্রতি ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার উপর প্রদত্ত চার্জশিটে অভিযুক্তের তালিকায় জোট সরকারের আমলের উপমন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টুর নাম রয়েছে। এছাড়া ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলাসহ বাংলাদেশের সকল বোমা হামলায় জেএমবিসহ বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠন জড়িত। ইতোমধ্যে বোমা হামলায় বিচারক নিহত হওয়ার মামলায় শায়খ আব্দুর রহমান, সিদ্দিকুর রহমান বাংলাভাইসহ জেএমবির শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দের ফাঁসি হয়েছে। তবে এদের ফাঁসি হলেও জঙ্গিবাদের এদেশীয় নেপথ্য গডফাদাররা ঠিকই ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে। যার ফলে শীর্ষ জঙ্গিদের ফাঁসির পর জেএমবি’র কার্যক্রমে সাময়িক ভাটা পড়লেও আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে তারা তাদের সন্ত্রাসী কার্যকলাপ ফের শুরু করেছে। নির্বাচনকে সামনে রেখে জেএমবির জঙ্গি সন্ত্রাসীরা আওয়ামী লীগসহ মহাজোটের প্রার্থীদের ঠিকানায় হুমকি প্রদান করা শুরু করেছে। সম্প্রতি র‌্যাবের একাধিক দল জঙ্গিদের গোপন আস্তানা থেকে বিপুল পরিমাণে বোমা বানানোর রসদ উদ্ধার করেছে।

জঙ্গিবাদ ফের সক্রিয় হওয়ায় রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রগতিশীল রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের জীবনের প্রতি একধরনের ঝুঁকির সৃষ্টি হয়েছে। ঝুঁকির মধ্যে থাকা রাজনীতিবিদদের মধ্যে নিঃসন্দেহে শীর্ষে আছেন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জঙ্গিবাদ ও মৌলবাদ বিরোধী আন্দোলনের প্রধান নেত্রী শেখ হাসিনাকে যেকোনো উপায়ে হত্যা করার জন্য বাংলাদেশের জঙ্গি গোষ্ঠী ও তাদের রাজনৈতিক গডফাদাররা মরিয়া হয়ে উঠতে পারে বলে অনেকের মনেই আশঙ্কা। পাকিস্তানের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেত্রী বেনজির ভুট্টোকে যে কায়দায় হত্যা করা হয়েছে, সেই একই কায়দায় শেখ হাসিনাকে হত্যার অপচেষ্টা করা হতে পারে। মৃত্যুর আগে বেনজির ভুট্টো দীর্ঘ নির্বাসন শেষে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরেছিলেন এবং নির্বাচনে তার দলের বিপুল ভোটে জয়লাভের সম্ভাবনার প্রাক্কালে তাকে হত্যা করা হয়। শেখ হাসিনাও সম্প্রতি চিকিৎসা শেষে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরেছেন এবং আসন্ন সংসদ নির্বাচনে দেশব্যাপী তার নেতৃত্বাধীন মহাজোটের বিপুল ভোটে জয়লাভের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

বর্তমান প্রেক্ষিতে সরকার শেখ হাসিনাকে বিশেষ নিরাপত্তা প্রদান করছেন। পাশাপাশি তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষীরাও সক্রিয়। তবে এই আপাত কঠোর নিরাপত্তা ব্যুহ নিয়ে স্বস্তিতে থাকার কোনো অবকাশ নেই। শেখ হাসিনাকে নিরাপত্তা প্রদানের পাশাপাশি সরকারকে জঙ্গি ও সন্ত্রাসীদের বিরূদ্ধে অভিযান কার্যকরভাবে আরো জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি নজর রাখতে হবে জঙ্গিবাদের পৃষ্ঠপোষক রাজনৈতিক গডফাদারদের দিকেও যারা বিভিন্ন সময়ে ‘বাংলাভাই মিডিয়ার সৃষ্টি’র মতো কথা বলে বিভিন্ন সময়ে জঙ্গিদের রক্ষা করতে সচেষ্ট ছিল।

শেখ হাসিনার জীবন বিপন্ন হলে কেবল ব্যক্তির প্রয়ান ঘটবে না, সামগ্রিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে উন্নয়নের পথে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা, ম্ুিক্তযুদ্ধের মৌলিক চেতনাসমূহ এবং প্রগতিশীলতা। জঙ্গিবাদ, মৌলবাদ, সন্ত্রাসী ও তাদের রাজনৈতিক গডফাদাররাতো এটাই চায়, প্রয়োজনে শেখ হাসিনাকে হত্যা করে হলেও!

ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন: কবি ও চিকিৎসক, অস্ট্রেলিয়াস্থ নিউক্যাসেল বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনারত।

ই-মেইল: সরষঃড়হ.যধংহধঃ@হবপিধংঃষব.বফঁ.ধঁ

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: