জীবনে এমন কত বিচ্ছেদ, কত মৃত্যু আছে, ফিরিয়া লাভ কি? পৃথিবীতে কে কাহার…

প্রফেসর মোহম্মদ আশরাফ:
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে উপন্যাস হলো আধুনিক যুগ সচেতন শিল্পকলা৷ ঊনবিংশ শতাব্দীর ইংরেজ বেনিয়া শাসিত কলকাতা এবং তত্‍কালীন মফস্বল জীবনের যে বিন্যাস, সেই বিন্যাসের টানাপোড়নের বাস-ব আকর্ষণেই জন্ম নেয় বাংলা উপন্যাস৷ সেই সময়ে কলকাতাকে কেন্দ্র করে মধ্যবিত্ত বাঙালি সমাজে জীবনগ্রহের যে বীজ অংকুরিত ও সঞ্চীবিত হতেছিল, তারই প্রচণ্ড আলোড়নে মধ্যবিত্ত চিরাচরিত জীবনবোধ এক নতুন আশা আকাঙ্ক্ষার জন্ম নেয়৷ ফলে জীবন ভাবনায় দেখা দেয় তীব্র সংকট৷ যুগ চেতনার সেই প্রক্ষাপটেই সৃষ্টি হয় নববাবু বিলাস ও আলালের ঘরে দুলাল৷ এর মাধ্যমে বাংলা উপন্যাসের যাত্রা শুর\” হয়৷
প্যারীচাঁদ মিত্র রচিত আলালের ঘরের দুলাল উপন্যাসের যথার্থ লক্ষণ প্রত্যক্ষ করা গেলেও বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ই বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক ঔপন্যাসিক৷ উপন্যাস রচনার কলা-কৌশল আয়ত্বের ক্ষেত্রে বঙ্কিমবন্দ্রই প্রথম সার্থক শিল্পী৷ এ জন্য তাকেই বাংলা উপন্যাসের জনক বলা হয়৷
বঙ্কিম পরবর্তীকালে কবিগুর\” রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সর্বশ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক হিসেবে বিবেচিত হলেও শরত্‍চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ছিলেন সর্বো\”চ জনপ্রিয়তার অধিকারী৷ উপন্যাস রচনায় তাঁর উপাধি ছিল অপরাজেয় কথাশিল্পী৷ শরত্‍চন্দ্রের পরে আরও অনেকেই উপন্যাস রচনায় কৃতিত্বের পরিচয় দিলেও মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ই সর্বাধিক জনপ্রিয় লেখক৷ উপন্যঅস রচনায় তিনি ছিলেন নানান কৃতিত্বের অধিকারী৷
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবী জুড়ে মানবিক মূল্যবোধের যে চরম সংকট দেখা দিয়েছিল, তারই প্রত্যক্ষ প্রভাবে বাংলা কথা-সাহিত্যে আমূল পরিবর্তনের এক ধারা সূচিত হয়েছিল৷ যে কয়েকজন লেখকের হাতে এ বৈপবিক ধারার সূচনা হয় মানিক বন্দোপাধ্যায় ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম৷ প্রকৃতপক্ষে তিনিই ছিলেন বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক রিয়ালিটি বা জীবনবাদী শিল্পী৷ কারণ, সমসাময়িককালের মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত বাঙালি জীবনের ট্রাজেডি, এতো নির্মমবাস-বতাও শিল্প-কুশলতায় আর কোনো লেখক ফুটিয়ে তুলতে পারেননি৷ নিম্নবিত্ত ও সর্বহারা সমাজের মানুষের ক্ষয়-ক্ষতি, মনুষ্যত্বের অপচয়, ক্লেদ-হতাশা ও দুঃখ বেদনা তাঁর সততা, নিষ্ঠা ও আদর্শ বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক স্বতন্ত্রধারায় চিরভাস্বর৷ এ প্রসঙ্গে প্রখ্যাত সমালোচক নারায়ণ চৌধুরী বলেছেন, ‘মানিক বন্দোপাধ্যায়ের অভ্যন-িক রিয়ালিজম ঘেঁষা মনোভাব তাঁকে শিল্পজীবনের সৌন্দর্যের আদর্শ থেকে দৃষ্টিগ্রাহ্যভাবেই বিচু্যত করেছে৷ এমন কি মধ্য ও শেষের দিকের লেখায় তিনি সচেতনভাবেই অসুন্দরের পূজারী হয়ে উঠেছিলেন বললেও অন্যায় হবে না৷’ (নারায়ণ চৌধুরী; সমকালীন সাহিত্য পৃষ্টা-১২৩-২৪)৷
কালের বিচারে মানিক বন্দোপাধ্যায় ছিলেন ত্রিশের যুগের বাংলা ঔপন্যাসিকরেদ অন্যতম প্রধান পুর\”ষ৷ এই ত্রিশের কলোল যুগেই বাঙালি মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবী মানসে চিন-াচেতনাকে বিজ্ঞান মনস্ক করে তোলার জন্য যে প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়; তার একদিকে যেমন রয়েছে বিশ্ববীক্ষা স্বদেশকে বিশ্বের অংশ হিসেবে উপলব্ধি করা, তেমনি অন্যদিকে রয়েছে মানুষেরা পরিবেশ ও মনোজগত সম্পর্কে নানা প্রশ্নের ক্রিয়াশীল ভূমিকা৷ সে কারণেই ত্রিশের বুদ্ধিজগতে জীবনের সার্বিক সংকটে৷ স্বীকৃতি যেমন স্পষ্ট, তেমনি সেই সংকটকে শিল্প সৃষ্টিতে পরিহার না করার দৃঢ় প্রবণতাও লক্ষণীয়৷ এই দৃঢ়তার মূলে ছিল জীবন সম্বন্ধে প্রবল আশাবাদ৷ মানিক বন্দোপাধ্যায় ছিলেন সেই আশাবাদী জীবনের একজন সচেতন শিল্পী৷ তাই তাঁর উপন্যাস সমূহে ধ্বনিত হয়েছে সমকালীন মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত বাঙালির আশাদীপ্ত জীবনচেতনার চঞ্চল প্রেরণাও তীব্র বেদনাবোধ৷
জীবন আশাবাদী শিল্পী মানিক বন্দোপাধ্যায় মোট ১৯টি উপন্যাস রচনা করেছিলেন৷ তাঁর প্রথম উপন্যাস দিবারাত্রির কাব্য’৷ প্রকাশকাল_১৯৩৫৷ প্রকাশের দিক থেকে এটি দ্বিতীয় প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ জননী’৷ তাঁর সর্বশেষ প্রকাশিত উপন্যাস ‘মাটির ছেলে’৷ প্রকাশকাল-১৯৬০৷ তার মৃতু্যর পর গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়৷
বিষয়বস\’ ও মনোদৃষ্টির ভিন্নতার কারণে তার রচিত উপন্যাসসমূহকে প্রধানত তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়৷ প্রথম ভাগে পুতুল নাচের ইতিকথা এবং পদ্মানদীর মাঝি৷ দ্বিতীয়ভিাগে চতুস্কোন সরীসৃপ অহিংসা প্রভৃতি এবং তৃতীয়ভাগে পড়ে শহরতলী চিহ্ন আরোগ্য ইত্যাদি৷ এরই তিনভাগের রচনায় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় যদিও তিনটি ভিন্ন দৃষ্টিকোণ ব্যবস্থা করেছেন, তথাপি তাঁর মনোভঙ্গি ও জীবন গ্রহণের পদ্ধতি প্রথম থেকে শেষ পর্যন- প্রায় অপরিবর্তিত থেকে গেছে৷ শিল্পী হিসেবে মানিক বন্দোপ্যাধায়ের শক্তি এবং দৌর্বল্যের উত্‍স এই অপরিবর্তনীয় মনোভঙ্গির মধ্যেই নিহিত৷ মানিক বন্দোপাধ্যায়ের ক্ষেত্রে তাঁর উপন্যাসের শিল্প-সংকটের যে অভিযোগ আনা হয়, সে সংকট তাঁর পক্ষে মূলত মতবাদেরই সংকট৷ এই সিদ্ধান-ের কথা মনে রেখেই মানিব কন্দোপাধ্যায়ের উপন্যাসের বাস-বতা এ সম্পর্কে আলোচনার সূত্রপাত৷
বাংলা সাহিত্যের ধারায় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস, বক্তব্য ও প্রকরণ ব্যাক্তিত্বমণ্ডিত ও স্বচিহ্নিত জীবনের অন-র্গত এবং বহির্গত বিষয়ের উন্মোচনে বাংলা উপন্যাসের সম্ভাবনার সীমানাকে তিনি অনেক দূর পর্যন- এগিয়ে দিয়েছেন মানুষের মনোবিশ্বও বহির্বাস-বতার সঙ্গে নিজস্ব জীবনাবেগও তত্ত্বাবেগের সুষম সমন্বয় সাধণের অসাধারণ দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন৷ সেজন্যই তাঁর উপন্যাসে বিন্যস- মনোবিশ্ব যেমন স্বতন্ত্র ও নিগূঢ়, অভিনিবেশ্য বিশেষত্বপুর্ণ৷ এ বৈশিষ্ট্যের কারণেই রাবীন্দ্রিক উত্তরাধিকারী হওয়া সত্ত্বেও তাঁর প্রথম উপন্যাস দিবারাত্রির কাব্য তাঁর শিল্প-চেতনার স্বাতন্ত্র্যময় সম্ভাবনাকেই ধারণ করেছে৷ বিষয় ও প্রকরণে এই উপন্যাসে তিনি যেমন নিরীক্ষাধর্মী ও ব্যতিক্রম, ব্যতিক্রম, তেমনি জীবনের প্রতি একটা গভীরতার স্বরূপ উন্মোচনেও উত্‍সুক৷ জীবনের এই অনর্-লোক সন্ধানী শিল্পদৃষ্টি তাঁর উপন্যাসে সহজ-সরল গ্রামীন জীবনের গভীরতার স্বরূপ উন্মোচনেও উত্‍সুক৷ জীবনের এই অনর্-লোক সন্ধানী শিল্পদৃষ্টি তাঁর উপন্যাসে সহজ-সরল গ্রামীন জীবনের জটিলতা চিত্রিত করেছেন৷ বৃহত্তর গণজীবনের সার্থক রূপচিত্র অঙ্কনে এবং শক্তিময় অন-স্রোত সৃষ্টিতে তিনি বাস-ব মূল্যবোধকে কাজে লাগিয়েছেন৷ তিরিশের দশকে অাঁকা তাঁর এই গ্রামীণ জীবন চিত্র প্রত্যক্ষ সংগ্রামের শ্রেণী সচেতনায় শাণিত না হলেও জীবন সংগ্রাম সেখানে কখনো প্রতীকের আড়ালে, কখনো অদম্য উত্তীর্ণ তার স্পৃহায় সীমাবদ্ধ৷ ‘পদ্মানদীর মাঝিতে তা গতিমুখর হলেও পুতুল নাচের ইতিকথায় সে স্পৃহা বুদ্ধিদীপ্ত৷ তিনি জীবন অন্বেষার পথ ধরে জনজীবনের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেছে৷
মানিক বন্দোপাধ্যায়ের প্রথম উপন্যাস ‘জননী’ মূলত শহরতলী এবং গ্রামের এক মিশ্র পরিচয়৷ শহরতলীতে বসবাসরত শ্যামার পারিবারিক জীবন যেন অনেকাংশেই গ্রামীণ জীবনাচরণ বহন করে চলেছে৷ তবুও একথা বলতে হয় যে, জননী অংশত পুতুল নাচের ইতিকথার এবং পরিপূর্ণ পদ্মানদীর মাঝিকে বাংলার গ্রাম তার রূঢ় বাস-ব নিসর্গ এবং চলিষ্ণু মানুষের কাহিনী নিয়ে আশ্চর্যরকম সজীবতায় মূর্ত৷ গ্রামীন জীবনের দৃশ্যচিত্র নির্মাণের এবং প্রধান প্রধান চরিত্র সৃষ্টিতে তিনি যে সচেতনতার স্বাক্ষর রেখেছেন, তা নিঃসন্দেহে এক বৈপ্লবিক পদক্ষেপ৷
পুতুল নাচের ইতিকথা ও পদ্মানদীর মাঝি উপন্যাস দুটিতে মানিক বন্দোপাধ্যায় একটি সুতীব্র ও বহমান নদীর দ্বন্দ্ব উপস্থিত করেছেন৷ এই দ্বন্দ্বস্মৃতির সঙ্গে বিস-ৃতির সীমার প্রসারতার বসতির সঙ্গে ভ্রমণের শোষন পীড়িত শ্রেণীদ্বন্দ্বের অসংগতিতে বিভক্ত সমাজে সাহিত্যিকের কাচে মার্কসবাদ একটি একটি আদর্শও স্বপ্ন৷ মানিক বন্দোপ্যাধ্যায় ছিলেন সেই স্বপ্নও আদর্শে বিশ্বাসী এক নিষ্ঠাবান শিল্পী৷ তাই তাঁর উপন্যাস এর যথার্থ প্রতিফলন লক্ষ্য করা যায়৷ বেঁচে থাকার আশা ও স্বপ্ন নিয়ে তাঁর উপন্যাসের চরিত্রগুলো প্রতিকূল অবস্থার সঙ্গে প্রতি নিয়ত সংগ্রাম করে চলেছে৷
উপন্যাস রচনায় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় সত্য-সন্ধানী৷ তাঁর উপন্যাসে যে গভীর সত্য প্রকাশিত হয়েছে তার স্বরূপ হলো মানুষের প্রতি ভালোবাসা৷ মানুষের বাস-ব জীবনের প্রতি ভালোবাসা৷ এই ভালোবাসার চিত্র অঙ্কন করেছেন৷ পদ্মাপাড়ের জেলে-মাঝিদের জীবন ও ওদের সুখ-দুঃখ নিয়ে তাঁর পূর্বে তার আর কোনো লেখক এমন তীক্ষ্মভাবে, এমন মমতার রসে সিক্ত হয়ে ওদের জীবন চিত্র অঙ্কন করেননি৷ বাংলা সাহিত্যে তাঁর উপন্যাসেই প্রথম সমাজের নীচুতলার মানুষের বলিষ্ঠ কন্ঠস্বর শোনা গিয়েছে৷ ওদের জীবনের এমন বাস-বচিত্র তাঁর পূর্বে আর কেউ অঙ্কন করতে সাহস করেননি৷ পুতুল নাচের ইতিকথার দেখা দেখা যায় গ্রাম বাংলার সেই রিক্ত পলী জীবনের এক অবিস্মরণীয় চিত্র সমকালীন জীবনের বাস-ব প্রতি\”ছবি বই আর কিছু নয়৷
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় আমাদের কথা_সাহিত্যের পরিধিতে যোগ করেছেন এক অচেনা ও অবহেলিত জনপদের জীবন কথা৷ তাঁর হাতেই বাংলা উপন্যাসে যৌনজীবন ও অনর্-জীবন একটি সুস্পষ্ট রূপ লাভ করেছে৷ বাংলা সাহিত্যে নরনারীর যৌন সম্পর্ক এতোদিন নিষেধ বা রোমান্সের ঘেরাটোপে ঢাকা ছিলো৷ সে অবস্থায় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ই প্রথম নির্ভীকচিত্তে তীর্যক সন্ধানী আলো নিক্ষেপ করেন সেই ধারাবাহিক অন্ধকারের উপর৷ প্রেম ও যৌনতাকে তিনি বিশেষণ করেছেন বিজ্ঞানী৷ নিরাসক্ত তীক্ষ্ম দৃষ্টি দিয়ে৷ বাংলা সাহিত্যের অঙ্গনে অস-িত্ববাদী এবং চৈতন্য প্রবাহের লক্ষণমুক্ত চরিত্রের তিনিই প্রথম স্রষ্টা৷ দিবারাত্রির কাব্য চতুস্কোন এবং পুতুল নাচের ইতিকথা তাঁর এই তিনটি উপন্যাসই মগ্ন-চৈতন্যের বিশেষণ ভিত্তিক সাহিত্য৷
পূর্বে যে মার্কসবাদের কথা উলেখ করা হয়েছে, মানিক বন্দোপাধ্যায়ের হাতেই এর প্রথম সার্থক প্রয়োগ হয়েছিলো৷ তাই মার্কসবাদী লেখক হিসেবেই তিনি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে সমধিক পরিচিত বাংলা উপন্যাস সাহিত্যের ধারায় তাঁর শিল্পকর্ম এক স্বতন্ত্র প্রতিভার স্বাক্ষর৷ তিরিশের লেখকদের মধ্যে যার গদ্যরীতি পরবর্তী দশরেক শক্তিমান লেখকদের বিশেষভাবে প্রভাবিত করেছিল, তিনি হলেন কালজয়ী ঔপন্যাসিক মানিক বন্দোপ্যাধ্যায়৷

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: