সম্রাট আকবর (১৫৪২-১৬০৫)

akbarপিতা হুমায়ুনের পলাতক জীবনে ২৩ নভেম্বর ১৫৪২ খ্রিস্টাব্দে সিন্ধু প্রদেশের অমরকোট নামক স্থানে মোগল বংশের সর্বশ্রেষ্ঠ সম্রাট আকবরের জন্ম। মাত্র ১৩ বছর বয়সে ১৫৫৬ সালে আকবর সিংহাসনে বসেন। বিশ্বস্ত সেনাপতি বৈরাম খাঁ তার প্রতিনিধি নিযুক্ত হন।
আকবরের পুরো নাম জালালুদ্দীন মুহম্মদ আকবর।
আকবর যখন সিংহাসনে আরোহণ করেন তখন ভারতের রাজনৈতিক অবস্থা ছিল অত্যন্ত বিশৃঙ্খল। হুমায়ুন মৃত্যুর আগে কেবল পাঞ্জাব, আগ্রা ও দিল্লি উদ্ধার করে গিয়েছিলেন, কিন্তু সাম্রাজ্য সুসংহত করে যেতে পারেননি। অভিভাবক বৈরাম খাঁর সহযোগিতায় আকবর সব বিদ্রোহ কঠোর হস্তে দমন করেন।
আফগান নেতা আদিল শাহের সেনাপতি হিমু ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দে দিল্লি আক্রমণ করলে সেনাপতি বৈরাম খাঁর নেতৃত্বে মোগল সৈন্যরা পানিপথ প্রান্তরে হিমুকে পরাজিত ও নিহত করেন। ইতিহাসে এ যুদ্ধ দ্বিতীয় পানিপথের যুদ্ধ নামে পরিচিত।
আঠারো বছর বয়সে আকবর নিজের হাতে রাজ্য শাসনের ভার গ্রহণ করেন। বৈরাম খাঁ বিদ্রোহী হলে তাকে পরাজিত করে মক্কায় হজ পালনের উদ্দেশে পাঠিয়ে দেন।
সব বিশৃঙ্খলা দমন করে আকবর রাজ্য বিস্তারে মনোনিবেশ করেন। গুজরাট, বাংলা, বিহার, কাশ্মীর ও কাবুল জয় করার পর তিনি দাক্ষিণাত্য আক্রমণ করেন। তার রাজ্য উত্তরে হিমালয়, পশ্চিমে কান্দাহার, দক্ষিণে বেরার এবং পূর্বে বঙ্গদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।
সম্রাট আকবর প্রায় ৫০ বছর রাজত্ব করেছিলেন। এর বেশিরভাগ সময় তাকে যুদ্ধবিগ্রহে লিপ্ত থাকতে হয়েছে।
আকবর একজন সুশাসক ছিলেন। শাসনকার্যের সুব্যবস্থার জন্য তিনি তার সাম্রাজ্যকে ১৫টি সুবা বা প্রদেশে বিভক্ত করেন। তিনি জায়গীর প্রথা বিলোপ করেন এবং সব জমি রাষ্ট্রীয় সম্পত্তিতে পরিণত হয়।
শাসন ব্যবস্থায় ও সামাজিক ক্ষেত্রে আকবর অনেক সংস্কার সাধন করে গেছেন। তিনি যুদ্ধবন্দিদের দাস করার প্রথা বিলোপ করেন। ১৫৬৪ খ্রিস্টাব্দে হিন্দুদের ওপর থেকে জিজিয়া কর তুলে নেন।
আকবর সতীদাহ প্রথার বিরোধী ছিলেন। ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো নারীকে স্বামীর চিতায় পুড়িয়ে মারা যাবে নাÑ এ মর্মে তিনি এক আদেশ জারি করে গিয়েছিলেন। এছাড়া তিনি বাল্যবিয়ে বন্ধ ও বিধবাদের পুনর্বিবাহের পক্ষপাতী ছিলেন।
আকবর সব ধর্মের সার সমন্বয়ে ‘দীন-ই-এলাহী’ নামক একটা ধর্মমত প্রচার করেছিলেন। কিন্তু এ ধর্মমত বিশেষ কেউ গ্রহণ করেননি। হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের জন্যই তিনি এ ধর্মমত প্রচার করেন। রাজ্য পরিচালনার ক্ষেত্রে আকবর হিন্দুদের বিশেষ সুযোগ-সুবিধা দিয়েছিলেন। রাজস্ব সচিব রাজা টোডরমল এবং সেনাপতি রাজা মানসিংহ তাদের অন্যতম।
আকবর সাহিত্য ও শিল্পের অনুরাগী ছিলেন। বিখ্যাত প-িত আবুল ফজল এবং সঙ্গীতজ্ঞ মিঞা তানসেন তার সভাসদ ছিলেন। তার রাজত্বকালেই বিখ্যাত হিন্দি কবি তুলসীদাস হিন্দি ভাষায় রামায়ণ রচনা করেছিলেন। তার সভাসদ ও বন্ধু আবুল ফজল রচিত ‘আকবরনামা’ ও ‘আইন-ই-আকবরী’ আকবরের জীবন ও শাসন সম্পর্কে প্রামাণ্য গ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃত।
পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শাসকদের মধ্যে আকবর অন্যতম হিসেবে বিবেচিত হয়ে আছেন।
২৭ অক্টোবর ১৬০৫ খ্রিস্টাব্দে তার মৃত্যু হয়। আগ্রার অদূরে সেকেন্দ্রা নামক স্থানে আকবরের সমাধি রয়েছে।

No comments yet

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

Follow

Get every new post delivered to your Inbox.