রঙ্গলাল ও মাইকেল : আধুনিকতার বীজবপন
গৌ ত ম ঘো ষ দ স্তি দা র
কবিয়াল-শাসিত বাংলা কবিতাকে ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত যে কেবল ছাপাখানার আধুনিকতায় পেঁৗছে দিয়েছিলেন, স্ব-সম্পাদিত সংবাদ প্রভাকর (১৮৩১) সংবাদপত্রের পৃষ্ঠায় সংযোজিত হয়েছিল কবিতার ব্যবহারোপযোগিতা, তা-ই নয়; বাংলা কবিতার ইতিহাস তাঁর ক্ষুরধার লেখনী-নির্ভর হয়ে পেঁৗছে গিয়েছিল আধুনিকতার দ্বারপ্রান্তে। মধ্যযুগের সীমান্ত-রেখা হিসেবে তাঁর যে গুরুত্ব, আধুনিকতার সূত্রপাতে তাঁর কবিকৃতির গুরুত্বও সে-হিসেবে কম নয়। তাঁর কাব্যসমগ্রে একদিকে যেমন রয়েছে কবিয়ালদের লোকচারিত্র্য, যুগপৎ তা-ই পরবর্তী কালের কবিদের মধ্যে সঞ্চারিত করেছে নতুনতর কাব্য-রচনার প্রণোদনা। মুখ্যত রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮২৭-১৮৮৭) বা মাইকেল মধুসূদন দত্তর (১৮২৪-১৮৭৩) হাত ধরে বাংলা কবিতা আবার এসে দাঁড়াল এক নূতনতার পটভূমিতে। লৌকিক কবিতা-উপাদান এখানে এসে পুনরায় পুরাণের আশ্রয়ে ফিরে গেলেও, তাঁর অন্তর্নিহিত প্রবণতা যে পুরাণের পুনর্বিচার এবং আধুনিকতার অন্বেষণ, তা আমরা ওই দুই কবির রচনায় অনুভব করেছি। আমরা দেখেছি, রঙ্গলাল ও মাইকেলের কবিতাবলি, পরবর্তী সময়ে, কীভাবে প্রবহমান হয়েছে বিহারীলাল চক্রবর্তী, হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় এবং নবীনচন্দ্র সেনের কবিতায়।
বাংলা কবিতার প্রবহমানতা ঊর্মিল নদীর চেয়েও গভীর, তরঙ্গিণী। ফলে, আমরা দেখেছি, কবিতার বিস্তৃত প্রেক্ষাপটে অনেক সময়ই একদা-প্রধান অনেক কবিই পরবর্তী সময়ে খুবই গৌণ হয়ে পড়েছেন। তথাকথিত বুদ্ধিপীড়িত সমালোচকেরা অনেক কবিকেই কোনো রহস্যময় কারণে নির্বাসন দিয়েছেন। সেইসব কবি হয়তো সার্বিক বিচারে কবিত্বের তীব্র ও চরমতর স্তরে পেঁৗছতে কিছু কম-সক্ষম হয়েছেন। কিন্তু, তার অর্থ কখনোই এই নয় যে, তাঁদের প্রণোদন, প্রণয়ন বাংলা কবিতার বিস্তৃত প্রেক্ষাপটে একেবারেই মূল্যহীন। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন :
প্রকৃতির ঐকতান স্রোতে
নানা কবি ঢালে গান নানা দিক হতে
তাদের সবার সাথে আছে মোর এইমাত্র যোগ,
সঙ্গ পাই সবাকার, লাভ করি আনন্দের ভোগ।
বস্তুত, রবীন্দ্রনাথের এই সামান্য-কটি পঙ্ক্তিতেই নিহিত রয়েছে বাংলা কবিতার সার্বিকতা। যুগে-যুগে বিভিন্ন কবি বাংলা কবিতার শরীরে সাধ্যমতো রক্ত ঢেলেছেন। কারও রচনা সমকাল অতিক্রম করে মহাকালের বিস্তারে লগ্ন হয়েছে, কারও কবিতা সে-ভাবে প্রভাববিস্তারী হয়নি। রবীন্দ্রনাথ কম বয়সে মাইকেলের মেঘনাদবধ কাব্যের বিরূপ সমালোচনা করলেও, পরে আমূল মত পাল্টে ছিলেন; আমরাও জানি, সাফল্য আর ব্যর্থতার ইতিহাসই আসলে বাংলা কবিতার সার্বিক ইতিহাস। চর্যাপদ থেকে শুরু করে সামপ্রতিকতম তরুণতর কবির কবিতাও সেই একসূত্রে বাঁধা। সমস্ত মিলিয়ে, বিভিন্ন কবির কলমে, যেন লেখা হচ্ছে একটিই মহাকবিতা। সে-ক্ষেত্রে কে রামচন্দ্র, বা কে কাঠবিড়াল- সেই বিচার অনেক সময়ই অবান্তর হয়ে যায়। রবীন্দ্রনাথ যেভাবে সারা জীবন আত্মসংশোধনের ভিতর দিয়ে বার বার অতিক্রম করেছিলেন নিজেকে, আমাদেরও সার্বিক আলোচনার ক্ষেত্রে মনে রাখা প্রয়োজন যে, রাজা, সমালোচক বা পরবর্তী কালে সাহিত্য-প্রতিষ্ঠানের আঙুল-দেখানো কবিরাই বাংলা কবিতার শেষ-কথা নন। যথার্থ সমালোচনা যথেষ্ট উদার ও সহানুভূতিসম্পন্ন হয়ে উঠলে বাংলা কবিতার বিস্তৃত ভুবনটিই আরও উজ্জ্বল দেখায়।
বাংলা কবিতা আধুনিকতার দ্বারপ্রান্তে পেঁৗছেছে যেসব কবির লেখনী-নির্ভর হয়ে, আধুনিকতার চূড়ান্ত পর্বে দাঁড়িয়ে আমরা প্রায়শই অনুরূপ কবিদের দিকে উপেক্ষার, অবহেলার, বিদ্রূপের চোখে তাকিয়ে থাকি। আধুনিক ইতিহাসচর্চা যেমন কেবল রাজন্যবর্গের শৌর্য-বীর্য-অত্যাচার-ব্যভিচারেরই ধারাবাহিক কথকতা নয়, কবিতার ইতিহাসও সেরকম। সেখানেও কেউই উপেক্ষণীয় নয়। মধুসূদন, রবীন্দ্রনাথ বা জীবনানন্দ দাশ হন না সকলে, ঠিকই। কিন্তু, সে-জন্য রঙ্গলাল, হেমচন্দ্র, বিহারীলাল, নবীনচন্দ্রদের প্রণয়ন ব্যর্থ হয়ে যায় না। জীবনানন্দ দাশের কিংবদন্তির সুভাষিতকে আমরা এক্ষেত্রে পাল্টে নিয়ে ভাবতে চাই : কেউ-কেউ নয়, সকলেই কবি। কেননা আমাদের বোঝা দরকার, রবীন্দ্রনাথ যেমন লিখেছেন (প্রাগুক্ত), তেমনই এক-একজন কবির রচনাই প্রশস্ত ও সুগম করে দিয়েছে পরবর্তী কবির যাত্রাপথ। এমনকী, এতদূর পর্যন্তও ভাবা যায় যে, একজন তথাকথিত ‘ব্যর্থ’ কবির প্রণয়ন থেকেও পরবর্তী সময়ে আবির্ভূত হতে পারেন কোনও ‘সফল’ কবি। যদিও, আমরা জানি, ওই ব্যর্থ ও সফলের বিচারও অনেক ক্ষেত্রেই আপেক্ষিক। রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পর্কে জনৈক কাব্য-সমালোচক মন্তব্য করেছিলেন :
ইংরাজী ছাঁচে ঢালাই না করিয়া, অন্য জাতে জাত না দিয়া, বাংলা কবিতার চিরন্তন রূপটি যথাসম্ভব বজায় রাখিয়া উৎকৃষ্ট কাব্যরচনা করা যায়- ইহাই প্রতিপন্ন করিতে তিনি বদ্ধপরিকর ছিলেন এবং অল্পবুদ্ধি ব্যক্তির ন্যায় আপনার কৃতিত্বে সম্পূর্ণ আস্থাবান ছিলেন।
যুগে-যুগে কাব্যালোচনায় একরম শ্রদ্ধাহীন উক্তি আমরা কম লক্ষ করিনি। রঙ্গলালের কাব্য-প্রতিভা যত সামান্যই হোক, এহেন মন্তব্য কতখানি রসগ্রাহী সমালোচকোচিত, সে-সম্পর্কে প্রশ্ন থাকেই। বস্তুত, সমালোচনা হওয়া উচিত প্রকাশিত-কাব্যের, কবি যা লিখেছেন তার- কবির পক্ষে কী লেখা উচিত ছিল, তা নির্দেশ করা কবিতা-সমালোচকের কাজ হতে পারে না। রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুরূপ বাক্যবাণ প্রকৃতই প্রাপ্য ছিল কি না, তাঁর কাব্যপাঠের প্রেক্ষিতে, আমরা বুঝে নিতে পারি। রঙ্গলাল সম্পর্কে সমালোচক লিখেছেন :
নবীন ভাবধারার সহিত নামমাত্র সন্ধিস্থাপন করিয়া তিনি প্রাচীনকে জয়যুক্ত করিতে চাহিয়াছেন। ঝপড়ঃঃ, ইুৎড়হ প্রভৃতি কবিদিগের সহিত পরিচয় থাকা সত্ত্বেও তিনি ভারতচন্দ্র ও ঈশ্বর গুপ্তকে কার্য্যতঃ কাব্যগুরু বলিয়া স্বীকার করিয়া লইয়াছিলেন।
২.
আমরা বলেছি, বাংলা কবিতা কেবল রবীন্দ্রনাথ, মধুসূদন, বা জীবনানন্দের মতো মুষ্টিমেয় মহৎ কবির প্রণয়নেই সীমায়িত নয়। তথাকথিত কম-শক্তিশালী কবির সংখ্যা কবিতার ভুবনে যেমন অফুরান, তেমনই তাঁদের ভূমিকাও অবিসংবাদিত। কিন্তু, কে বলতে করতে পারে যে ওইসব অপ্রধান কবিদের আবির্ভাবও প্রধানতম কবিদের রচনার অন্তঃপ্রেরণা হয়ে দেখা দেয়নি।
ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তর সংবাদ প্রভাকর-এ তৎকালীন নবীন কবিরা সম্পাদকের যথেষ্ট প্রীতিভাজন হয়েছিলেন। বঙ্কিমচন্দ্রও প্রথম জীবনে প্রভাকরে কবিতাচর্চা করেছিলেন। আমাদের মনে হয়, সংবাদপত্র এবং সম্পাদকের আস্থাভাজন হওয়ার গূঢ় অভীপ্সাতেই তৎকালীন নবীন কবিরা কাব্যাদর্শ হিসেবে ঈশ্বরচন্দ্রের কবিতাকেই গ্রহণ করেছিলেন। অবশ্য, এই অনুমানযোগ্য ঐহিক কারণ-ব্যতীত অন্য একটি কারণও এখানে কম-গুরুত্বপূর্ণ নয়। তৎকালীন নবীন কবিদের সামনে আধুনিকতার দৃষ্টান্ত হিসেবে ঈশ্বরচন্দ্রের কবিতাও খুবই উজ্জ্বল প্রতিভাত হয়েছিল। ফলে তাঁকেই গ্রহণযোগ্য আদর্শ বলে মনে করেছিলেন তাঁরা। এই গ্রহণ খুব শুভ নাহলেও অস্বাভাবিকও ছিল না। ছিল অনেকটাই অনিবার্য, অমোঘ।
বস্তুত, সেই অমোঘেই আত্মসমর্পিত হয়েছিলেন রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়। অবশ্য, তাঁর সেই সমর্পণ যে একেবারেই নিরবচ্ছিন্ন ছিল, তা নয়। রঙ্গলাল ইংরেজি-শিক্ষায় আলোকিত করেছিলেন নিজেকে। পরবর্তী কালে এডুকেশন গেজেট (১৮৪৬) নামে বিখ্যাত পত্রিকাটির সম্পাদক হিসেবে তিনি তাঁর অন্যতর প্রতিভা ও শ্রমের যথোচিত নিদর্শন রেখেছিলেন। বাংলা কবিতার জগতে, মাইকেলের মতোই, রঙ্গলালের আবির্ভাবের ঘটনাটি যথেষ্ট কৌতূহলের।
সেসময় ইংরেজিয়ানার প্রভাবে ‘ইয়ং বেঙ্গল’ সমপ্রদায় বাংলার আবহমান সংস্কৃতিকে মোটেই সুনজরে দেখত না। এক সাহিত্যসভায় জনৈক তরুণ বক্তার মুখে মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য সম্পর্কে অযৌক্তিক, অশালীন, বিরূপ মন্তব্য শুনে রঙ্গলাল এতটাই আহত ও ক্ষুব্ধ হন যে ১৮৫২ সালে ব্রিটন সোসাইটির অধিবেশনে তিনি ‘বাঙ্গালা কবিতাবিষয়ক প্রবন্ধ’ নামে একটি পালটা বক্তৃতায় ওই প্রবন্ধের তীব্রতর জবাব দিলেন। এবং এই ঘটনা যে রঙ্গলালের কাছে নিছক বাইরের ঘটনা হিসেবেই থাকেনি, তা বোঝা যায় যখন তিনি ভারতচন্দ্র এবং ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তর ঘরানা থেকে বেরিয়ে এসে স্বাদেশিকতা ও ঐতিহাসিক বীররসের গভীরতর বিষয় অবলম্বনে নতুনতর কাব্য-রচনায় ব্যাপৃত হন। মহাকাব্য রচনায় মাইকেলকে আমরা যতটা একক ও সর্বগ্রাসী ভেবে থাকি, ঘটনা সম্ভবত তা নয়। এ-ক্ষেত্রে হেমচন্দ্র-নবীনচন্দ্রের সঙ্গে রঙ্গলালের প্রাথমিক প্রচেষ্টার কথাও আমাদের মনে রাখা দরকার।
বস্তুত, মাইকেলের তিলোত্তমাসম্ভব-এর (১৮৬০) দু-বছর আগেই রঙ্গলাল লিখে ফেলেছিলেন পদ্মিনী-উপাখ্যান কাব্য। এই কাব্যগ্রন্থের সাহিত্য-মূল্য যা-ই হোক না কেন, বোঝা যায়, মাইকেলের আত্মপ্রকাশের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষে এই গ্রন্থ ভূমিকা-স্বরূপ।
তবে, এখানে আরও একটি প্রসঙ্গের উল্লেখ অনিবার্য হয়ে পড়ে। যদিও গদ্যের ক্রমবিকশিত প্রেক্ষিতে রঙ্গলাল কবিতার হাত ধরেছিলেন, কিন্তু তাঁর কাব্যরচনা যত না স্বভাবজ, তার চেয়ে বেশি বাইরের চাপের ফল। ভারতচন্দ্র বা ঈশ্বরচন্দ্রের মধ্যে যে-স্বভাবকবিত্ব ছিল, রঙ্গলালের তা ছিল না। তার ফলে, স্বভাবতই, তিনি কবিতার আধুনিক যুগের অন্যতম প্রবক্তা হলেও, কবিতাকল্পনালতা তাঁর কবিতায় আশ্চর্যরকম দুর্লক্ষ্য। এবং কবিতা-সরস্বতীর এই অকৃপণতা বিষয়ে তিনি যে নিজেই যথেষ্ট সচেতনম, ও সেই কারণে বিষণ্নও, ছিলেন, তা আমরা টের পাই রঙ্গলালের দুটি বিচ্ছিন্ন পঙ্ক্তি থেকে :
কোথা গো কবিতা সতি সুধাস্বরূপিনী।
কেন গো আমার প্রতি এরূপ কোপিনী \\
আমরা দেখেছি, তাঁর পদ্মিনী উপাখ্যান (১৮৫৮), কর্ম্মদেবী (১৮৬২), শূরসুন্দরী (১৮৬৮) এবং কাঞ্চীকাবেরী (১৮৭৯) শীর্ষক আখ্যানকাব্যে গভীরতর অনুভূতি বা কল্পনার ভূমিকা একেবারেই অকিঞ্চিৎকর। এবং পদ্মিনী উপাখ্যান কাব্যের ভূমিকায় রঙ্গলালের ভাষা এই তথ্য স্পষ্ট করে দেয় যে, উনিশ শতকের নতুনতর স্বাদেশিক বোধই আসলে তাঁর কাব্য-রচনার ভূমিকাস্বরূপ। কাব্যিক তীব্রতা না-থাকলেও তাঁর রচনাবলি যে অন্যতর উপযোগ তৈরি করেছিল, আমরা তা টের পাই। এবং এক্ষেত্রে তাঁর সামনে কোনও পূর্ব-নিদর্শন, আদর্শ ছিল না। এককভাবেই তিনি একটি আদর্শ তৈরিতে সচেষ্ট হয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে মাইকেল, হেমচন্দ্র বা নবীনচন্দ্রের মধ্যে যে-প্রেরণা সঞ্চারিত হয়েছিল, তার প্রথম স্ফূরণ যে রঙ্গলালেরই রচনায়, তা অস্বীকার করা যায় না। তা ছাড়া, বাংলাভাষাকে কেবল গদ্যাশ্রিত করে না-রেখে তাকে যে কাব্যের খাতে প্রবাহিত করেছিলেন, বাংলা কবিতাকে পুরনো ধারার বশবর্তী করে না-রেখে তাকে যেতে দিয়েছিলেন পরবর্তী নতুনতর, আধুনিক কাব্য-প্রবাহের দিকে- কেবল সে-জন্যও রঙ্গলালের প্রতি বাংলা কবিতা কৃতজ্ঞ হয়ে থাকবে।
টডের অ্যানাল্স্ অ্যান্ড অ্যান্টিকুইটস অফ রাজস্থান গ্রন্থে আলাউদ্দিনের চিতোর আক্রমণ এবং রানি পদ্মিনীর জহরব্রতে আত্মাহুতির যে-বিবরণ পাওয়া যায়, রঙ্গলাল তার উপর ভিত্তি করেই পদ্মিনী উপাখ্যান কাব্য লিখেছিলেন। ইতিহাস এবং লোকশ্রুতি নির্ভর করে রঙ্গলাল এই একটি কাব্যের মাধ্যমেই একাধারে বীর ও করুণরসের মিশ্রণে পাঠক মনে স্বাদেশিকতার প্রেরণা সঞ্চার করেছিলেন। এবং এই আখ্যায়িত স্বাদেশিক কাব্যসম্ভারের সঙ্গে ঈশ্বরচন্দ্রের স্বাদেশিক কবিতার মৌলিক তফাত রয়েছে।
অবশ্য, একথাও অনস্বীকার্য যে, রঙ্গলাল, স্কট-মুর-বায়রনের ভক্ত-পাঠক রঙ্গলাল, বীররসাশ্রিত মহাকাব্য লিখতে বসেও মহাকাব্যের নিজস্ব ভাষা-ছন্দ-শৈলী তৈরি করে নিতে পারেননি। পয়ার-ত্রিপদী-মালঝাঁপ-একাবলীর গতানুগতিক ক্লান্তি তাঁর বর্ণনা, চরিত্র এবং ভাবকে যথোচিত গাম্ভীর্য ও গভীরতা দিতে সক্ষম হয়নি। তাঁর অতিস্মরণীয় কটি কাব্য-পঙ্ক্তি উদ্ধার করলেই বিষয়টি বোঝা যায় :
স্বাধীনতাহীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে, কে বাঁচিতে চায়।
দাসত্বশৃঙ্খল বল, কে পরিবে পায় হে, কে পরিবে পায়?
কোটিকল্প দাস থাকা নরকের প্রায় হে, নরকের প্রায়।
দিনেকের স্বাধীনতা স্বর্গসুখ তায় হে, স্বর্গসুখ তায়।
উদ্ধৃত পঙ্ক্তি নিচয়ে যে-পৌনঃপুনিক গতানুগতিকতা, তা শ্রেষ্ঠ কাব্যের উদাহরণ নিশ্চয়ই নয়। কিন্তু এর ইতিহাসগত মূল্য অপরিসীম। বাংলা সাহিত্যের অন্যতম ইতিহাসকার অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন :
এ ভাষা অত্যন্ত লঘু ধরনের, কিন্তু মর্মার্থ রুদ্ররৌদ্রাকীর্ণ যুদ্ধভূমিকেই স্মরণ করিয়ে দেয়। তাই বাঙালীর স্বাধীনতার উজ্জীবনলগ্নে এ গান সমর-সঙ্গীতের কাজ করেছিল।
এই কাব্য-উপযোগও কিন্তু কম-কথা নয়।
রঙ্গলালের কাব্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল, তিনি ভারতচন্দ্র বা ঈশ্বরচন্দ্রের অনুসৃত আদি বা স্থূলরসের ধারা থেকে বাংলা কবিতাকে অনেকটাই দূরবর্তী করেছিলেন। কবিওয়ালাদের পথও পরিহার করেছিলেন তিনি। ঈশ্বরচন্দ্রের কষাঘাতের কবিতাও লিখতে চাননি রঙ্গলাল। ঈশ্বরচন্দ্র কিন্তু পক্ষান্তরে ইংরেজের অধীনতা অস্বীকার করেননি। কিন্তু, রঙ্গলাল দেশাত্মবোধকে অন্যতর মাত্রা দিয়েছিলেন পদ্মিনীর উপাখ্যানে। আলাউদ্দিনকে বিদেশি শাসকের পরিপূরক করেই এঁকেছিলেন তিনি। ইতিহাস ও পুরাণকে তিনি সমকালের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে দিয়েছিলেন। সর্বোপরি, প্রাচীন যুগের কাব্যে আমরা যে-অলৌকিক, দিব্য ঘটনার ঘনঘটা লক্ষ করেছি, রঙ্গলালের রচনায় তা একেবারেই অনুপস্থিত। পরবর্তী কালে আধুনিকতার এইসব লক্ষণগুলিই আরও সুচারু হয়ে উঠেছিল মাইকেল, হেমচন্দ্র, নবীনচন্দ্রের রচনায়। অবশ্য, ভাবগত আধুনিকতা থাকলেও রঙ্গলালের রচনারীতি প্রায়শই প্রাচীনত্বের অনুসারী। অতিশয়োক্তি, অনুপ্রাস বা গদ্যসম ভঙ্গিতে তিনি যে প্রায়ই ভারতচন্দ্রের একান্নবর্তী হয়ে পড়েন, তা-ও বিশেষ বলার। যেমন, রঙ্গলাল লিখেছেন :
জ্বালিয়ে ঘৃতের বাতি প্রখর ভাস্কর ভাতি
বৃদ্ধি করা দুরাশা কেবল।
কি কাজ সিন্দুরে মাজি গজ মুক্তা ফলরাজি
মাজিলে কি হয় সমুজ্জ্বল?
সেইরূপ ভূপজার রূপ গুণ চমৎকার
বর্ণনায় ব্যর্থ অকিঞ্চন \\
এসব স্খলন আমাদের এখন চোখে পড়ে। কিন্তু সমকালের প্রেক্ষিতে, বিশেষত যে-সময়ের সামনে আধুনিকতার কোনও উদাহরণই নেই, সে-সময়ে, আধুনিকতার যে-নান্দীমুখ রঙ্গলাল রচনা করেছিলেন, তার মূল্য আসলে অপরিসীম। বিশেষত আমরা যখন পড়ি :
কোন স্থলে মৃদু স্বর করি নিরন্তর
উপরে নির্ঝরচয় মুকুতা-নিকর \\
তরুণ অরুণ ভাতি জ্বলে কোন স্থলে।
প্রবালের বৃষ্টি যেন হ’য়েছে অচলে \\
কোথাও তটিনীকূল কুল কুল স্বরে।
শেখরের শ্যাম-অঙ্গে চারু শোভা করে \\
যেন রঘুপতি হৃদে হীরকের হার।
ঝলমল ভানু করে করে অনিবার \\
তখন মনে না-হয়ে পারে না, পরবর্তী সময়ে বাংলা কবিতার লিরিক-স্রোতের গোপন উন্মেষ যেন এখান থেকেই। একটি বিস্তৃত যুগের সূচনালগ্নে একজন কবি যদি পরবর্তী সময়ের জন্য এ-রকম বীজ বুনে দিতে পারেন, তা কবি-হিসেবে কম সার্থকতা নয়।
৩.
ঘটনাচক্রে পদ্মিনী উপাখ্যান-এর দু’বছর পরে প্রকাশিত হয়েছিল মাইকেলের তিলোত্তমাসম্ভবকাব্য, এবং তারও এক বছর পর বেরিয়েছিল সুবিখ্যাত মেঘনাদবধকাব্য। ফলে, রঙ্গলাল আধুনিক কাব্যযুগের সূচনা-কবির ঐতিহাসিক সম্মান পেয়ে যান। কিন্তু, বাংলা কাব্যের প্রকৃত আধুনিকতার সূত্রপাত যে মাইকেলেরই হাতে, তা আমরা সকলেই জানি। রবীন্দ্রনাথ ভারতী (১৮৭৭) পত্রিকার ফাল্গুন সংখ্যায় ‘মেঘনাদবধকাব্য’ শীর্ষক প্রবন্ধে ছিন্নভিন্ন করেছিলেন মাইকেলের জনশ্রুতিময় কাব্যগ্রন্থটিকে। মাইকেল যে রামায়ণের উচ্চ আদর্শ বিসর্জন দিয়ে রাম-রাবণ-লক্ষ্মণ-বিভীষণ-ইন্দ্রজিৎ আদি চরিত্রগুলির চিরকালীন মহিমা ক্ষুণ্ন, লুপ্ত করেছিলেন, তা সহ্য হয়নি তরুণ রবীন্দ্রনাথের। তিনি লিখেছিলেন :
কেহ কেহ বলেন, ‘অন্য কবি যাহা লিখিয়াছেন তাহাই যে মাইকেলকে লিখিতে হইবে এমন কি কিছু লেখাপড়া আছে?’ আমরা তাহার উত্তর দিতে চাহি না, কেবল এই কথা বলিতে চাহি যে সকল বিষয়েরই ত একটা উচ্চ আদর্শ আছে, কবির চিত্র সেই আদর্শের কত নিকটে পেঁৗছাইয়াছে এই দেখিয়াই ত আমাদের কাব্য আলোচনা করিতে হইবে। স্বাভাবিক অস্বাভাবিক এই দুইটি কথা লইয়া কতকগুলি পাঠক অতিশয় গ গোল করিতেছেন। তাহারা বলে যাহা স্বাভাবিক তাহাই সুন্দর, তাহাই কবিতা, পুত্রশোকে রাবণকে না কাঁদাইলে অস্বাভাবিক হইত, সুতরাং কবিতার হানি হইত। দুঃখের বিষয়, তাঁহারা জানেন না যে, একজনের পক্ষে যাহা স্বাভাবিক আর অন্যজনের পক্ষে তাহাই অস্বাভাবিক। যদি ম্যাকবেতের ডাকিনীরা কাহারো কষ্ট দেখিয়া মমতা প্রকাশ করিত তবে তাহাই অস্বাভাবিক হইত, যদিও সাধারণ মনুষ্যদের পক্ষে তাহা স্বাভাবিক।
বস্তুত, রবীন্দ্রনাথ মাইকেলের কাব্যের অস্বাভাবিকতা একেবারেই মেনে নিতে পরেননি। পরবর্তী সময়ে বুদ্ধদেব বসুও মাইকেলের বিরূপ সমালোচনা করেছিলেন। এইসব সমালোচনা সত্ত্বেও মাইকেলের গুরুত্ব মিথ্যা হয়ে যায় না। কেননা, বাংলা কাব্য যে ওই প্রথম আধুনিকতার লক্ষণবাহী হয়েছিল, তা সর্বাগ্রে স্বীকার করে নিয়েই মাইকেলের কাব্য প্রয়াসের বিবেচনা করা প্রয়োজন।
ভারতচন্দ্র (১৭০৫-১৭৬০) থেকে ঈশ্বরচন্দ্র (১৮১২-১৮৫৯) এবং ঈশ্বরচন্দ্র থেকে রঙ্গলাল পর্যন্ত বাংলা কাব্য প্রবাহের যে স্পন্দন, তা যেন অনেকটাই লোকজীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত। কিন্তু মধুসূদনই বাংলা ভাষার একমাত্র ধ্রুপদী কবি। পূর্ববর্তী কাব্যধারার সঙ্গে তাঁর প্রত্যক্ষ সম্পর্ক ছিল না বললেই চলে। রঙ্গলালের মহাকাব্য রচনার প্রয়াস থেকে মাইকেলের প্রণয়ন যে ভাবে বা বিন্যাসে একেবারেই আলাদা, তা স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত বুঝতে প্রাথমিকভাবে ভুল করেছিলেন। মাইকেলের কাব্যে রোমান্টিকতার চকিত বিচ্ছুরণে তাকে আপাততভাবে বাংলা কাব্যের ধারায় বিচ্ছিন্ন মনে না হলেও তা ছিল আসলেই মাইকেলের ছদ্মবেশ। ক্লাসিকাল ভাব ও ভাবনাই তাঁর কাব্যসমগ্রে সমধিক-বিস্তৃত। বাংলা কবিতার চিরন্তন রোমান্টিক গীতিময়তার সঙ্গে ব্রজাঙ্গনাকাব্য-এর (১৮৬১) সামান্য সম্পর্ক থাকলেও তিলোত্তমাসম্ভবকাব্য, মেঘনাদবধকাব্য বা বীরাঙ্গনাকাব্য (১৮৬২) সবই ক্লাসিকাল কাব্য-গুণান্বিত। সাহিত্যের প্রাচীনতম ধারা মহাকাব্য সততই ক্লাসিকাল বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। মাইকেল যখন প্রাচীন মহাকাব্য অবলম্বনে নতুন করে মহাকাব্য লিখতে গেলেন, তখন মহাকাব্যের ওই গম্ভীর ও গভীর ধ্রুপদী ধর্মকে গ্রহণ করতেই হয়েছিল তাঁকে। মহাকাব্যের লালিত সংস্কার ভাঙতে গিয়ে রাম রাবণকে বিপরীত মহিমা দিলেও, মাইকেল যে আকারে প্রকারে মহাকাব্যিক আদর্শকেই ধ্রুব ভেবেছিলেন, বিদেশি কাব্য পাঠের অভিজ্ঞতা তাঁর মধ্যে গভীরপ্রোথিত ছিল, এই অবলোকন একাধারে বিস্ময়বহ ও স্বাভাবিক। কেননা তিনি নিজেই স্বীকার করেছিলেন : ও ষড়াব ঃযব মৎধহফ সুঃযড়ষড়মু ড়ভ ড়ঁৎ ধহপবংঃড়ৎং. ওঃ রং ভঁষষ ড়ভ ঢ়ড়বঃৎু.
এ-জন্যেই প্রাচীন মহাকাব্যকে নতুন করে লিখতে প্রবৃত্ত হয়েছিলেন তিনি। বাংলার তথাকথিত নবজাগরণ এবং ‘ইয়ং বেঙ্গলি’ উগ্রতার সঙ্গে মাইকেলের রক্তে যে সুপ্ত ছিল ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতাও, সে কথা আমাদের না ভোলাই ভালো। প্রসঙ্গত আমরা বিষ্ণু দে’র মাইকেল বিশ্লেষণের অংশ বিশেষভাবে মনে করতে চাই। ‘মাইকেল ও আমাদের রেনেসান্স’ শীর্ষক নাতিদীর্ঘ প্রবন্ধের প্রায় শুরুতেই বিষ্ণু দে লিখেছিলেন :
বাপমা-র আদুরে ছেলে, মাইকেল হয়তো ঠিক একটা আদর্শ গৃহশিক্ষা পাননি, তবে তাঁর মায়ের কল্যাণে দেশের কাব্যজগতে তিনি শৈশবেই প্রবেশ করেছিলেন। শৈশবের এই পরিগ্রহণই পরে বাংলা পদ্যের মর্মস্থল অন্বেষণের অধিকার দিয়েছিল এই ইউরোপ-মাতাল শক্তিধরকে। কারণ সেকালের বহু নব্যশিক্ষিত বাবুদের মতো মাইকেলও ক্যানিঙের উপমা-মরীচিকার পিছু-ধাওয়া করেছিলেন এবং একেবারে বালক বয়সেই এই অসাধ্যসাধনের আরম্ভ। কিন্তু রামায়ণ, মহাভারত এবং কবিকঙ্কন চ ী যশোর-খিদিরপুরের ছেলেরও রক্তের মধ্যে অমর হয়ে রইল। বস্তুত মাইকেলের প্রতিভার বৈশিষ্ট্য প্রতিষ্ঠিত ও বিকশিত হয় এই দ্বন্দ্বের মধ্যে দিয়েই, কারণ এই ঐক্যভঙ্গ সারা ইঙ্গভারতীয় যুগের ভিত্তিতে, সামাজিক রাজনৈতিক মানসিক সব অর্থেই।
অর্থাৎ প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য ভাবধারাগত এক দ্বন্দ্বমূলক যুগলবন্দিই রচনা করতে চেয়েছিলেন মাইকেল। লেখা-অতিরিক্ত, সেই চাওয়াটাই, গুরুত্বের প্রয়াসটিই, ঔজ্জ্বল্যের, তাঁর চুলচেরা সাফল্য বা ব্যর্থতা নয়। তাই আজ আমরা যখন বহুযুগ পেরিয়ে এসে মাইকেলের পাঠ নিতে যাই, তখন সবিস্ময়ে লক্ষ করি, তাঁর মাত্রই সাত বছরের (১৮৫৯-১৮৬৬) কবিতাচর্চা আজও কীভাবে উদ্ভাসিত করে আমাদের।
মাইকেল বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক বিস্ময়কর প্রতিভা। কেবল সাত বছরের সীমায়িত সাহিত্য জীবনই নয়, রচনার সংখ্যায়ও তিনি খুবই হ্রস্ব। সর্বোপরি, কোনওরকম পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়াই তিনি বাংলা লিখতে এসেছিলেন। আমরা সকলেই জানি, তাঁর প্রকৃত পিপাসা এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল ঐহিক সাফল্য অর্জনের। সে জন্য তিনি যেমন বর্জন করেছিলেন বাঙালি পোশাক, হিন্দুর ধর্ম, তেমনই রক্তের ভাষাটিও। তিনি বায়রনের সমকক্ষ কবি হওয়ার দুরাশা পোষণ করেছিলেন। মাদ্রাজে থাকাকালীন নানা ইংরেজি পত্রপত্রিকার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। সেসময়ে ১৮৪৮-৪৯ সালে, ম্যাড্রাস সারকুলেটর পত্রিকায় তিনি ‘টিমোথি পেনপোয়েম’ ছদ্মনামে এ ভিসন – ক্যাপটিভ লেডি নামে একটি কাব্যে পৃথ্বীরাজ-সংযুক্তার প্রণয়কাহিনী বর্ণনা করেন। কিন্তু স্বভাবতই ভিন ভাষায় লেখা কাব্যটি মোটেই মাইকেলের আশানুরূপ যশোবাহী হয়নি। বন্ধু গৌরদাস বসাক সেসময় কবিকে বাংলায় কাব্য রচনার অনুপ্রেরণা জোগান। প্রবাসে ক্ষতবিক্ষত মাইকেলের শেষপর্যন্ত বোধোদয় হয়, বুঝতে পারেন বাংলাভাষা ছাড়া আর কোনও আশ্রয় নেই তাঁর। তিনি গৌরদাসকে সেই সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে লেখেন : “অস ও হড়ঃ ঢ়ৎবঢ়ধৎরহম ভড়ৎ :যব মৎবধঃ ড়নলবপঃ ড়ভ বসনবষষরংযরহম :যব :ড়হমঁব ড়ভ সু ভধঃযবৎং?”
তিনি উপলব্ধি করেন :
[...] তব কণ্ঠস্বর
যেন পূর্বজন্ম হতে পশি কর্ণ ‘পর
জাগাইছে অপূর্ব্ব বেদনা।
No comments yet
উত্তর রেখে যান