স্বাধীনতার ঘোষণা : যার যা প্রাপ্য

ব্যা রি স্টা র মো হা ম্ম দ আ লী
সম্প্রতি বঙ্গবন্ধুকে স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে রায় দিয়েছেন হাইকোর্টের একটি ডিভিশন বেঞ্চ। আমরা আশা করেছিলাম এ রায়ের ফলে দীর্ঘদিনের বিতর্কের অবসান ঘটবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আমরা এর উল্টোটা দেখতে পেলাম। রায়কে কেন্দ্র করে উভয়পক্ষের সুশীল সমাজ ও বুদ্ধিজীবীরা যার যার পক্ষে যুক্তিতর্ক উত্থাপন করে বিষয়টিকে প্রায় আদালত অবমাননার পর্যায়ে নিয়ে গেছেন। মূলত আওয়ামী লীগ ও বিএনপির রাজনীতির মূল বিরোধ এ ইস্যুকে কেন্দ্র করেই সৃষ্টি করা হয়েছে। সেই সঙ্গে গোটা দেশ ও জাতিকেও স্বীয় কায়েমি স্বার্থে সুকৌশলে বিভক্ত করে রাখা হয়েছে। যেন আমরা আমাদের জš§ বিতর্কের পংকিলতায় চিরদিন নিমজ্জিত থেকে জাতি হিসেবে কোন দিন মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে না পারি।
বিস্মৃতিপরায়ণ জাতি হিসেবে আমাদের একটা অপবাদ থাকলেও মাত্র ৩৭ বছর আগের ঘটনা আমরা বেমালুম ভুলে যাব তা কি করে সম্ভব? মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রজšে§র বিরাটসংখ্যক মানুষ এখনও বেঁচে আছে এবং আমাদের জীবদ্দশাতেই ইতিহাস বিকৃতির প্রচেষ্টা লজ্জাকর ও অপমানজনক ঘটনা ছাড়া আর কিছু নয়। তাই আমাদের জীবদ্দশাতেই এই অপচেষ্টার কবর দিতে হবে, নইলে জাতিগত দৃঢ়ীকরণ আর কোন দিন সম্ভব হবে না।
তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান কর্তৃক কালুরঘাট রেডিও স্টেশন থেকে ২৭ মার্চের সন্ধ্যা ৭টা ৪৫ মিনিটে প্রদত্ত ভাষণটির পটভূমি, প্রকৃতি ও মর্ম আমাদের অনুধাবন করতে হবে।
এর আগের দিন অর্থাৎ ২৬ মার্চের কালরাতে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করার সঙ্গে সঙ্গে সারাদেশে পাকবাহিনী বিডিআর, পুলিশ, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীসহ সাধারণ মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করে ধ্বংসযজ্ঞ কায়েম করে। বঙ্গবন্ধু গ্রেফতার হওয়ার আগে কোনরকম আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই লিখিত বিবৃতির মাধ্যমে তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দেন, যা তৎকালীন ইপিআরের সিগন্যালে কর্মরত সদস্য সুবেদার মেজর সাখাওয়াত হোসেন ও অন্য বাঙালি সদস্যরা প্রচারের ব্যবস্থা করেন। স্বাধীনতা ঘোষণার লিখিত একটি কপি টিএন্ডটির মগবাজারস্থ ওয়্যারলেস স্টেশনেও পৌঁছানো হয়। বঙ্গবন্ধুর ইংরেজিতে লিখিত বিবৃতিটি চট্টগ্রামস্থ ড. মনজুলা আনোয়ার অনুবাদ করেন। কাজী হোসনে আরা, মাহবুব হাসান, বেলাল আহমেদ এবং আবুল কাশেম সন্দ্বীপ ভাষণটি প্রচারের উদ্দেশ্যে কালুরঘাট রেডিও স্টেশনে যান, কিন্তু অনুমতির অভাবে তাদের পক্ষে প্রচার করা সম্ভব হয়নি। সে সময় তারা তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমানের সাহায্য কামনা করেন এবং সেদিন তিনি স্বদেশপ্রেমী একজন সেনা কর্মকর্তা হিসেবেই তার দায়িত্ব পালন করেন। তিনি তার ভাষণে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে ও তার নেতৃত্বে সাময়িকভাবে প্রজাতন্ত্রের প্রধান হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণের কথা জানান এবং বঙ্গবন্ধুর নামে সবাইকে পাকবাহিনীর আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান করেন।
তৎকালীন মেজর জিয়া কর্তৃক প্রদত্ত ভাষণটি চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে অবস্থানকারী একটি জাপানি জাহাজের রেডিওতে তা ধরা পড়ে এবং পরবর্তী সময়ে অস্ট্রেলিয়া রেডিও কর্তৃক প্রচারিত হয়। আমরা সাবেক রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়ার ভাষণটি বিশ্লেষণ করলে দেখতে পাই যে, তিনি কখনোই সেখানে নিজের নাম বা কৃতিত্ব দাবি করেননি আর এর কোন সুযোগও সে সময় ছিল না। কেননা সাড়ে সাত কোটি বাঙালি তখন স্বাধীনতার মন্ত্রে পাগলপ্রায় এবং তাদের হƒদয় ও চেতনায় শুধু বঙ্গবন্ধু বিরাজমান। জেনারেল জিয়াউর রহমান তার জীবদ্দশায় কখনও স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে নিজেকে দাবি করেননি। কেননা তিনি ভালোভাবে জানতেন, তিনি ছিলেন ওই সময়ে একজন ঘোষণাপত্র পাঠকারী মাত্র।
তাই তাকে আমরা পরম শ্রদ্ধায় স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠকারী হিসেবে আখ্যায়িত করতে পারি। প্রশ্ন আসে, তিনি যদি ২৭ মার্চ সন্ধ্যায় বঙ্গবন্ধুর নামে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ না করতেন তাহলে কি আমাদের পক্ষে স্বাধীনতা অর্জন সম্ভব হতো না? অবশ্যই সম্ভব হতো। কেননা তিনি আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে কোন নিয়ামক কিংবা নিয়ন্ত্রক শক্তি হিসেবে কাজ করেননি বরং তার ভূমিকা ছিল সহায়ক। কেননা স্বাধীনতা যুদ্ধ ২৬ মার্চ রাতেই শুরু হয়ে গিয়েছিল, যা সংবিধানের প্রথমেই বর্ণিত আছে। পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে সমগ্র বাঙালি জাতির ঘৃণা ও ধিক্কারের মাত্রা সে দিন চরম পর্যায়ে পৌঁছেছিল। তাই বাঙালি জাতি কারও ঘোষণার জন্য সেদিন অপেক্ষা করেনি। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশমতো আমাদের যার কাছে যা ছিল তাই নিয়ে যুদ্ধে নেমে পড়েছিলাম। তাই বলে মেজর জিয়ার অবদানকে খাটো করে দেখার কোন অবকাশ নেই। তিনি জেড ফোর্সের কমান্ডার ছিলেন এবং মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন। আমাদের ওই সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে মেজর জিয়ার ভূমিকাকে মূল্যায়ন করতে হবে। আমরা নিজেদের স্বার্থে রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়াউর রহমানের সঙ্গে মেজর জিয়াকে যেন গুলিয়ে না ফেলি এবং বেশি আবেগপ্রবণ হয়ে বঙ্গবন্ধুর সমকক্ষ কিংবা প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করানোর জন্য তাকে নিয়ে টানাহেঁচড়া না করি। এর ফলে জেনারেল জিয়ার মর্যাদা কখনোই বাড়বে না।
তবে বঙ্গবন্ধুর নামে তার এ ঘোষণার সাংবিধানিক কোন গুরুত্ব না থাকলেও কৌশলগত মূল্য অবশ্যই ছিল। তখনও মুজিবনগর সরকার গঠন হয়নি। তাই সাময়িকভাবে হলেও বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ইপিআর ও পুলিশ বাহিনীকে সংগঠিত হওয়ার জন্য এ ভাষণ উৎসাহ যুগিয়েছে।
স্বাধীনতার পটভূমি
আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাস অত্যন্ত দীর্ঘ ও রক্তাক্ত। দীর্ঘ ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকে এদেশের অসংখ্য সূর্যসন্তান বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে আমাদের স্বাধীনতার আন্দোলনকে এগিয়ে দিয়ে গেছে। ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৬-এর ছয় দফা আন্দোলন, ১৯৬৮-এর আগরতলা ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণআন্দোলন, সত্তরের নির্বাচন এবং সর্বশেষ ১৯৭১-এর স্বাধীনতা যুদ্ধ সবই একই সুতোয় বাঁধা। শেখ মুজিবুর রহমান প্রতিটি আন্দোলনেই ক্রমশ উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর নক্ষত্রে পরিণত হয়েছেন। সাধারণ মানুষ থেকে অসাধারণ এক মহামানব তথা মহানায়কে রূপান্তরিত হয়েছেন। ইতিহাসের দীর্ঘ পথযাত্রায় এই পুরোধা ব্যক্তিত্ব প্রতিটি পদক্ষেপ নিয়েছেন অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে। ঐতিহাসিক ছয় দফা ছিল পশ্চিম পাকিস্তানিদের শোষণ ও অপশাসনের বিরুদ্ধে বাঙালির মুক্তির প্রাথমিক সনদ। শেখ মুজিব যদি সেদিন ছয় দফা প্রণয়ন না করতেন, তাহলে বাঙালির স্বাধীনতা প্রাপ্তি আরও কয়েক যুগ কিংবা শতাব্দী পিছিয়ে যেত। মওলানা ভাসানীর নিষেধ উপেক্ষা করে গোলটেবিল বৈঠকে যোগদান, সত্তরের সাধারণ নির্বাচনে অংশগ্রহণ সবই ছিল এই মহানায়কের অসাধারণ প্রজ্ঞা ও ধীশক্তির বহিঃপ্রকাশ। যদি তিনি আলোচনায় না বসতেন তবে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতো না আর নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করলে সংসদীয় দলের নেতা নির্বাচিত হতে পারতেন না। নির্বাচনে বিজয় লাভের পরও যখন তাকে ক্ষমতা দেয়া হল না, বিশ্বশক্তির সহানুভূতি তিনি তখন ক্রমশ পেতে শুরু করলেন এবং এরই একপর্যায়ে তিনি শেখ মুজিব থেকে বঙ্গবন্ধুতে পরিণত হলেন। এ সময় আলোচনার পাশাপাশি তিনি তীব্র গণআন্দোলনের নেতৃত্ব দিলেন। আকাশে বাতাসে তখন কেবল বঙ্গবন্ধু ধ্বনি উচ্চারিত হতে লাগল। সাংবিধানিক ক্ষমতায় না থাকলেও তার নির্দেশেই সমগ্র বাঙালি জাতি পরিচালিত হয়েছে। ৭ মার্চকে বাদ দিয়ে বাঙালির স্বাধীনতার ইতিহাস রচনা করা কোন ইতিহাসবেত্তার পক্ষেই সম্ভব নয়। ৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার দর্শন ও ঘোষণা, স্বাধীনতা যুদ্ধের আহ্বান, দিকনির্দেশনা ও পরিকল্পনা অর্থাৎ প্রয়োজনীয় সবকিছুই প্রদান করেছিলেন।
দেখা যায়, ইতিহাসের এ দীর্ঘ পথপরিক্রমার চূড়ান্ত পর্যায়ে বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তার সমসাময়িক কিংবা আগে ও পরের সব জাতীয় নেতা বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধুর মাঝে তাদের অজান্তেই বিলীন হয়ে গেছেন মত ও পথ ভুলে। অবশ্য এছাড়া তাদের আর কোন উপায় তখন ছিল না। যেমনটিÑ পদ্মা, মেঘনা, যমুনা মিশে একাকার হয়ে গেছে বঙ্গোপসাগরে।
বঙ্গবন্ধুর জাদুকরী বজ্রকণ্ঠ, অপার দীপ্তিমান মোহময়ী ব্যক্তিত্ব, কঠিন ত্যাগ, অকৃত্রিম দেশপ্রেম, প্রজ্ঞা, ধীশক্তি ও নিখুঁত পরিকল্পনা ইত্যাদি গুণাবলী তাকে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালির উচ্চতায় নিয়ে গেছে। তিনি আমাদের ভৌগোলিক ও ভাষার স্বাধীনতা এবং এর সঙ্গে গাঢ় সবুজের ওপর লাল সূর্যখচিত একটি জাতীয় পতাকা উপহার দিয়েছেন, যা সব জাতির জন্যই চিরদিনের কাক্সিক্ষত বস্তু। অনেক কট্টর সমালোচক প্রায়ই বলে থাকেন, শেখ মুজিব তো যুদ্ধ করেননি, তিনি পাকবাহিনীর কাছে আÍসমর্পণ করেছেন। তারা হয়তো তাদের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার কারণে কিংবা বিরোধিতার জন্য বিরোধিতার কারণে এমনটা বলে থাকেন। তাদের জ্ঞাতার্থে বলি, বঙ্গবন্ধু যদি সেদিন আÍগোপন করতেন, তাহলে হয়তো তাকে খোঁজার নামে কত হাজার নিরীহ জনসাধারণকে প্রাণ দিতে হতো তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বঙ্গবন্ধু এ শংকা থেকেই সেদিন আÍগোপন করেননি। এছাড়া তিনি যদি সত্যিই আÍগোপন করতেন, তাহলে কখনও ধৃত কিংবা গেরিলা নেতা প্রভাকরণের মতো তাকে প্রাণ দিতে হতো না, তারইবা নিশ্চয়তা কে দিত? আর সে ভয়ংকর পরিস্থিতিতে স্বাধীনতার সূর্য কি আদৌ উদিত হতো? আগেই বলেছি, বঙ্গবন্ধুর মতো প্রাজ্ঞ ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতা তার সমসাময়িককালে কেউ ছিল না। আর সেজন্যই তিনি বিশ্বকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন, তিনি নির্বাচন, গণতন্ত্র এবং আলোচনায় বিশ্বাসী। একই সঙ্গে তিনি সশস্ত্র যুদ্ধের সব পরিকল্পনা নিখুঁতভাবে করে রেখেছিলেন বলে আমার কাছে প্রবলভাবে প্রতীয়মান হয়েছে। তিনি সেদিন সশরীরে যুদ্ধক্ষেত্রে না থেকেও আদর্শ ও অনুপ্রেরণা হয়ে আমাদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যুদ্ধ করেছেন যুদ্ধক্ষেত্রে।
সবশেষে বলতে চাই, বঙ্গবন্ধুকে মূল্যায়ন করতে হলে বিশ্বমানের মাপকাঠি দরকার। তার সঙ্গে জর্জ ওয়াশিংটন, মহাÍা গান্ধী, হোচিমিন, কামাল পাশা, ফিদেল ক্যাস্ট্রোর মতো প্রমুখ সংগ্রামী নেতার তুলনা চলে। তাই আমি সংশ্লিষ্ট সবাইকে অনুরোধ জানাব যে, আপনারা এমন আইন পাস করুন কিংবা নির্দেশ দিন যেন বঙ্গবন্ধু কিংবা জেনারেল জিয়াকে কেউ কটূক্তি করে অপমানিত না করতে পারে। যার যার স্থানে তাকে মূল্যায়িত করা হোক।
ব্যারিস্টার মোহাম্মদ আলী : আইনজীবী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

No comments yet

উত্তর রেখে যান