জীবনে এমন কত বিচ্ছেদ, কত মৃত্যু আছে, ফিরিয়া লাভ কি? পৃথিবীতে কে কাহার…

ekti-bangladesher-golpo-bwমিলু চৌধুরী
একটি কার্যক্রম নেয়া হোক, যে কার্যক্রমের অধীনে ধারাবাহিক ও অব্যাহতভাবে বাংলাদেশের সব স্কুলের প্রতিবছরের নবম শ্রেণীর ছাত্রছাত্রীকে ঢাকায় এনে জাতীয় স্মৃতিসৌধ দেখানোর ব্যবস্থা হবে। স্মৃতিসৌধের মূল বেদির কাছে যাওয়ার পথে যে সঙ্গীত শোনার ব্যবস্থা আছে, তা থেকে যেন শুরু এবং শুধু স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত ও ১৯৭১ ডিসেম্বর-পূর্বের শিল্পীদের ওই সময়ের কণ্ঠে গাওয়া গান বা গানের সুর-মূর্ছনা পরিবেশন করা হয়।

দিন না, মাস না বছর না পুরো তিন যুগ। সুদীর্ঘ এ সময়ে একবারো ওখানে যাওয়া হয়নি। এই না যাওয়াটা প্রায়ই আমাকে বুনো বোলতার মতো হুল ফুটিয়ে কষ্ট দিতো। মনে হলেই নিজের কাছে লজ্জায় পড়তাম। বিনয় নয়, বাড়িয়েও বলা নয় অকৃতজ্ঞ অপরাধী ঠেকতো আমাকে। সেদিন যখন কামাল, আমাদের বন্ধু, বললেন শনিবার তৈরি থাকবেন, সবাই মিলে সাভার যাবো। তাতেই এতোকালের ওই লজ্জা, ওই অপরাধ বোধের কাক্সিক্ষত মৃত্যু হলো। সেদিনই আমি জাতীয় স্মৃতিসৌধে প্রথম গিয়েছি। তাতে যেন বাঁচলাম। নির্ভার হলাম। আত্মগ্লানি থেকে নিষ্কৃতি পেলাম।
বিষয়টা মামুলি ছিল না। জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ যে প্রাণ, যে স্বপ্ন-সাধ-প্রেম-ভালোবাসা তার সবটুকু এক মহৎ চেতনায় তারা উৎসর্গ করেছিল দেশের জন্য। মানুষের জন্য। দেশের মানুষের রাজনৈতিক অর্থনৈতিক সাংস্কৃতিক মুক্তি ও স্বাধীনতার জন্য। তারা তাদের জীবনের বিনিময়ে আমাদের আহার আবাস পোশাক শিক্ষা চিকিৎসা বিনোদনÑ এসব মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে চেয়েছিল। গল্পে ও ইতিহাসে পড়া আগের দিনের মতো বাংলাদেশকে ধান গান শিল্প সাহিত্য উৎসব পার্বণ আনন্দ সৌহার্দে ভরে তুলতে চেয়েছিল। তারা চেয়েছিল আমাদের দেশ শৌর্যে-বীর্যে, বিত্তে-বৈভবে আবারো পৃথিবীর বুকে নিজ শক্তিতে উঠে দাঁড়াকÑ এ চাওয়া কতো বড়, কতো মহৎ কতো সুন্দর আমি জানি। আমি বুঝি। অথচ তাদের এ চাওয়া ও আত্মত্যাগের মহিমাকে সমুন্নত করে রাখতে যে স্মৃতিসৌধ সাভারে নির্মাণ করা হয়েছে, তার কাছে দুদিন আগেও যাইনি। সত্যিই লজ্জার। গ্লানির। নিজেকে নিখাদ প্রগতিমনা সংস্কৃতিবান দেশপ্রেমিক জেনে এসেছি। আর কি না আমিই দেশমাতৃকার শ্রেষ্ঠ সন্তানদের স্মৃতির সৌধে যেতে এতো দীর্ঘ সময় নিয়েছি। ধিক!
আজ আমার, আমার পরিবার, আমার স্বজন-পরিজনের যে অস্তিত্ব, স্বাধীন সার্বভৌমভাবে যে বেঁচে থাকা, রাষ্ট্রের পিয়ন থেকে প্রেসিডেন্ট হওয়ার যে সর্বজনীন অধিকার, জীবনের এই যে এতোসব অর্জনÑ তার সুযোগ, তার অফুরন্ত সম্ভাবনার এ দেশের মালিক আমাকে বানিয়েছে কারা? ওরা। ওরাইÑ আমাদের ছাত্র-শিক্ষক, শ্রমিক, কিষান, মজুর, সৈনিক শহর-গ্রামের শতসহস্র সোনার শহীদ সন্তানরা। অতএব এতো আমার নৈতিক বাধ্যকতাÑ শহীদদের স্বপ্নকে সফল করা, তাদের স্মৃতিকে সম্মান করা।
আমরা রওনা দিয়েছিলাম সকাল সকালইÑ সাতটায়। ঢাকা শহরের পাড়ায়-পাড়ায় ততো বেশি তো তরুলতা নেই। প্রভাতী পাখির কাকলি শোনার সৌভাগ্য তখন হয়নি, যা হয়েছে সূর্যালোক দেখার। কাছের কয়েকটি কড়ই কৃষ্ণচূড়ার পাতা প্রশাখার ফাঁক দিয়ে শিশুরোদ এসে এলিয়ে ছিল আমাদের অপেক্ষার চারপাশেÑ বিজ্ঞান জাদুঘর চত্বরে। সবার মিলিত হওয়ার স্থান ঠিক হয়েছিল সেখানেই। উদ্যোক্তা পরিবার এসে পৌঁছাতেই আমরা শান্ত-সুশৃঙ্খল রওনা দিলাম। সামনে সাদা প্রাইভেট কার। পেছনে পিউলি মাইক্রোবাস। রাস্তায় তখনো যানজট লাগেনি। স্বাচ্ছন্দ্যে এগোচ্ছিল আমাদের গাড়ি। সবাই প্রায় নির্বাক। থেকে থেকে গুঁড়ি গুঁড়ি মৃদু কথাচারিতা। একটা বিশেষ স্থানে যাচ্ছি বলে আমার অনুভূতি ক্রমে একমুখী ও তীব্রতর হচ্ছিল। এমনিতে ওই স্মৃতির সৌধ ছবিতে, টিভিতে অনেক দেখেছি। তাতে কমবেশি আলোড়িত হয়েছি। কিন্তু জীবন্ত দেখতে যাওয়ার অনুভূতির সঙ্গে তার তুলনা হয় না। আজকের এই যাওয়া নিছক স্মৃতিসৌধে যাওয়া তো নয়ইÑ এ যে শত চেনা, শত শহীদকে শত বছর পর দেখতে যাওয়া।
স্বল্প সময়ের মধ্যে আমরা ঢাকা থেকে ৩৫ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে সাভার এসে পৌঁছালাম। সৌধ সীমার সংলগ্ন এলাকায় গাড়ি দুটো রেখে ধীর পায়ে প্রধান প্রবেশ দ্বারের দিকে এগোতে থাকলাম। তখন হঠাৎ মনের সমুদ্রে একটা দুর্ভাবনার দাঁতাল হাঙর উঁকি দিয়ে উঠলো। আজকের সর্বোব্যাপী বাণিজ্যের বৈকল্যে প্রশ্ন জাগলোÑ এ মহান পুণ্যস্থানে প্রবেশের জন্য মূল্যটুল্য রাখা হয়নি তো? আশঙ্কার দোলাচলে মনে মনে চাইলাম, সৌধ এলাকায় যাওয়ার জন্য পয়সা নেয়ার চলন যেন না থাকে। যা চির মহিমান্বিত, চির গৌরবের, চির কালের, চির আদর্শেরÑ যাকে কেন্দ্র করে ছুটে এসে মানুষ নিবেদন করে হৃদয়-মনের নিঃস্বার্থ আবেগ, নির্মল অনুভূতি তা দেখতে তা অনুভব করতে মুদ্রার মসকরা কেন থাকবে! আকাশের অসীমতা, সমুদ্রের মহাউচ্ছ্বাস, পাহাড়ের মহাউত্থান, অরণ্যের মহাবিস্তারকে অভিভূত চোখে দেখবো, উপলব্ধি করবো সেজন্য কিসের দর্শনী চাও তুমি? সাধুবাদ সৌধের কর্তৃপক্ষকে, তারা তা চাননি। প্রয়োজনের পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে পয়সা গ্রহণের রীতি রাখেননি।
আমরা কয়পা এগোতেই সৌধের সাধারণ ফটকে পৌঁছালাম। সেখানে বেঞ্চে বসা ও পাশে দাঁড়ানো দুজন লোক। প্রবীণ তারা। কর্তৃপক্ষ মনে হলো। আমরা তাদের সালাম বলে ভেতরে প্রবেশ করলাম। তারপর সরাসরি দৃষ্টি দিলাম একটু দূরে সৌধের দিকে। আমি পুলকিত হলাম। কী বিশাল উচ্চতায় দাঁড়িয়ে যেন আমাদের মূর্ত স্বাধীনতা। আমার হৃদয়ে ঘুমিয়ে থাকা মহান শহীদদের স্মৃতির প্রতীক। বিনম্র শ্রদ্ধায় মনে মনে বললাম, তোমরা আমাকে ক্ষমা করো, আমি অবশেষে এসেছি।
তারপর এদিকে ওদিকে তাকালাম। সবুজ। কেবলই সবুজ। সবুজ দুর্বাঘাসের দ্বীপ যেন চারপাশে। ঘাসদ্বীপের তীরে তীরে যতেœ পালিত বিভিন্ন গাছ। ছোট ছোট। ফুলের, ফলের আর শুধুই সুন্দরের। খুব পরিচ্ছন্ন পরিবেশ। বাড়ন্ত সূর্যের আলোয় আলোয় ঝকঝক করছে পুরো প্রকৃতি। তবে নীরব, নিথর। দর্শক যারা এসেছে, শান্ত-শিষ্ট সৌম্য সবাই। যে যার মতো হাঁটছে, দেখছে, এগোচ্ছে। কথা নেই কারো মুখে। নৈঃশব্দের এমন রূপ মানুষের রাজ্যে বিরল। আমার মনে হলো এমন স্থান এ রকমই শোভনÑ হই চই হই-হুল্লোড়হীন। এখানে জীবনের ভাষা উচ্চারণের নয়, অনুভবের। কেবল অনুভবের। সে অনুভব হোক অঙ্গীকার বন্ধেরÑ আমরা শহীদদের স্মরণে কৃতজ্ঞ থাকবো, আমরা শহীদদের স্বপ্নকে সমুন্নত রাখবো।
চারপাশের আয়োজনÑ লেক সেতু ঘাসদ্বীপ ঝরনা জলাশয় আর বিশাল বিস্মৃতি দেখে আমি তো থ। রীতিমতো মুগ্ধ। তখনই ভাবলাম ১০৮ একর জমি জুড়ে নির্মিত স্মৃতিসৌধের পুরো কমপ্লেক্সটা ঘুরে দেখবো। তবে সবকিছুর আগে এগোতে থাকলাম সৌধের মূল বেদীর কাছে। ঝরনাটা বাঁয়ে রেখে শোকাতুর হাঁটছি। হঠাৎ শুনতে পেলাম স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসমথিত একটি গানের সুর-মূর্ছনাÑ ‘আমার হৃদয় রেখে যেতে চাই তাদের স্মৃতির চরণে।’ মৃদুভাবে বাজছে সব বাঙালির প্রাণ জয় করা ফজল- এ খোদার লেখা, নিজের সুরে আবদুল জব্বারের গাওয়া গান। একেবারে অভিভূত হলাম। এমন আবহে এমন গান শতভাগ সঠিক সংযোজন। আমার শরীরের সব লোম মুহূর্তেই ওই গানের লক্ষ্যÑ সুরকার-শিল্পীর প্রতি সম্মান শ্রদ্ধায় উঠে দাঁড়ালো। মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচার করা এ গান আমাদের মোহিত আর মৃত্যুঞ্জয়ী করে তুলতো। কোথা থেকে আসছে এ কালজয়ী গান? চোখ ফিরে দেখি লাল ইটে তৈরি পাশের শৈল্পিক অবকাঠামোয় আঁটানো আছে বেশ ক’টি সাউন্ডবক্স। নির্মাতাদের এ আইডিয়া আমার খুব ভালো লাগলো।
আর কয়েক মুহূর্ত পরই এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। আমি এসে পৌঁছালাম লক্ষ্যবস্তুর একেবারে কাছে। আমার সামনে তখন চির উন্নত শির, শিখর হিমাদ্রির, আমাদের অনন্তকালের যুগপৎ শোক ও শক্তির, সাহস ও সংগ্রামের, সহস্র শহীদের ত্যাগ ও শৌর্যের পুণ্য প্রতীক জাতীয় স্মৃতিসৌধ। কালবিলম্ব না করে মনের স্বতঃস্ফূর্ত আবেগে অনুরাগে শুদ্ধ সৈনিকÑ শৈলীতে আমি তাকে সেলুট করলাম। তারপর মন্ত্রমুগ্ধ নতশির দাঁড়িয়ে থাকলাম কতোক্ষণ। তারপর ওই শাশ্বত স্থাপত্যশিল্পের সবটুকু সৌকর্য সৌন্দর্য ঘুরেফিরে দেখলাম।
অসম উচ্চতা ও ভিন্ন ভিন্ন ভিত্তির ওপর ৭টি প্রাচীর। ত্রিভুজ আকৃতির। প্রতিটি প্রাচীরের মাঝে ভাঁজ দিয়ে কোণাকৃতি করা ও সারি সারি বসানো। সব পেছনের প্রাচীরের শীর্ষ ১৫০ ফুট উঁচু। পুরো কাঠামোটি এমনভাবে তৈরি যে, ভিন্ন ভিন্ন স্থান থেকে তাকে ভিন্ন ভিন্ন অবকাঠামোয় পরিদৃষ্ট হয়। এর অভ্রভেদী সূক্ষ্ম উচ্চতা, মেরুদ- খাড়া সুদৃঢ় ভঙ্গি, প্যাটার্নের বলিষ্ঠতা, গাম্ভীর্য, রঙ, আকার এবং পুরো ডিজাইনের অনন্যতায় আমার অন্তর আনন্দে অহঙ্কারে ভরে উঠলো।
স্থপতি শিল্পী মইনুল হোসেনের এ অমর সৃষ্টির মাধ্যমে বাঙালি জাতির হৃদয় বুদ্ধি ও শিল্পবৃত্তির যে ধ্রুপদী পরিচয় প্রকাশ পেয়েছে, তা বাংলাদেশের গৌরব-সৌরভ-ভাবমূর্তি বহু মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে।
সৌধের সামনে বেশকটি গণকবর। একটি প্রতিফলন সৃষ্টিকারী জলাশয়। মূল বেদীতে পৌঁছাতে চলার পথে বেশকিছু উঁচু-নিচু এলাকা, স্থাপনা ও কৃত্রিম লেকের ওপর নির্মিত সেতু পার হতে হলো। এসবের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জনের কষ্ট ও সংগ্রামের প্রতীকী চেতনা দেয়ার উদ্দেশে কাজ করেছে বলে মনে হলো। আমি যখন সৌধের সবকিছু নিবিড়ভাবে দেখছি, তখন স্তম্ভ প্রাচীরের অঙ্গনজুড়ে সে কী বাতাস! প্রাণ জুড়ানো দখিনা মলয়। আমার মনে হলো, এ নিছক বাতাস নয়, আরো কিছুÑ শহীদদের প্রতি প্রকৃতির মমতা। দেশমাতার মুক্তির জন্য যে সন্তানরা অকাতরে প্রাণ দান করেছে, সে প্রাণ প্রশান্ত রাখতে ওই বাতাস যেন দেশমাতার প্রতিদিনের প্রতিদান।
সৌধ সীমায় চলার সময় একবার মনে পড়লো বঙ্গবন্ধুকে। আর মনে হলো, ১৯৭২ সালে পরিকল্পিত এ সুবিশাল সৌধ তার অকুতোভয় দেশপ্রেম, কোমল-কঠিন ব্যক্তিত্ব, তার বিশাল বক্ষেরই বহির্প্রকাশ যেন।
তখন বেলা বেশ বেড়েছে। আমরা ইতিমধ্যে সৌধসীমার সবটুকু দেখেছি। সবটুকুই সুন্দর। শিল্পিত। সন্তুষ্ট হলাম সরকারের গণপূর্ত বিভাগের প্রতি। জাতীয় মূল্যবোধ জড়িত এ রকম একটি আবেগ ও সংবেদনশীল কাজ তারা সুচারুভাবে সম্পন্ন করেছেন এবং সংরক্ষণ করছেন।
একটা অপরিহার্য কর্তব্য শেষে অসীম আত্মিক তৃপ্তি নিয়ে আমরা ঢাকার দিকে রওনা দিলাম। গাড়ি চলছে। সদ্যঅর্জিত অভিজ্ঞতার ভারে আমি তখন নিমগ্ন ভাবনার ভৈরবে। সে ভাবনা সৌধকেন্দ্রিক। সৌধ এলাকায় প্রবেশ থেকে প্রস্থান পর্যন্ত আমার মনে অনেক কিছুর উদয় হয়েছিল। তার কিছু নিয়ে আমি কল্পনায় কথা বলতে থাকি গণপূর্ত বিভাগের উচ্চপদের কর্মকর্তাদের সঙ্গেÑ জাতির পক্ষ থেকে আপনাদের ধন্যবাদ। স্মৃতিসৌধের বাস্তবায়ন সত্যিই সুন্দর। তবে সুন্দরের শেষ বলে তো কথা নেই, তাই কিছু প্রস্তাব নিয়ে এসেছি।
প্রস্তাব ১
একটি-দুটি রুম করা হোক প্রবেশ পথের পাশেই। দর্শক যারা আসবে, বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের, তাদের সেখানে মিনিট তিরিশ ব্রিফ করার ব্যবস্থা হোক। তাদের আসাটা যাতে সৌধ-স্থাপত্য দেখার সঙ্গে সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের তাৎপর্য, শহীদদের ত্যাগ ও শৌর্য এবং স্বাধীনতার মূল্যবোধের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়। এ ব্রিফিংয়ের বক্তব্য-বিষয় হবে পূর্ব নির্ধারিত, সুনির্দিষ্ট ও অপরিবর্তনীয়। যে যখনই ব্রিফ করবেন, ওই একই বিষয় মুখস্থ, সাবলীল ও স্বাচ্ছন্দ্যভাবে তুলে ধরবেন।
ব্রিফিংয়ের বক্তব্যÑ বিষয়ের দুটি পর্ব থাকবে। প্রথম পর্বে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম বা রাজনৈতিক ইতিহাস বলা হবে। এর সময় হবে ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত। এখানে মূলধারার গণতান্ত্রিক রাজনীতির দিকপাল ব্যক্তিত্বদের ভূমিকা ও অবদানের কথা বলা হবে। দ্বিতীয় পর্বে থাকবে বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রাম বা সশস্ত্র যুদ্ধের ইতিহাস। এর সময়কাল হবে ১৯৭১-এর জানুয়ারি থেকে ১৯৭১-এর ডিসেম্বর পর্যন্ত। এখানে সেনানিবাস, শিক্ষাঙ্গন, শ্রমিকাঞ্চল ও মাঠ পর্যায়ের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী শীর্ষ বীরযোদ্ধাসহ সব মুক্তিযোদ্ধা তথা মুক্তি সংগ্রামে সহযোগিতাকারী সমগ্র জনগোষ্ঠীর ভূমিকা ও অবদানের কথা বলা হবে।
প্রস্তাব ২
ব্রিফিং রুমের পাশেই একটি জাদুঘর করা হোক। জাদুঘরের এক অংশে ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম বা মূলধারার গণতান্ত্রিক রাজনীতির দিকপাল ব্যক্তিত্বদের অভিন্ন মাপের একটি করে ছবি রাখা হোক। আরেক অংশে ১৯৭১ মার্চ থেকে ১৯৭১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রাম বা সশস্ত্র যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী শীর্ষ বীর যোদ্ধাদের অভিন্ন মাপের একটি করে ছবিসহ সব মুক্তিযোদ্ধার আরেক ও অভিন্ন মাপের একটি করে ছবি রাখা হোক। সেসঙ্গে ওই সময়কালের তথ্য ও প্রচার যুদ্ধের, চিকিৎসা ও সেবাযুদ্ধের, চিত্রকলা ও সঙ্গীত যুদ্ধের, গ্রামে গ্রামে মুক্তিসেনা এবং বিপন্ন মানুষের আশ্রয় ও আহারদান যুদ্ধের তথা সামাজিক-সাংস্কৃতিক রণাঙ্গনের বিভিন্ন ছবি রাখা হোক। প্রস্তাবিত ব্রিফিং ও জাদুঘর হয়ে দর্শনার্থীরা সৌধ এলাকায় বেরিয়ে পড়বে।
প্রস্তাব ৩
একটি কার্যক্রম নেয়া হোক, যে কার্যক্রমের অধীনে ধারাবাহিক ও অব্যাহতভাবে বাংলাদেশের সব স্কুলের প্রতিবছরের নবম শ্রেণীর ছাত্রছাত্রীকে ঢাকায় এনে জাতীয় স্মৃতিসৌধ দেখানোর ব্যবস্থা হবে।
প্রস্তাব ৪
স্মৃতিসৌধের মূল বেদির কাছে যাওয়ার পথে যে সঙ্গীত শোনার ব্যবস্থা আছে, তা থেকে যেন শুরু এবং শুধু স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত ও ১৯৭১ ডিসেম্বর-পূর্বের শিল্পীদের ওই সময়ের কণ্ঠে গাওয়া গান বা গানের সুর-মূর্ছনা পরিবেশন করা হয়।
প্রস্তাব ৫
জাতীয় স্মৃতিসৌধকে আরো বিশেষায়িত করতে লেক বা জলাশয়ে সবসময়ের জন্য সুনির্দিষ্টভাবে ১৯৭১টি হাঁস পালনের উদ্যোগ নেয়া হোক। এ হাঁসগুলো হতে হবে অবশ্যই সাদা এবং সাদা। এর মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত স্বাধীনতা ও শান্তির প্রতীকী অর্থ বোঝানো হবে। দেশে দু®প্রাপ্য হলে বিদেশ থেকে সাদা হাঁস সংগ্রহ করতে হবে।
মিলু চৌধুরী: লেখক।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: