জীবনে এমন কত বিচ্ছেদ, কত মৃত্যু আছে, ফিরিয়া লাভ কি? পৃথিবীতে কে কাহার…

ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন: কৈশোরে শেখা বীজগণিতের ‘মাইনাসে প্লাসে মাইনাস’ সূত্রটির কথা খুব মনে পড়ছে। রাজনীতিও এক ধরনের গণিত, তবে বীজগণিতের সাথে এই গণিতের একটা বড় পার্থক্য হলো, রাজনীতিতে ভুল হলে জাতির জীবনে মারাত্মক বিপর্যয় ঘটতে পারে। কতিপয় স্বার্থান্বেষী, গণবিচ্ছিন্ন কর্পোরেট বুদ্ধিজীবী ও তাদের দেশি-বিদেশি মিত্রদের উর্বর মস্তিষ্ক থেকে সৃষ্ট বিধ্বংসী এক রাজনৈতিক প্রকল্প ছিল ‘মাইনাস টু’। সামান্য কলাম লেখক হিসেবে আমি গত দু’বছরে আমার প্রায় প্রতিটি লেখায়ই একথাটি বলবার চেষ্টা করেছি। ‘মাইনাস টু’র প্রবর্তকরা ক্ষমতার স্বাদ পেয়ে সম্ভবত বাস্তবতা ভুলে গিয়েছিলেন। ওয়ান ইলেভেন পরবর্তী সরকারকে জনগণ স্বাগত জানিয়েছিল। দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে তথাকথিত হেভিওয়েট রাজনীতিবিদদের গ্রেফতার করে বিচারের আওতায় আনায় সাধারণ জনগণ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিল, পাশাপাশি একটি দুর্নীতিমুক্ত সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতেও শুরু করেছিল।

কিন্তু সকল সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও জনগণের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় সিক্ত শীর্ষ দুই নেত্রীর গ্রেফতার ও তাদের মাইনাস করার চক্রান্তকে জনগণ স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করেনি। ‘মাইনাস টু’ ছিল গোষ্ঠীগত স্বার্থ-দ্বন্দ্ব থেকে উৎসারিত একটি অপ্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। তার মাসুল এখন বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে দিতে হচ্ছে। ‘মাইনাস টু’ এখন রূপান্তরিত হয়েছে ‘ম্যানেজ টু’তে। আর এই ম্যানেজ প্রক্রিয়ায় যেসব ঘটনাগুলো একের পর এক ঘটছে তাতে চরম আশাবাদী মানুষের পক্ষেও ওয়ান ইলেভেন পরবর্তী সরকার প্রদর্শিত স্বপ্নগুলো ধারণ করা বোধ হয় অসম্ভব। মাইনাস প্লাসে এখন গণতন্ত্রেরই মাইনাস হবার দশা।

কারাগারে অন্তরীণ কিংবা দেশ-বিদেশে পলাতক রাজনৈতিক গডফাদাররা আবার গা-ঝাড়া দিয়ে উঠছে। কারাগার থেকে বুক ফুলিয়ে বেরিয়ে অনেক গডফাদার উচ্চ কণ্ঠে বলবে, ‘যদি অপরাধী হতাম তাহলে তো বিচার হত, সুতরাং আমরা নির্দোষ’! ঢাকা শহরে কোনো একদিন প্রেমিক-প্রেমিকারা ফুলের দোকনে গিয়ে কোনো ফুল পাবে না, সব ফুল চলে যাবে এইসব নষ্ট রাজনীতিবিদদের সংবর্ধনা সভায়, তাদের গলায়, মঞ্চে শোভা পাবে ফুলের স্তূপ। এইসব গডফাদারদের হাত ধরে বাংলাদেশে গণতন্ত্র ফিরে আসবে এটি নিশ্চয়ই আমাদের বিশ্বাস করতে বলবে না কেউ। স্রেফ নির্বাচন করাই যদি বর্তমান সরকারের একমাত্র এজেন্ডা হত, তাহলে তো তিন মাসের মধ্যেই তা করা যেত, কেন জাতির জীবন থেকে দুইটা বছর ধ্বংস করা হল? একমাত্র ছবিযুক্ত ভোটার আইডি ছাড়া তো আর কোনো টেকসই অর্জন থাকলো না।

খুব ভালো হত যদি শুরু থেকেই দুই নেত্রীকে স্ব স্ব স্থানে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে পারস্পরিক আস্থার ভিত্তিতে রাজনীতি ও দেশ শাসনে গুণগত পরিবর্তনের জন্য সরকার যৌথভাবে কাজ করতো। কিন্তু শুরুতে আমরা তা দেখিনি, পরিবর্তে রাজনীতির মাঠে কোরেশী-নীলুর মতো কতিপয় টোকাইয়ের লম্ফঝম্ফ পরিস্থিতিতে আরো জটিল করেছে। ছাগল দিয়ে যদি হাল চাষ হত তাহলে তো গরু কেনার প্রয়োজন হত না। এখন প্রতিশ্র“ত আগামী নির্বাচনের কাছাকাছি দাঁড়িয়ে রাজনৈতিক দলগুলো যার যার মতো খেলছে, কিন্তু ভবিষ্যতের কাক্সিক্ষত পরিবর্তনের পক্ষে এখনো তাদের তেমন কোনো তৎপরতা চোখে পড়ছে না। সরকারও মনে হয় সবকিছু গুলিয়ে ফেলে এখন ক্ষমতার বাঘের পিঠ থেকে নামার জন্য উদগ্রীব।

দূর প্রবাসে প্রাচুর্যের দেশে থাকি, এখানে প্রতি মুহূর্তের অনিশ্চয়তা নেই, নেই গণতন্ত্রের নামে শাসকগোষ্ঠীর তাণ্ডব। তবু নদীর বুকে চরের মতো হৃদয়ে জেগে থাকে বাংলাদেশ। স্বদেশকে ভালোবাসার এ দায় আমার, আমাদের। শেখ হাসিনা বিদেশ থেকে ফিরে রাজনীতিতে একটি সুষ্ঠু ধারার নেতৃত্ব দেবেন, তার কাছে আমাদের এই প্রত্যাশা। ইতিমধ্যে তার কথাবার্তা-আচরণে সেরকম একটা ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

আশা করি কারামুক্তির পর বেগম খালেদা জিয়াও রাজনীতিতে পরিবর্তনের স্বপক্ষে আপসহীন ভূমিকা নেবেন। আর তারা যদি পুনর্বার ফিরে যান রাজনীতির পুরনো ধারায়, তাহলে প্রশান্ত পাড়ে বসে স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় মুখ লুকোবো কবিতার কাছে: ‘গোলাপের পাশে আমি অশুভের ছায়া দেখে/কেন কেঁপে উঠেছিলাম?/ না গোলাপ না অশুভ কেউইতো আমার নয়’।

ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন।
কবি ও চিকিৎসক, বর্তমানে অস্ট্রেলিয়াস্থ নিউক্যাসেল বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনারত।
ই-মেইল: milton.hasnat@newcastle.edu.au

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: