জীবনে এমন কত বিচ্ছেদ, কত মৃত্যু আছে, ফিরিয়া লাভ কি? পৃথিবীতে কে কাহার…

আকিদুল ইসলাম : সিডনি, অস্ট্রেলিয়া থেকে:
সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে ধীরে ধীরে মুখ খুলতে শুরু করেছেন সাবেক সেনা কর্মকর্তারা। এই কর্তাদের প্রত্যেকেই জিয়া হত্যার জন্যে দায়ী করছেন তখনকার সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে। আভাস ইঙ্গিতে নয়, এ দাবিটি এখন তারা করছেন সরাসরিভাবেই। সবশেষে মুখ খুললেন জিয়াউর রহমানের একসময়ের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠজন কর্নেল অলি আহমেদ। তিনি বলেছেন, শুধু জিয়া হত্যাকাণ্ড নয়, আরো অনেক মুক্তিযোদ্ধা সামরিক অফিসার হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত সাবেক সেনাপ্রধান এরশাদ।’ ২৭ বছর পর জিয়া হত্যা মামলা নতুন করে আলোচনায় আসায় সেই সেনা অভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে যাদেরকে ‘সুপরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছিল’ তারাও ফিরে আসছেন আলোচনায়। জিয়া হত্যার পাশাপাশি সেইসব সেনা অফিসারদের হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবিটিও উচ্চারিত হচ্ছে এখন।

জিয়া হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে পরবর্তীকালে যাদের হত্যা করা হয় তার ভেতরে সাবেক চিফ অব জেনারেল স্টাফ মেজর জেনারেল এম এ মঞ্জুর ছিলেন অন্যতম। তিনি ছিলেন আমাদের গৌরবময় মুক্তি সংগ্রামের একজন আলোকিত সেক্টর কমান্ডার। তার হত্যাকাণ্ডটি সেসময়ে যেমন ছিল বিতর্কিত, সমালোচিত এবং রহস্যাবৃত এত বছর পরও তেমনিই আছে। তার পরিবারের পক্ষ থেকে বারবার এই নৃশংস হত্যার বিচার দাবি করা হলেও কোনো সরকারই তা আমলে নেয়নি। বাংলাদেশের রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের ইতিহাসের পাতায় জেনারেল মঞ্জুর হত্যার করুণতম অধ্যায়টি ধীরে ধীরে ধূসর হয়ে যাচ্ছে। একদিন হয়তো মুছেও যাবে। আজ সময়ের দাবিতে সেই বেদনাময় উপাখ্যানটি আমরা আবার স্মরণে আনতে চাই।

লেফটেন্যান্ট কর্নেল এ জেড তোফায়েল আহম্মদ নিহত মেজর জেনারেল মঞ্জুরের ময়না তদন্ত করেছিলেন। সেই তদন্ত রিপোর্ট অনুযায়ী মঞ্জুরের মাথার ডান অসিপিটাল রিজিয়নে ৪ দশমিক ২ ইঞ্চি গর্ত দেখা যায়। রিপোর্টে বলা হয়, মাত্র একটি বুলেটের আঘাতে মাথার হাড় ও মগজ বেরিয়ে যায় এবং তার শরীরে আর কোনো আঘাতের চিহ্ন ছিল না।

জেনারেল মঞ্জুর গ্রেফতার হয়ে হাটহাজারী থানায় আসার পর পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্তা মোহম্মদ শাহজাহানকে বলেছিলেন, আমাকে সেনাবাহিনী থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে। আমি এখন বেসামরিক ব্যক্তি। আমাকে সেনাবাহিনীর হাতে না দিয়ে চট্টগ্রাম কারাগারে পাঠিয়ে দিন।’ তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোর করে চট্টগ্রাম সেনাসদরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেই তিনি নিহত হন।

সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হত্যা করার অভিযোগে হত্যা করা হয় মেজর জেনারেল মঞ্জুরকে। ২৪তম পদাতিক ডিভিশনের কমান্ডার এম এ মঞ্জুরের সঙ্গে জিয়ার সম্পর্কের অবনতি হলে মঞ্জুর জিয়াকে বন্দি করে কিছু দাবি-দাওয়া আদায় করতে চেয়েছিলেন। সেভাবেই পরিকল্পনা করা হয়েছিল। ৩০ মে রাতে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে তাকে বন্দি করতে সৈন্যও পাঠানো হয়েছিল। নিচ তলার দায়িত্বে নিয়োজিত সৈন্যদের মধ্য থেকে লেফটেন্যান্ট কর্নেল মতি উপরে উঠে রাষ্ট্রপতিকে খুঁজতে থাকেন। সার্কিট হাউসের ৫ নম্বর কক্ষে প্রবেশ করে তিনি রাষ্ট্রপতিকে পেয়ে যান এবং সঙ্গে সঙ্গে গুলি চালান। তার মৃত্যুর পর মুখ উপরে তুলে পুরো একটি ম্যাগজিন শেষ করেছিলেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল মতি। মতি এরশাদের অধিনায়কত্বে তৃতীয় বেঙ্গলে চাকরি করেছেন। তাদের ছিল পুরনো সখ্য। জিয়া হত্যার মাত্র চারদিন আগে এরশাদ চট্টগ্রাম সফরে গিয়ে একান্তে মতির সঙ্গে হিলটন অফিসার্স মেসে দুপুরের খাবার খেয়েছিলেন।

জিয়া নিহত হওয়ার পর মঞ্জুর রেডিও ভাষণ দিয়ে সেনা সদস্যদের তার প্রতি সমর্থন জানাতে অনুরোধ করেন। তিনি ভেবেছিলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যার পর যে পরিস্থিতি হয়েছিল জিয়া হত্যার পরও তাই হবে। কিছুক্ষণের ভেতরেই তিনি বুঝতে পারেন জীবিত জিয়ার চেয়ে মৃত জিয়া অনেক বেশি শক্তিশালী। তাকে কেউই সমর্থন করে না। বরং তার সঙ্গে থাকা অনেকেই দল ত্যাগ করে চলে যায়। ৩০ মে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি বিদ্রোহীদের আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেন। এরই প্রেক্ষিতে সেনাবাহিনী প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল এরশাদ মঞ্জুরসহ সকল বিদ্রোহীকে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের নির্দেশ জারি করেন। জেনারেল এরশাদের এই ঘোষণা ১ ঘণ্টা পরপর রেডিও-টেলিভিশনে প্রচারিত হচ্ছিল। মঞ্জুর বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমির তৎকালীন কমান্ড্যান্ট ব্রিগেডিয়ার হান্নান শাহকে ঢাকায় সেনাসদরের সঙ্গে আলোচনা শুরু করার নির্দেশ দেন এবং কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখে সৈন্য পাঠিয়ে অহেতুক রক্তপাত ও গৃহযুদ্ধ শুরু না করার জন্য বলেন। হান্নান শাহ চিফ অব জেনারেল স্টাফ মেজর জেনারেল নুরুদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগ করে রেডিও টেলিভিশনে বিপ্লববিরোধী প্রচারণা বন্ধ করে চট্টগ্রামে ২ জন উচ্চপদস্থ কর্তাকে আলোচনার জন্য পাঠানোর অনুরোধ করেন। সেনাসদর বিদ্রোহীদের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের ব্যাপারে অনড় থাকে।

১ জুন রাত ১টায় মঞ্জুর ডিভিশনাল সদর দফতর থেকে তার বাসায় যান। আধঘণ্টা পর বেরিয়ে এসে একটি জিপে চড়েন। জিপ থেকে ফ্ল্যাগ নামিয়ে ফেলা হয়। তার সঙ্গী হন মেজর মোজাফফর ও মেজর রেজা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে একটু আড়ালে জিপ থামিয়ে মঞ্জুরের স্ত্রী এবং তিন ছেলে মেয়েকে তুলে নেয়া হয়। জিপ ছোটে গুইমারা এলাকায় মোতায়েনকৃত ২১ ইস্ট বেঙ্গলের এলাকার দিকে। লেফটেন্যান্ট কর্নেল মেহবুব ছিলেন এই ব্যাটেলিয়নের অধিনায়ক। তিনি ছিলেন মঞ্জুরের বিশ্বস্ত। পরে মঞ্জুর সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে ফটিকছড়ির দিকে অগ্রসর হন। তিনি তার র‌্যাংক খুলে ফেলেন এবং জিপ থেকে নেমে স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে পাহাড়ি পথ বেয়ে হাঁটতে থাকেন।

মঞ্জুর বেলা ২টার সময় ফটিকছড়ির পাইন্দং ইউনিয়নের খৈয়ামছড়া চা বাগানে পৌঁছেন। চা বাগানের এক কুলির বাড়িতে আশ্রয় নেন। পথে মঞ্জুর যে গাইডের সাহায্য নিয়েছিলেন সেই গাইড থানায় খবর দিলে হাটহাজারী থানার ইন্সপেক্টর গোলাম কুদ্দুস ও ফটিকছড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত অফিসার কুলির ঘর ঘেরাও করেন। মঞ্জুর ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বলেন, আমি এখানে আছি, কোনো গোলাগুলির প্রয়োজন নেই। আমি আত্মসমর্পণ করছি।’

’৮১-এর ১ জুন বিকাল ৫টায় হাটহাজারী থানার পুলিশ মঞ্জুরকে ফটিকছড়ি থানার খৈয়ামছড়া চা বাগানের এক কুলির বাড়ি থেকে গ্রেফতার করে। রাত ১০টায় ক্যাপ্টেন এমদাদ কয়েকজন সৈন্যসহ হাটহাজারী থানায় পৌঁছে মঞ্জুরকে চট্টগ্রাম সেনাসদরে নিয়ে যেতে চাইলে মঞ্জুর আপত্তি করেন। তাকে জোর করে সেনাবাহিনীর জিপে তোলা হয়। চট্টগ্রাম সেনানিবাসের ২ নম্বর এমপি চেকপোস্ট দিয়ে তারা সেনাসদরে প্রবেশ করেন। মেজর জেনারেল মঞ্জুর হত্যার পর সরকারি শ্বেতপত্রে বলা হয়, মঞ্জুরকে বহনকারী গাড়িটি যখন ভিআইপি হাউসের কাছাকাছি পৌঁছায় তখন সেখানে বহুসংখ্যক অস্ত্রধারী সেনা টহল দিচ্ছিল। ক্যাপ্টেন এমদাদ গাড়িটি ঘুরিয়ে আর্টিলারি লাইনের দিক দিয়ে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টার অফিসার্স মেসের ভিআইপি হাউসে ঢোকার সিদ্ধান্ত নেন। গাড়িটি ক্যান্টিন স্টোরসের কাছে এলে ২০ থেকে ৩০ জন সৈন্য গাড়িটি অবরোধ করে। ভীত সন্ত্রস্ত ক্যাপ্টেন এমদাদ ব্রিগেডিয়ার আজিজ ও ব্রিগেডিয়ার লতিফের কাছে রিপোর্ট করার জন্য ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারে যান। ব্রিগেডিয়ারদ্বয় অবিলম্বে ক্যাপ্টেন এমদাদকে ঘটনাস্থলে ফিরে যেতে বলেন এবং জেনারেল মঞ্জুরের যেন কোনো ক্ষতি না হয় সেজন্য সৈনিকদের প্রতি আহ্বান জানান। এসকর্ট অফিসার এমদাদ ফিরে আসেন এবং মঞ্জুরকে ড্রেনের মধ্যে উপুড় হয়ে পড়ে থাকতে দেখেন। সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে নিয়ে গেলে ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করেন।’

এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর রেডিওতে বলা হয়, একদল উচ্ছৃংখল সৈনিকের গোলাগুলিতে নিহত হয়েছেন জেনারেল মঞ্জুর।’ সরকারি সেই ঘোষণা যদি সত্য হয় তাহলে ময়না তদন্তে যে একটি গুলির আঘাতে নিহত হওয়ার কথা বলা হয়েছে সেটি কি মিথ্যা? কোনটি সত্য? আজ সম্ভবত সময় এসেছে সেই সত্য-মিথ্যার রহস্য উদঘাটনের।

ই-মেইল: mail@basbhumi.com

Advertisements

Comments on: "জিয়া হত্যাকাণ্ড: কাফনে মোড়া নিষিদ্ধ অশ্র“বিন্দু জেনারেল মঞ্জুরকে যেভাবে হত্যা করা হয়েছিল" (1)

  1. This is the very fine ascertainment.

    zia-ur-rahman is the very popular president.

    we ask panisment the killer of zia-ur-rahman.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: