জীবনে এমন কত বিচ্ছেদ, কত মৃত্যু আছে, ফিরিয়া লাভ কি? পৃথিবীতে কে কাহার…

মোহাম্মদ শাহজাহান
৩ নভেম্বর জাতির ইতিহাসে একটি কলঙ্কময় দিন৷ ১৯৭৫-এর ৩ নভেম্বর সোমবার ভোররাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সুরৰিত নিরাপদ কৰে স্বাধীনতাযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী মুজিবনগর সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরম্নল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, মন্ত্রী এম. মনসুর আলী ও এএইচএম কামারম্নজ্জামানকে সুপরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়৷ এ হত্যাকা-ের ৭৯ দিন আগে ‘৭৫-এর ১৫ আগস্ট শুক্রবার ভোরে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়৷ একইভাবে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ঢাকায় আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের সামনে প্রকাশ্য জনসভায় গ্রেনেড হামলায় বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা চলে৷ এ ভয়াবহ নারকীয় হামলায় মহান সৃষ্টিকর্তার অপার দয়ায় শেখ হাসিনা জীবনে বেঁচে গেলেও নারীনেত্রী আইভি রহমানসহ ২৪ জন নিহত এবং কয়েকশ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী আহত হন৷ রাজনৈতিক বিশেস্নষকদের মতে, “১৫ আগস্ট, ৩ নভেম্বর ও ২১ আগস্টের হত্যাকা- একই সূত্রে গাঁথা৷ বাংলাদেশের অসত্মিত্ব যারা মেনে নিতে পারেনি, স্বাধীনতাবিরোধী সেই অপশক্তি এবং তাদের দোসররাই এ ৩টি বর্বর হত্যাকা- ঘটিয়েছে৷”
বঙ্গবন্ধুকে হত্যার এক ঘণ্টার মধ্যেই স্বাধীনতাবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত মুজিব মন্ত্রিসভার বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার মোশতাক আহমদের নাম রাষ্ট্রপতি হিসেবে ঘোষণা করা হয়৷ এটা ঠিক, ১৫ আগস্ট হত্যা ষড়যন্ত্রের অন্যতম হোতা ঘাতক মোশতাক জাতির পিতার সহকর্মী এবং আওয়ামী লীগের একজন শীর্ষ নেতা ছিলেন৷ স্বাধীনতাযুদ্ধকালে প্রবাসী মুজিবনগর সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও ছিল এ চক্রানত্মকারী মোশতাক৷ তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী থেকেই তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির সঙ্গে মিলে স্বাধীনতার বিরম্নদ্ধে চক্রানত্মে লিপ্ত ছিলেন৷ যুদ্ধ চলাকালে মোশতাকের ষড়যন্ত্রের কথা জানাজানি হয়ে যায়৷ ফলে একাত্তরের আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসেই প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পদ থেকে খন্দকার মোশতাককে কার্যত অপসারণ করেন৷ যুদ্ধের শেষ কয়েক মাস মোশতাক অনেকটা গৃহবন্দির মতোই ছিলেন৷ যে কারণে ‘৭১-এ জাতিসংঘ অধিবেশনে প্রেরিত বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন মোশতাকের পরিবর্তে বিদেশে তত্‍কালীন সরকারের বিশেষ প্রতিনিধি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী৷
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ‘৭১-এর ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব দেশে এসে ১২ জানুয়ারি যুদ্ধবিধ্বসত্ম বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন৷ খন্দকার মোশতাককে ওই মন্ত্রিসভায় বিদু্যত্‍, জ্বালানি ও পানিসম্পদমন্ত্রী করা হয়৷ যুদ্ধের ৯ মাসে সরকারের নেতৃত্বে না থাকার কারণে পাকিসত্মান কারাগারে বন্দি বঙ্গবন্ধু ওই সময়ের অনেক কিছুই অবহিত ছিলেন না৷ চতুর, ধুরন্ধর ও চানক্য খন্দকার মোশতাক এবং তার সহযোগীরা তখন যুদ্ধকালীন সরকারের মূল নেতা তাজউদ্দীন আহমদের বিরম্নদ্ধে বঙ্গবন্ধুর কানভারী করতে থাকে৷ খন্দকার মোশতাক, সে সময়কার একজন প্রভাবশালী যুবনেতা এবং স্বাধীনতাবিরোধী একটি বড় পরাশক্তির চক্রানত্মে ১৯৭৪-এর ২৬ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তাজউদ্দীন আহমদকে মন্ত্রিসভা থেকে সরিয়ে দেন৷ অভিমানী তাজউদ্দীন আহমদ নীরবেই দূরে চলে গেলেন৷ পর্যবেৰকদের মতে, মন্ত্রিসভা থেকে তাজউদ্দীন আহমদকে সরিয়ে দেয়া ছিল বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল৷ অসাধারণ মেধাবী, দেশপ্রেমিক এবং খুবই বিশ্বসত্ম ও কাছের মানুষ তাজউদ্দীন আহমদ বঙ্গবন্ধুর কাছে থাকলে এত সহজে ‘৭৫-এর ১৫ আগস্টের ষড়যন্ত্র কার্যকর হতো না৷ মুজিববিরোধী এবং স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি এটা জানতো বলেই সর্বাগ্রে বঙ্গবন্ধু থেকে তাজউদ্দীন আহমদকে বিচ্ছিন্ন করার কাজটি তারা খুব নিপুণভাবে করে নেয়৷ এটাও এখন স্পষ্ট, স্বাধীনতাবিরোধী একটি পরাশক্তি ও পাকিসত্মানের ভুট্টোচক্র তাদের এদেশীয় দোসরদের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব এবং জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করেছে৷ ‘৭১-এ পাকিসত্মানের সামরিকচক্র জাতির পিতাকে যে মৃতু্যদ- দিয়েছিল, স্বাধীন বাংলাদেশে ‘৭৫-এর আগস্ট তা কার্যকর করা হয়৷ স্বাধীনতাবিরোধী যে চক্র সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছে, চক্রানত্মকারী সেই গোষ্ঠীই জেলখানায় চার জাতীয় নেতাকে হত্যা করেছে৷ স্বাধীনতাবিরোধীদের প্রতিনিধি মোশতাক ও ঘাতক ফারম্নক-রশীদচক্র ১৬ আগস্টই গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের নাম পরিবর্তন করে ইসলামী প্রজাতন্ত্র রাখার প্রচেষ্টা চালায়৷ এ ধরনের খবর মিডিয়ায় প্রচারিতও হয়৷ কিন্তু বাসত্মব অবস্থার কারণে ঘাতকচক্র তাদের ওই সিদ্ধানত্ম তখন স্থগিত রাখে৷ ১৫ আগস্ট থেকেই স্বাধীন বাংলাদেশকে পাকিসত্মানি ধ্যান-ধারণায় নিয়ে যাওয়ার চক্রানত্ম শুরম্ন হয়৷ মূলত বাংলাদেশকে পরাজিত পাকিসত্মানের আদলে একটি ‘মিনি পাকিসত্মান’ বানানোর লৰ্যেই রাষ্ট্রের স্থপতি মহান নেতা শেখ মুজিব এবং তাঁর বিশ্বসত্ম সিপাহসালার চার জাতীয় নেতাকে সুপরিকল্পতভাবে হত্যা করা হয়৷ ১৫ আগস্ট থেকেই আত্মস্বীকৃত ঘাতক ফারম্নক-রশীদ ট্যাংক নিয়ে বঙ্গভবনে অবৈধ রাষ্ট্রপতি মোশতাকের সঙ্গে অবস্থান করে৷ বঙ্গবন্ধুকে হত্যার দিন থেকেই বাংলাদেশ বেতারকে পাকিসত্মান স্টাইলে রেডিও-বাংলাদেশ নামকরণ করা হয়৷ ঘৃণ্য মোশতাক প্রথম ভাষণেই তার মদদদাতা পাকিসত্মানি প্রভুদের নির্দেশে জয় বাংলার পরিবর্তে সেই পুরনো পরিত্যক্ত জিন্দাবাদ ধ্বনি চালু করে৷ আজো এ দেশের একশ্রেণীর মানুষ তাদের সাধের ‘পাকিসত্মান জিন্দাবাদ’ অনুকরণে বাংলাদেশ জিন্দাবাদ বলতে পছন্দ করে৷ অথচ ১৯৭১ সালে ৩০ লাখ শহীদের তাজা রক্ত এবং ২ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে আমরা সামপ্রদায়িক পাকিসত্মানের কবরের ওপর অসামপ্রদায়িক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছিলাম৷ যুদ্ধকালীন সম্মুখসমরে মুক্তিযোদ্ধারা জয় বাংলা রণধ্বনি দিয়েই শত্রম্নর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তেন৷ মূলত আমাদের মহান মুক্তি সংগ্রামের রণধ্বনিই ছিল ‘জয় বাংলা’৷ একাত্তরেই জয় বাংলার কাছে জিন্দাবাদের কবর রচিত হয়৷ কারা একাত্তরের রণধ্বনি জয় বাংলার পরিবর্তে পরিত্যক্ত জিন্দাবাদ নিয়ে এখনো মাতামাতি করে, দেশপ্রেমিক মানুষদের তা না বোঝার কথা নয়৷
ৰমতা দখলকারী খুনি মোশতাক-ফারম্নক-রশীদচক্র ১৫ আগস্ট থেকেই নিবেদিতপ্রাণ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিরম্নদ্ধে অভিযান চালায়৷ একশ্রেণীর ভীরম্ন-কাপুরম্নষ, সুবিধাবাদী বুঝে না বুঝে খুনি মোশতাকের মন্ত্রিসভায় যোগদান করে৷ সাহসী ও দেশপ্রেমিকরা জাতির পিতার এ হত্যাকা- মেনে নিতে পারেননি৷ সৈয়দ নজরম্নল ইসলাম মোশতাক সরকারের উপ-রাষ্ট্রপতি হওয়ার প্রসত্মাব ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেন৷ তত্‍কালীন প্রধানমন্ত্রী এম. মনসুর আলী ১৫ আগস্ট সকালেই ঘাতকচক্রকে নিমর্ূল করতে বিমান বাহিনী প্রধান এ কে খন্দকারসহ সংশিস্নষ্ট কতর্ৃপৰকে নির্দেশ দিয়েছিলেন৷ শুধু তাই নয়, এ মহান নেতা মোশতাকের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার প্রসত্মাব মুখের ওপর ঘৃণার সঙ্গেই প্রত্যাখ্যান করেছিলেন৷ ১৫ আগস্ট সকালেই মনসুর আলী সরকারি বাসভবন ছেড়ে আত্মগোপনে চলে যান৷ একজন ব্যক্তিগত স্টাফের বিশ্বাসঘাতকতা এবং ওবায়দুর রহমানের তত্‍পরতায় গোপন স্থান থেকে মনসুর আলীকে বঙ্গভবনে মোশতাকের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়৷ ঘাতক মোশতাক প্রধানমন্ত্রীর পদ গ্রহণ করার আহ্বান জানান তাঁকে৷ তাঁদের দুজনের ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল ভালো৷ হতচকিত মনসুর আলী অবৈধ মোশতাককে বলেন, “তুমি শেখ মুজিবকে হত্যা করলে_ করতে পারলে?’ আবেগে-কান্নায়-ঘৃণায় বুজে এলো তাঁর কণ্ঠ৷ গৃহবন্দি চার নেতাসহ আওয়ামী লীগের ১৯ জনকে ২২ আগস্ট ঢাকা জেলে নেয়া হলো৷ ২ নভেম্বর মধ্যরাতে খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে একটি অভু্যত্থান হয়৷ মাসকারেনহাস তাঁর গ্রন্থে লিখেছেন, ৰমতা দখলের পরই মোশতাক, ফারম্নক ও রশীদ একটি পরিকল্পনা তৈরি করে রাখে৷ সেটা হচ্ছে অন্য কেউ ৰমতা দখল করলে সর্বপ্রথম একটি কিলার গ্রম্নপ জেলে গিয়ে চার নেতাকে হত্যা করবে৷ সুবেদার মুসলেমের নেতৃত্বে কিলারদের নামও নির্দিষ্ট করে রাখা হয়৷ খালেদের অভু্যত্থান শুরম্ন হলে বর্বর মুসলেমের নেতৃত্বে চার সেনা সদস্য ঢাকা জেলে গিয়ে চার নেতাকে হত্যা করে৷ মোশতাকের পর বিচারপতি সায়েমকে রাষ্ট্রপতি করা হয়৷ কিন্তু পরে ধীরে ধীরে সেনাপ্রধান, সশস্ত্র বাহিনী প্রধান, উপ-প্রধান ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক এবং রাষ্ট্রপতি হিসেবে সর্বময় ৰমতার মালিক বনে যান জেনারেল জিয়া৷ জেনারেল জিয়া শুধু বঙ্গবন্ধু ও জেলহত্যার বিচার বন্ধ রাখেননি, আত্মস্বীকৃত খুনিদের বিদেশী মিশনে উচ্চপদে চাকরি দিয়ে পুরস্কৃত করেন৷ জেনারেল জিয়ার পর জেনারেল এরশাদ এবং নির্বাচিত বেগম খালেদা জিয়া সরকার ১৫ আগস্ট ও ৩ নভেম্বরের হত্যার বিচার বন্ধ রাখে৷ ‘৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ৰমতায় এলে এ দুই বর্বর হত্যার বিচার শুরম্ন করা হয়৷ ২০০১ সালে জোট সরকার ৰমতায় আসলে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার প্রক্রিয়া আবার বন্ধ হয়ে যায়৷
২০০৪-এর ২০ অক্টোবর বুধবার জেলহত্যা মামলার রায়ে ৩ জনকে মৃতু্যদ- ও ১২ জনকে যাবজ্জীবন কারাদ-ে দ-িত করা হয়৷ ফাঁসিতে দ-িত ৩ জনই পলাতক রয়েছে আর যাবজ্জীবন দ-প্রাপ্ত ১২ জনের মধ্যে ৯ জন পলাতক, বাকি ৩ জন বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় ফাঁসিতে দ-িত এবং এ ৩ জন জেলে আটক রয়েছে৷ রায়ে ৪ জন রাজনীতিক ও ১ জন সরকারি কর্মকর্তাকে বেকসুর খালাস দেয়া হয়৷ জাতীয় চার নেতার পরিবার এই রায় প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, বিচার সুষ্ঠু ও নিরপেৰ হয়নি৷ বিভিন্ন পত্রিকায় এ রায়ের তীব্র সমালোচনা করা হয়৷ দৈনিক সংবাদ সম্পাদকীয়তে লিখেছে, “রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রকারীদের নির্দেশ ছাড়া হত্যাকারীরা জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করতে পারতো না এবং জেলের ভেতর ঢোকাও তাদের পৰে সম্ভব ছিল না৷ আর ষড়যন্ত্র না থাকলে মৃতু্যদ- বা যাবজ্জীবন কারাদ-ের মতো সাজাই-বা হলো কিভাবে? অথচ তারা ধরাছোঁয়ার বাইরেই রয়ে গেল৷” (২২.১০.০৪)
২০০৮-এর ২৮ আগস্ট হাইকোর্ট নিম্ন আদালতে ফাঁসিতে দ-িত পলাতক ৩ জনের মধ্যে ২ জনকে খালাস এবং অন্য পলাতক সুবেদার মুসলেমের মৃতু্যদ- বহাল রাখেন৷ যাবজ্জীবন দ-প্রাপ্ত পলাতক ১২ জনের মধ্যে যে ৪ জন আপিল করেছিল তাদের সবাইকে খালাস দেয়া হয়েছে৷ বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় ফাঁসিতে দ-িত জেলে আটক এ ৪ জন হচ্ছে_ ফারম্নক রহমান, সুলতান শাহরিয়ার রশীদ খান, বজলুল হুদা ও এ কে এম মহিউদ্দিন৷ যাবজ্জীবন দ-প্রাপ্ত রশীদসহ অন্য ৮ জনের ব্যাপারে আদালত কিছু বলেননি৷ ধারণা করা যায়, আপিল করলে হয়তো এরাও খালাস পেয়ে যেতো৷ গত তিন দশকে ১৫ আগস্ট ও ৩ নভেম্বরের হত্যাকা- বিষয়ে অনেক তথ্য-প্রমাণ ও দলিল বের হয়েছে৷ এ নিয়ে অনেকে বই লিখেছেন৷ পত্রপত্রিকায় এ সম্পর্কে শত শত লেখা বের হয়েছে৷ এ দুই হত্যাকা-ের ঘটনা সম্পর্কে সে সময় সামরিক বাহিনীতে কর্মরত কর্নেল শাফায়াত জামিল, জেনারেল মইনুল হোসেন চৌধুরী, সদ্য প্রয়াত কর্নেল এম এ হামিদ ও ব্রিগেডিয়ার সাখাওয়াত হোসেনসহ আরো অনেকে বই লিখেছেন৷ তাছাড়া ৩ নভেম্বর জাতীয় চার নেতা হত্যার সময় আইজি প্রিজন নূরম্নজ্জামান, ডিআইজি প্রিজন কে. আবদুল আউয়াল, জেলার আমিনুর রহমান, সুবেদার আবদুল ওয়াহেদ মৃধা সাৰাত্‍কার দিয়েছেন৷ তারা চারজনই ছিলেন চার নেতা হত্যার প্রত্যৰদর্শী৷ তাজউদ্দীন কন্যা সিমিন হোসেন রিমির গ্রন্থে এ সাৰাত্‍কারগুলো রয়েছে৷ এ চারজনের সাৰাত্‍কার এবং সামরিক বাহিনীর অফিসারদের লেখা গ্রন্থ থেকে দেখা যায়, “অবৈধ রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমদ ও কর্নেল রশীদ ২ নভেম্বর মধ্যরাতের পর বঙ্গভবন থেকে ফোনে আইজি প্রিজনকে মুসলেমের নেতৃত্বে ৪ খুনিকে জেলে প্রবেশ করতে দিতে নির্দেশ দেন৷ অনত্মত দুবার খুনি মোশতাক আইজি প্রিজনকে বলেন, সশস্ত্র মুসলেমরা যা করতে চায়, তাই যেন করতে দেয়া হয়৷ জেল গেটের খাতায় ওই চার খুনির নাম লেখা রয়েছে৷”
সশস্ত্র খুনিরা জেলে ঢুকেই বলে তারা চার নেতাকে হত্যা করতে এসেছে৷ এ সময় আইজি আবারো বঙ্গভবনে ফোন করলে মোশতাক ও রশীদ হত্যাকা- ঘটাতে সম্মতি দেয়৷ চারজনকে গুলি করে খুনিরা বের হয়ে আসার কিছুৰণ পর আবার জেলে যায়৷ দ্বিতীয়বার গিয়ে তারা বেয়নেট দিয়ে চার নেতার শরীরে আঘাত করে৷ ৪ নভেম্বরে ডিআইজি প্রিজন কে. আবদুল আউয়াল লালবাগ থানায় মামলা করেন৷ এজাহারে ৪ খুনির নাম লেখা ছিল৷ এখনো জেল গেটের খাতায় এবং লালবাগ থানায় মোশতাক ও রশীদের নির্দেশে যে চার খুনি চার নেতাকে গুলি করেছে, বেয়নেট চার্জ করেছে_ তাদের নাম লেখা রয়েছে৷ মোশতাক মারা গেছে সত্য৷ মৃত ব্যক্তির কি বিচার হয় না? রায়ে উলেস্নখ থাকলে পরবর্তী প্রজন্ম জানতে পারতো রাষ্ট্রপতির গদিতে অধিষ্ঠিত কুলাঙ্গার মোশতাকের নির্দেশে মুক্তিযুদ্ধের মহান চার নেতাকে হত্যা করা হয়েছে৷ হাইকোর্টের রায়ে পলাতক মুসলেম ছাড়া অন্য তিন খুনিকে খালাস দেয়া হয়েছে৷ তাছাড়া হত্যার অন্যতম নির্দেশদাতা ঘাতক রশীদেরও কোনো শাসত্মি হলো না৷ মুসলেম কি একাই চার নেতাকে খুন করেছে? বাকি তিনজনকে খালাস দেয়া হলো কোন যুক্তিতে? জাতীয় নেতাদের হত্যার হুকুমদাতা মোশতাক-রশীদ কি কোনো অপরাধই করেনি?
হাইকোর্টের রায়ে তদনত্ম কর্মকর্তাকে যথাযথ তদনত্ম না করার জন্য দায়ী করা হয়েছে৷ ২৫-৩০ বছর পর মামলার তদনত্ম করলে ভুল হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়৷ কিন্তু যে খোন্দকার মোশতাক_ জেনারেল জিয়া, বিচারপতি সায়েম, জেনারেল এরশাদ, বেগম খালেদা জিয়া ও নিজামী চক্রের নির্দেশে গত ২৫-৩০ বছর বঙ্গবন্ধু হত্যা ও জেলহত্যার বিচার বন্ধ থাকলো এবং বিচার হওয়ার পরও যারা বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে দেয়নি, তাঁরা কি কোনো অপরাধ করেননি? রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা এবং যাঁদের নেতৃত্বে এ দেশ সৃষ্টি হয়েছে, তাঁদের হত্যার বিচার যাঁরা বন্ধ রাখলেন, তাঁদের অপরাধ কি খুনিদের চেয়ে কম? এই তথাকথিত নিরপেৰ ও নির্দলীয় সরকারের আমলেও জাতির পিতা হত্যার মামলার বিচার সম্পন্ন হলো না৷ বঙ্গবন্ধু ও জেলহত্যার বিচার যারা বন্ধ রেখেছিল বাংলাদেশের আদালতে হয়তো কোনোদিনই তাদের বিচার হবে না; কিন্তু ইতিহাসের আদালতে তাঁদের বিচার একদিন নিশ্চয়ই হবে৷
লেখক : সাপ্তাহিক বাংলাবার্তা সম্পাদক

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: