জীবনে এমন কত বিচ্ছেদ, কত মৃত্যু আছে, ফিরিয়া লাভ কি? পৃথিবীতে কে কাহার…

মাহমুদুল বাসার
ড. আজাদ ত্রিশের প্রধান পাঁচ কবির কবিতা বিশ্লেষণ করে তাদের মৌল বৈশিষ্ট্য আলোকিত করে শামসুর রাহমানের স্বতন্ত্র যাত্রার সাফল্য চিহ্নিত করেছেন। শামসুর রাহমান তো পঞ্চাশের দশকের কবি, তাই তার স্বাতন্ত্র্য অবশ্যম্ভাবী। বলেন ড. আজাদ, ‘তিরিশি কবিতার বড় অংশ মনোবিশ্বের শস্য; শামসুর রাহমান তার সঙ্গে গেথে দেন বস্তুবাস্তবতা ও অব্যবহিত প্রতিবেশ পৃথিবী। বাংলা দেশীয় কবিতা, তার কাছ থেকে পায় বিস্তৃতি ও বৈচিত্র্য, জীবন ও স্বপ্ন, বাস্তব ও অবাস্তব প্রতিবেশ ও অধরা নীলিমা।

প্রথাবিরোধী, সব্যসাচী, অপ্রতিরোধ্য লেখক ড. হুমায়ুন আজাদ অসামান্য, গবেষণামূলক বইটির স্রষ্টা। ২৪ অক্টোবর, বাংলাদেশের প্রধান কবি শামসুর রাহমানের জন্মদিন উপলক্ষে বইটির ওপর আলোকপাত করে কবির প্রতি শ্রদ্ধা জানাবো।
শামসুর রাহমানকে বাংলাদেশের প্রধান কবির শেরপা হুমায়ুন আজাদই দিয়েছেন। এর যুক্তিও তিনি দীর্ঘ পরিসরে তুলে ধরেছেন আলোচ্য বইটির প্রথম নিবন্ধে। নিবন্ধটির নাম ‘আদিম দেবতারা ও সন্ততিরা।’
বাংলাদেশের বিংশ শতাব্দীকে চিহ্নিত করেছেন ড. আজাদ ত্রিশীয় আধুনিক কবিতার কাল হিসেবে। উনিবংশ শতাব্দীকে বলেছেন বাংলা গদ্যের আধিপত্যের কাল। বলেছেন যে, বিংশ শতাব্দী ত্রিশীয় আধুনিক কবিতার উজ্জ্বলতম বৈশিষ্ট্যের কারণে বাংলাদেশে খ্যাতিখচিত হয়ে আছে।
ড. আজাদ বলার চেষ্টা করেছেন যে, ত্রিশের কবিতা বিংশ শতাব্দীর কাল ও সময়কে মানুষের যাবতীয় অন্তর্লোককে, আধুনিকতাকে জটিলতা, সমস্যা, দাহ-দ্রোহ, অমঙ্গল তথা পেলব অনুভূতির বিপরীতে বক্র বৈকল্যকে শনাক্ত করেছে। পাঁচজনই ত্রিশীয় আধুনিক কবিতার স্থাপতি জীবনানন্দ দাশ, বুদ্ধদেব বসু, বিষ্ণু দে, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত ও অমিয় চক্রবর্তী। এরা ছিলেন রবীন্দ্রনাথের মতো সার্বভৌম কবির অপ্রতিহত প্রভাব অতিক্রমণের যোগ্য প্রতিভূ। এদের মেধা ছিল ঈর্ষণীয়। তাদের সময়ের আধুনিক ইউরোপের তাবৎ যুগধর্ম, চিত্রকলা, ভাস্কর বিদ্যা, সমালোচনা, নাটক, প্রবন্ধসহ আধুনিক কবিতার যথাযর্থ বহিরঙ্গ ও অন্তরঙ্গে সৃজ্যমানতা ওই পাঁচজন আত্মস্থ করে বাংলা কবিতার নতুন সড়ক পথ নির্মাণে সফল হয়েছিলেন।
ত্রিশীয় কবিতার পঞ্চপ্রদীপ রবীন্দ্র কবি সার্বভৌমকে অস্বীকার করে নয়, অতিক্রম করে অরবীন্দ্র কবিতার প্রতিবেশ তৈরি করেছিলেন। গতানুগতিক সব প্যারাডক্স ভেঙে দুমড়ে মুচড়ে ফেলেছিলেন। এ কথাই বলেছেন ড. হুমায়ুন আজাদ।
দেখিয়েছেন তিনি যে, রবীন্দ্র সমসাময়িক তো বটেই, রবীন্দ্র পরবর্তী কালের এক ঝাঁক কবি রীন্দ্রনাথ দ্বারা প্রভাবগ্রস্ত ছিলেন। তারা বিংশ শতাব্দীর বাংলার আধুনিক কবিতার কোনো সন্ধানই পাননি। কেন না তারা ছিলেন রবীন্দ্র বিশ্বে, ইউরোপ বিশ্বের হাওয়া স্পর্শ করার যোগ্যতা তাদের ছিল না। ত্রিশীয় কবিদের আধুনিক কাব্য-কবিতার তুলনায় তাদের কবিতা ছিল স্রেফ পদ্য। তারা পদ্যকারই ছিলেন।
ড. আজাদ বলতে চান, ত্রিশের ওই পাঁচ আধুনিক বিংশ শতাব্দীতে ইয়েটস, এজরা পাউন্ড, টিএস এলিয়ট, বোদলেয়র, মালার্মে, হাইন রিখ হাইনেকে আত্মস্থ করে বাংলা কবিতার ইতিহাসে যথাযর্থ আধুনিকতার যাত্রাপথ নির্মাণ করেন। ত্রিশের এ নতুন ধারারই কবি শামসুর রাহমান। ড. আজাদ দেখিয়েছেন, শামসুর রাহমানের একদল অগ্রজ কবি যথার্থ ত্রিশের অনুগামী হতে পারেননি, পারেননি তার সমবয়সীরাও। দেখিয়েছেন যে, অনেকে শামসুর রাহমানের সময়ের কবি হয়েও আধুনিক রবীন্দ্র-নজরুল চর্বিত চর্বণকারী ছিলেন। আবার কেউ কেউ আংশিক আধুনিক ছিলেন, কেউবা আধুনিকতার দরজায় দাঁড়িয়েছিলেন মাত্র। কিন্তু শামসুর রাহমান আত্মপ্রকাশেই ত্রিশের উত্তরসূরির আধুনিক এবং অন্তিমেও সেই আধুনিকতা অক্ষুণœ রেখেছেন।
ড. আজাদ ত্রিশের প্রধান পাঁচ কবির কবিতা বিশ্লেষণ করে তাদের মৌল বৈশিষ্ট্য আলোকিত করে শামসুর রাহমানের স্বতন্ত্র যাত্রার সাফল্য চিহ্নিত করেছেন। শামসুর রাহমান তো পঞ্চাশের দশকের কবি, তাই তার স্বাতন্ত্র্য অবশ্যম্ভাবী। বলেন ড. আজাদ, ‘তিরিশি কবিতার বড় অংশ মনোবিশ্বের শস্য; শামসুর রাহমান তার সঙ্গে গেথে দেন বস্তুবাস্তবতা ও অব্যবহিত প্রতিবেশ পৃথিবী। বাংলা দেশীয় কবিতা, তার কাছ থেকে পায় বিস্তৃতি ও বৈচিত্র্য, জীবন ও স্বপ্ন, বাস্তব ও অবাস্তব প্রতিবেশ ও অধরা নীলিমা। শামসুর রাহমানের প্রথম কাব্য দুটিতে গোপন ও প্রকাশ্য প্রভাব বিস্তার করেছে বাংলাদেশের। কবিতার আলোবাতাসে; বিষয় ও ভাষায় তিনি যে চেতনা সঞ্চার করেছেন তার কবিতায়, তা অন্যদের ও তরুণতরদের মধ্যে এবং শামসুর রাহমানোত্তর বাংলায় অনাধুনিকচেতনা লালন করাই হয়ে ওঠে কষ্টকর। আজ বাংলার নবীনতম কবির ব্যর্থতম রচনাও কোনো না কোনোভাবে আধুনিক চৈতন্যের উপাসক। শক্তি সৃষ্টি সাফল্যে, তার সাম্প্রতিক ধূসরতা সত্ত্বেও পঞ্চান্ন হাজার বর্গ মাইলে প্রতিদ্বন্দ্বীরহিত তিনি এবং সম্ভবত শামসুর রাহমানই বাংলাদেশের একমাত্র প্রধান কবি।’
ড. আজাদ শামসুর রাহমানকে ত্রিশের পাঁচজনের পর সমগ্র বাংলা ভাষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কবি বলে অভিহিত করেছেন বরং বলার চেষ্টা করেছেন, শামসুর রাহমান ত্রিশের পাঁচজনের চেয়েও ব্যাপকতা স্পর্শ করেছেন।
এরপর বর্তমান গ্রন্থের দ্বিতীয় পরিচ্ছেদব্যাপী ড. আজাদ ত্রিশের পাঁচজনের সামগ্রিক কাব্য-প্রতিভা বিশ্লেষণ করে শামসুর রাহমানের কাব্য প্রতিভার স্বাতন্ত্র্য বিশ্লেষণ করেছেন। বলেছেন ত্রিশীয়রা মূলত ছিলেন প্রতিবেশবিমুখ, অন্তর্লোকবাসী। সেখানে শামসুর রাহমান তার কবিতা নির্মাণ কলার প্রভাবাশ্রিত হয়েও বাংলা কবিতাকে বের করে নিয়ে আসেন বহির্লোকে, প্রতিবেশ বিশ্বে।
বলতে চেয়েছেন, ড. আজাদ: ত্রিশি আন্তর বৈশিষ্ট্য, শৈলীগুণ, মননকৃত আধুনিকতা বজায় রেখে শামসুর রাহমান সমকাল, স্বদেশ, সমাজ, নাগরিক মনস্কতা, বাস্তবতা, চলমান জীবনের আগাপাছতলা স্পর্শ করেছেন। ড. আজাদ বলেন, ‘প্রতিটি কবিতার অন্তরেই ঢুকে থাকেন তিনি ধ্বনিত করেন আপন স্বর ও হৃদস্পন্দন;’ কিন্তু তা তার সমকাল ও প্রতিবেশের স্বরও হৃদস্পন্দন বলেই বোধ হয়। এভাবেই তিনি ত্রিশি কবিতার আন্তর্জগৎ থেকে বাংলা কবিতাকে নিয়ে আসেন বহির্জগতে ও অব্যবহিত প্রতিবেশে তার কোলাহল কলরোল ক্লান্তি শ্রান্তি ও উজ্জ্বলতায়। অন্যভাবে বলা যায় শামসুর রাহমান তার কবিতা রাশিতে বাহ্য জগত ও প্রতিবেশকে, তার সমগ্র চরিত্রকে, শুষে নিয়েছেন নিজের অন্তর্লোকে এবং পরিণত কবিতায়। তাই তার কবিতা ধ্যান বাস্তব বা গান বা শাশ্বত শ্লোক নয়; তা সমকালীন সৃষ্টি।
ড. আজাদ শামসুর রাহমানের স্বাতন্ত্র্য অšে¦ষণ করতে করতে আমাদের জানিয়ে দিয়েছেন যে, শামসুর রাহমান সমকালে বিস্তৃত ও বাস্তবতাকে ধারণ করেছেন। রাজনৈতিক-সামাজিক-বৈশ্বিক ঘটনা প্রপাতের খড়কুটোও বাদ পাড়েনি তার আওতা থেকে। আবেগে কম্পমান অনেক কবিতা তিনি লিখেছেন। মানুষের দুর্দশার উতরোল কবিতা লিখেছেন। বলেছেন তিনি উলোল নগরের অধিবাসী। তার কবিতায় এসেছে জাতীয় চেতনার প্রতিটি স্তরের উত্তাপ, উত্তেজক উপাদান, এসেছে পৈশাচিক, বৈমানিক, ক্রুদ্ধ দ্রোহ, উন্মাতাল আবহ, গণমুক্তির মুখর শব্দমালা, কিন্তু তা তারল্যের সমীকরণে শব্দের জড়রাশি না হয়ে, ত্রিশ খচিত শিল্পঋদ্ধির আগুনে যথার্থ কবিতাই, স্লোগান নয়।
ড. আজাদ প্রতিটি কাব্য ধরে, প্রতিটি কবিতা ধরে এমনকি প্রতিটি বাক্য, শব্দ ধরে ধরে মহান ধৈর্যশীল বিশ্লেষকদের মতো শামসুর রাহমানের কবিতা নির্মাণ কলার তাৎপর্য উন্মোচন করেছেন। বলেছেন আজাদ, তিনি দুটি বিবর্ধমান স্তর অতিক্রম দায়িত্ব পালন করেছেন, এক. রবীন্দ্রবিশ্ব, দুই. ত্রিশ আধুনিক থেকেও আলাদ। তাকে পঞ্চাশের চৌরঙ্গীতে স্বতন্ত্র কাব্যমঞ্চ তৈরি করতে হয়েছে।
ড. আজাদ একথা ঠোঁটকাটা ঔচিত্য স্পষ্টতায় বলেননি হয়তো, কিন্তু প্রতিভাস দিয়েছেন যে, ত্রিশি মহানরা বাস্তবকে ভয় পেতেন, যদি আধুনিকতার মলাটে ধুলার আস্তরণ লাগে। তাই তাদের কবিতা নন্দনকাননের শুভ্র ঘেরাটোপে সীমাবদ্ধ ছিল। শামসুর রাহমানের কৃতিত্ব এখানেই যে, তিনি বাস্তবকে ভয় পাননি, তিনি বাস্তব প্রতিবেশকে ব্যাপক বিস্তৃত বাস্তবতাকে তার কবিতায় ধারণ করেছেন এবং কবিতার নম্র স্বভাবে পরিণতি দান করেছেন, ত্রিশি আধুনিকতার স্বর্ণকাঠামো অধ্যায় রেখেছেন।
শামসুর রাহমানের কবিতায় আছে সময়খচিত সারাৎসার, আছে জনগণের দুঃসময়ের অভিঘাত স্পন্দিত বাণী, আছে প্রেম, আছে নগর চেতনা, আছে ঢাকা শহরের পুনঃপুন পাঁচালি, আছে, দেহবাঞ্ছা, চুম্বন, কামরীতি, স্তনবন্ধনা, ওষ্ঠকম্পন আরতি অর্থাৎ অতীতের যাবতীয় বিমূর্ত, শুভ্রভাবনার কৃত্রিম খোলস চূর্ণ করে নিষ্কুণ্ঠ রক্তমাংসের মানবস্বপ্নের কবিতা লিখেছেন, তাতে শামসুর রাহমানীয় বৈশিষ্ট্য বজায় রেখেছেন বলে মনে করেন ড. আজদ।
শামসুর রাহমানের প্রতিটি কাব্যের ক্রমপরিণতি আলোচনা করেছেন। শুধু আন্তরধর্ম নয়, শরীরীগুণের প্রতিটি উপাদান নিয়ে ড. আজাদ প্রকৃত জহুরির মতো আলোচনা করেছেন। উপমা, উৎপ্রেক্ষা, রূপক, চিত্রকল্প এবং পরাবাস্তববাদ শামসুর রাহমান কবিতায় কখন কিভাবে কাজ করেছে তা আলোচনা করেছেন।
ড. আজাদ নিজেও কবি, কবিতাবোদ্ধা প-িত, ক্ষুরধার বিশ্লেষক, অপ্রতিরোধ্য সত্য আচ্চারণী ভাষ্যকার; আপন স্বভাবে স্থির প্রত্যয়শীল কণ্ঠে শামসুর রাহমানের কবিতা রাশির গুণাবলী যাচাই করে, তার সবলতা দুর্বলতা, প্রভাব-স্বভাব, বাস্তবলোক, কল্পলোক তদন্ত করে তার শ্রেষ্ঠত্বের মানদ- দাঁড় করেছিয়েছেন। শামসুর রাহমানের মতো বাঙালি হৃদয়ের অধিরাজ কবিকে ড. আজাদ তার ‘শামসুর রাহমান/নিঃসঙ্গ শেরপা’ নামক ধীমান গবেষণামূলক অমূল্য, শ্রমশীল তথ্যের আকর গ্রন্থে আলোকস্তম্ভিত করে তুলেছেন।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: