প্রিন্সেস জয়া!


হাল আমলের বিখ্যাত গান ‘পাঞ্জাবিওলা’র গল্প নিয়ে সুমন আনোয়ার একটি নাটক বানাচ্ছেন। গাজীপুরের খতিব খামার বাড়িতে এর শুটিং চলছে। এর কাহিনী গড়ে উঠেছে যাত্রার প্রিন্সেসদের জীবনের গল্প নিয়ে। হঠাৎ সেই নাটকের শুটিংস্পটে গিয়ে একদিনের নানা কান্ডের কথা লিখেছেন মীর সামী।
খুব মন খারাপ করে দাঁড়িয়ে আছেন সুমন আনোয়ার। রাত দশটায় যাত্রা করে আরো প্রায় ঘন্টা দেড়েক পরে খামার বাড়ি পৌঁছে যদি দেখা যায় পরিচালকের মন খারাপ অথবা বিধ্বস্ত মূর্তিতে তিনি সামনে হাজির, তাহলে কার না মন খারাপ হয়! অবশ্য সামান্য চাপাচাপির পরে আসল ঘটনা জেনে শেষ পর্যন্ত কোনো ধরনের দু:খ বোধ আর মনের মধ্যে থাকলো না।
আসলে ঘটনা হয়েছে এই- ‘পাঞ্জাবিওয়ালা’ নাটকে যাত্রার দৃশ্য দরকার। সেখানে কিছু দর্শকও লাগবে। পরিচালক করিৎকর্মা সহকারীকে প্রয়োজনের কথা জানাতেই তিনি আলাদীনের চেরাগের দৈত্যের মতো জানালেন, সমাধান হয়ে যাবে!
বুদ্ধিমান সহকারী পাশের গার্মেন্টেস এর শ্রমিকদের মধ্যে গিয়ে আওয়াজ তুললেন, যাত্রা দেখার জন্য দর্শক লাগবে। তাদের আবার টেলিভিশনেও দেখানো হবে! এতো বড় সুযোগ হেলায় হারাতে কোনো শ্রমিকই রাজি নন। ফলে বারবার অনুরোধ করা সত্ত্বেও কাউকেই শুটিং স্পট থেকে বের করতে পারেননি পরিচালক এবং তার সহকারীরা। ফলাফল হলো- প্রায় দুই হাজার মানুষ শুটিং স্পটে এসে ভীড় করায় আর কোনো দৃশ্যই শুট করা সম্ভব হয়নি। অথচ তাদের দরকার ছিল মাত্র ১১ জন দর্শক। এজন্যই সুমন আনোয়ারের এই হাল!
সুতরাং এমন বিধ্বস্ত মানুষকে কোনোভাবেই বলা গেল না, মাইক্রো আসতে দেরি করেছে। বেশ রাত হয়ে গেছে। যে যার মতো গল্প করছেন। ৯ তরুণ সাংবাদিক আর পরিচালক মিলে ১০ জনের বাহিনীটা যখন গোল হয়ে তুমুল আলাপে মত্ত তখনই হঠাৎ করে বাজনা বেজে উঠলো। শুরু হলো শুটিং। আর দশজনের চেয়ে বোধহয় ফটোগ্রাফার রাজিব পালের আগ্রহটাই বেশি, তিনিই এগিয়ে গেলেন। আর বিরস মুখে ফিরলেন ক্যামেরা বের করতে পারেননি বলে। তার কাছ থেকেই জানা গেল, যারা দর্শক হিসেবে থাকবেন তাদের নৃত্য ভঙ্গিমা দেখিয়ে দিচ্ছেন সহকারী পরিচালক। আর সেজন্যই এই আওয়াজ!
মেকআপ রুমে জয়া মেকআপ নিচ্ছেন। পরনে হালকা স্কীন কালারের টপস। তার দিকে তাকাতে মিষ্টি হেসে কুশল বিনিময় করলেন। “আপনাকে খুব সুন্দও দেখাচ্ছে”- বলতেই উল্টো জিজ্ঞেস করলেন, “আমাকে কি যাত্রার প্রিন্সেসদের মতো লাগছে?” ‘হ্যাঁ’ জবাব দিতে তিনি নিজে থেকেই বলতে শুরু করলেন- “পাঞ্জাবিওয়ালা’র শুটিংয়ের আগে আমি আর ফয়সাল গাবতলী গিয়ে যাত্রা দেখেছি। সেখানে গিয়ে প্রিন্সেসদের সঙ্গেও কথা বলেছি। তাদের পোষাক পরার ধরনও শিখেছি।”
জয়া জানালেন- নাটকের প্রয়োজনে ডান্সের ধরণও তিনি ওই প্রিন্সেসদের কাছ থেকে শিখেছেন। জয়ার ব্যক্তিগত ডিজাইনার ‘পাঞ্জাবিওয়ালা’র জন্য পোষাক ডিজাইন করেছেন।
উন্মাতাল নৃত্য!
কথোপকথন যখন চলছে, হঠাৎ সুমনের এক সহকারী এসে জানালেন, সেট রেডি। এখন যেতে হবে। জয়া উঠলেন। পিছু নিলাম আমরাও। দারুণ এক সেট বানানো হয়েছে। প্যান্ডেলটাও খুব চমৎকার। এটা সেটা আমরা যখন দেখছি, তখন চোখে পড়লো-প্রিন্সেস জয়া আর পরিচালক খুব আলাপ করছেন। বোধহয় কীভাবে দৃশ্য ধারণ করা হবে সেই নিয়েই তারা কথা বলছেন।
হঠাৎ সবাইকে চমকে দিয়ে সুমন বললেন, “লাইট- ক্যামেরা- রোলিং… অ্যাকশন।” শুরু হলো বিখ্যাত হিন্দি গান- ‘বাবুজি জারা ধীরে চলো বিজলী গিরি আহা বিজলী গিরি…।’ আর শুরু হলো দর্শকদের উন্মাতাল নৃত্য। লাফিয়ে লাফিয়ে তারা নাচতে লাগলেন।
স্বপ্নের নায়িকা
ষ্টেজের পেছন থেকে কোমর দুলিয়ে নাচতে নাচতে এলেন জয়া আহসান। স্বপ্নের নায়িকা। তিনি শুধু নাচছেনই না, দর্শকদেরও নাচাচ্ছেন। হঠাৎ সামনের সারি থেকে টাকা ছোঁড়া শুরু হলো। টানা দশ মিনিটের মতো এই অর্থ-বৃষ্টিবর্ষণ চললো। যার হাত থেকে প্রিন্সেস টাকা নিচ্ছেন তিনি নিজেকে সত্যিকারের জমিদার মনে করতে লাগলেন। আর বাকীদের দিকে করুণার দৃষ্টিতে তাকাচ্ছেন।
নাচতে নাচতে এতোটাই তাতে ডুবে গেলেন জয়া যে, তাকে সত্যিকারের প্রিন্সেসই মনে হতে থাকলো উপস্থিত দর্শকদের। হঠাৎ হুঁশ ফিরে এলো ‘কাট’ শুনে! আরেক দিক থেকে ক্যামেরা চালানো হবে। এই কাজের ফাঁকে যেটুকু সময় পাওয়া যাবে সেটার সর্বোত্তম ব্যবহারের জন্য ক্লান্ত, ঘর্মাক্ত মানুষেরা ছুটলেন সামান্য বিশ্রামের আশায়।
নিজের দিকে ফ্যানটা ঘুরিয়ে দেবার অনুরোধ করে প্রিন্সেস জয়া হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, “আমার সারা জীবনের ক্যারিয়ারে এতো মেকআপ কখনো নিইনি।” মেকআপ ম্যান এগিয়ে এলেন তার মুখের ঘাম মুছে দেবার জন্য। হাতে টিস্যু। জয়া তখন আবারো আলাপ শুরু করলেন, এই নাটকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেবার জন্য আসা সত্যিকারের প্রিন্সেস অঞ্জলী অপেরার লাভলীর সঙ্গে। তার কাছ থেকে জয়া জানছেন চরিত্র ফোটানোর জন্য আরো কী কী করা দরকার।
সারা রাত শুটিং দেখা শেষ করে আবারো ঢাকার পথে যাত্রা শুরু হলো। গাড়ি যখন নিরব রাজপথে চলছে, সহকর্মীরা নিজেদের মধ্যে আলাপে মশগুল হয়ে উঠলেন। তাদের কথা শুনে মনে হলো- সব সময়ই আলাদা ধরনের চরিত্রে অভিনয়ের জন্য উন্মুখ হয়ে থাকেন জয়া। আর সেজন্যই এতো পরিশ্রমের মাধ্যমে নিজের অভিনয়ের স্বকীয়তা প্রকাশের চেষ্টা করে চলেছেন তিনি। আমাদের এখন আসলেই ভালো অভিনেতা- অভিনেত্রী প্রয়োজন। যারা অভিনয়গুণে সমৃদ্ধ করবেন আমাদের টেলিভিশন নাটককে।
[ad#co-1]



baje kaj