জীবনে এমন কত বিচ্ছেদ, কত মৃত্যু আছে, ফিরিয়া লাভ কি? পৃথিবীতে কে কাহার…

আধুনিক বাংলা কবিতা এবং আবদুল মান্নান সৈয়দ সমার্থক শব্দ। কবিতা ব্যতিরেকেও সাহিত্যের এমন কোনো শাখা-প্রশাখা নেই, যেখানে তিনি বিচরণ করেন না। তবে সবকিছু ছাপিয়ে তিনি একজন বিশুদ্ধ কবি। ‘জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ’, ‘মাছ সিরিজ’, ‘পার্ক স্ট্রিটে এক রাত্রি’, ‘হে বন্ধুর বন্ধু হে প্রিয়তম’, ‘প্রেমের কবিতা’, ‘অঘ্রানের নীল দিন’, ‘জনসাধারণ অসাধারণ’ ইত্যাদি তার উল্লেখযোগ্য কবিতাগ্রন্থ। সব্যসাচী এ লেখকের সঙ্গে ১৪ অক্টোবর সন্ধ্যায় শাহবাগ আজিজ সুপার মার্কেটে আকস্মিক দেখা। তারপর অন্তরে রেস্তরাঁয় সুদীর্ঘ আড্ডার ফাঁকে ফাঁকে তিনি কথা বলেন, কবিতা এবং শুধুই কবিতা নিয়ে। এ সাক্ষাৎকারে উন্মোচিত হয় আবদুল মান্নান সৈয়দের এবং একই সঙ্গে বাংলা কবিতার অনেক গোপন-গহন বিষয়-আশয়।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন পিয়াস মজিদ

কবিতায় আমি ভ্রাম্যমাণ।
ফলে বছর পঞ্চাশ ধরে কবিতা যে লিখে গেছি, তার মধ্যে যে রূপান্তর তাকে আমি বাধা দিইনি। জোর করে কখনো কবিতা লিখিনি। আজো না। কবিতা আমি তখনই লিখি যখন কবিতা নিজে এসে আমার ওষ্ঠ চুম্বন করে।

পরীক্ষা কবিতার ভাষা নিয়ে চলতেই থাকবেÑ সমীক্ষা তো ভাষায়
থাকবে। দেশজ ভাষার এ ব্যবহারকে সমর্থন করি, তবে এটি কোনো
কোনো কবির জন্য আরাধ্য হতে পারে; কিন্তু সামগ্রিকভাবে নয়। হাজার বছরের পরিশ্রমে প্রযতেœ ভালোবাসায় যে স্ট্যান্ডার্ড বাংলা ভাষায় দাঁড়িয়ে গেছে তা থেকে সাহিত্যকে বিচ্যুত করা অসম্ভব। তবে এর সঙ্গে এটুকুও যোগ করবো দেশজ শব্দ, উপভাষা আমাদের জ্ঞাত-অজ্ঞাতসারে বাংলাদেশের কবিতা-গদ্যে সঞ্চারিত হয়েই চলেছে। শুধু যেন আরোপণ মনে না হয়। যেমন এখন অনেক টিভি নাটকে যেন একটু বেশিভাবেই এ দেশজতার প্রকোপ ঘটেছে। একে আমি ঠিক সমর্থন করি না।

যাযাদি: এক কবিতায় আপনি বলেছিলেন, শ্রাবণে-আষাঢ়েও অগ্নি নেভে না। তবে কেন কবিতা লেখেন? কবিতা কি আপনার অন্তর্দাহে জল ঢালে?
মান্নান সৈয়দ: জল ঢালে। জল দেয়। শান্ত করে। উদ্দামও করে। বহুদিন থেকে গত দশ-বিশ বছর থেকে আমি কবিতা লিখি বাধ্যতামূলক। এই যে গত কয়েক বছর অবিশ্রাম কবিতা লিখছি। আমার মন খুব খারাপ যে, আমি গদ্য লিখতে পারছি না। গদ্য মানে গদ্যপ্রবন্ধ। এমনিতে এখন পর্যন্ত  কবিতা এবং ছোটগল্প এগুলো আমার এতো স্বতঃস্ফূর্ত আসে যে, লিখতে ইচ্ছা হয় না, যেন বসেই লিখতে পারি সেজন্য আমার উৎসাহ কম। অহঙ্কার মানুষের সাজে না। কাজেই অহঙ্কার করবো না, তবে একথা বলবো যে, পিকাসোর মতোই আমাকে খুঁজতে হয় না। আমি পেয়ে যাই।
যাযাদি: কবি হিসেবে প্রকৃতি নারী, বস্তু পৃথিবীকে কি অভিন্ন না পৃথক হিসেবে বিবেচনা করেন?
মান্নান সৈয়দ: এরা বিভিন্ন এবং বিভিন্ন নয়। বস্তু পৃথিবীর মোকাবেলা করার জন্য কবিতা কেন আমার সমস্ত সাহিত্যিক চেষ্টা। দেখুন বস্তু পৃথিবীর বাইরে তো কেউ নয়। এই যে আমরা অন্তরে রেস্তরাঁয় বসে আছি, চা খাচ্ছি, অনেক কোলাহল চলছে। চায়ের দাম দিতে হবে। কোন সময় এখান থেকে বেরিয়ে যেতে হবে। চান বা চান এর বাইরে আপনি যেতে পারবেন না। নারী ও প্রকৃতি এরাও বস্তু পৃথিবীরই অধিবাসী, আপনি তো লক্ষ করেছেনই গত কয়েক বছর ধরে আমি বিরামহীন প্রেমের কবিতা লিখে চলেছি। তার যেমন বাস্তব ভূমি আছে, তেমনি প্রাকৃতিক পটভূমিও আছে। তবে এমনও হয়েছে নারী ও বস্তু প্রথিবীর কাছে প্রতিহত হয়ে আমি প্রাকৃতিক শুশ্রƒষা চেয়েছি। কিন্তু এর মধ্যেই আবার ফিরে এসেছি, শুধু নারীর কাছেই নয়, মানুষের কাছেও। আমার সাম্প্রতিক দুটো কবিতাগ্রন্থ ‘অঘ্রানের নীল দিন’ এবং ‘জনসাধারণ অসাধারণ’ থেকেই তার প্রমাণ পাবেন।
যাযাদি: এই যে আপনার ইদানীংকালের কবিতায় প্রেম অন্যরকম রূপে দেখা দিচ্ছে, এর কোনো পরিপ্রেক্ষিত আছে কি?
মান্নান সৈয়দ: অবশ্যই আছে, এখন পর্যন্ত প্রকাশিত আমার প্রেমকেন্দ্রিক যে কটি কবিতাগ্রন্থ বেরিয়েছে, লক্ষ করে দেখবেন তার কোথাও পুনরাবৃত্তি নেই। এসব কবিতা প্রেমিকতার বিভিন্ন মাত্রা বিতরণ করে চলেছে। প্রেমিকতার এতো স্তরে আমি সঞ্চরণ করবো, এ জেনে তো আর লিখিনি। আমার শুধু কবিতার বই কেন সমস্ত গ্রন্থের মধ্যেই সবচেয়ে আনন্দকরোজ্জ্বল বই ‘হে বন্ধুর বন্ধু হে প্রিয়তম’। তবে এরপর প্রকাশিত ‘অঘ্রানের নীল দিন’। আমি অন্য জায়গায় চলে এসেছিÑ যেখানে আনন্দ ও বেদনার একটি সহাবস্থান ঘটেছে।
যাযাদি: আধুনিক কবিতায় হৃদয়ের অগ্নির পাশাপাশি বুদ্ধির দীপ্তি কি প্রাসঙ্গিক মনে হয়?
মান্নান সৈয়দ: অবশ্যই। কবিতা একই সঙ্গে মন্ময় এবং হৃদয় উৎসারিত। হৃদয়হীন কবিতা হরহামেশা মুদ্রিত হচ্ছেÑ দেখতে পাই। নাম ক্রমাগত মুদ্রিত হচ্ছে অনেকের কিন্তু কবিতা হচ্ছে কী?
যাযাদি: কবিতাকে কী মৌহূর্তিক সৃষ্টি না দীর্ঘ প্রক্রিয়াজাত মনে করেন?
মান্নান সৈয়দ: আমি কবিতাকে চিরকাল মুহূর্তের ভাষ্য হিসেবে বিবেচনা করে এসেছি। আমার কবিতা যদি ওই মুহূর্তেই লীন হয়ে যায়, তাতে আমার করার কিছু নেই।
যাযাদি: ‘জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ’ এক সংশয়াকীর্ণ; দ্বন্দ্বময়, রক্তভারাতুর জগৎ আপনি তৈরি করেছেন। সেখান থেকে ‘সকল প্রশংসা তাঁর’ এর মতো নিখিল সমর্পণের জায়গায় পৌঁছালেন কীভাবে?
মান্নান সৈয়দ: জীবনের এতো চড়াই-উতরাই পার হয়েছি। সেই অপার অনুভূতি ও অভিজ্ঞতাই আমাকে ওই প্রাথমিক স্তর থেকে ‘সকল প্রশংসা তাঁর’ এর স্তরে উত্তীর্ণ করে তুলেছে। কিন্তু আমি কি সেখানে থেমে থেকেছি? আমার কবিতার পর্বান্তর তো মাঝে মাঝেই ঘটে চলেছে। আমার কবিতার নিবিষ্ট পাঠক হিসেবে আপনিও তা লক্ষ্য করে থাকবেন।
যাযাদি: রহস্যময় ‘মাছ সিরিজ’ বইটি সম্পর্কে কিছু বলুন
মান্নান সৈয়দ: এখন আমার কাছেও এ বই রহস্যময়। চাবি হারিয়ে গেছে। সিন্দুকের ডালা খুলতে পারবো না। আপনারা যেখানে আমিও সেখানে।
যাযাদি: কবি না হলে কী হতেন?
মান্নান সৈয়দ: নিশ্চিতভাবেই চিত্রশিল্পী। অথবা নর্তক।
যাযাদি: লাতিন আমেরিকান কবিতা নিয়ে খুব হই চই হচ্ছে। এর কারণ শুধুই সাহিত্যিক?
মান্নান সৈয়দ: সাহিত্যিকও অনেকখানি। কেননা কয়েক দশক আগে লাতিন আমেরিকার সাহিত্য সম্পর্কে আমরা তো আদৌ ওয়াকিবহাল ছিলাম না। খারাপ কী?
যাযাদি: কবির জন্য কাব্যতত্ত্ব কতোটা জরুরি?
মান্নান সৈয়দ: কবির জন্য কাব্যতত্ত্ব ভয়াবহ ব্যাপার। আমিও মাঝে মাঝে কবিতা সম্পর্কে তত্ত্বকথা বলি; কিন্তু ভেতরে ভেতরে সেটা অতিক্রমের জন্য পাগল হয়ে যাই। কবিতায় কোনো হিসাব চলে না।
যাযাদি: ‘কবিতা কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেড’-এর মতো আপাতরম্যের জগৎ, যা আপনার কবিতাভুবনের কেন্দ্রীয় চরিত্রের সঙ্গে বেমানানÑ সেদিকে আপনি গেলেন কেন?
মান্নান সৈয়দ: আমি তো বলেছি আমার কবিতা আকস্মিক আবেগ থেকে লেখা। খুব অল্প সময়ে এ কবিতাগুলো লেখা হয়। একদিন সকালে আমার বন্ধু কবি বেলাল চৌধুরীর বাড়িতে গিয়ে কবিতাগুলো তাকে শুনিয়েছিলাম। আরেকটি কবিতার আসরে এসব কবিতা পড়েছিলাম। সেখানে পরিষ্কার মনে আছে আমার সৈয়দ আলী আহসানের দৃষ্টিতে এক বিষয়ে লক্ষ করেছিলাম, প্রসঙ্গত উল্লেখ করি ‘কবিতা কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেড’-এর কয়েকটি কবিতা ময়মনসিংহ ও রংপুরে পড়ে ব্যাপক সাড়া পেয়েছি।
যাযাদি: ‘মাতাল মানচিত্র’ ছাড়াও আপনি বিদেশি কবিতার ব্যাপক অনুবাদ সম্পন্ন করেছেন। আপনার অনেক কবিতাও বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। এ সূত্রেই জানতে চাইবোÑ অনুবাদে কবিতা কতোটা রক্ষিত হয় বলে আপনার ধারণা?
মান্নান সৈয়দ: আমি চিরকাল অনুবাদ কবিতার বিপক্ষে ছিলাম। আজো আছি। রবার্ট ফ্রস্টের মতো আমিও বিশ্বাস করি অনুবাদে যা বাদ পড়ে, সেটাই কবিতা। ফলে এখন আর কবিতা অনুবাদে উৎসাহ নেই। আগেও যা করেছি খেয়ালের বশে।
যাযাদি: গল্পের মতো আপনার কবিতাতেও কৌতূহল-উদ্রেকি নানা চরিত্রের সমাবেশ ঘটে; যেমনÑ মাছ, মৌমাছি, প্রজাপতি ইত্যাদি। জীবনযাপনের কোন পর্যায়ে ইত্যাকার কবিতাচরিত্রের সঙ্গে কী আপনার দেখা হয়?
মান্নান সৈয়দ: যদ্দুর আঁচ করি এসব আমার সম্পূর্ণ স্বকপোকল্পিত। মাছ তো প্রায়ই খাই। প্রজাপতি মৌমাছি মাঝে মাঝেই দেখি। কিন্তু ওই দেখা তো কবিতার দেখা নয়।
যাযাদি: গল্প-উপন্যাস-প্রবন্ধ-গবেষণাসহ আপনি অজস্র সাহিত্যি তৎপরতার সঙ্গে যুক্ত। এ বহু কৌণিক বিচরণ আপনার কবিতার জন্য ক্ষতিকর বলে কি মনে করেন?
মান্নান সৈয়দ: আমি তো এসব আমার কবিতার জন্য উপকারী বলে মনে করি। আমার এ বহুচারিতা কবিতার পুনরাবৃত্তি থেকে আমাকে বাঁচিয়ে দিয়েছে। জীবনভর এক কবিতা লিখলে কী আপনার মতো তরুণরা আমার সাক্ষাৎকার নিতেন?
যাযাদি: নতুন কবিতার জন্য আপনার ভেতর কি তৃষ্ণা কাজ করে?
মান্নান সৈয়দ: তৃষ্ণা কাজ করে না। প্রবল অন্তর্তাড়না আমাকে অনেক সময় নতুন নতুন কবিতার কাছে নিয়ে গেছে। আমি নিজে যাইনি অথবা যেতে চাইনি। আমি কী কখনো জানতাম যে আমি ‘জনসাধারণ অসাধারণ’ নামে কবিতার বই লিখবো।
যাযাদি: আপনার বহু কবিতায় ফিরে ফিরে রাত্রির দাপট। রাত্রি নামক এ সার্বভৌম শাসকের সঙ্গে আপনার কবিতার সম্পর্কটা খোলাসা করুন।
মান্নান সৈয়দ: এতো ঠিক বলতে পারবো না। আপনার মতো আরো কারো কথা শুনে মনে হয় আমি বোধহয় রাত্রিপ্রেমিক। এ মুহূর্তে মনে পড়ছে কুয়াশাচ্ছন্ন এক সন্ধ্যায় বছর কয়েক আগে একজনের সঙ্গে প্রথম দেখা হয়েছিল। আশ্চর্য, সেও এক আলো আর কুয়াশাজড়ানো সন্ধ্যাই ছিল। অবিস্মরণীয় সেই সন্ধ্যা ও রাত্রি। হয়তো দীর্ঘদিনের রাত্রিপ্রেমিক হিসেবে রাত্রি নিজে ভালোবেসে আমাকে এ সন্ধ্যা আর রাত্রি উপহার দিয়েছে। কেন ভাই হৃদয় খুঁড়ে আনন্দ আর বেদনা জাগিয়ে তোলেন…? শুধু বেদনা বললে কিন্তু মিথ্যা বলা হয়।
যাযাদি: ‘সুররিয়ালিস্ট কবি’ হিসেবে আপনার ব্যাপক পরিচিতি, তো এ ২০০৮-এ এসে এ বিষয়ে  আপনার ভাবনাটা কেমন?
মান্নান সৈয়দ: প্রসঙ্গিক প্রশ্ন। আমি ২০০৭ সালে ক্রমে উপলব্ধি করেছি যে, আমি যদিবা এক সময় সুররিয়ালিস্ট ছিলাম; কিন্তু এখন সুররিয়ালিজমের চেয়ে মূল্য দিতে চাই এক্সিসটিয়ালিজমকে। এ দেশ-কাল-সমাজ-সংস্কৃতি সাহিত্য জগৎ আমাকে সুররিয়ালিস্ট মান্নান সৈয়দকে এক্সিসটিয়ানিস্ট মান্নান সৈয়দে রূপান্তর করেছে।
যাযাদি: কবি হিসেবে, একজন মানুষ হিসেবে নিজেকে আপনার অনিকেত না সুনিকেত বলে বোধ হয়?
মান্নান সৈয়দ: আগে কখনো মনে হয়নিÑ সম্প্রতি নিজেকে উদ্বাস্তুই মনে হয়। তবে যে দেশের নিমক খেয়েছি, সে দেশের ঋণ ভুললে নিজেকে অসম্মান করা হয়। শেষ পর্যন্ত যতো বেদনাই থাকুক, পূর্ব বাংলা-পশ্চিম বাংলা কারো বিরুদ্ধে বললেই আমার কিন্তু লাগবে। এক দেশ আমাকে জন্ম দিয়েছে, আরেক দেশ লালন-পালন করেছে। যতো দুঃখই থাকÑ হয়তো এ দুঃখ আমাকে সৌভাগ্যবান করেছে।
যাযাদি: আধুনিক কবিতার সঙ্গে চিত্রকলার আন্তঃসম্পর্ককে কিভাবে বিশ্লেষণ করবেন?
মান্নান সৈয়দ: আমি তো চিত্রকলার মুগ্ধ অনুসরণকারী। তারপরে আমার চিত্রী হওয়ারও কথা ছিল। ফলে আমার কবিতার সঙ্গে চিত্রকলার তো বটেই অন্যান্য শিল্প মাধ্যমেরও অল্পবিস্তর সহযোগ ঘটেছে।
যাযাদি: গদ্য কবিতা নিয়ে আপনার এখনকার অনুভব ও অবস্থান জানতে চাচ্ছি।
মান্নান সৈয়দ: আমি প্রায় প্রথম থেকে গদ্য কবিতার বিরোধী। এখনো। কিন্তু কী জানি কেন গদ্য কবিতা চলে আসে। আর আমি তার আলিঙ্গনে বাধা দিই না। প্রসঙ্গত একটু উল্লেখ করি, কবি উৎপল কুমার বসু সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘কৃত্তিবাস’ পত্রিকায় বিনীত দাবি করেছেন যে, বাংলায় তিনিই প্রথম ব্যাকরণ ভাঙা কবিতা লিখেছেন। উৎপল বসু বয়সে আমার চেয়ে বড়। সেদিক থেকে হতে পারে আমার আগেই তিনি লিখেছেন; কিন্তু তার কবিতা যে রকমভাবে জীবনানন্দ আক্রান্ত, তাতে ওই ব্যাকরণ ভঙ্গের গৌরব জীবনানন্দকেই দিতে হয়। আমি তো বলবো জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছই (১৯৬৭) প্রথম তা জীবনানন্দীয় ব্যাকরণ ভাঙা পরিষ্কার দেখিয়ে দিয়েছে। ওদের মুশকিল হলো আমাদের আত্মপ্রচারক কবিদের বাইরে যে কবিতা লিখিত হয়েছে, তার আদৌ কোনো খোঁজ-খবর রাখেন না। উৎপল কুমার বসুর সঙ্গে আশির দশকের প্রথম দিকে কলকাতা বইমেলায় কেউ একজন আলাপ করিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি আমাকে অশ্রুকুমার সিকদারের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য বলেছিলেন। আমার কবিতার সঙ্গে তার কোনো পরিচয় আছে বলে মনে হয় না। ও, অশ্রুকুমার সিকদারের সঙ্গে ঢাকায় একবার আলাপ হয়েছিল আমার। তিনি শিল্পতরুর অফিসে এসেছিলেন। তখন তিনি বাংলা কবিতা নিয়ে একটি সরকারি কাজের ভারপ্রাপ্ত হিসেবে সফলরত। শিল্পতরু সম্পাদক কবি আবিদ আজাদ আমাকে বলেছিলেন অশ্রুকুমার সিকদার আসছেন। ততোদিনে আমার শ্রেষ্ঠ কবিতা বেরিয়ে গেছে। আমি তাকে ওই বই দেয়ার কোনো প্রয়োজন বোধ করিনি। খুব নিবিড় পরিচয় ছাড়া কোনো দেশেরই বা কোনো ভাষারই সাহিত্যের ইতিবৃত্ত লেখা দুঃসাধ্য। অশ্রুকুমার পরিকল্পিত বইটি বেরিয়েছে এবং বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করেছি আমাকে তিনি যথার্থ মূল্য দিয়েছেন। আমি খুশি এবং বিস্মিত। তার মানে এই নয় যে, আমি একটু আগের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছি।
যাযাদি: আপনার কবিতায় ঘুরে ঘুরে পাথর ফাটিয়ে ঝরনা নামানোর কথা আসে। শিলার ভেতর জল-সন্ধিৎসা কী আপনার ব্যক্তিত্বের সঙ্গেও জড়িত?
মান্নান সৈয়দ: খুব গহীনে-গভীরে নিশ্চয়ই ব্যাপারটা আছে। আমি প্রত্যক্ষ বাস্তবকে যতোটা মূল্য দিই, তার চেয়ে বোধহয় বেশি মূল্য দিই অবচেতন-অচেতন-অবদমন-অর্ধজ্ঞাত ইত্যাদি বিষয়গুলোকে, যে কারণে অনেক সময় পাঠক/সমালোচক আমাকে ভুল বোঝে। আমি তাদের দোষ দিই না। আমি এ রকমই। আমি নিজেকেও জানি না। অপরাধ যদি করে থাকি, তাহলে আমি এবং আমার কবিতাই করেছি। পাঠক-সমালোচককেও শেষ পর্যন্ত দোষ দেবো না।
যাযাদি: রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ, নজরুল, সুধীন্দ্রনাথ দত্তসহ অসংখ্য কবিকে নিয়ে আপনি লিখেছেন, গবেষণা করেছেন। নিজের কবিতায় এসব কবির কোনো ছায়া কি অনুভব করেন?
মান্নান সৈয়দ: কখনোই না। হুমায়ুন আজাদ একবার মৌখিকভাবে বলেছিল বলে শুনেছিÑ ‘জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ’র কবি কী করে নজরুল ইসলামের ওপর  লেখে। সমালোচক হিসেবে আমার রুচি সম্ভবত একটু প্রসারিত; ফলে বহু বিচিত্র কবিতায় সাড়া দিতে পারি। তবে আমার অজ্ঞাতসারে কোনো কবির প্রভাব থাকতে পারে আমার কবিতায় এবং সমালোচকেরা সে কথা বললে মাথা পেতেই নিতে হবে। কিন্তু কোনো পূর্ব আরোপিত ধারণা থেকে এ কথা বললে মানবো না।
যাযাদি: এক সময় আপনাকে বলা হতো ‘অতি দুর্বোধ্য কবি’। এখন অনেকে বলেন যে, আপনি ইদানীং সরল কবিতার চর্চা করছেন। নিজের
কবিতা নিয়ে এ ধরনের মন্তব্যকে কিভাবে গ্রহণ করেন?
মান্নান সৈয়দ: হ্যাঁ, এটা আমাকেও শুনতে হয়েছে এবং হচ্ছে। এক সময় দুর্বোধ্য কবি বদনাম ছিল আমার। এখন শুনি আমি এতো সরল কেন? আপনাকে তো বলেছিই কবিতায় আমি ভ্রাম্যমাণ। ফলে বছর পঞ্চাশ ধরে কবিতা যে লিখে গেছি, তার মধ্যে যে রূপান্তর তাকে আমি বাধা দিইনি। জোর করে কখনো কবিতা লিখিনি। আজো না। কবিতা আমি তখনই লিখি যখন কবিতা নিজে এসে আমার ওষ্ঠ চুম্বন করে।
যাযাদি: পক্ষে-বিপক্ষে সমালোচনা আপনাকে কতোটা প্রভাবিত করে?
মান্নান সৈয়দ: এতো স্বাভাবিকভাবেই একটা প্রভাব থাকে। তবে আমার কবিতা সম্পর্কে পঞ্চাশ বছর ধরে এতো বিরূপ উক্তি শুনে যাচ্ছি যে, অনেকখানি গা-সহা হয়ে গেছে। তার মধ্যে অপরিচিত কেউ যখন বলে ‘আপনার কবিতা ভালো লাগে’ তখন রীতিমতো বিস্মিত হয়ে যাই। যেমন তরুণ কবি আয়শা ঝর্ণার সেদিন এক সাক্ষাৎকারে আমার কবিতার কথা দেখে চমকে উঠলাম।
যাযাদি: পূর্ব বাংলার পৃথক ভাষা বৈশিষ্ট্যের কথা বলছেন অনেকে। এও বলছেন যে, আমাদের কবিতা ও অন্যান্য লেখায় এ পৃথকত্বের ছাপ পড়া জরুরি। বিষয়টি কেমন মনে হয়?
মান্নান সৈয়দ: পরীক্ষা কবিতার ভাষা নিয়ে চলতেই থাকবেÑ সমীক্ষা তো ভাষায় থাকবে। দেশজ ভাষার এ ব্যবহারকে সমর্থন করি, তবে এটি কোনো কোনো কবির জন্য আরাধ্য হতে পারে; কিন্তু সামগ্রিকভাবে নয়। হাজার বছরের পরিশ্রমে প্রযতেœ ভালোবাসায় যে স্ট্যান্ডার্ড বাংলা ভাষায় দাঁড়িয়ে গেছে তা থেকে সাহিত্যকে বিচ্যুত করা অসম্ভব। তবে এর সঙ্গে এটুকুও যোগ করবো দেশজ শব্দ, উপভাষা আমাদের জ্ঞাত-অজ্ঞাতসারে বাংলাদেশের কবিতা-গদ্যে সঞ্চারিত হয়েই চলেছে। শুধু যেন আরোপণ মনে না হয়। যেমন এখন অনেক টিভি নাটকে যেন একটু বেশিভাবেই এ দেশজতার প্রকোপ ঘটেছে। একে আমি ঠিক সমর্থন করি না।
যাযাদি: আপনার কবিতা বিশ্বাস?
মান্নান সৈয়দ: ‘আমার বিশ্বাস’ নামে একটি বই লিখেছি; এখন আর আমার কবিতা বিশ্বাস বলে কিছু নেই। যদি একটি বিশ্বাসের কথা বলতে হয়, তাহলে বলবো স্বতঃস্ফূর্ততা। গত কয়েক বছর ধরে আমি আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের বলে আসছি এটাই আমার শেষ কবিতাগ্রন্থ। আমি বিশ্বাস করি, যদি আর কোনো আবেগে আন্দোলিত না হই, তা হলে কবিতা লিখবো না। আমি বিশ্বাস করি, কবিতা তারুণ্যনির্ভর। এ কথা বলেছিও অনেকবার। এখন মনে হয় হয়তো এ তারুণ্য পৃথিবীর বা শরীরের বা বয়সের ওপর পুরো নির্ভরশীল নয়।
যাযাদি: ঠিক এ মুহূর্তে কবিতা নিয়ে কী ভাবছেন?
মান্নান সৈয়দ: কিছুই ভাবছি না। বেড়িয়ে বলেছিÑ হয়তো আজ রাতেই কবিতা লিখবো কিংবা আদৌ লিখবো না। ঠিক জানি না। আমার কবিতা আপনার কথিত সেই ঝরনা বা নদীর মতোন, সে নিজে পথ করে নেয় তার।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: