রাজা রামমোহন রায় (১৭৭২-১৮৩২)

বাঙালিদের মধ্যে প্রথম আধুনিক দৃষ্টিসম্পন্ন চিন্তানায়ক, সমাজ সংস্কারক ও কর্মবীর। ১৭৭২ সালে হুগলি জেলার রাধানগর গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে রামমোহন রায়ের জন্ম। রামমোহন একদিকে সংস্কৃত পড়েন, অন্যদিকে ফার্সি শেখেন। আরবি-ফার্সি পড়তে গিয়েই প্রচলিত হিন্দুধর্মের সংস্কার ও আচার-অনুষ্ঠান বিষয়ে তার মনে সংশয় জাগে।
পনের-ষোলো বছর বয়সে তিনি ঘর ছেড়ে চলে যান কাশীতে। তারপর কিছুকাল থাকেন পাটনায়। এ সময় তিনি মনোযোগ দিয়ে বেদ ও উপনিষদ পাঠ করেন।
রামমোহন ১৮০৫ থেকে ১৮১৪ সাল পর্যন্ত রংপুরে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানরূপে কাজ করেন। পরে ১৮১৫ সালে স্থায়ীভাবে কলকাতায় বসবাস শুরু করেন। তখন থেকেই তিনি ধর্ম ও সমাজ সংস্কারের কাজে আত্মনিয়োগ করেন। তিনি বেদ ও উপনিষদ বাংলায় অনুবাদ করে প্রচার শুরু করেন। তিনি ছিলেন একেশ্বরবাদে বিশ্বাসী এবং ব্রাহ্মধর্মের প্রবর্তক। হিন্দুধর্মের গোঁড়ামি ও অজ্ঞানতা দূর করার জন্য তিনি ১৮১৫ সালে ‘আত্মীয় সভা’ প্রতিষ্ঠা করেন। এ আত্মীয় সভাই পরে ১৮২৮ সালে ‘ব্রাহ্মসমাজ’-এ রূপলাভ করে।
১৮১৮ সালে তিনি ‘প্রবর্তক ও নিবর্তকের সম্বাদ’ নামে একটি পুস্তিকা লিখে প্রমাণ করেন, সতীদাহ প্রথা অন্যায় এবং এ বিষয়ে হিন্দুদের ধর্মশাস্ত্রে কোনো বিধান নেই। রামমোহন রায়ের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ১৮২৯ সালে সতীদাহ প্রথা নিষিদ্ধ করা হয়। ধর্মমত প্রচারের উদ্দেশ্যে তিনি বাংলা ও ইংরেজিতে বেশ কয়েকটি সাময়িক পত্র সম্পাদনা করেছিলেন।
রামমোহন রায় ছিলেন বহু ভাষাবিদ। বাংলা ছাড়াও তিনি সংস্কৃত, আরবি, ফার্সি, হিব্রু, গ্রিক, লাতিন ও ইংরেজি ভাষা জানতেন। তিনি ছিলেন আধুনিক মন ও মননের অধিকারী। তার কথা ছিল ইংরেজি ও বিজ্ঞান শিখতে হবে, জানতে হবে আধুনিক বিশ্বকে।
দিল্লির বাদশাহ তাকে ‘রাজা’ উপাধি দিয়েছিলেন। ১৮৩০ সালে তিনি ইংল্যান্ডে যাত্রা করেন। ইংল্যান্ডের সম্ভ্রান্ত ও বিদ্বানসমাজ তাকে যথাযোগ্য মর্যাদায় গ্রহণ করে। ১৮৩২ সালে তিনি ফ্রান্সে যান। ফেরার পথে ব্রিস্টলে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং ২৭ সেপ্টেম্বর ১৮৩২ সালে তার মৃত্যু হয়। ব্রিস্টলেই রাজা রামমোহন রায়ের সমাধি রয়েছে। তিনি ফরাসি বিপ্লবের সমর্থক ছিলেন বলে জানা যায়।

No comments yet

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

Follow

Get every new post delivered to your Inbox.