জীবনে এমন কত বিচ্ছেদ, কত মৃত্যু আছে, ফিরিয়া লাভ কি? পৃথিবীতে কে কাহার…

নেছার আহমদ
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন দেশকে পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্তির সংগ্রামের প্রথম সোপান হিসেবে চিহ্নিত। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে সমগ্র বাংলার নারীরা যেমন এগিয়ে এসেছেন তেমনি অগ্নিগর্ভা বীর চট্টলার নারীরা কোন অংশে পিছিয়ে ছিলেন না। তারা অংশগ্রহণ করেছেন প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে। ১৯২০ খ্রিস্টাব্দের অসহযোগ আন্দোলনে চট্টগ্রামের জনগণ যেন বাঁধভাঙ্গা জোয়ারের মতো সাড়া দিয়েছিল। সে সময়কালে দেশবু চিত্তরঞ্জন দাশ এসেছেন চট্টগ্রামে। অনুষ্ঠিত হলো বিশাল মহাসমাবেশ। চট্টগ্রামে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের ব্যপ্তি দেখে মহাত্মা গাী তার ‘তরুণ ভারত’ সাপ্তাহিক পত্রিকায় চট্টগ্রামকে অভিনন্দিত করতে গিয়ে বলেছিলেন, চট্টগ্রাম সবার আগে ‘ঈযর::ধমড়হম :ড় :যব ঋড়ৎব’। সে সময়ে দেশপ্রিয় যতীন্দ্র মোহন সেনগুপ্তের ইংরেজ সহধর্মিণী নেলী সেনগুপ্ত খদ্দেরের শাড়ি পরে সমাবেশে যোগদান করলেন এবং আন্দোলনে অর্থ সাহায্যের জন্য নিজ হাত থেকে খুলে দিলেন সোনার দুটি চুড়ি। চুড়ি দুটি সঙ্গে সঙ্গে নিলাম দেয়া হলো। পাঁচশ’ টাকায় কিনে নিল একজন। এভাবে চট্টগ্রাম শহর ধীরে ধীরে পরিণত হলো বিপ্লবী নেতা ও কর্মীদের তীর্থ কেন্দ্রে। ১৯২৩ সালের পর থেকে ব্রিটিশবিরোধী নানা কর্মকাণ্ডে চট্টগ্রামবাসী আন্দোলনে উদ্বেলিত। এ আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন ‘মাস্টারদা সূর্যসেন’।
সে সময়ে হিন্দু-মুসলিম মেয়েরা নিজেদের অলঙ্কার, পরিবার থেকে নেয়া অর্থ, এমনকি নিজের বিয়ের জন্য তৈরি করা অলঙ্কারও অবলীলায় দান করেছেন।
মাস্টার দার আহ্বানে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের ইতিহাসে দুর্জয়, সংকল্প ও দৃপ্ত প্রত্যয়ী অভিযাত্রী ও এক আত্মনিবেদিত বিপ্লবী কন্যার নাম ‘প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার’। দেশকে পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্তির সংগ্রামে তিনি প্রথম শহীদ কন্যা হিসেবে ইতিহাসে অমর হয়ে রয়েছেন। প্রজন্মের সঙ্গে বিপ্লবী যুগের প্রথম নারী শহীদ প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারকে পরিচয় করিয়ে দেয়ার এটি আমার ক্ষুদ্র প্রয়াস।
প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার ওরফে রানী ১৯১১ সালের ৫ মে পটিয়া থানার ধলঘাট গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম জগবু ওয়াদ্দেদার, মায়ের নাম প্রতিভা ওয়াদ্দেদার। পিতা জগবু ওয়াদ্দেদার ছিলেন চট্টগ্রাম পৌরসভার হেড কেরানি এবং মা ছিলেন একজন সংবেদনশীল সচেতন নারী। চট্টগ্রাম শহরের মধ্য পশ্চিম এলাকায় আসকার দীঘির একটু দূরে গলির শেষ প্রান্তে একটি মাটির দোতলা ঘরে তারা বসবাস করতেন। সে সময়ে মধ্যবিত্ত পরিবারে মেয়ে সন্তান জন্মানো ছিল অপরাধ, তার ওপর কালো, সে তো কথাই নেই। এ কালো মেয়েটিকে তারা বুকে জড়িয়ে সাদরে গ্রহণ করে নিলেন। রানী ছিল তাদের সংসারে দ্বিতীয় সন্তান। তখন মেয়েদের লেখাপড়ার বিশেষ প্রচলন ছিল না।
বড় ভাইয়ের গৃহশিক্ষকের কাছে চুপিসারে গোপনে প্রীতি পড়ালেখা করার চেষ্টা করতেন। লেখাপড়ার প্রতি উৎসাহ এবং মায়ের ঐকান্তিক আকাáক্ষা ও প্রচেষ্টায় সাত বছর বয়সে প্রীতিলতাকে চট্টগ্রামের ডা. খাস্তগীর গার্লস হাইস্কুলে ভর্তি করানো হয়। এ স্কুলে তৃতীয় শ্রেণী থেকে সে প্রতি শ্রেণীতেই প্রথম তিন স্খানের একটিতে নিজের স্খান করে নিয়ে বিদ্যালয়ের সবার প্রিয়পাত্রে পরিণত হয়। সে সময়ে চট্টগ্রামে যেন এক অগ্নিযুগ। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের জোয়ারে চট্টগ্রামের জনগণ যেন উত্তাল হয়ে উঠেছে। চারদিকে বিপ্লবীদের নানা ধরনের তৎপরতায় ঘটনাকালে আসে প্রীতি। এরই মাঝে ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দে বেঙ্গল অর্ডিন্যান্সের অধীনে বিভিন্ন নেতৃস্খানীয় বিপ্লবীদের ধরপাকড় শুরু হয়। কয়েকজন বিপ্লবী ধরা পড়ে। প্রীতির পূর্বপরিচিত এক বিপ্লবীর মাধ্যমে প্রীতির হাতে আসে সরকার কর্তৃক বাজেয়াপ্ত করা বিপ্লবীদের কয়েকটি বই। বইগুলো হচ্ছে ‘ক্ষুদিরাম, বাঘা যতীন, কানাই লাল ও দেশের কথা’ ইত্যাদি। বইগুলো পড়ে তার মনের গভীরে দেশপ্রেমের বীজ অঙ্কুরিত হয় এবং সে হয়ে ওঠে অন্য এক প্রীতিলতা। ১৯২৭ সালে প্রীতিলতা ডা. খাস্তগীর উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় থেকে প্রথম বিভাগে মেট্রিক পাস করেন। কৃতিত্বের সঙ্গে মেট্রিক পাস করার পর তাকে ঢাকায় ইডেন কলেজে ভর্তি করা হয়। ইডেন কলেজে অধ্যয়নকালে তার মেধার পরিচয় পেয়ে কলেজের একজন অধ্যাপিকা তাকে ‘দীপালী সংঘের’ একটি ফরম দিয়ে এতে সদস্য হওয়ার অনুরোধ করেন। এরই মধ্যে তার জন্য বিবাহের প্রস্তাব আসে। কিন্তু তার প্রবল আপত্তির কারণে তার মা বিয়ের ব্যবস্খা তখনকার মতো স্খগিত রাখেন।
‘দীপালী সংঘটি’ ছিল একটি বিপ্লবী দল ‘শ্রী সংঘের’ মহিলা শাখা। এ সংগঠনের নেত্রী ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমএ লীলা রায় (নাগ)। ১৯২৯ সালে প্রীতিলতা ঢাকা ইডেন বালিকা মহাবিদ্যালয় থেকে আইএতে মেয়েদের মধ্যে ১ম স্খান অধিকার করে কৃতিত্বের সঙ্গে পাস করেন এবং মাসিক বিশ টাকা হারে বৃত্তি পান। মেয়ের ভাল ফলাফল দেখে মধ্যবিত্ত পিতা মেয়ের বৃত্তির টাকার ওপর নির্ভর করে প্রীতিলতাকে কলকাতার বেথুন কলেজে দর্শন শাস্ত্রে বিএ অনার্সে ভর্তি করিয়ে দেন।
কলকাতার বেথুন কলেজে ছাত্রী নিবাসে থাকার ফলে ব্যক্তিগত মধুর ব্যবহারে এবং নানা কাজের মধ্য দিয়ে সে ছাত্রীদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। পূর্ব সিদ্ধান্ত অনুসারে কলকাতায় বিপ্লবীদের চট্টগ্রাম শাখার এক বিশিষ্ট কর্মীর সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল। সে সময়ে বাজেয়াপ্ত বিপ্লবী দলের বইপত্র সে নিয়মিত সংগ্রহ করে পড়ত এবং অন্য ছাত্রীদেরও পড়াত। ক্রমে চট্টগ্রাম বিপ্লবী দলের চারজন মেয়ে ও অন্য কয়েকজন ছাত্রী নিয়ে প্রীতিলতা বিপ্লবীদের জন্য নিয়মিত অর্থ সংগ্রহ করে বিপ্লবীদের জন্য পাঠাত। বিপ্লবীদের পক্ষ থেকে ভবিষ্যৎ কর্মপন্থায় ব্যবহারের জন্য কলকাতায় গোপন কারখানায় তৈরি বোমার খোল আনার জন্য মেয়েদের এ দলকে নির্দেশ দেয়া হয়। প্রীতিলতা ও তার দলের মেয়েরা নিজ ট্রাংক সুটকেসে লুকিয়ে কয়েকটি করে বোমার খোল এনে চট্টগ্রামে বিপ্লবী দলের হাতে পৌঁছে দেয়। এ দলে ছিলেন প্রীতিলতা, কল্পনা দত্ত, সরোজিনী পাল, নলিনী পাল ও কুমুদিনী রক্ষিত প্রমুখ। তারা প্রত্যকে চারটি করে মোট কুড়িটি বোমার খোল ঢাকা এনেছিল বলে জানা যায়। চট্টগ্রামে ১৯৩০-এর অস্ত্রাগার দখল ও পরবর্তী অনেক বিপ্লবী কার্যক্রমে এ খোলের বোমাগুলো ব্যবহৃত হয়েছিল।
বিএ অনার্স দর্শন শাস্ত্রের পড়াটা শেষ করতে পারল না প্রীতিলতা। বিএ নির্বাচনী পরীক্ষার পর প্রীতিলতা তার বাবা-মাকে দেখার নাম করে কয়েকদিনের জন্য চট্টগ্রামে আসেন। সে সময় অস্ত্রগার দখলের পর আত্মগোপনরত বিপ্লবীদের গ্রেফতারের জন্য পুলিশ ও মিলিটারি তৎপরতা বেড়ে যায়।
বিএ শেষ বর্ষে চট্টগ্রামের অস্ত্রগার দখল, জালালাবাদ সংঘর্ষ ও সেই যুদ্ধে তার আত্মীয় শহীদ হওয়ায় লেখাপড়ায় সে অমনোযোগী হয়ে ওঠে এবং রামকৃষä বিশ্বাসের ফাঁসির পর থেকে সে বিএ পরীক্ষা না দেয়াই স্খির করে ফেলে। কিন্তু তার শুভাকাáক্ষীদের অনুরোধে শেষ পর্যন্ত বিএ পরীক্ষা দিয়ে ডিসটিংশনে পাস করলেন। এরপর ফিরে এলেন চট্টগ্রামে। তবে এ যেন অন্য এক প্রীতিলতা! সদা গম্ভীর, অন্যমনস্ক, মনে মনে যেন এক গভীর প্রত্যয়ী মহিলা। অভিভাবকরা তাকে বিবাহ দেয়ার চেষ্টা করলে তিনি শহরের নন্দনকানন এলাকায় সদ্য প্রতিষ্ঠিত অপর্ণাচরণ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষাত্রিয়ীর পদে যোগ দেন।
এদিকে বিপ্লবী ছাত্রী কল্পনা দত্ত বেথুন কলেজ থেকে বদলিপত্র নিয়ে ভর্তি হন চট্টগ্রাম কলেজে। অবশেষে এক গোপন ঘাঁটিতে বিপ্লবী মহানায়ক মাস্টারদা সূর্যসেনের সঙ্গে প্রীতিলতার সাক্ষাৎ হয়। ১৯৩২ সালের ১৩ জুন ধলঘাটের সাবিত্রী দেবীর বাড়িতে সূর্যসেনের সঙ্গে গোপন বৈঠক হয়। সেখানে একজন ইংরেজ দালালের দেয়া খবরে পুলিশ বাড়িটি ঘেরাও করে ফেলে। সেখানে বিপ্লবীদের সঙ্গে পুলিশের প্রচণ্ড সংঘর্ষ হয়। এ সংঘর্ষে নির্মল সেন ও অপূর্ব সেন (ভোলা সেন) শহীদ হন এবং মাস্টারদা ও প্রীতিলতা পালাতে সক্ষম হন। এ সংঘর্ষ ধলঘাটের সংঘর্ষ হিসেবে ইতিহাসে সুপরিচিত।
ধলঘাট সংঘর্ষের পর পুলিশ জানতে পারে এ সংঘর্ষে বিপ্লবী নেতা সূর্যসেনের সঙ্গে ছিলেন প্রীতিলতা নামে একটি মেয়ে। সুতরাং মাস্টারদার নির্দেশে প্রীতিলতাকেও আত্মগোপন করতে হয়। সংবাদপত্রে তখন সংবাদ বের হলো, ‘সূর্যসেনকে ধরিয়ে দিতে পারলে দশ হাজার টাকা পুরস্কার’। পত্রিকার সংবাদটি ছিল নিম্নরূপ :
‘১৯৩০ সালের এপ্রিল মাসে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন কাজে বিপ্লবী দলের নেতা বলিয়া কথিত সূর্যসেনকে যে ধরিয়া দিতে পারিবে বা এমন সংবাদ দিতে পারিবে যাহাতে সে ধরা পড়ে। তাহাকে দশ হাজার টাকা পুরস্কার দেওয়া হইবে বলিয়া ঘোষণা করা হইয়াছে। গত ১৩ জুন পটিয়ার বিপ্লবীদের সহিত সংঘর্ষের ফলে ক্যাপ্টেন ক্যামেরুন নিহত হইয়াছেন। সূর্যসেন নাকি সেই সংঘর্ষের পরিচালক। (আনন্দ বাজার পত্রিকা ৩-৭-১৯৩২) এবং অপর সংবাদে বলা হয়, ‘চট্টগ্রাম জেলার পটিয়া থানায় ধলঘাটের শ্রীমতী প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার গত ৫ জুলাই মঙ্গলবার, চট্টগ্রাম শহর থেকে অন্তর্ধান করিয়াছেন। তাঁহার বয়স ১৯ বৎসর। পুলিশ তাহার সানের জন্য ব্যস্ত। [আনন্দ বাজার পত্রিকা ১৩-৭-১৯৩২]।’
প্রীতিলতাকে ধরার জন্য আড়াইশ’ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করা হয় যা পরবর্তী সময়ে আরও বাড়ানো হয়। প্রীতিলতা ধলঘাট বৈঠকে মাস্টারদাকে বলেছিলেন, ‘বিপ্লবীদের সক্রিয় কাজে কেন মেয়েদের অংশগ্রহণ করতে দেয়া হবে না?’ বাংলার বিপ্লবীরা যেখানে ১৯০৭-১৯০৮ থেকে সশস্ত্র আন্দোলনে অংশগ্রহণ করছে সেখানে ২৫ বছরেও কোন মেয়ে বিপ্লবী সম্মুখযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেনি এ বেদনা ও ক্ষোভে প্রীতিলতা অধীর ছিলেন।
মাস্টারদা প্রীতিলতার উত্তরে বলেছিলেন, ‘বাংলার বীর যুবকের আজ অভাব নেই। বালেশ্বর থেকে জালালাবাদ, কালারপোল পর্যন্ত দেশের মাটিতে বারবার যুবকের রক্তে সিক্ত হয়েছে। কিন্তু বাংলার ঘরে ঘরে মায়েদের জাতি ও সে শক্তির খেলায় নামতে পারে ইতিহাসে সে অধ্যায় আজ অলিখিত। মেয়েদের আত্মদানের সে অধ্যায় রচিত হোক এই আমি চাই। ইংরেজ জানুক, বিশ্বজগত জানুক, এদেশের মেয়েরাও মুক্তিযুদ্ধে পেছনে পড়ে নেই’।
মাস্টারদার এ সিদ্ধান্তে ইতিহাসে লিখিত হলো আর এক অধ্যায়। সে অধ্যয়ে স্বর্ণের অক্ষরে লেখা আছে এবং থাকবে বিপ্লবী মেয়েদের সাহসিকতায় অভূতপূর্ব কাহিনী।
১৯৩২ খ্রিস্টাব্দের ১৭ সেপ্টেম্বর দক্ষিণ কাট্টলী গ্রামে এক গোপন বৈঠকে মাস্টারদার নির্দেশে প্রীতিলতা ও কল্পনা দত্ত দেখা করতে রওনা হয় পুরুষের বেশে। কিন্তু পথে পাহাড়তলীতে কল্পনা দত্ত ধরা পড়েন। প্রীতিলতা নিরাপদে নির্দিষ্ট গ্রামে এসে পৌঁছেন। এখানেই পরিকল্পনা নেয়া হয় প্রীতিলতার নেতৃত্বে ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণ করার।
আক্রমণে প্রস্তুতি নেয়ার জন্য কাট্টলীর সাগরতীরে প্রীতিলতা ও তার সাথীদের অস্ত্র শিক্ষা শুরু হয়। প্রীতিলতার নেতৃত্বে যেসব বিপ্লবীকে ওই আক্রমণ পরিচালনার জন্য নির্বাচিত করা হয় তারা হলেন, ১. শান্তি চক্রবর্তী-দক্ষিণ কাট্টলী, ডবলমুড়িং থানা, ২. কালী দে- গোসাইলডাঙ্গা, ডবলমুড়িং থানা, ৩. সুশীল দে- ধৈরলা, বোয়ালখালী থানা, ৪. প্রফুল্ল দাশ- কাট্টলী, ডবলমুড়িং থানা, ৫. মহেন্দ্র চৌধুরী- মোহরা, পাঁচলাইশ থানা। ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দের ২৩ সেপ্টেম্বর পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
ইতিপূর্বে ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে ১৮ এপ্রিল চট্টগ্রামের বিপ্লবীরা যেসব কর্মসূচি হাতে নিয়েছিল তার মধ্যে চট্টগ্রাম ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণের সিদ্ধান্ত ছিল প্রধান। সেদিন গুডফন্সাইডে থাকাতে সে পরিকল্পনা তারা পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়। ইউরোপিয়ান ক্লাবের বাইরে লেখা ছিল ‘কুকুর ও ভারতীয়দের প্রবেশ নিষেধ’ এ বাক্যটি বিপ্লবীদের মনে প্রতিশোধের আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিল। ইউরোপিয়ান ক্লাবে বারবার বিপ্লবীরা আক্রমণ করার চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত শৈলেশ্বর চক্রবর্তীর নেতৃত্বে একদল বিপ্লবীকে এ ক্লাব আক্রমণের দায়িত্ব দেয়া হয়। দুর্ভাগ্যবশত এই প্রচেষ্টাও সফল না হওয়াতে তিনি নিজেই রিভলবারের গুলিতে আত্মহত্যা করেন। পরবর্তী সময় প্রীতিলতার নেতৃত্বে নেয়া হয় পুনরায় আক্রমণের সিদ্ধান্ত।
২৩ সেপ্টেম্বর রাত দশটা। প্রীতিলতার পরনে খাকি পোশাক, কোমরে চামড়ার কটিবে গুলিভরা রিভলবার ও চামড়ার খাপে গুরখা ভোজালী মাথার দীর্ঘকেশ রাশিকে সুসংঘবদ্ধ করে তার উপরে সামরিক কায়দায় পাগড়ি। অন্যান্য সবার হাতে চট্টগ্রাম অস্ত্রগার লুণ্ঠনের সময় লুণ্ঠন করা রাইফেল, রিভলবার, ভোজালী ও কাঁধের ঝোলাতে বোমা। ইতিপূর্বে প্রীতিলতা ও তার সাথীরা বিদায় নিলেন নেতা মাস্টারদা কাছ থেকে। তিনি আশীর্বাদ করেন সবাইকে।
আক্রমণ পদ্ধতি সম্পর্কে গোপন বৈঠকে বিশদ আলোচনা করা হয়েছে। একই সঙ্গে ক্লাবের মুসলমান বাবুর্চির সহযোগিতার আশ্বাসও মিলেছে। রাত দশটা, ক্লাবের ভেতর শতাধিক শ্বেতাঙ্গ নরনারীর হইচই, গান বাজনার শব্দ, ওরা সবাই আনন্দে মগ্ন। এমন সময় বাবুর্চির টর্চের সংকেত এবং সঙ্গে সঙ্গে প্রীতিলতার কণ্ঠের আদেশ ‘চার্জ’ একই সঙ্গে বোমা ও গুলির শব্দে চারদিক কম্পিত। অকস্মাৎ এ আক্রমণের ক্লাবের ভেতরের ইংরেজ নরনারীর আর্তনাদ। আত্মরক্ষার্থে পালাতে থাকে সবাই এদিক ওদিক। অবিরাম গুলি চালাতে থাকেন প্রীতিলতা। যেন তিনি এতদিনের শত শত দেশপ্রেমিক বিপ্লবীদের হত্যার প্রতিশোধ নিচ্ছেন। আক্রমণ শেষে সামরিক নিয়মে দলনেত্রী আদশে দিলেন সবাইকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার, পেছনে তিনি। হঠাৎ নালার মধ্যে লুকিয়ে থাকা এক ইংরেজ যুবকের ছোড়া গুলি এসে লাগে প্রীতিলতার বুকে, আহত রক্তাক্ত অবস্খায় তিনি লুটিয়ে পড়েন মাটিতে। মনস্খির করে নিলেন সে মুহূর্তে। কালক্ষেপণ না করে পটাশিয়াম সায়ানাইড বিষের মোড়ক পোশাকের ভেতর থেকে বের করে মুখে ঢেলে দেন এবং পৃথিবীর সীমানা ছাড়িয়ে হারিয়ে গেলেন যেন অমৃতলোকে’।
বিপ্লবী এ মহীয়সী নারীর আত্মদানকে সে সময়কালে বিশ্বের বিভিন্ন পত্রিকায় শিরোনাম করে সংবাদ ছাপানো হয়। সে সংবাদের অংশবিশেষ এখানে তুলে ধরছি।
‘গতকাল রাত ১১টার সময় বিপ্লবী বলে বর্ণিত একদল লোক পাহাড়তলী ইনস্টিটিউট নামক আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে ইউরোপিয়ান ক্লাবে অতিশয় দু:সাহসিকভাবে ইউরোপীয়দের ওপর আক্রমণ করে। আক্রমণকারীর দলে পুরুষের বেশে একজন নারীও ছিল।
আক্রমণকারীরা ঘরের মধ্যে বোমা নিক্ষেপ করেছিল। এর ফলে একজন বৃদ্ধ ইউরোপিয়ান মহিলা নিহত এবং ইন্সপেক্টর ম্যাগডোনাল্ড, সার্জেন্ট উইলিস এবং অপর ছয়জন ইউরোপিয়ান আহত হন।
একজন স্ত্রীলোক ব্যতীত আক্রমণকারী দলের আর সবাই পালাইয়া গেছে। পুরুষের সজ্জিত ২০ বছর বয়স্কা এই নারীকে মৃত অবস্খায় পাওয়া গেছে। তার মৃতদেহ ক্লাব ঘর হতে কিছু দূরে পড়ে ছিল। প্রকাশ যে, ‘এই স্ত্রীলোকটিকে কুমারী প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার বিএ বলে শনাক্ত করা হয়েছে। সে নাকি শহরের শ্রীযুক্ত জগৎবু ওয়াদ্দেদার কন্যা। তাহার পকেটে রিভলবার ও রাইফেলের কতগুলো কার্তুজ পাওয়া গেছে’। [আনন্দবাজার- ২৫-৯-১৯৩২] কলকাতা ইংলিশম্যান পত্রিকায় প্রকাশিত হলো ৫০ জনের বেশি নরনারী এই অভিযানে আহত হয়েছিল। পত্রিকার সংবাদদাতা প্রীতিলতাকে বীরনারী বলে আখ্যায়িত করে।
দর্শন শাস্ত্রের ছাত্রী ছিলেন প্রীতিলতা। ছোটবেলা থেকে ডায়েরি লেখার অভ্যাস ছিল তার। বিপ্লবী কাজে সম্পৃক্ত হওয়ার পর ডায়েরি লেখাকে নিয়মের মধ্যে রেখেছিলেন তিনি। ক্লাব আক্রমণের পূর্বে কেন তিনি এ সন্ত্রাসী কাজে অংশ নিচ্ছেন। সে সম্পর্কে যে বিবৃতি লিখেছেন সেটি তার মৃত্যুর পরে মৃতদেহের তল্লাশির পর পুলিশ কর্তৃক আবিষ্কৃত হয় এবং এটি এক ঐতিহাসিক বিবৃতি পাঠকদের জন্য তা এখানে তুলে ধরছি।
‘আমি বিবিধ-পূর্বক ঘোষণা করিতেছি, এ প্রতিষ্ঠানের উচ্চ আদর্শে অনুপ্রাণিত হইয়া অত্যাচারীর স্বার্থ সাধনে প্রয়োগকারী সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ শাসনের উচ্ছেদ সাধন করিয়া আমার মাতৃভূমি ভারতবর্ষে গণতান্ত্রিক শাসন প্রবর্তন করিতে ইচ্ছুক, সেই ভারতীয় রিপাবলিকান আর্মির চট্টগ্রাম শাখার আমি একজন সদস্য।
এ বিখ্যাত শাখা দেশের যুবকদের দেশপ্রেমকে নবচেতনায় উদ্বুদ্ধ করিয়াছে। স্মরণীয় ১৯৩০-এর ১৮ এপ্রিল এবং উহার পরবর্তী পবিত্র জালালাবাদ ও পরে কালারপোল, ফেনী, ঢাকা, কুমিল্লা, চন্দননগর ও ধলঘাটের বীরোচিত কার্যসমূহ ভারতীয় মুক্তিকামী বিদ্রোহীদের মনে এক নতুন প্রেরণা জাগাইয়া তুলিয়াছে। আমি এরূপ একটি গৌরবমণ্ডিত একটি সংঘের সদস্য হইতে পারিয়া নিজেকে সৌভাগ্যবতী বলিয়া অনুভব করিতেছি।
আমার দেশের মুক্তির জন্যই সশস্ত্র যুদ্ধ করিতেছি। অদ্যকার পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণ স্বাধীনতা যুদ্ধেরই একটা অংশ। ব্রিটিশরা জোরপূর্বক আমাদের স্বাধীনতা ছিনাইয়া লইয়াছে। ভারতের কোটি কোটি নরনারীর রক্ত শোষণ করিয়া তাহারা দেশে নিদারুণ দুর্দশার সৃষ্টি করিয়াছে। তাহারাই আমাদের রাজনৈতিক অর্থনৈতিক ধ্বংসের এবং সব অধ:পতনের একমাত্র কারণ। সুতরাং তাহারাই আমাদের একমাত্র শুত্রু। স্বাধীনতা লাভ করার পথে তাহারাই আমাদের একমাত্র অন্তরায়। যদিও মানুষের জীবন সংহার করা অন্যায়, তবুও বাধ্য হইয়া বড় বড় সরকারি কর্মচারীর ও ইংরেজদের জীবন সংহার করিতে আমরা অস্ত্রধারণ করিয়াছি। মুক্তিপথের যে কোন বাঁধা ও অন্তরায় যে কোন উপায়ে দূর করার জন্য আমরা সংগ্রাম করিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ …..।’
এই ছিল প্রীতিলতার ঐতিহাসিক বিবৃতির অংশ বিশেষ।
প্রীতিলতার অমর জীবন হতে এই দেশের মেয়েরা তার অবিচল আদর্শ নিষ্ঠার শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে। ভাইদের পাশে দাঁড়াতে বোনদের সমানে সংগ্রাম করার যে দাবি তিনি উথাপন করেছিলেন, সংগ্রাম ও ইতিহাসের পরিবর্তিত রূপে এবং বিশ্বের বহু বৈজ্ঞানিক ও রাজনৈতিক অগ্রগতির পরও আমাদের দেশে প্রীতিলতার সেই দাবি আজও বাস্তবে রূপায়িত হয়নি।
প্রীতিলতার এ সংক্ষিাপ্ত সুন্দর ও সুখী সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে এ দেশের নারী সমাজকে উদ্বুদ্ধ করবে বলে আমি আশা করি। প্রীতিলতার শৌর্য ও সাহস ও অম্লান আদর্শ নিষ্ঠা এ দেশের মেয়েদের কাছে এক অমূল্য উত্তরাধিকার হয়ে রইল যা তাদের জন্য আলোকবর্তিকা বলে আমি মনে করি।
তৎকালীন বিপ্লব যুগের প্রথম নারী শহীদ প্রীতিলতা। সে সময়কার চট্টগ্রামের একটি তরুণী নিজের মাতৃভূমিকে সাম্রাজ্যবাদের কবলমুক্ত করার জন্য যে মরণ স্বপ্ন দেখেছিল তার কর্মপন্থা যুগের সঙ্গে সঙ্গে পরিত্যক্ত হয়েছে। কিন্তু তার দেশপ্রেম প্রশ্নাতীত। তার অটুট আদর্শ নিষ্ঠা আজও প্রেরণা সঞ্চারী। প্রীতিলতার আদর্শের লক্ষ মহিলা এ জাতিতে জন্ম নিয়েছে যা আমরা প্রত্যক্ষ করেছি আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে। এভাবে আজ আমাদের মধ্যে প্রয়োজন লাখো কোটি প্রীতিলতার। যারা হাজার বছরব্যাপী আমাদের প্রেরণাদায়িনী হয়ে আলোর পথ দেখাবে।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: